অ(ন)ন্য মহীনের ভূমিকায় || সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়

অ(ন)ন্য মহীনের ভূমিকায় || সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়

SHARE:

আমরা যারা আনপড় পাবলিক, যারা একটু-আধটু গুরুচণ্ডা৯ করি, নেটে যত্রতত্র উড়ে বেড়াই এবং পল্লবগ্রাহী বলে আখছার গাল খাই, মহীনের ঘোড়াগুলি সম্পর্কে তারা শুধু এইটুকু জানি, যে, সত্তরের দশকের কোনো-এক সময় ছাদভর্তি সদ্যোজাত অ্যান্টেনার তারকাঁটায় কান্নিক খেয়ে উৎপটাং লাট্টুর মতো দুনিয়ার ছাদনাতলায় টপকেছিল এই অজানা উড়ন্ত বস্তুরা। ললিতলবঙ্গলতা-কাটিং ঝিনচ্যাক হিন্দি গানে যখন জগৎ কোমর দোলাচ্ছে, তখন তাদের ব্যাকগ্রাউন্ডে ছিল নিভন্ত নকশালবাড়ি, কোমরের খাপে আধখানা সলিল চৌধুরী, তেরো আউন্স বাউল এবং দু-ছিপি জ্যাজ ও কীর্তনের গলাজ্বালানো মিক্সচার। তাদের সৃষ্টিরহস্য ছিল যৌথতার ধূসরত্বে ঢাকা, জীবনের বাঁদিকের বুকপকেটে জীবনানন্দ দাশ, ঈষৎ অধিকই ছিল বিষণ্ণতা। গানবাজনা হয়েছিল বিস্তর, তারচেয়েও বেশি উড়েছিল ক্ষ্যাপামির ধুলো, কারণ এই ধাবমান অশ্বগণের বগলের নিচে দু-পিস ইচ্ছেডানা থাকলেও খুরে কোনো নাল ছিল না।

আমরা, যারা ইন্টারনেটে চরে খাই, যারা ফুস করে পেরিয়ে এসেছি সত্তরের মৃত্যু-উপত্যকা, দু-একটি পেরেস্ত্রোইকা ও সোভিয়েত পতনের শব্দ, যুগপৎ বার্লিনের পাঁচিল ও ওয়াই-টুকে টপকে দেখে নিয়েছি রূপকথার টুকটাক কেটে পড়া, তারা এও বিলক্ষণই জানি, যে, এসবই কুয়াশাতুলিতে আঁকা শহরতলির প্রাচীন অরণ্যপ্রবাদ মাত্র। আদতে মহীনের ঘোড়াগুলি কী ও কেন, সে-রহস্য এখনও বিশবাঁও জলতলে। একথা কখনও স্পষ্ট করে জানা যায়নি, যে, ওই আশ্চর্য যানের ঘোড়ারা কারা। এ ভিনগ্রহী ঘোড়ারা কি মূলত অন্তর্ঘাতী, ব্যর্থ বিপ্লবপ্রচেষ্টার পর যারা গা ঢাকা দেয় গোপন কন্দরে? নাকি উদ্ধত-হয়গণ বাঁচেই এক বিকল্প জীবনাচরণে, স্রেফ ভালোবেসে স্বেচ্ছা প্রব্রজ্যায় চলে যায় এই সুরে, বহুদূরে। এই অশ্বখুরের দাপাদাপি কি এক রাজনৈতিক প্রকল্প, এ হ্রেষাধ্বনি কি এক সাংগীতিক উপপ্লবের সংকেতচিহ্ন? নাকি এসব স্রেফ পরতে পরতে কবিতা আর সব-হারানোর-বেদনামাখা বিষণ্ণতার গান, যাদের ‘ভালোবাসি’ উচ্চারণের আগে অব্যর্থভাবে জুড়ে থাকে ‘হায়’। এ ভালোবাসার প্রকরণ কি প্রিলুডের সিম্ফনিক শৃঙ্খলায় বাঁধা, নাকি ‘ভালো লাগে না’-র হাহাকার, ইম্প্রোভাইজেশন আর স্বত্ঃস্ফূর্ততায়?

মহীনের গানই-বা কোনগুলো, সে-রহস্যও ঘনঘোর। আমরা যারা গুরু ও চণ্ডাল, বচ্ছরভর লেখালিখি নামক আগাছা ও ফলমুলের চাষাবাদ করি, বইমেলায় ইতিউতি উঁকি মারি, যারা ফালতু ঝগড়ায় জড়াই আর অকারণে ঝাড়ি বাকতাল্লা, তারা সেসবও জানি। খেউড় আর কোঁদল, পুকুরপাড়ের কলহে চিল্লাতে চিল্লাতে, কেউ বিশ্বাস না করলেও, মাইরি, আমাদেরও ঘেন্না হয়, কষ্ট হয়, বাথরুমে ঢুকে আমরাও গান গাই। উগরে দিই, ক্রোধ, বিরক্তি, বিষণ্ণতা। চানঘরের সেই ঘেন্নার গান নব্বইয়ের হলেও মহীনেরই কি না এ-রহস্যের অবশ্য কোনো সমাধান নেই। আমরা অবশ্য মহীন ভেবেই গাই, কিন্তু আমাদের উগরে দেওয়া অস্তিত্বের কোন গান মহীনের, কোন গান মহীনের নয়, সে আরেক প্রশ্নচিহ্ন। বীজমন্ত্রের মতো যা রচিত হয়েছিল সত্তরের সেই আদিম আস্তাবলে, গূঢ় সাধনার কমিউনে বাঁধা সেই গানগুলিই কি ‘আসল’ মহীন, মালিকানাহীনতাই যার স্বাক্ষর? নাকি আনপড় পাবলিক যে-গানগুলিকে ‘মহীন’ বলে চেনে, নব্বইয়ের দমকা হাওয়ায় দক্ষিণখোলা জানলা দিয়ে ‘মহীনের ঘোড়াগুলি সম্পাদিত’ হয়ে যারা ঢুকে এল ঘরে, তারাও মহীনই? এর শিল্পীরা, আদি ঘোড়া না-হলেও, অন্তত টাট্টু পদবাচ্য কি, মহীনের ইচ্ছেডানার উত্তরাধিকার নিয়ে যারা কেউ-কেউ পক্ষীরাজ হয়ে উড়ে যাবে ভবিষ্যতে?

আমরা এও জানি এসবের উত্তর হয় না। ওভাবে ছক কেটে সৃষ্টিরহস্যের সমাধান করা যায় না। আমরা যারা নিজেদের চণ্ডাল বলি, যারা বইমেলায় স্টল বাগিয়ে বসি, যারা গুরুচণ্ডা৯র বিস্তীর্ণ নেটচারণভূমিতে চরে খাই, এটুকু আমাদের অন্তত বিলক্ষণ জানা আছে, যে, অজস্র ক্যাচাল, আর কোটিকোটি উড়ন্ত শব্দের বৃষ্টির মধ্যে কীভাবে গজিয়ে ওঠে একখানা ড্যান্ডিলায়ন, তার রহস্যোন্মোচনের চেষ্টা আহাম্মকি মাত্র। সৃষ্টিরহস্যের এসব কূটকচালি, ফ্র্যাঙ্কলি, আমাদের অনধিগম্য। আমরা নিজেরাই জানি না আমরা কারা। কারা গুরু কারাই-বা চণ্ডাল? যারা এক আড়ালহীন কমিউনিটিতে, নেটমহল্লায় সতত সঞ্চরমান? যারা প্রেসে দৌড়য়? যারা বইমেলায় বসে? যারা সম্পাদনা করে? যারা পাঠক? কোথায় সীমারেখা আমরা জানি না। আমরা জানি না, কোথা থেকে গজিয়ে ওঠে শিল্প, কীভাবে ‘অন্য মহীন’ নামক একটি পুঁচকি পুস্তিকা থেকে আমাদেরই মগজে জন্ম নেয় ‘অ(ন)ন্য মহীন’-এর আইডিয়া। আমরা জানি না, নদী তুমি কোথা হইতে আসিয়াছ। আমরা জানি না কারা ঘোড়া, কীভাবে জন্ম নেয় গান, কীভাবে তৈরি হয় মিথ আর মায়া। প্রশ্নগুলো থেকে যায় শুধু সমুদ্রের বুকে আখাম্বা লাইটহাউসের মতো।

বলা বাহুল্য, আমরা যারা সম্পাদনা করেছি এই বই, তারা মহীন সংক্রান্ত এসব কূট প্রশ্নের উত্তর জানি না। যদিও তিনটি টুকরোয় বাঁধা হয়েছে এই বইকে, কিন্তু এই সব টুকরোটাকরা, সেসব বাইরের বাঁধাছাঁদা মাত্র, আমাদের সম্পূর্ণ প্রতীতি আছে, এই বইয়েও এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। মহীনের ঘোড়াগুলিকে আমরা দেখেছি গুরুচণ্ডা৯র মতোই এক খোলা কমিউনিটি হিসেবে, যা খামখেয়ালি, এবড়োখেবড়ো, কিঞ্চিৎ এলোমেলো এবং বোধগম্য সকল স্ট্রাকচারের অতীত, অথচ যাকে নাড়াচাড়া করলেই কোনো-না-কোনো বিন্দু থেকে আলো এসে কখনও চোখ ঝলসে দেয়, কখনও-বা সে-আলো ছটফটে, কখনও বিষণ্ণ, কখনও মোলায়েম। এই বইটিও, অবিকল তাই। নিজ দায়িত্বে যে যা খুশি লিখেছেন, প্রায় কাঁচিহীন এই বইয়ে ভিন্নমত আছে, আলাদা ভঙ্গি আছে, পুনরাবৃত্তি আছে, দৃষ্টিকোণের কাটাকুটি আছে।

এ বস্তু আদতে এবড়োখেবড়ো, কিন্তু নাড়াচড়া করলেই নানা প্রান্ত থেকেই নানা সুর বেজে ওঠে।
পরিকল্পনা থেকে প্রকাশ পর্যন্ত এই লম্বা যাত্রার শেষে আমরা কেবল এইটুকুই বলতে পারি। এ-যাত্রা অবশ্য এখনও শেষ হয়নি, বহু লেখা এখনও বাকি, যে-কারণে এটি ‘অ(ন)ন্য মহীন’-এর প্রথম পর্ব মাত্র। কারণ মহীনের ঘোড়াগুলি সম্পর্কে বাকি সবকিছু এখনও অজানা। কারণ সেই অজানা উড়ন্ত যানটিকে সত্তরের পর আর দেখা যায়নি, তার রানওয়ে জুড়ে পড়ে আছে শুধু কেউ-নেই শূন্যতা। সমস্ত রহস্য নিয়ে ব্ল্যাকবাক্সটি শুধু শুয়ে আছে, কোনো-এক চৈত্রের কাফনে, ঝরা ফুলগুলি বসন্তের গান শোনাচ্ছে তাকে, দশকের পর দশক ধরে। আপাতত এই বইও সেই বহমান গানেরই অংশ।

[দ্রষ্টব্য : মহীনের ঘোড়াগুলি সম্পাদিত বাংলা গানের প্রবাহপরম্পরা নিয়া বাংলায় একটা সংকলন প্রকাশিত হয়েছে ইন্ডিয়ার পশ্চিমবঙ্গ থেকে। সেই সংকলনের ভূমিকাটা আমরা গানপারে রাখছি পড়ার জন্য, অবশ্য রচনাটা আগে একবার ছাপা হয়েছে গুরুচণ্ডা৯ পত্রিকায় এবং সংকলনে তো বলাই বাহুল্য। ‘অ(ন)ন্য  মহীন’ শীর্ষক সংকলনে অনেকেরই লেখা জায়গা পেয়েছে এবং কন্টেন্ট ও মেকাপ-গেটাপ সব দিক দিয়েই বইটা ভালো উত্পাদন হতে পেরেছে। এই ভূমিকা গানপারে পুনঃপ্রকাশের মূল কারণ তো এ-ই যে লেখাটা আমাদের পড়তে ভালো লেগেছে এবং বিশ্বাস করি রিডারেরও মন্দ লাগবে না। গান যারা ভালোবাসেন, নতুন বাংলা গানের নিত্য খোঁজতল্লাশ যারা করেন, তাদের কাছে মহীনের ঘোড়াগুলি সম্পাদিত সংগীতক্রিয়াকলাপ তো অবশ্যই রিকালেক্টেবল। ফলে এই বইটা পাঠকের দেখতে মন চাইতেই পারে। সেক্ষেত্রে এখানকার ভূমিকাটা পাঠ করে সেরে বইটা খুঁজে বের করবার বইটা হাতে নেবার উদ্যম পাইতে পারি কিংবা ভাইস-ভার্সা হারাইতেও পারি। কিন্তু রচনাটা ছাপানোর আগে আমরা চেষ্টা করেছি লেখকের অনুমতি নিতে। ইনডিরেক্ট অনুমতি নিয়েছি ঈপ্সিতা পাল মহোদয়ের মাধ্যমে। ঈপ্সিতা পাল গুরুচণ্ডা৯ পত্রিকার একজন ইনসাইডার এবং সংকলন প্রকাশনার সঙ্গে জড়িত অনেকের মধ্যে একজন সম্ভবত। ফলে একটা অনলাইন প্রকাশমাধ্যমে এর আগে ছাপা হওয়া সত্ত্বেও রচনাটা আমরা গানপারে একোমোডেট করবার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়া পার্মিশনের জন্য অপেক্ষা করেছি, ঈপ্সিতা পালের নিকট লেখকসম্মতি আদায়ে সহায়তা পেয়ে সেই অপেক্ষার অবসান হয়েছে শেষমেশ। মহীনের ঘোড়াগুলি নিয়া গানপার থেকে আমরা আরও কতিপয় দিক-উন্মোচনী লিখনকর্ম সংগ্রহ, সম্পাদন ও সম্প্রচার করতে সঙ্কল্প প্রকাশিয়া রাখি এই সুযোগে। এই বইটা কালেক্ট করার ব্যাপারে আগ্রহী রিডারদের শুভকামনা জানিয়ে রেখে এই ফ্যুটনোট শেষ করি। বইটার নাম আবারও বলি : ‘অ(ন)ন্য মহীন’,  প্রচ্ছদ করেছেন চিত্রশিল্পী হিরণ মিত্র, বইটা গুরুচণ্ডা৯ থেকে প্রকাশিত — গানপার]

… …

COMMENTS

error: