চলো বদলে যাই || নজরুল ইসলাম

চলো বদলে যাই || নজরুল ইসলাম

SHARE:

জ্ঞানী কি-রকম? ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ বলেন, জ্ঞানীর ভেতর গঙ্গা একটানা বইতে থাকে … একদিকেই যাচ্ছে, তার জীবনে খুব-একটা বৈচিত্র্য নেই; একটা ভাবকে অবলম্বন করে সে চলেছে, একটানা; তার পক্ষে সব স্বপ্নবৎ। ঠিক যেমন আমাদের আইয়ুব বাচ্চু, কেবল গান নিয়েই আছেন। ’৭৫ সালে গিটার হাতে পাওয়ার পর থেকে এবং একবছরের মধ্যে গিটারপাগল হওয়া থেকে আজতক আছেন গিটার আর গান নিয়েই। গোটা আইয়ুব বাচ্চু জুড়ে আছে গান। শ্যাম তন, শ্যাম মন, শ্যাম হৈ হামারো ধন — এই লোকবচনের মতো ব্যাপার। আমাদের এই বঙ্গদেশে যখন সরকারি আমলা হওয়া আর স্বর্গ হাতে পাওয়া সমান কথা তখন আইয়ুব বাচ্চু রীতিমতো প্রফেশনাল মিউজিশিয়ান। নিজেই বলেন, দশটা-পাঁচটা অফিস করে সন্ধ্যায় শখের সংগীতচর্চার সময় এখন আর নেই। তাই পথ তার একটাই, কেবল গান আর গান।

চট্টগ্রামের এনায়েতবাজারের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম হাজি পরিবারে জন্ম-নেওয়া আইয়ুব বাচ্চু যে এ-রকম গানপাগল হয়ে উঠবেন তা সেই বিশাল পরিবারের কেউই ভাবতে পারেননি কখনো। সংগীতের পারিবরিক ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করা মিউজিশিয়ানদের সাথে বাচ্চুর পার্থক্য এটুকুই যে, তাকে শিখতে হয়েছে, জানতে হয়েছে প্রবল বাধার মুখে, পেছন থেকে ঠেলে দেওয়ার মতো কেউ নেই — সামনে থেকেও টেনে ধরবে না কেউ। এ-অবস্থায় কেবল অন্ধের মতো এগিয়ে চলা। মীরাবাঈ যে গেয়েছেন, “হরিষে লাগি রহো রে ভাই / তেরা বনত বনত বনি যাই / তেরা বিগড়ি রাত বনি যাই।” আসলে লেগে থাকতে হয়। যেমনটি হয়েছ আইয়ুব বাচ্চুর। চট্টগ্রামের অখ্যাত এক গায়ক একক প্রচেষ্টায় উঠে এসেছেন। তাই তো বাচ্চু আজ সহজেই বলতে পারেন, — আগে বাড়ি ছিল কেবল চট্টগ্রামে, এখন গোটা দেশটাই আমার বাড়ি।

CUkc1R2VEAA7m37আমি এক মা-পাগল ছেলে, — বললেন বাচ্চু। বাবা মো. ইসহাক চৌধুরী ব্যবসায়ী। গৃহিণী মা নূরজাহান বেগমের কাছেই তার যাবতীয় আব্দার যাবতীয় অভিযোগ। পাহাড়ী শহর চট্টগ্রামে মায়ের স্নেহে-আদরে বেড়ে উঠতে উঠতে হয়ে উঠলেন গিটারপাগলা। বন্ধুরা মিলে গঠন করলেন একটা ব্যান্ড, কোনো নাম ছিল না সেই ব্যান্ডের, কেবলি বাজাতেন আর গাইতেন। এমনি আরো কয়েকটা ছোটোখাটো ব্যান্ডগ্রুপ মাড়িয়ে অবশেষে এলেন সোলস্-এ। চট্টগ্রামে গণ্ডি ছাড়িয়ে দেশব্যাপী জনপ্রিয়তা-পাওয়া সোলসের সাথে বাচ্চুও এলেন ঢাকায়। তার আগেই অবশ্য চট্টগ্রামের জাহেদ ইলেক্ট্রনিক্স থেকে বেরিয়েছে তার প্রথম অ্যালবাম ‘রক্তগোলাপ’। তো ’৮১ থেকে ’৯১ — এই দশবছর একটানা সোলসে বাজিয়ে আইয়ুব বাচ্চু হয়ে উঠলেন গিটারের এক দুর্দান্ত প্রতিভা। নয়ন মুন্সি আর নিলয় দাস ছাড়া আর কেউ এ-রকম গিটারওয়ার্ক করতে পারে না, পারবে না — এ-রকম কথা বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠল সবার কাছে।

’৯১ সালে ছেড়ে দিলেন সোলস্। সে-বছরেই ৫ এপ্রিল গড়লেন এলআরবি। সোলস্ ছেড়ে নিজের মতো করে ব্যান্ডগ্রুপ করাটা যখন দেশের একটা বড় ঘটনা হয়ে দাঁড়াল তখনই বোঝা গেল, বাচ্চু আর সাধারণ কেউ নন। প্রথমেই নিলেন চূড়ান্ত রিস্ক। এলআরবি বাজারে ছাড়ল দেশের প্রথম ডাবল অ্যালবাম, ‘এলআরবি’ নামেই। ৭০টাকা খরচ করে অ্যালবাম তো মানুষ এমনি-এমনি কেনেনি। নতুন ব্যান্ডের চেয়ে বাচ্চু নিজেই যে একমাত্র আকর্ষণ ছিলেন তা-ও তো আর বলার প্রয়োজন নেই।

bachchu_1নিজের গাওয়া গানের মতোই বাচ্চু বললেন, আমি ঘরছাড়া এক সুখী ছেলে। …  গানের জন্য অনেককিছুই ছেড়েছেন, ছাড়তে হয়েছে। ঠিকমতো লেখাপড়া করতে পারেননি, সময় দিতে পারেননি পারিবারিক জীবনে; এমন যে মায়ের ভক্ত, সেই মাকেও দিতে পারেন নি বেশি সময়। স্ত্রী-ছেলেমেয়েদের বেলায়ও একই কথা খাটে। এই তো সে-বছর বৈশাখে রিলিজ-হওয়া মিক্সড অ্যালবাম ‘ময়ূরী’র জন্য একটানা প্রায় আট-নয়দিন স্টুডিওতেই কাটাতে হয়েছে। পাশেই বাড়ি থাকলেও যাওয়ার সুযোগ হয়েছে খুব কম।

গিটার বাজাতে, সুর করতে, কম্পোজিশন করতে, সিকোয়েন্স তৈরি করতে খুব ভালোবাসেন বাচ্চু। নিজেই বলেন, — “ভালোবাসি এবং ভালোবাসতেই থাকব। সারাক্ষণ কাজ করতে ভালো লাগে।” আর এজন্যই তৈরি করে নিয়েছেন নিজস্ব স্টুডিও। রেকর্ডিং, মিক্সিং ইত্যাদি নিজেই করেন। বাচ্চু তাই হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের একমাত্র কমপ্লিট মিউজিশিয়ান, একটি প্রতিষ্ঠান। তাই তো প্রতিদিন কমপক্ষে আট-দশঘণ্টা কাজ করতে পারেন নিজের মতো করে। কারো কাছেই হাত পাততে হয় না কোনোকিছুর জন্য। এ-রকমটা অবশ্য আগেই ধারণা করা গিয়েছিল, যখন মাত্র দশদিনে বের করেছিলেন ‘তবুও’র মতো সফল অ্যালবাম।

ব্যান্ড, সলো, কম্পোজ, জিঙ্গেল, ফিল্মিগান … সবকিছুরই চূড়ান্ত নাম আজ আইয়ুব বাচ্চু। ‘এলআরবি’ এবং তার নিজস্ব অসংখ্য জনপ্রিয় গান ছড়িয়ে আছে বাংলার আকাশে বাতাসে। জিঙ্গেলে আইয়ুব বাচ্চু একটি অপরিহার্য নাম। ‘অনন্ত প্রেম তুমি দাও আমাকে’ কিংবা ‘আকাশ ছুঁয়েছে মাটিকে’ — এগুলোর মতো বেশকিছু ভালো এবং ব্যাপক জনপ্রিয় গান তিনি দিয়েছেন বাংলাদেশের গানপ্রেমী সিনেমাভোক্তাদেরকে। ব্যান্ডের ব্যানারে আইয়ুব বাচ্চু যে কতসংখ্যক মাতোয়ালা গান উপহার দিয়েছেন, মিক্সড অ্যালবাম আর সুরকার ও সংগীতপরিচালক হিশেবে অ্যালবাম করেছেন অসংখ্য নতুনতর শিল্পীর, গণিতের সংখ্যায় সেসব পরিমাপ্য নয়।

[লেখাটা আইয়ুব বাচ্চুর বায়োস্কেচের মতো। সংক্ষিপ্ত। সংগীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চু সম্পর্কে একনজরে অন্তরঙ্গ অবলোকনের একটা প্রাথমিক পদক্ষেপ হিশেবে এই রচনা পাঠ করা যেতে পারে। ব্যান্ডসংগীতের চারদশকদীর্ঘ পথপরিক্রমকালে যে-কয়জন শিল্পী নিজেদের শতভাগ নিয়োজিত করেছেন নতুন দিনের গানবাঁধায় গানগাওয়ায়, তৈয়ার করে নিয়েছেন নতুনতর শ্রোতা যার যার, আইয়ুব বাচ্চু ওই নিশান-ওড়ানো সড়কদিনের অন্যতম অগ্রগণ্য। রচনাটা ছাপা হয়েছিল আজ থেকে আঠারো বছর আগে, আনন্দভুবন পত্রিকায়, এটি লিখেছেন পত্রিকারই নিয়মিত প্রদায়ক নজরুল ইসলাম। মূল লেখাটা দেখতে চাইলে ৩ বর্ষ ২২-২৩ সংখ্যা ১৬ এপ্রিল ১৯৯৯ আনন্দভুবন দ্রষ্টব্য। একই শিরোনামে এইখানে নবপ্রকাশ হচ্ছে। এই নিবন্ধের সমাপ্তি অংশের দুইটা বাক্য জুড়ে দিতে হয়েছে এই নবপ্রকাশকালে, কেননা লেখাটা আকস্মিকভাবে শেষ হয়ে যেতে দেখা যায় আনন্দভুবন পত্রিকার অনবধানবশত। যা-হোক, বাংলাদেশের ব্যান্ডমিউজিশিয়্যানদের প্রাথমিক পরিচিতিজ্ঞাপক ফিচারধাঁচের লেখা আমরা ‘গানপার’ থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করব। — গানপার]

COMMENTS

error: