জেমস্ ও জনতা || জাহেদ আহমদ

জেমস্ ও জনতা || জাহেদ আহমদ

গাও হেলানি দিয়া নাচ রে গোলাপি
চোখ হেলানি দিয়া নাচ রে গোলাপি
গোলাপির ওই নাকের বেশর ঝকমক ঝকমক করে
গোলাপির ওই কোমরবিছা ঝুরমুর ঝুরমুর করে …

এই গানটা, বাংলাদেশ টেলিভিশনের নৃত্যানুষ্ঠানে ছেলেবেলায় শুনে শুনে মুখস্থ হয়ে যাওয়া গানটা, আরেকবার মনে পড়ছিল ঘুরেফিরে সেদিন মধ্যযামে জেমসের কন্স্যার্ট শেষে ডেরায় ফেরাকালে। এইটা ফারুক মাহফুজ আনাম জেমসের গান নয় যদিও, ইউটিউবে এর কোনো কাভারও অদ্যাবধি কানে পশে নাই, কমপ্লিটলি স্মৃতি থেকেই টিউনটা বাজতেছিল মাথায় বা শারীরিক অন্যান্য কোণাকানায়। ভাবছিলাম, জেমস্ এই গানটা, আমাদের গরিমাঋদ্ধ পল্লিসুরের এই মাতোয়ালা তালদ্রুতির গানটা, ‘গাও হেলানি দিয়া’ গানটা, গাইলে ফের একবার মাৎলা হাওয়ায় ভেসে যেত কি না বাংলার ত্রস্ত নীলিমা।

ভাসত বৈকি। ভীষণ শরীরান্দোলক গানাবাজানা-পার্ফোর্ম্যান্সে জেমস্ অধুনা দারুণ সিদ্ধ। লোকে জেমসের এই নাচুনে স্টেজপ্রেজেন্স পছন্দও করে খুব, সম্ভবত অন্য জেমসের অস্তিত্ব সম্পর্কে তেমন ওয়াকিবহাল লোক অনুপস্থিত ক্রমশ, বোঝা গেল কন্স্যার্টে জেমসক্রেইজি ইয়াংজেনের ম্যুভ দেখে। এপিগ্রাফ হিশেবে যে-গানটা উপরিভাগে ঝোলানো হয়েছে, কেন এবং কী বিত্তান্ত তা আর জিগাইতে নাই। কিন্তু জরুর জ্ঞাতব্য কথাটা এ-ই যে, জেমস মাতোয়ালা তালের গানাবাজানা ছাড়া আজকাল জনতাবাজারে তথা মঞ্চে তেমন-একটা ঝুঁকিতে যেতে চান না। মানে, এমনটা আমার মনে হলো যে, জেমস স্টেজে এসে সেই গানগুলোই ইচ্ছুক গাইতে যেগুলো শুনে কেউ উসখুশ করবে না বা অস্বস্তিতে পড়বে না লিরিক্স মুখস্থ না-থাকার কারণে। এই মনে-হওয়াটা খালি সেদিনকার কন্স্যার্টজাত নয়, জেমসের যে-সমস্ত কন্স্যার্ট/স্টেজশো হয় ইনডোর বা ওপেন-এয়ার, বাংলা বর্ষশুরু বা নানাবিধ কর্পোরেট মিউজিক ফেস্টের আয়োজনে বা ভ্যালেন্টাইনের দিবস উদযাপনে, ডেইলি নিউজপেপারগুলোতে সেসবের বিরল হলেও অল্পবিস্তর বিবরণ পাওয়া যায় দিনান্তে, তেমন বিস্তারিত প্রতিবেদন না-হলেও গোটা সাতেক গানের লিস্টি রিপোর্টার মারফতে পাওয়া যায় এবং গত বছর-দশ ধরে এইধারা হাল্কা চালের নমঃনমঃ কন্স্যার্টরিভিয়্যুগুলো অন্-অ্যাভারেজ্ গণনায় নিলে দেখা যাবে যে জেমস সোজাসিধা আদ্দিকালিক রাস্তাটাই ধরেছেন মঞ্চমাতানোয় এবং লোকমনোরঞ্জনে জেমস সন্দেহাতীতভাবে সফলও হয়েছেন। সফলতাটা ঈর্ষণীয় হলেও রাস্তাটা তত ঈর্ষণীয় নয় বোধহয়। কেন নয়, বিশদে ব্যাখ্যেয়।

তবে একটা বা দুইটা কথা আগেভাগে কবুল করে রেখে এগোনো যাক। জনমনোরঞ্জন-ক্যে-লিয়্যে যাবতীয়কিছু শৈল্পিক বিবেচনায় ন্যাক্কারজনক ও গর্হিত, বর্তমান প্রতিবেদনের বক্তব্য মোটেও তা নয়। এবং দুই, নৃত্যঝোঁকা গান গুণমানগত বিচারে তুলনামূলক লঘু বলবার মতো ভুয়া সাংগীতিক সমুজদারবুজরুকি নিবন্ধকারের কস্মিনকালেও ছিল না, আজও নাই, আসন্ন ভবিষ্যতে তেন সমুজদারিতা গজাইবার ফাঁড়া কাটিয়া গিয়াছে এই বয়সে। ব্যাপার সেইটা না। ব্যাপার বরং উল্টাটা। ব্যাপার হচ্ছে, জেমস্ এমনই এক শিল্পী যিনি ভাংড়া গাইলেও হবে জেমসেরই ভাংড়া সেইটা; লালন গাইলেও তদ্রুপ হবে জেমসেরই লালন। বলছিলাম যে এপিগ্রাফের ওই গানটা, ‘গাও হেলানি দিয়া’ গানটা, গাইতেন যদি জেমস্ তবে কেমন হতো? উত্তর দুইশব্দেই প্রদেয় : অভাবিত উন্মাদনা! হ্যাঁ, এবং পেতাম আমরাও পুনরায় ‘দি ইল্যুশনিস্ট’ জেমসের ম্যাজিক্, পেতে পারতাম হয়তো-বা আরেকটা মাতাল রাত্রি, মীরাবাঈ এফেক্ট পুনরায়। বিস্তারে যাবার প্রাক্কালে জেমসের আলোচ্য কন্স্যার্টটার কিছু তথ্য আর্কাইভে রেখে যাওয়া কর্তব্য।

James (1)

বহু বহু বছর আগের কথা। খ্রিস্টীয় ২০১৭ অব্দ। উইন্টারের আমেজ রইলেও সমাজে এবং শাস্ত্রে তখন বসন্ত। ১৭ ফেব্রুয়ারি, শুক্রবার, সিলেটের শাহি ঈদগা মাঠে জেমস্ গাইতে আসেন। শহরের একটা প্রাইভেট য়্যুনিভার্সিটিশিক্ষার্থীদের সংগীতানুশীলনদল ‘ব্যান্ড কম্যুনিটি’ ছিল ওপেন-এয়ার সেই কন্স্যার্টের অর্গ্যানাইজার। শুধু সিটি কর্পোরেশন অ্যারিয়ার লিমিটেড কিছু অংশে অ্যানাউন্সমেন্ট হয়েছিল, লোক্যাল কমিউনিটি টিভিচ্যানেলে অ্যাড গিয়েছিল অনুষ্ঠানের ডেইট অ্যান্ড ভেন্যু জানিয়ে, কয়েকটা নির্ধারিত জায়গায় এবং স্টুডেন্টদের হাতবাহিত হয়েই টিকেট বিক্রি হয়েছিল। অনুষ্ঠানের দিনে দেখা গেল ‘লোকে লোকারণ্য’ বাগধারার চাক্ষুষ নজির। সম্ভবত সংবাদজীবীরা ‘লাখো জনতা’ রেটোরিকের ব্যবহার ঘটান তাদের প্রতিবেদনে এই-সাইজের জমায়েত দেখে। অ্যানিওয়ে। জনতা লাখো না-হলেও পনেরো সহস্রাধিক হবে তো বটেই। বিকাল দুইটা থেকে গেইট ওপেন হওয়া মাত্র লোকে এসে লাইন দিতে শুরু করে। উইক্যান্ড সত্ত্বেও নগরীতে ব্যাপক যানজট দেখা যায় ঈদগা-কানেক্টেড কয়েকটা পয়েন্টে। জেমস্ মঞ্চে অ্যাসেন্ড/আরোহণ করেন রাত্তির পৌনে-দশটায়। নিতান্ত অল্পবয়সী শিক্ষার্থীরা আয়োজক হলেও গোটা অ্যারেঞ্জমেন্টে হিম্মতের ছাপ ছিল আগাগোড়া। খালি সিলেট নয়, সমগ্র বাংলাদেশ গণনায় রেখে দেখেন যে সারাবছরে ব্যান্ডকন্স্যার্ট হয় সাকুল্যে কয়টা? আয়োজন করতে যান, দেখবেন রাষ্ট্রবাহিনী আপনাকে নিরাপত্তার জুজু দেখাবে। স্টেডিয়াম দেবে না আপনারে, দেবে শাস্তরজীর্ণ নব্য ধনিক সমুজদারদিগেরে। এরপরও ঝুঁকি নিতে পারবে কেউ? কয়জন? সমাধান একটাই, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন। ক্রমশ স্কয়ার ফাউন্ডেশন হবে, বেক্সিমকো ফাউন্ডেশন ওই এল বলে। বেবাক বাংলা আজ ‘শুদ্ধ সংস্কৃতি’ আর ‘সুস্থ রুচি’ শিখতে একঠ্যাং উঁচিয়ে ধ্যানস্থ। ফলে, এই সময়ে, জেমস্ বা আইয়ুব বাচ্চু বা আর্টসেল বা নেমেসিস বা আর্বোভাইরাস বা মেঘদল বা শিরোনামহীন প্রভৃতি মিউজিকের তরফদারি যারা করছেন তাদের বুকের পাটা বাহাত্তর ইঞ্চি নির্দ্বিধায় স্বীকার করতে হয়।

জেমস্ আসছেন শুনে বেশকিছু অগ্রবিবেচনাজাত অনুমান নিয়া ভাবছিলাম হফতাদিন আগে থেকে। যেমন, ভাবছিলাম, দেখব উনি ‘ভিগি ভিগি’ বা ‘আলবিদা’ বা ‘বেবাসি’ না-গেয়ে শো খতম্ করতে পারেন কি না। পারলেও যা, না পারলেও তা। আমরা ভাই চিনি-হিন্দি, কিংবা ফাউন্ডেশন বেঙ্গল বা সুফি সোসাইটি কি ফোক-রকি, কিসিম্ যা-ই হোক সুর হইলেই নো অব্জেকশন্। অসুরেও। শুধু রক্-ন্-রল্ হওয়া চাই, দ্যাটস্ অল্। উচ্চাঙ্গ গলাব্যায়াম চাই না। বাংলাও দুইয়েকটা, ফর অ্যা চেইঞ্জ, গাওয়া যাইতে পারে অবশ্য। মর্জি হইলে গাইবেন, না-হইলে না, ব্যাপারটায় আমাদের বিন্দুমাত্র স্যে থাকবে না। বাব্বাঃ! আমরা তো গ্লোব্যাল্ সিটিজেন্, বিশ্বভূমণ্ডলের সংগীতসমুজদার, তাই না? আমাদের সাম্প্রতিক সমুজদারিতা ব্যান্ডমিউজিক না-বলে রকমিউজিক বলবার মধ্যেই পরিলক্ষিত হয়, ডেথ আর হেভি কিংবা হাজার রেলার মেটাল টার্ম আওড়ানো তো টোয়েন্টিফোরাওয়ার্স টাস্ক আজকাল। টাশকি খাইতে খাইতে এখন আর অন্য খানাপিনা আমাদিগের মুখে রোচেই না। অ্যানিওয়ে। বেঙ্গল মিউজিক ঘোড়দৌড়ে আগাচ্ছে। লেট’স্ সি।

কিন্তু ঘটনাটা হচ্ছে, জেমস্ যে-গানগুলো মঞ্চে গাইলেন, কেবল সিলেটশোতেই নয়, হামেশা জেমস্ যে-নাম্বারগুলো মঞ্চে গেয়ে থাকেন অধুনা, সেসব বিবেচনায় নিয়ে একটা অ্যাজাম্পশন করা যায় জেমস্ জনতাবাজারে নিজেকে কেমন করে প্লেইস্ করছেন বা চাইছেন কোন অরিয়েন্টেশনে দেখতে নিজেরে। এজন্য লক্ষ করা যাক যে-কয়টা গান জেমস্ গেয়েছেন সেগুলোর দিকে। তেরোটা গান মোটমাট গেয়েছেন জেমস্, সাড়ে-এগারোর কাঁটায় ‘প্রশাসন অনুষ্ঠান শেষ করতে বলছেন, তাই আমরা অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছি’ বাক্যটা ছুঁড়ে জেমস্ মঞ্চ ছেড়ে যাওয়ার সময় এক্সিট দৃশ্যে দেখা যায় আসলেই জমায়েত হয়েছিল কাতারে কাতার; কেউ কেউ মন্তব্য করছিলেন বেরোতে বেরোতে, এ তো দেখছি ইজতেমার ভিড়! শুধু তুরাগ নয়, বাহুল্য বলা, সুরমাতীরেও সম্প্রতি ইজতেমা আয়োজিত হয়েছে প্রশাসনের ‘আন্তরিক’ সহায়তায়। অ্যানিওয়ে। সেই রাতে সত্যি সত্যি ট্রাকচালক ও শ্রমিকদের সঙ্গে প্যুলিস ফোর্সের সংঘর্ষ হয়েছিল। গোটা নগরী ছিল অচল, সন্ধ্যার পর থেকে, এবং উত্তেজনা বাড়ছিল উত্তরোত্তর। রাস্তায় বেরিয়ে দেখা যায় স্থানে স্থানে ট্র্যাঙ্ক ও জলকামান নিয়া আইনশৃঙ্খলাবাহিনী ইতস্তত অসহায় দাঁড়ানো, নৌপরিবহনমন্ত্রীর মদতপুষ্ট বৈপ্লবিক বসন্ত, শ্রমিক-ট্রাকলরিচালকদের টায়ারপোড়ানো অগ্ন্যুৎসব। পদব্রজে গেহে ফিরতে এই প্রতিবেদকের সে-রাতে বেদিশা আড়াইটা পারায়েছিল।

James (8)

কোন গানগুলো করেছিলেন জেমস্? ওই যে-গানগুলো মঞ্চে জেমস্ কমন্ করে থাকেন আজকাল। সর্ট-অফ খ্যামটা বা আড়খ্যামটা তাল ও লয়ের গান। কথাটা আক্ষরিক অর্থে নেবেন না কেউ। ‘গুরু ঘর বানাইলা কী দিয়া’, ‘পাগলা হাওয়ার তোড়ে মাটির পিদিম নিভুনিভু করে’, ‘ও বিজলী চলে যেও না’, ‘ঝাকানাকা দেহ দোলা না’ প্রভৃতি। শুরু করেন ‘কবিতা, তুমি স্বপ্নচারিণী হয়ে খবর নিও না’ গানটা দিয়ে। একদম কোনো গলাখাকারি না-দিয়ে, সাউন্ডচেকের নামে কোনো শব্দদূষণ না-ঘটিয়ে, জেমস্ শুরু করেন গাওয়া। তার আগে অবশ্য নগরবাউলক্রুরা প্রায় আধাঘণ্টারও অধিক সময় নিয়ে চেকিং সেরে রেখেছিলেন মনিটর ইত্যাদি। গিটারটা হাতে-কাঁধে নিয়ে জেমস্ ভনিতাবিহীন শুরু করেন ‘কবিতা …’। সাউন্ডে বেগড়বাই ঠিকই টের পায় বাউন্ডারিলাইনের শ্রোতাটাও, তথা এই নিবন্ধকারের কানেও শব্দাবহগত ত্রুটি ধরা পড়ে। একটানে জেমস্ গানটা আদ্যোপান্ত গেয়ে শেষ করে নেক্সট গানে যাবার মুখে সেকেন্ড-কয়েকের মধ্যে প্রম্পট ইন্সট্রাকশন দিয়ে শ্রোতাদের কিচ্ছুটি তকলিফ না-দিয়ে সাউন্ডের প্রোব্লেম শ্যুট করে ফেলেন এবং বাকি বারোটা গানের পথ সুগম করে নেন। যদিও শব্দব্যবস্থার সম্পূর্ণ ব্যবহার করা হয়েছে বলিয়া আদৌ মনে হয় নাই, নির্দিষ্ট সীমায় নিয়ন্ত্রিত রাখা হয়েছিল সম্ভবত শব্দবিবর্ধনব্যবস্থাটাকে; এর কারণ, ময়দানের দুইদিকে দুই চিকিৎসানিকেতন, হার্ট ফাউন্ডেশন ও ট্যুবার্কিয়্যুলাসিস্ হস্পিট্যাল। তবু জনতার ইউফোরিয়া হা হয়ে দেখবার মতো। গুরুধ্বনিতে গুঞ্জরিত গোটা শাহি-ঈদগা মাঠপ্রান্তর।

মনে করার কোনো কারণ নাই যে জেমস্ নিজের ম্যাজিক দেখাতে পারেন নাই সেদিনকার কন্স্যার্টে; দেখায়েছেন, কয়েকটা জায়গায় তো অকৃত্রিম ও আদি জেমসের চেহারা দেখেছে জনতা। ইভোল্ভিং ওভার টাইম নিজেকে জেমস্ কেমন করে পাল্টিয়েছেন, খাপ খাইয়ে নিয়েছেন পরিবর্তিত বয়সের কণ্ঠস্বরান্তরের সঙ্গে নিজের রচনাগুলো, অভিনিবেশে এইসব দ্রষ্টব্য সংগীতজীবী সক্কলের। মঞ্চে জেমসের ইম্প্রোভাইজেশন সবিস্ময়ে দেখার মতো। ‘উইন্ড অফ চেইঞ্জ’ শীর্ষক একটা আসরে জেমসের একজোড়া গানের নবপর্যায়িক উপস্থাপন দেখে একটা ব্যাপার স্পষ্ট হয় যে, জেমস্ কখনোই নিজের অরিজিন্যাল রেকর্ড অনুসরণপূর্বক পুনরুৎপাদনের বিরক্তি পয়দা করেন না। জেমস্ সেই বিরল সংগীতশিল্পীদের একজন যিনি নিজের কম্পোজিশনগুলো যত্রতত্র বদলিয়েও উৎপাদন করতে পারেন তাৎক্ষণিক জাদু। ক্যারিয়ারের চূড়াকালীন রচনাগুলোকে এখন যেভাবে জেমস্ ডেলিভার করেন, পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সে নিজের গলাটা খামাখা ছোকরা না বানিয়ে যেভাবে দীপ্ত দখল রাখেন অভিব্যক্তিস্ফূর্ত, অবাক তাকিয়ে শুধুই লীলা দেখতে হয়। টেনর ভোয়েসের রেন্ডিশন অবলীলায় ব্যারিটোনে ট্র্যান্সফার করে নিতে পারেন, ‘মন্দ্র’ আর ‘তার’ দুইই ক্রিয়া করে একসঙ্গে এমন আশ্চর্য গলা আর গায়ন লোকটার, অতি বিরল এই জিনিশ যে একলগে মন্দ্রসপ্তক আর তারসপ্তকে গলা খেলানো। উস্তাদজি হিম্মতওয়ালা হলে পরে তারসপ্তক আর মন্দ্রসপ্তক গা-ঘেঁষাঘেঁষি লীলা দেখায়ে যায়। জেমসের এই লীলা, খাদে নামানো গলাও যে কেমন ভরাট হতে পারে এর উদাহরণ ‘দুঃখিনী দুঃখ কোরো না’ অ্যালবামের ‘তালপাখা’ গানে এবং অন্য অনেক উদাহরণ তো রইলই, আমরা যারা বাষট্টি বছরে এসেও অশীতিপর বব ডিলানের ন্যায় ফ্যাশনঝিলমিলা জরিচুমকিখচা জামায় স্টেজে উঠে রেবেল ছোকরা গায়ন ভর করাটাকেই ভীষণ রক্-ন্-রল্ ভাবি তাদের জন্য বিশেষভাবেই দ্রষ্টব্য। উল্লেখ থাকবে যে লেনার্ড কোহেনের শেষ-বয়সের স্টেজ পার্ফোর্ম্যান্সগুলো মনে রেখে জেমসের আপকামিং ডেইজের অন্-স্টেজ/অফ-স্টেজ শোগুলো/রচনাসৃজনগুলো কেমন হবে সেইটা হান্ড্রেড পার্সেন্ট সহি ইম্যাজিন্ করে নিতে পারি। ঈশ্বর আমাদেরে যেন লম্বা পাল্লার আয়ু দান করেন জেমসের আরও-দুইদশক-পরেকার সাংগীতিক তুজুর্বা দেখিয়া যাবার।

James D

কথা হচ্ছিল কন্স্যার্টে, জেমসের ফেব্রু টু-থাউজ্যান্-সেভেন্টিনের সিলেট ট্যুরকালীন স্টেজ-পার্ফোর্ম্যান্সে, একটি বিশেষ বিটের পরিবেশনা নিয়ে। জেনারালাইজেশনের ঝুঁকি নিয়ে সেইটেকে খ্যামটা তালের গাওনা বলেছি আমরা প্রারম্ভিক অনুচ্ছেদে। ব্যাপারটা আরেকটু সবিশদ বলবার চেষ্টা চালানো যাক এক্ষণে। হ্যাঁ, সাইকেডেলিয়ায় যেটুকু ফাঙ্কি দুলুনি থাকে, হেডব্যাঙ্গিং থাকে যেটুকু, এতে একদম আপত্তি নাই, ছিলও না আপত্তি কোনোকালে, যে-কোনো ব্লুজ টিউনে যেমনটা ফাঙ্কি ইল্যুশন থাকে জেমসে সেইটা আগাগোড়া আছে এবং উয়িথ ডিউ সুরগাম্ভীর্য। পরিবর্তিত জনতামাতানো মকসদের পরিস্থিতিতে জেমসের গানাবাজানায় ফাঙ্কি মিউজিকটাই লিড নিতে শুরু করেছে কি না, আমাদের শঙ্কা সেখানেই। শঙ্কা; কারণ, বড়ে-গোলাম-আলি যদি নিধুবাবুর বা রামকুমারের বা শ্রীধর কথকের শ্রোতা মাতাইতে লেগে পড়েন ঘি-পরোটা সাবড়ে খেয়ে, সেক্ষেত্রে যে-ক্ষতির শিকার হব আমরা, ব্যাপারটা যে ভজকট পাকাবে, জেমসের রিসেন্ট আইডি নিয়া আশঙ্কা আমাদের সেখানেই। নিজের জাতচেনানো রচনাগুলো বোধহয় জেমস্ আজকাল সেভাবে এই জেনারেশনের সামনে নিয়া হাজির হচ্ছেন না। মাথাদোলা আর গতরঝাঁকানি দিয়া মাঠে সমবেত শ্রোতা হিলবাবা আর হকমৌলা আওয়াজে বিদীর্ণ করুক চরাচর, লক্ষ্য যদি হয় এইটুকুই, তখনই চিন্তার ভিতর আশঙ্কা উদিত হয়। কেননা খ্যামটা তালের ও দ্রুতির গানবাদ্যি মিলা বা তিশমা আরও উপভোগ্য কায়দায় করেন, আমরা তা উপভোগও করি বিলক্ষণ। এখন, টু বি প্রিসাইজড, ‘দোলা দে রে পাগলা’ গানটা জেমসের চেয়ে মিলাই ভালো করবেন অনুমেয় কারণে; তেমনি তিশমা ভালো করবেন তার ‘প্রেমিক পুরুষ আরে রহিম মিয়া / রূপবানে নাচে কোমর দুলাইয়া’ গানে; জেমস যদি ড্যান্সবিটে এদের চেয়ে ভালো করেনও, কোশেশ করলে জেমস্ পারবেন না ধারার গান দুনিয়ায় আছে বলে আমি বিশ্বাস করি না, তবু কি নিজের জাত খুইয়ে স্রেফ নবনব শ্রোতা পটাতে সেগুলো ধরবেন?

যদিও গোড়ার একজোড়া অ্যালবামের পরে জেমস্ ওই অর্থে প্রেমরোম্যান্সের প্রথানুবর্তী মিষ্টি জিনিশ করেন নাই, নৃত্যঝঙ্কৃত সংগীত কিন্তু ছিলই। কিন্তু ওই নৃত্যধুয়া আর আজকের জেমসের ফাঙ্কি ড্যান্সঝোঁকা গানা আদৌ সমান জিনিশ নয়। এমনকি মিক্সড-অ্যালবামবাহিত পরবর্তীকালিক জেমস্ বেদনাখ্যান-উপজীব্য বিরহবিচ্ছেদী গীতেও প্রথানুগতা। ‘আমি ভাসব যে-জলে তোমায় ভাসাব সে-জলে’, এক্সাম্পল্ হিশেবে দেখুন, এই গীতের এবং এর সুরযোজনের সঙ্গে একলষেঁড়ে জেমস্ নামের সেই শিল্পীটারে কি মিলানো যায়? রেবেল সেই পালোয়ান কণ্ঠস্বরটারে কি মিলানো যায় মিক্সড-অ্যালবামবাদ্যির বালিকাভোলানো কথাগীতের লগে? জেমসের কণ্ঠসম্পদটারে অবশ্য অতিক্রম করা বা অগ্রাহ্য করা আজও সম্ভব হয় না। আপনা মাঁসে যেমন হরিণা বৈরী, ঠিক তেমনি নিয়মানুশাসন-দুমড়ানো কণ্ঠশৌর্যের অতিকায়তা নিয়ে জেমসও অসহায় ইন্ ম্যেনি সেন্সেস্। ফলে এই কণ্ঠে এককালে ‘অনন্যা’ অ্যালবামের মিষ্টি মেলোডিয়া গাইলেও অব্যবহিত পরের পরিণত জেমসের গলায় আখড়াই/হাফআখড়াই বিট বেখাপ্পা লাগে। এবং বড় কথাটা হচ্ছে এ-ই যে, জেমসের অবিসংবাদিত অধিষ্ঠান হয়েছে গ্র্যামার-গুব্লেট-করা গানধারা বাংলায় ইন্ট্রোডিউস্ করার মধ্য দিয়ে। এখন যে-সমস্ত বস্তু মঞ্চে জেমস্ পরিবেশন করেন, এইগুলো কোনোভাবেই জেমসকে রেপ্রিজেন্ট করে না। বাংলার বছরবিয়োনো উপন্যাসকারদের অনেকেরই সিগ্নেচারওয়ার্ক খান-দুয়েক উপন্যাসে যদিও-বা পাওয়া যাবে খুঁজলে, কে খুঁজতে যায় এদের এত্তা জাঞ্জালের ভিড়ে এক-দুই সিগ্নেচারটিউনেরে, বেস্টসেলারদৌড়ে এরা হারায়েও খুশহাল নিজেদের আইডেন্টিটি। ভীষণ ধুমধাড়াক্কা হাজিরানায় স্টেজে জেমসেরেও অধুনা বাংলা আখ্যানকারই মনে হয়।

James (4)

এইটা মামুলি মনে-হওয়া নয়। এইটা আসলেই গুরুতর। বৈশাখ-আবাহনী বিকেলে, ভ্যালেন্টাইন-সন্ধ্যায়, দেশের রাজধানীতে জেমসের গত কয়েক বছরে ম্যাসিভ গ্যাদারিংগুলোতে যে-সমস্ত মঞ্চসফল গানবাদ্য করে চলেছেন উনি, তিয়াত্তর শতাংশই শিল্পীর রিয়্যাল্ মুরদ প্রকাশ করছে না লক্ষণীয়। পোকার মতো লোক টানছে সেসব মঞ্চশোভা গানগুলো, লোকাকর্ষণও অতি বৃহৎ হিম্মতি কীর্তিকলাপ অবশ্য, বহতা বাংলা গানে জেমসের যেটুকু অবদান তা আবছাভাবেও ফোটাতে ব্যর্থ হচ্ছে। জেমস্ নিজেই নিজের জন্যে এই নিশ্চিন্ত ঝুঁকিমুক্ত পথ প্রস্তুত করে সেই পথেই বিহার করছেন মুখস্থ। যদিও ঝুঁকি কিছুই প্রায় নেই বলতে গেলে। জেমসের মতো সংগীতশিল্পী নিজের হাতে একদেশভরা আনকোরা ধারার শ্রোতা-গানগ্রাহক-সমুজদার তৈয়ার করেছেন তিনদশকের একটানা ঘামে এবং প্রেমে। জেমসের মতো পরাক্রমশালী শিল্পী স্টেজে উঠে স্রেফ একটা গান গেয়ে নেমে গেলেও শ্রোতারা আপত্তি করে না, সারারাত গাইলেও শ্রোতা ক্লান্ত হয় না, দাঁড়িয়ে থেকে জেমস্ নামের ঘটনাটাকে টুপিমুক্ত কুর্নিশ জানায়। এ সেই জেমস্, ‘সহসাই নেমে পড়ে অরণ্যের গভীরতা’ গানে একটা আরণ্য রহস্যছমছমা টান দিয়া উঠবার সঙ্গে সঙ্গে বেবাক মানুষ বধির ও উন্মাদপ্রায় বিধুর হয়ে উঠত এককালে, একই লিরিকের একজায়গায় যেয়ে ‘অসীম আমি ঈশ্বরের মতো’ বলবার সঙ্গে সঙ্গে জনতা আবেগে গোঙানি দিয়ে উঠত, বনের গাছপালার মতো ঘন ও উজ্জ্বলতর মদিরায় ধীরস্থির প্রকৃতিলীন হয়ে যেত শ্রোতার শরীরবৃত্তীয় চঞ্চলতা; আজকের জেমসের প্রচলিত মঞ্চচেহারার সঙ্গে কি মিলানো যায় সেই মায়াবী দুর্বৃত্ত দুর্ধর্ষ খুনে এক মহান গাইয়ে জেমসকে?

মেলাবেন তিনি, মেলাতে পারবেন এখনও, ঝড়ো হাওয়ার সনে পোড়ো বাড়িটারে; জেমসের হাতে একান্নটার চেয়েও অধিক কার্ড, অতি অবিশ্বাসীও কথাটা খারিজ করে দেবে না আলবৎ, তবু বলতে হবে লোকসান যা হবার তা তো হয়েই গিয়েছে। জেমসের সেই আদি রূপটাকে আত্মসাৎ করে, সেই গায়ন ও গলার চালটাকে আত্তীকরণের মধ্য দিয়ে, বেরিয়ে এসেছে অ্যাট-লিস্ট দুইটা ব্যান্ড দুর্দান্তভাবে; এক, ‘শিরোনামহীন’; এবং দুই, ‘আর্টসেল’; ওই ডিস্টিউন্ড ডম্বরু, প্রণম্য জেমসেরই দিঙনির্দেশিত পন্থ, ওই অরৈখিক আওয়াজের অতুলনীয় নৈরাজ্য। অধিকতর সৃজনসৌকর্য নিয়ে এদের পত্তনি এবং প্রতিষ্ঠা। আর আজকে? কেবল ‘জলের গান’ আর ‘চিরকুট’ ধাঁচায় প্রেমদিওয়ানা আর খাঁচার পাখি উড়াইবার উদ্বাহু মরমিয়ানা। যারাই গাইছে এখন এককে এবং দঙ্গলে, একচেটিয়া আহ্লাদী আর আদুরে মিউজিকবাজি করে যেতেছে; কেবল মিষ্টি মিষ্টি লিরিক্স, মৌচাক শুধু, হুল নাই ভিমরুল নাই হোরিক্রীড়াও গরহাজির। অল্পদিনের নতুন বাংলাদেশের গানে একটা ফাঁকা আরও বড় হতেছে ক্রমে। জেমসের মতো শিল্পীদের দায় নিশ্চয় নাই এক্ষেত্রে। একেবারেই নাই?

james F.jpg

শিল্পীর দায়দায়িত্ব নিয়া আলাপালোচনা আউটডেটেড। অতএব প্রসঙ্গ ঘুরাই। ফিরি শিল্পীর কন্স্যার্টে। জেমসের ইম্প্রোভাইজেশন নিয়া খানিক আগে একটা বাক্য বুনেছিলাম। দেখি ফিরে ফের। মঞ্চে না-যেয়েও হয়, জেমসের ইম্প্রোভাইজেশন ক্যাপাবিলিটি ইউটিউবে ব্যাপকভাবে দেখা যায়। সেদিন সিলেটের মঞ্চে বেশি নয়, তিনটা গানে, ‘মা’ আর ‘দুষ্টু ছেলের দল’ এবং সম্ভবত ‘বিজলী’ গানত্রয়ে, যে-কাণ্ড ঘটায়ে দেখায়েছেন এই ম্যুজিকমায়েস্ত্রো, উরিব্বাপ! লোকে দেড়ঘণ্টা মাথাঝাকানাকার মধ্যে এই তিনবারের তিনচারটা জায়গায় ঝিম মেরে দেখে গেছে বাকবিরহিত হয়ে জেমসলীলা। ‘মা’ গানটার একটা জায়গায় ‘দূর নক্ষত্রমাঝে’ অংশটুকু বলতে যেয়ে যে-জিনিশ জন্ম দিয়েছেন, ভাবলেই শিউরে ওঠে অন্তরাত্মা, কোনো-একদিন নিশ্চয় সেই ক্ষণজন্মা ম্যাজিকের বর্ণনা আমরা আমাদের কোনো ভবিষ্যতের রচনায় দিতে কামিয়াব হব। ‘দুষ্টু ছেলের দল’ গানে যে-জায়গাটায় ‘গোপনে প্রিয়ার কাছে পত্র লিখি’ পঙক্তিটা আছে, সেখানকার ‘গোপনে’ শব্দটা নিয়ে যে-খেলা খেলিয়ে দেখালেন জেমস্, নতজানু হয়ে রইব বহুদিন এই স্মৃতিটুকুর দুয়ারে। এবং, বলতে হবে না নিশ্চয়, অল্পবয়সী শ্রোতাদের সমুজদারিতা নিয়া আমার অন্তত কোনোদিনও সন্দেহ হয় না, আমার নিজেরও বয়স যেহেতু একটা টাইমের পরে থেমে গেছে ন্যাক্কারজনকভাবে, জেমসের বর্ণিত উস্তাদিগুলোর সময় (গিমিক অর্থে নয়, নিরুপম নান্দনিক অর্থে যে-উস্তাদি) এই প্রজন্মের শ্রোতারা যেভাবে রিসিভ করেছে তাতে যেটুকু অবনমন নিয়া আমরা হাহুতাশ করি বুড়াহাবড়ারা তা-সবের দায় ইয়াংদের একেবারেই নেই নিঃসন্দেহে বলা যায়। ‘দিলি বড় জ্বালা রে পাঞ্জাবিওয়ালা’ টাইপের চট্টলাট্র্যান্সপোর্টেড দেহদোলায়িত জম্পেশ ছক্কা-বাউন্ডারির গানে যেমন তরুণেরা যথাযোগ্য গতর গমগম ঘুরাইয়া ঘুরাইয়া সাড়া দিয়া যায়, আশ্চর্য উন্মীলনের সময় তেমনি নিশ্চুপে দেহকুঁজো স্তব্ধ উদ্ভাস গ্রহণ করতে পারে।

জেমসের কোন গানগুলো অধুনা বাংলাদেশের নতুন শ্রোতাদের কাছে বেশি চিনপরিচিত? কোন গানগুলো জেমসকে কেবলই এক ফাঙ্কি মিউজিশিয়্যান পরিচয়ে হাজির করেছে তাদের সামনে? এর উত্তর সম্ভবত না-দিলেও চলবে। দেখা যাক কোন গানগুলো অধুনা প্রায় শোনা যায় না লোকালয়ে, জেমসের মুখে ও মঞ্চে তো কালেভদ্রেও না, যে-গানগুলোই কি-না জেমসকে আর-আটানব্বই শিল্পী/মিউজিশিয়্যান থেকে আলাদা করেছে। হ্যাঁ, ‘বিজলী’ নয়, ‘পাগলা হাওয়ার তোড়ে’ নয়, ‘আমি ভাসব যে-জলে’ নেভার নৈব চ, ‘কবিতা স্বপ্নচারিণী’ তো নয়ই, এমনকি ‘ঝাকানাকা মীরাবাঈ’ কিংবা ‘দুষ্টু ছেলের দল ছন্নছাড়ার দল’ নয়; এই গানগুলোর অন্তর্লীন একটা তালসাযুজ্য লক্ষ করুন, যে-ব্যাপারটা স্বাগত হচ্ছে না আলোচ্য জনতাকাঠগড়ায়। আখড়াই বা হাফআখড়াই, উনিশশতকী বাংলা লঘুসংগীতের সামষ্টিক স্মৃতি আমরা ফিরাইতেই পারি, ইঙ্গিতটা আগে একবার দেয়া হয়েছে। এর মানে আবার এ-ও নয় যে এইসব গানবাজনা ত্যাজ্য অথবা সানন্দ সুরগীতাখ্য নয় সেগুলো; বরঞ্চ অনবদ্য বলতেও অসুবিধা নাই এসবেরে; জেমসের পরিচয়চিহ্ন নয় এগুলো, কথা এখানে এটুকুই। কিন্তু কোনগুলো তবে জেমসের পরিচয়তিলক প্রকৃতপক্ষে? সেগুলো কি বিলুপ্তির পথেই? ঠিক তা না, আবার কানের আড়ালে যেয়ে গান একসময় মনের আড়ালেও তো চলে যায় বলিয়া আমরা আগে দেখেছি যুগে যুগে। ড্যান্স নয়, জেমসের বিটগুলো রক্তে একটা আলগ নাচন যোগাবার, জেমসের গান অন্যধারা মাতনদোলার। অথবা আদতে জেমসের গান ঝিম ধরাবার। কিছুদিন আগে পর্যন্তও জেমস্ নিজে স্ট্যান্ডস্টিল অবয়বে কেশঝাকড়া মাথামুখ নুইয়ে গেয়ে যেতেন একের-পর-এক এক্সপ্লোসিভ, লোকে আত্মহারা হয়ে কেবল মাতমধ্বনি ফুকারিত। বর্তমানে জেশ্চারেও পরিবর্তন এসেছে জেমসের, লক্ষ করা যাবে, ভাবে এবং ভঙ্গিমাতেও। ছক্কাতালের গানেই ইদানীং মঞ্চহাজিরায় জেমস্ মশহুর।

James E

অথচ কোনো-একদিন মঞ্চে জেমস্ ‘বাংলার লাঠিয়াল’ গাইতেন, ‘বেদের মেয়ে জোছনা’ গাইতেন, ‘মান্নান মিয়ার তিতাস মলম’ গাইতেন, ‘হারাগাছের নূরজাহান’ গাইতেন, ‘হাউজি’ গাইতেন; সমস্তই হেরিটেইজ্ আর ট্র্যাডিশন বিনির্মাণের বাসনা আড়ালে রেখে ল্যান্ডস্লাইড সফলতা আর অভিনবতার নমুনা একেকটা। ড্যান্সদ্রুতির গান হলেও অন্যতর ও অচিনজাগতিক নৃত্যমুদ্রার উদ্বোধন ঘটাতে পেরেছিল রক্তে সেসব। প্রজন্মান্তরে জেমসের রিয়্যাল রোয়াবের কাজগুলো কি বাহিত হচ্ছে? জেমস্ নিজেও উল্টোগতির রোল প্লে করছেন না? ‘পালাবে কোথায়’, ‘প্রিয় আকাশী’, ‘নাযায়েজ’, ‘পূর্ণিমা নৃত্য’, ‘হেরেমের বন্দিনী’, ‘শাদা অ্যাশট্রে’, ‘ভুলব কেমন করে’, ‘সাড়ে তিনহাত ভূমি’, ‘জবাব চাই’, ‘ভালোবাসার যৌথ খামার’, ‘নাগ-নাগিনীর খেলা’, ‘কতটা কাঙাল আমি’, ‘জঙ্গলে ভালোবাসা’, ‘নবজীবনের কথা বলছি’, ‘যে-পথে পথিক নেই’, ‘মধ্যরাতের ডাকপিয়ন’, ‘বেদুঈন’, ‘ব্যাবিলন’, ‘আমি ও আঁধার’, ‘হে পাগলী’, ‘নিষিদ্ধ ইতিহাস’, ‘গিটার কাঁদতে জানে’, ‘ঈশ্বর’, ‘চিরহরিৎ’, ‘একগ্লাস অন্ধকার’ … এইসব গান গত একদশকে জেমসকে কয়বার গাইতে শোনা গেছে? এই সময়ের অনেক তরুণযুবা আদৌ অনেক জেমসগানের খবরই রাখে না, রাখলেও লিরিক্স দেড়লাইনের বেশি নয়, আজকে ইউটিউবে যে-গানগুলোতে ট্র্যাফিক হয় বেশি সেগুলো সবই জেমসের লেইটার ডেইজ মিক্সডমাসালা গানা। টাকডুম টাকডুম ধাড়ামধুড়ুম। প্রোক্ত কয়েকটা গান গোড়ার অ্যালবাম চার/পাঁচটা থেকে উৎকলিত হয়েছে, এর বাইরে আরও অন্তত ডজনদুয়েক গান আছে যেগুলো জেমসকে আজকের অবিসংবাদিত অবস্থানে নিয়ে এলেও বর্তমানে সেভাবে শ্রোতাসমক্ষে সেই গানগুলা অ্যাবসেন্ট।

ফলে ব্যাপারটা হচ্ছে এ-ই যে, এই সিলেটসফরে জেমস্ নয়/দশ ক্রমের হিশেবে যখন “এই শহরের কতশত অট্টালিকার ফাঁকে / আমার জানালা ভরে ছবি হয়ে ঝুলছে আকাশ / আমি আর একফালি নিষ্পাপ চাঁদ / সারারাত কথা বলে হয়েছি উদাস” গানটা ধরেন তখন নবীনবয়সী অনেককেই কন্স্যার্টমাঠ থেকে বেরোতে দেখা যায়। লিরিক্স অচিন, বডি ম্যুভ করা যাচ্ছে না এর বিটের সঙ্গে, অনভ্যস্ততা ব্যাপারটা তো অস্বস্তিকরই হবে বেচারাদের জন্য। অথচ জেমসের গ্রেইট গানগুলো বৈতালিক ধাঁচেরই বলতে গেলে। এর সঙ্গে দোদুল দোলা যায় না, হকমৌলা বা হিলবাবা নামুমকিন এইধারা গানবাজনার তালে, কাজেই জেমসই পারেন নিজের গানগুলো জনপরিসরে ফের রিভাইভ করাইতে স্টেজে নিয়মিত গেয়ে এবং বাজিয়ে।

james H.jpgএকটা ব্যাপার লক্ষণীয় হবে যে, জেমস্ যখন টেলিভিশনগুলোর কাচবেষ্টিত ভবনে স্টুডিয়োলাইভ করছেন তখন কিন্তু অন্য চেহারায় হাজির হচ্ছেন। সম্ভবত সেই চেহারাটা আমাদের তো বটেই খোদ জেমসেরও অভিপ্রেত। পরীক্ষানিরীক্ষা করতে পারছেন, নিজের অধুনা-প্রায়-অপ্রচলিত পছন্দের কম্পোজিশনটা আবয়বিক প্রয়োজনীয় রদবদল সহ উপস্থাপন করছেন, ইলেক্ট্রিকের সঙ্গে অ্যাক্যুস্টিক জুতে দিয়ে একটা জাদুময়তা আনছেন। সর্বোপরি নিজের আশ্চর্য গলা আর গায়ন দিয়ে স্টুডিয়োঅ্যালবামের বাইরে টেলিভিশনলাইভগুলোতে জেমস্ এতটাই বিস্ময়বিস্তারী যে এর তুলনা বাংলায়-অবাংলায় বিরল। উন্মুক্ত মঞ্চের জনতামাঝারে জেমস্ কেন তবে এমনটা দায়সারা ধুমধাড়াক্কা ছক্কাপাঞ্জা? ব্যাপারটা কি নিছক নগদ পয়সাপাত্তির কমজোর-বেশজোরজনিত? মনে হয় না। কারণ, ওপেন-এয়ার কন্স্যার্টগুলোর বায়নাতে রেস্ত তো কম দেয়া হয় না। তাহলে? এর একটা কারণ আমরা আন্দাজ করতে পারি, কিন্তু বর্তমান কন্স্যার্টরিভিয়্যু নিবন্ধে এতদসংক্রান্ত কথালাপ তুলতে চাইছি না। যারা সাধারণত কন্স্যার্ট ইত্যাদি মিউজিক্যাল ফেস্টফাস্ট আয়োজন করিয়া থাকেন তাদের মিউজিক-লিট্যারেইসি নিয়া আপাতত সন্দেহের উর্দ্রেক হলেও উল্লেখে বিরত রই। শিল্পীর সঙ্গে ডিল্ করতে যারা যান, অর্গ্যানাইজারদের মধ্যে যারা শিল্পীকে বায়না করা দায়িত্বে থাকেন, তাদেরে দিয়াই শিল্পী সাধারণত অডিয়েন্স সম্পর্কে একটা মাপজোখ করিয়া ফ্যালেন। সচরাচর এমনটাই হয়। মিউজিশিয়্যানরা ভালো সমুজদার পেলে পয়সাকড়ি ভুলে যেয়ে রিহ্যার্স্যালে বিভোর হয়ে যান, সমুজদারের সামনে শিল্পী মাত্রই শিশুর ন্যায় ম্যাজিকওয়ালা, এই ব্যাপারটায় আস্থা আমরা আজও হারাইতে চাই না।

আড়াই দশক ধরে জেমসের কম্যান্ড তার শ্রোতাদের ওপর প্রায় একই অবস্থানে বলবৎ লক্ষ করা গেল। গড’স্ কম্যান্ড যেন! কন্স্যার্ট চলাকালীন ‘অইত নি? অইত!’ অথবা ‘ওয়ান ম্যোর’ ধরনের কোনো ধ্বনি বিদারিত হতে কেউ শোনে নাই। তিনি যা শুনিয়েছেন, আধো বোলে তিনি যা-ই বলেছেন, শ্রোতা তাতে দ্বিরুক্তি কিংবা আতিরেক্যের আব্দার করে নাই। ইউফোরিয়ার শোর মাচায়েছে শুধু। প্রত্যেকটা গানান্তে জেমস্ ‘লাবিয়্যু’ উচ্চারণ করে গেছেন পৌনঃপুনিক, মধ্যরাতে মেয়েদের উপস্থিতিস্ফীতি লক্ষ করে জেমস্ ছেলেদের দিকে ইঙ্গিত উঁচিয়ে বলেছেন ‘আজকে দেখব তোমরা কতটা শিক্ষিত’, গোটা-তেরো গান গেয়ে এবং বাজিয়ে জেমস্ মঞ্চত্যাগের সময়ে একটুও মনে হয় নাই সিলেট-অডিয়েন্স কোথাও হতাশ করেছে তাকে। উপরন্তু সহসা স্টেজ ছেড়ে যাবার সময় ‘প্রশাসন বন্ধ করে দিতে বলছেন … অনুষ্ঠান বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছি’ … জেমসের হেন উচ্চারণে আন্দাজ করা যায় তিনি নিরুৎসাহী ছিলেন না আরও গাইবার ব্যাপারে। যে-জিনিশটা আরও লক্ষণীয় সেইটে এ-ই যে, দেশে এখন সংগীতাসরগুলোতে যেভাবে সমাজ-সভ্যতা আর রুচিপ্রবর্তনার জাগৃতিজিগিরমূলক মোটাসোটা ভাষণ দান করেন মহামহিম গণসংগীতজীবীরা, গানের চেয়ে বাখানের বাহার হয়ে যায় বেশি সেইখানে, জেমস্ সেসবের তোয়াক্কা না-করে সোজাসাপ্টা গানটাই শোনান। বড়জোর লাবিয়্যু অথবা নারী শ্রোতাহাজিরানা উদ্দেশ করে দুইতিনটা উইটি রিমার্ক ছুঁড়ে ঝটিতি গিটার প্লাক করেন। এইটা ভালো। গণসংগীতকারদের সভ্যতাদায় নিয়া জাগরণপালা শুনে শুনে এমনিতেই বাংলার শ্রোতারা আধমরা। গানযাপনের অ্যাম্বিয়্যান্স তৈরিতে জেমসের দক্ষতা আনপ্যারালাল।

জনতাবাজারে জেমসের নবরূপায়িত মূর্তি নিয়া আরেকদফা আলাপ তোলা আবশ্যক হবে। সেইটা বাদ্-ম্যে দেখা যায়েগা। আপাতত কথা এ-ই যে, সেই দিন নাই যখন মহারাজাদরবারে গান শুনিয়ে গুজরানো হতো বড়ে-বড়ে শিল্পীদের জিন্দেগি। এখন জনতারাজার দরবারি যুগ। এখন পণ্ডিতজিদিগেরেও ফ্যুটবলখেলার ময়দানে ঘেমো ভিড়ে কামিয়াবি হাসিল করতে হয়। আমজাদ আলি খান বাঙ্গাশ আর গিরিজা দেবী বলি কিংবা আরও যারা রাজারাজড়াদের ঝাড়বাতিঝিলমিলানো জলসাঘরের শান্তিভক্তিশ্রী সুনন্দা গান করেন তারাও বর্তমানে ব্যাপক গণজমায়েতমুখো। ধ্রুপদ সংগীতও গণসংগীতের জায়গা নিয়ে নিতেছে বোধহয় অচিরে। যে-হারে কর্পোরেটের বায়নানির্ভর বর্তমান ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিকের তা-বড় গাইয়ে-বাজিয়েরা, তাতে এমন ভাবাটা আনলাইক্লি নয় যে ঘরানাগত উচ্চাসীনতার গুমর ভিতরে রেখে গর্বে গুঁজ হয়ে চলাফেরার দিন অস্ত গিয়াছে। জেমসের জনতামুখিনতা কাজেই ঠিকই আছে। এইটাই অল্টিমেইট হওয়াটা বাঞ্ছনীয়। তবে জেমসের মতো প্রভাবশালী শিল্পী নিজের সিগ্নেচার অটুট রেখেও সেইটা করতে পারেন, বাংলা গানের তাতেই মঙ্গল হয়, কথা আপাতত ওইটুকুই।

স্বীয় বসতগৃহ হইতে সেজেগুজে কন্স্যার্টে বেরোনোর প্রাক্কালে মেয়েকে জিজ্ঞেস করি, জেমসের ছবি দেখিয়ে, উস্তাদজিকে চেনে কি না। আমারে অবাক করে মেয়ে জবাব দেয়, চিনি চিনি, ‘ভিগি ভিগি’ গানের গায়ক না? আমার মন্তব্য প্রয়োজন নাই আর। ইয়্যে হ্যায় বাজার, ম্যেরে ইয়ার! তবু, মন মানে না, হায়! আমি কি ভুলিতে পারি, আমার ঘর আমার গিন্নি আমার দোস্ত আমার দোসর আমার পুত্র আমার কন্যা, আমার ঘরকন্না, আমার গড্ডালিকায়-ভাসা বাণিজ্যবাতাসের তোড়ে ম্রিয়মাণা বাড়ি? বিস্মৃত, চুপসানো, অবহেলায় ন্যাতানো ও অগোছালো। ভুলে গেলেও ঘুরেফিরে ফেব্রুয়ারি এলে সেই মনেপড়াপড়ির সুরটুকু রক্তে কান্নাধারার দোলা জাগায় প্রভাতফেরিজুড়ে। কে মনে পড়ায় রে? আগাচৌ? আলতাফ মাহমুদ? এই শালার গানের কারণেই জিন্দেগিতে এল না আমার একটুকরা কামিয়াবি। ‘জীবনে জীবনে জীবনে জীবনে শালার / কিছুই পেলাম না’ … তা, কি পাইতে চেয়েছিনু? ধন-মান তো অবশ্যই, হতে চেয়েছিনু সলজ্জ সফেদ শ্মশ্রুসেক্সি সালমান এফ. রহমান, মনে সাধ হব পাব্লিকের পয়সাহাতানো মস্ত ধনকুবের ভিভিআইপি; নিদেনপক্ষে এক অকাল কুষ্মাণ্ড গবেষক, গণ্ডার গদ্যকার এবং সর্বোপরি শীর্ষহরি বিপন্ন কন্দর্পকান্ত কবি। ‘জিন্দেগি টেস্টিং, হ্যালো হ্যালো, এই জিন্দেগি টেস্টিং / দেখছি দেখছি ওই আগামীর দিন’ … শেষমেশ জেমস্ অবশ্য ‘আন্তর্জাতিক’ একটামাত্র ‘সংগীত’ ‘পরিবেশন’ করে এ-যাত্রা ক্ষান্ত হয়েছেন এই শোয়ে, সেইটা ২০০৬ বলিউডম্যুভি ‘ওহ্ লামহে’ থেকে ‘চল্ চলে’ গানটা, প্রীতমের মিউজিকডিরেকশনে এইটা জেমসের হিউজ্ হিটের মধ্যে একটা, “চল্ চলে আপ্নে ঘর / অ্যায় ম্যেরে হামসফর”, গানের লিরিক্স সুন্দর, গেয়েছেনও জেমস্ দুর্দান্ত, সেদিনের কন্স্যার্টেও হয়েছে টেরিফিক রেন্ডিশন। লোকের আওয়াজে তখন ‘ভিগি ভিগি’ আব্দার শোনা না-গেলেও অনেকেই নিকটে-দূরে আফসোস করছিলেন আরও দুইয়েকটা ‘আন্তর্জাতিক’ শোনার জন্য। তবে, যে-প্রশ্নটা কারো কারো ভিতরে জেগেছিল তবু বাইরে বাইরায় নাই, জেমস্ কি নিজগৃহে ফেরার নিয়ৎ করেছেন অবশেষে? একখানা অ্যালবাম কি রিলিজ্ করবেন এইবার দুঃখিনী বর্ণমালা বাংলায়? ঢের দিনরাত তো গুজারিয়া যাওয়া হলো প্রীতমসার্ভিসে, এইবার কি ঈদে-পুজোয় একখানা অ্যালবাম আমরা তার পেটরোগা প্রেমিকা বাঙালরা পাব? প্রশ্ন উড়েছে হাওয়ায়, অ্যান্সার মেলেনিকো।

ছড়া বা নার্সারি রাইমের ভিতরে একেকটা জাতি-ভূখণ্ডের মানুষের সামষ্টিক চৈতন্যের অন্তর্গত দুঃখদৈন্যানুভূতি, বিষাদবেদনা, ভাব-অভাব-লড়াই-পরাজয় যেমনটা থাকে বিধৃত, অন্য কোথাও — অন্য কোনো সাহিত্যসংরূপে — অত গভীরের স্তরে সেইটা পাওয়া যায় না। আবিশ্ব ঘুমপাড়ানিগান বা লালাবাইগুলোতে ব্যাপারটুকু লক্ষণীয়। জনগোষ্ঠীর জন্মজন্মান্তরের সহজাত অনুভব-অভিব্যক্তিগুলো পোরা থাকে ছড়াগানে। যেমন আছে আংরেজিতে, এস্পানিয়োলে, অ্যারাবিকে, ল্যাতিনে, হিস্পানিকে, তেমনি আছে বাংলাতেও। উদাহরণ চাও? দুনিয়াভাসানি বিনোদনবাতাসে, এমনধারা ‘পাগলা হাওয়ার তোড়ে’, কে রাখে খবর তার কওমের ভালোমন্দের? উদাহরণ দেয়া যায় কাতারে-কাতার, তোমরা কি আমলে নেবে? “ছেলে ঘুমালো পাড়া জুড়ালো / বর্গী এল দেশে / বুলবুলিতে ধান খেয়েছে / খাজনা দিব কিসে? / ধান ফুরালো পান ফুরালো / খাজনার উপায় কি? / আর-ক’টা দিন সবুর করো / রসুন বুনেছি” … নিদ্রায় যাবে না জেগে রইবে, এই পদ শুনে, এর বিষাদব্যঞ্জনায় তেতে উঠবে নাকি থম বসিয়া থাকবে, অ্যাপোলিটিক্যাল লিরিকের লবঙ্গলতিকা বাংলায় লালাবাই মিউজিক থেকে একবার যদি নিতে পারো পোলিটিক্যাল লিরিক লেখার শিক্ষা, আখেরে তোমারই তো প্রোফিট হতো। অত্যন্ত ব্যক্তিগত দুঃখসুরেও পুরে দিতে পারো তোমার প্রতিবেশের পরিজনের বোবা কান্নার থমথমানো যুগযুগান্ত ক্রোধ, করুণা, মায়া ও মন্থরতামাখা আশাকরোজ্জ্বল উদ্ভাস — খোকাভোলানো ছড়াগানে এই শিক্ষাটাই লভ্য।

James C

শুনবে, একটা, আরও? শোনো : “খোকন খোকন করে মায় / খোকন গেছে কাদের নায় / দুধমাখা ভাত কাকে খায় / খোকন রে তুই ঘরে আয়” … কিন্তু খোকনসোনার কানে এখন দুনিয়ামাতানো রকিং রলিং গানের মেশিন লাগানো। খোকনসোনা আজিকালি ফাঙ্কি মিউজিকের সনে হেডব্যাঙ্গিঙে মাতোয়ারা, হ্যাব্বি দোল খায় আমাদিগের খোকাখুকু অতিগাগনিক ইংলিশ রক্-অ্যা-রল্যায়, হিন্দি ফিল্মিগানায়, হেভিমেটালে-ডেথমেটালে, পিঙ্ক ফ্লয়েড অরিজিন্যাল নাম্বারের কাভার ভার্শন পয়দানোয়, ডায়ার স্ট্রেটস্ আর নির্ভানায়, বড়জোর বাংলা আড়খ্যামটা নাচনায়। আমাদের খোকাখুকু ঘুমিয়েছে, পাড়াগাঁর দুপুরবেলাটা শান্ত সুনসান, হ্যাপি নিদ্রায় রাজামশাই ড্রিমবিভোর, বর্গীরা আমাদের মায়ের পেটের ভাইয়ের চেয়েও বড়, ফ্যুটবলময়দানে এম্পিরর অ্যান্ড ক্লাউনদের হ্যান্ডশেইকিং মিউজিক ফেস্ট বছরভর চলে। জ্যান্ত সময়ের গান গাইবার, বাঁধবার, মঞ্চ ও মওকা আমাদিগের দরকার হয় না আর। এসে গেছে এরই মধ্যে উইন্ড অফ চেইঞ্জ, তামাশার, দুনিয়ার সেশনপ্লেয়ার দেখানোপনার। সংক্ষেপে এটুকুই ইতিহাস আমাদের সাম্প্রতিক প্রোফিট-মার্জিনগোনা ভাড়াখাটা গানবাংলার।

কৃতজ্ঞতাসূত্র
♣ প্রচ্ছদচিত্রে ব্যবহৃত মূল ফোটোগ্রাফের শিল্পী ইমতিয়াজ আলম বেগ।

♣ সিলেট-কন্স্যার্ট ২০১৭ মঞ্চের সংশ্লিষ্ট প্রোমো ও ফোটোগ্রাফসমূহ কন্স্যার্ট-অর্গ্যানাইজার ‘ব্যান্ড কমিউনিটি ইভেন্ট পেইজ‘ থেকে গৃহীত।

… …

 

অন্যত্র প্রকাশিত একই লেখকের জেমস্ বিষয়ক রচনার আরেকটি লিঙ্ক 
‘চিরহরিৎ চিৎকারের গ্র্যাম্যাটোলোজি’

COMMENTS

error: