টিলাগড় পয়েন্ট, আহত চড়ুই এবং অন্যান্য আলাপ || সাব্বির পারভেজ সোহান

টিলাগড় পয়েন্ট, আহত চড়ুই এবং অন্যান্য আলাপ || সাব্বির পারভেজ সোহান

SHARE:

খ্রিস্টাব্দ ২০১২। কাগুজে উড়োজাহাজের শৈশব পেরিয়ে আমরা তখন ভেসে বেড়াচ্ছি আস্তিন-গোটানো কৈশোরের নদী উপত্যকা ও বিবিধ অরণ্যে। আমরা মানে আমি একা, আমরা মানে আমি ও আমার সকল মৃত স্যাঙাত।

নদীর নাম সুরমা, ইস্কুলের নাম পাইলট, সিনেমার নাম অ্যাপোক্যালিপ্স নাউ। একটা দুরন্ত ব্ল্যাকআউট। হেলিকপ্টারের ডানার মৃদু আর্তনাদ এবং গ্যাসোলিনে-জ্বলে-ওঠা একসারি গাছ । কমলা আগুন, লাল আগুন, লাল আগুন, কমলা আগুন, জিম মরিসন। জিম মরিসন, জিম মরিসন, জিম মরিসন। ‘মিস্টার মোজো রাইজিন’। সেলিব্রেশন অব দ্যা লিজার্ড কিং – হি ক্যান ডু অ্যানিথিং।

ইয়ারফোনের অজর সুড়ঙ্গপথে আমরা ফেরত যাই তথা ব্রেক অন থ্রু করি সিক্সটি সেভেন, নাইন্টিনসিক্সটিসেভেনের রকসিন,শকসিন, নকশাল, বনি ও ক্লাইড, দিস ইজ দি এন্ড, অ্যান্টি-এস্টাব্লিশমেন্ট-এর আলো ও দৃশ্যে। দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি শেষে আমরা থামি লস অ্যাঞ্জেলসের লন্ডন ফগে। সেইখানে, জনহীন রাত্তিরে গান গায় (মহীনের ঘোড়াগুলি নয়) চন্দ্ররথের সর্প-সারথিদল। ব্যান্ডের নাম হয় – The Doors. শ্রেষ্ঠাংশে রন- সাইকাডেলিয়ার আনপ্যারাল্যাল সম্রাট জিম মরিসন। নেপথ্যের জাদুকর – কিবোর্ডকারক রে মাঞ্জারেক, সূনৃত গিটারে রবি ক্রেইগার, লুডউইগ মড অরেঞ্জ কিটে জন ডেন্সমুর।

১. 

“অতল, তোমার সাক্ষাৎ পেয়ে চিনতে পারিনি বলে
হৃদি ভেসে গেল অলকানন্দা জলে”

গল্পটা শুরু হয় ’৬৭-র এপোনিমাস অ্যালবাম The Doors-এ।  ইন্ট্রোতেই মরিসন কণ্ঠে উচ্চারিত হয়–

“You know the day destroys the night
Night divides the day
Tried to run
Tried to hide
Break on through to the other side”

পৃথিবীর প্রথম বাইসন বিদ্যুৎগতিতে আমাদের নিউরন ছিঁড়েখুঁড়ে এক করে দেয়। লুটপাট হতে থাকি আমরা। মরিসন উচ্চারণ করতে থাকে, দেবী ও মানবীর প্রতি–

“I found an island in your arms
Country in your eyes
Arms that chain
Eyes that lie
Break on through to the other side”

ততক্ষণে আমরা বুঝে যাই, শিল্পের যে-কোনো সর্বগ্রাসী শাখার মতোই মরিসন ও তার গান, সুরে ও কথায়, অনুবাদে নয় – মূলেই বাঁচে প্রবলরূপে; রূপ-অরূপে। মূল স্বর ও মূল ভাষাতেই এই আফ্রোদিসিয়াকের প্রবল প্রকাশ। তাই আমরা আরো খানিকটা বিহ্বল হই, আরো একটু সুরশুরা পান করে নেই।

jm

আমাদের চেতনার চৌকাঠ পার হই। মরিসন ও তার বন্ধুগণ আমাদের নিয়ে যান অবচেতনার এলএসডি-ঘোরে। গানটা তখন গানের বদলে হয়ে ওঠে মরফিন – একটা প্রজাপতি অথবা একটা স্বয়ম্ভূ কবিতা।

একে একে আমরা আলো জ্বালি স্বপ্নের ঘরে। আমরা গাইতে থাকি –

অচেতনে তোমার তলিয়ে যাওয়ার আগেই
অধর চিনুক অধরের নিগূঢ় মানচিত্র
চমকানো সুখে –

অনিমিখ উল্লাসে!

এই ঘোরগ্রস্থ মৌতাত ধী নিয়ে আমরা শরিক হই মানবপ্রবৃত্তির গুপ্তঘরে সিক্সটিজের অনবদ্য অবদান সাইকাডেলিয়ার এসেনশিয়্যাল রিচুয়াল – অস্তিত্বের অনঙ্গ যাপনে। সেইখানে, আমরা প্রকৃত কায়ায় দৌড়ে চলেছি জ্যোৎস্নার তলে। প্যালিওলিথিক চাঁদ আমাদের ডুবিয়ে নিচ্ছে।

একদিন ঘুম ভেঙে শামান পুরোহিতে রূপান্তরিত হওয়া মরিসন তখন অমোঘ উচ্চারণে আমাদের প্রশ্ন করে–

“Can you picture what will be
So limitless and free?”

নিরুত্তর আমরা ঈডিপাল স্পোকেন ভার্সে, গ্রিক মিস্টিকের মৃদঙ্গে শুনতে পাই–

jh2

“The killer awoke before dawn, he put his boots on
He took a face from the ancient gallery
And he walked on down the hall 

Father, yes son, I want to kill you
Mother…I want to…fuck you !”

আমরা ভেসে যাচ্ছি। আমরা ভেসে যাই।

এন্ডোরফিনের প্রবল জোয়ার নিউরনের শেকড় বেয়ে পৌঁছে যাচ্ছে আমাদের অনাদি অস্তিত্বের আদিমতম শেকড়ে।

২.

রক এবং মিউজিকের অন্যান্য জঁরার ইতিহাসে নানাবিধ কারণেই 1967-কে আমরা একটা ল্যান্ডমার্ক ধরে নিতে পারি। ওয়ার্ল্ডম্যাপের নানা প্রান্তে ট্র্যাডিশন এবং এস্টাব্লিশমেন্ট-এর বিরুদ্ধে সিক্সটিজের কালচারাল ম্যুভমেন্ট-এর ব্যাকড্রপ চিন্তা করলে আর সিক্সটিসেভেনে রিলিজ হওয়া অ্যালবামগুলোর দিকে তাকালে মিউজিক হিস্ট্রি আমাদের সে-কথাই বলে।

The Beatles (Sgt. Pepper’s Lonely Hearts Club Band), The Jimi Hendrix Experience (Are You Experienced, Axis: Bold As Love), Pink Floyd (The Piper At The Gates Of Dawn), Leonard Cohen (Songs Of Leonard Cohen), The Doors (The Doors, Strange Days), The Moody Blues (Days Of Future Passed), Tim Buckley (Goodbye And Hello), The Velvet Underground And Nico (The Velvet Underground And Nico)

nicoএ-রকম অর্ধশতাধিকের বেশি বেঞ্চমার্ক অ্যালবাম  আমরা পাই  1967-এর মেইনস্ট্রিম মিউজিক ফ্রন্টে। আর তাই, প্রাতিষ্ঠানিক সংগীতশিক্ষার মানদণ্ডে খেতাবহীনতার খেতাবধারী হয়েও, মিউজিকযাপন ও মিউজিকদর্শনের খুচরো কথা নিয়ে গানপারের হয়ে লিখতে বসার যে রকবাজি, সেটার খেরোখাতা আমি খুলব রোয়ারিং সিক্সটিজের 1967 থেকেই। যেখানে ঘুরেফিরে আসবে আমাদের রকমগ্ন না-কবি-না-সন্ন্যাসী-না-কৃষক-না-পরবাসী পরানের ভাবালুতার কথা। একটা জলাবদ্ধ সমাজে অফেন-অ্যাপোলিটিক্যাল, মোস্ট অব দি পিরিয়ড আইদার রুটলেস অর রংরুট হবার যন্ত্রণার কথা। অজানিতে চলে আসতে পারে কবিতা, সিনেমা আর বাংলা রক। আর যেটা আসবে, যাকে আসতেই হবে সে হলো – টিলাগড় পয়েন্ট। যেখানে আমি রোজ মিলতাম, নিজেকে মিলাতাম বিটলস্, কোবেইন, রবিশংকর কিংবা জীবনানন্দের সাথে। যেখানে আমার অবাধ্য কলেজের দিন, বায়বীয় শব্দজীবন আর বৃষ্টির রেখা জমা আছে। যেখানে আমার লাবণ্য পূর্ণ প্রাণে রকধারণের বিকাশ। যেখানে আমার কাফকা লোর্কা শক্তি কামুর আকাশ।

pf2

লেখাটি তাই আগাগোড়া মোড়া থাকবে ভাববাহুল্য এবং উন্মাদনায়। একটা চড়ুই, যার ডানা বারবার ভেঙে দিতে চেয়েছে কেন্দ্রীয় শিক্ষাব্যবস্থা, দাসত্বের অর্থনীতি, তার সাথে সুরের আকাশে ওড়ার সাহসটুকু যে-পাঠক দেখাবেন, তার সাহস ও নির্জনতাকে তারিফ জানাই। আর, বাকি দুনিয়ার জন্য রইল প্রিয় এপিটাফ –

“When the music’s over
Turn out the lights”

(চলবে)

COMMENTS

error: