দ্রোহমন্ত্র শহরগরাদে || মেঘদল

দ্রোহমন্ত্র শহরগরাদে || মেঘদল

SHARE:

[ফরাশি সেই কবির মুখ তো মনে পড়বেই — শার্ল ব্যোদলেয়্যর — মনে পড়বেই তিরিশি বাংলা আধুনিক কবিতার সেই দিগবলয়বিস্তৃত বুদ্ধদেব বসু ও তার দৌত্যে ক্লেদজ উজ্জ্বল সেই কুসুমচয়নিকার স্মৃতি — জীবনে এক-আধলাবারের তরে হলেও যে-পাঠক সঙ্গ করেছেন দুঃখিনী বাংলা কাব্যদয়িতার, তিনি নিশ্চয় পাশরিয়া যান নাই নিকষিত হেমের সনে তুলনীয় বুদ্ধদেবকৃত অনুবাদগুচ্ছ; মনে পড়বেই সৃজনশালী মিউজিক্যাল বাংলা ব্যান্ডের এই নামটা কানে প্রবেশিবার সঙ্গে সঙ্গে — মেঘদল — “বলো আমাকে রহস্যময় মানুষ, কাকে তুমি সবচেয়ে ভালোবাসো? তোমার পিতা, মাতা, ভ্রাতা অথবা ভগ্নীকে? — পিতা, মাতা, ভ্রাতা অথবা ভগ্নী … কিছুই নেই আমার। — তোমার বন্ধুরা? — ঐ শব্দের অর্থ আমি কখনোই জানিনি। — তোমার দেশ? — জানি না কোন দ্রাঘিমায় তার অবস্থান। — সৌন্দর্য? — পারতাম বটে তাকে ভালোবাসতে; দেবী তিনি, অমরা। — কাঞ্চন? — ঘৃণা করি কাঞ্চন, যেমন তোমরা ঘৃণা করো ঈশ্বরকে। — বলো তবে, অদ্ভুত অচেনা মানুষ, কী ভালবাসো তুমি? — আমি ভালোবাসি মেঘ, চলিষ্ণু মেঘ … উঁচুতে … ঐ উঁচুতে … আমি ভালোবাসি আশ্চর্য মেঘদল।” মনে কি পড়ে এই সওয়াল-জওয়াব, মনে পড়ে? হে বন্ধু হে প্রিয়, বহমান কবিতাবাতাসে হে গেরুয়া গানের গগন-উত্তরীয়! মনে কি পড়ে না? — “আশ্চর্য মেঘদল” … উঁচুতে নয়, প্যারিসের স্ট্রিটে নয়, এই নিমনাগরিক শহরগাঁয়ে এঁদো গলিঘুপচির চিরপরিচিত অন্ধকারে-আলোয় একটা ব্যান্ডের সুবাদে গেল-শতকের অন্তিম দশকের উপান্ত থেকে এস্কেইপিস্ট না-হয়েও শোনা গেল সত্যম-শিবমের ঊর্ধ্ব সুন্দরমের সুর। এইখানে, হে পাঠক, মেঘদলের কিছু গান সংকলিত রইল। পড়ার জন্য। শুধুই পড়ার জন্য, সুর ও সংগীতের আয়োজন ভুলে কেবল মনোলীন উচ্চারণে এই লিরিকপুঞ্জ গুঞ্জরিয়া যাওয়াই এক্ষণে অভিপ্রেত, নতুন দিনের বাংলা গানে ব্রেক-থ্রু উদবোধনের পথঘাট সুগম হবে এইধারার যাবতীয় কথাগীতি নিরীক্ষণ করে যেতে পারলে; এছাড়া নিদান নাই, মুক্তি নাই, বিশল্যকরণী ডিটেক্ট করতে গেলে এই আবহমানের গন্ধমাদনে এ-সময়ের বিপুল জনতারাশির হৃদয়োৎসারিত সুর-বেসুরগুলো সযত্ন-সসম্মান করপুটে নিতেই হবে। এরপর যথেচ্ছ তর্কাতর্ক হোক, তুলোধোনা তারিফি-খারিজি তুল্যমূল্যাঙ্কন, তবে এসবের আগে চাই নিজের ভাব ও আবেগের স্বতঃস্ফুরণের সর্বশেষ তথা সাম্প্রতিক প্রকাশধরনটাকে একবাক্যে স্বীকৃতি। আমরা ‘গানপার’ থেকে এই কাজটাই করে যেতে চেষ্টাশীল অন্য শতেক চেষ্টার ফোকরে। এইখানে মেঘদলের কয়েকটা গানপাঠ শুধু; কোনো মূল্যাঙ্কন নয়, লিরিক্সের বাইরে কোনো লতাপাতানো তথ্যও নয়, এই মুহূর্তে নয় অন্তত, সেসব পরে হবে। এই লিরিকগুলো সংগৃহীত হয়েছে মেঘদলের ‘দ্রোহের মন্ত্রে ভালোবাসা’ ও ‘শহরবন্দি’ অ্যালবামদ্বয় থেকে; একটা শুধু — নেফারতিতি — গ্রহণ করা হয়েছে ‘নিয়ন আলোয় স্বাগতম’ শীর্ষক একটি মিক্সড-অ্যালবাম থেকে। — গানপার]

রোদের ফোঁটা
শূন্যতায় ভেসে গেছে
শহরের সব পথঘাট
ফিরবে না গতকাল জানি
ফিরবে না আগামীকাল।

তবু চাইছি তোমাকেই তুলে নিতে
অঞ্জলিতে রোদের ফোঁটা।

শোনো কবি, শোনো কবিতা
ভাঙো দীর্ঘ মূর্ছনা
রাখো এইখানে হাতটুকু
তবু চলে যেতে বোলো না।

শূন্যতায় ঢেকে গেছে
শহরের বাকি ইতিহাস
ফিরব না তুমি আর আমি
ফিরব না হয়তো আবার।

তবু চাইছি তোমাকেই তুলে নিতে
অঞ্জলিতে রোদের ফোঁটা।

শূন্যতার শোকসভা
শূন্যতার যত গান
দিলাম তোমার মুকুটে
আমার যত অভিমান।

শূন্যতায় ডুবে গেছে
শহরের সব পথঘাট
ফিরবে না গতকাল জানি
ফিরবে না আগামীকাল।

তবু চাইছি তোমাকেই তুলে নিতে
অঞ্জলিতে রোদের ফোঁটা।

আকাশ মেঘে ঢাকা
আকাশ মেঘে ঢাকা
ঢেকে যায় সব রোদ
ছায়া-ছায়া অন্ধকারে
উড়ে যায় সব বোধ

আকাশ মেঘে ঢাকা …

উড়ে যায় বিষণ্ন পাখি
আমি একা জেগে থাকি
অন্ধকারের গান
উড়ায় না অভিমান

আমরা তবু জেগে থাকি
উড়ে যায় বিষণ্ন পাখি …

চোখের জলে আগুন জ্বলে
বৃষ্টি তুমি জানো কি?
চোখে চেতনায় অন্য আলো
স্তব্ধ সময় বোঝো কি?

আকাশ মেঘে ঢাকা
ঢেকে যায় সব রোদ
ছায়া-ছায়া অন্ধকারে
উড়ে যায় সব বোধ

আকাশ মেঘে ঢাকা …

পাথুরে দেবী
পাথুরে দেবী পাতার পাখনা গায়ে
স্নানজলে নিহত অগ্নিমাছ
নেইকো মানুষ সুর্যের দিকে যাই
ট্রাফিকভিড়ে সহস্র পঙ্খীরাজ।

আনমনা লোকটা এখনও দাঁড়িয়ে একা
রোজকার রেলগাড়ি-রেলগাড়ি বিকেল
ময়দানে লড়াই মহিষে-মহিষে আজ
খুন হবে প্রোজ্জ্বল ঐ চাঁদ।

সিলিঙে ঝুলছে রূপবতী লাশ
মহাশূন্যের মতো একা একা
শহরে আজও বৃষ্টি হবে না
তাই কাঁচপোকাদের নেই দেখা।

জলজ ঘ্রাণের নুন অনেকটা প্রাচীন
খোলসের মতো আছে পড়ে
করোটির ভেতরে জমাট অন্ধকার
অক্ষরগুলো শুধু ওড়ে।

শহরবন্দি
শহরবন্দি মেঘ, ঘুরে ঘুরে একা
আমাদের এই সুবর্ণ নগরে
আমিও পেতেছি কান, শুনি বৃক্ষের ক্রন্দন
ধূসর রাজপথের প্রান্তরে …

চন্দ্রগ্রস্ত ভোর বড় বিদায়-বিদায়
তুমি এখনও দেখো সূর্যালোকের ভোর
তুমি গাইতেই পারো গান, এই সুবর্ণ নগরে
ভুলে যেতে পারো ইতিহাস অর্থহীন নগরকালে …

কেটে-ফেলা গাছ ভুলে যাবে সব শোক
কিছু সবুজ পাতার ক্রন্দন তুলে রেখো
ভেজা ভেজা চোখে কান্না লুকাতে পারো
ভুলে যেতে পারো চাইলেই বারবার …

তুমি গাইতেই পারো গান, এই সুবর্ণ নগরে
ভুলে যেতে পারো ইতিহাস অর্থহীন নগরকালে …

কুমারী
কুমারী উত্তর দাও তুমি
যে-বাক্য অশ্রুত অন্ধকার
আমার হৃদয় প্রবল ঝোঁকে
চাপ দেয় তোমার হৃদয়ে

যদি কখনো দেখি
রূপান্তরে তোমার অস্থিরতা
তবে সেই অস্থিরতায়
আমি তোমাকে প্রেমের আগে
তোমার প্রেমকে ভালোবাসি।

কুমারী বন্ধ চোখে ভাবো
আকাশ তোমার আঁচল
তোমার চোখের নদীতে
বৃষ্টির যত গান
নীরবতার অপর পাড়ে
মুখর কলতান

তবে সেই অস্থিরতায়
আমি তোমাকে প্রেমের আগে
তোমার প্রেমকে ভালোবাসি।

ঠিকঠাক
সব ঠিকঠাক যখন বলো
ওলটপালট হয়ে যায়
এলোমেলো সব হয়ে যায়
সব ঠিকঠাক।

সব ঠিকঠাকের এই শহরে
উঁচুনিচু আঁকা সব দেয়ালে
নাগরিক সব ফুল ফুটে থাক
সব ঠিকঠাক।

অকারণে বুঁদ-হওয়া ভাবনায়
এলোমেলো যখন-তখন
নগরের মতো যেন যানজট
মাথার ভেতর থেকে যায়
সব ঠিকঠাক।

মুঠোফোন
করতলে চিহ্ন মেঘের স্বর
লোকাল বাসে বাড়িফেরা প্রিয় মুখ
হৃদয়ের কাছে ব্যর্থ মুঠোফোন
দিনরাত্রি গুনগুন

হ্যালোজেন রোদ চিলতে বারান্দায়
টিকটিকি তাই বলছে ভবিষ্যৎ
তোমার-আমার যৌথ ডানা আর আকাশ
আর কিছু অবিনাশী গান

হ্যালোজেন রোদ চিলতে বারান্দায়
টিকটিকি তাই বলছে ভবিষ্যৎ
পলিথিনমোড়া আকাশ দিয়েছে ডুব
তোমরা রয়েছ যার-যার জানালায়

তোমার-আমার যৌথ শামুকবাস
আর কিছু অবিনাশী গান
হ্যালোজেন রোদ চিলতে বারান্দায়
টিকটিকি তাই বলছে ভবিষ্যৎ

নেফারতিতি
যাচ্ছো চলে নেফারতিতি
বিষণ্ণ চুল উড়ছে হাওয়ায়
সবুজ আকাশ দূরে সরে যায়
পথের এখনো কিছুটা বাকি …

এখনি নামবে সন্ধ্যা
পৃথিবীর পুরনো পথে
ল্যাম্পোস্ট নতজানু
প্রার্থনায় একা দাঁড়িয়ে থাকে

হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিতে তুমি পারো না
একা চাঁদ, চাঁদের কঙ্কাল
হেঁটে যেতে যেতে ভুলপথে তুমি থামো না
খুঁজো না উদার আকাশ

কিছু সূর্যবন্দি মেঘ
কিছু বিস্মরণের নদী
বয়ে যায় তোমার আত্মার কাছাকাছি
নেফারতিতি

যাবেই চলে নেফারতিতি
বিষণ্ণ চুল উড়ছে হাওয়ায়
সবুজ আকাশ দূরে সরে যায়
শহরে আজো বৃষ্টি নেই

তোমার শঙ্খ শরীরে জলপদ্মরেখা
এখনই যেও না অন্ধকারে
আমাকে ফেলে একা

ওম
ওম অখণ্ডমণ্ডলাকারং, ব্যাপ্তং যেন চরাচরম্
তৎপদং দর্শিতং যেন, তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ

লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক,
লাব্বাইক লা শারিকা লা
ইন্নাল হা’মদা ওয়াননি’মাতা লাকাওয়াল মুল্ক্
লা শারিকা লা

বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি
ধর্মং শরণং গচ্ছামি
সঙ্ঘং শরণং গচ্ছামি

বল হরি, হরিবোল, তীর্থে যাব
বিভেদের মন্ত্রে স্বর্গ পাবো;

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্,
মানুষ কুর্বানি মাশাল্লাহ্‌!

হালেলুইয়া জেসাস ক্রাইস্ট,
ধর্মযুদ্ধে ক্রুসেড বেস্ট!

কবিয়াল
ভীষণ গন্ধ ডুমুরফুলে
মাকালের লাল মেখে
শুকনো নদী বুকে
রাতের রোদ্দুরে
বুনেছি ঘাসফুল কবিতা
তুমি কবের কবিতা?

কাকডাকা ভোরে হৃদয় উজাড় করে
গদ্যের যুক্তিতে ছন্দ শেখাও?
আমি কবিয়াল নই
আমি কবিয়াল নই
নই গানের মিছিল কোনো!

মগজের বালুচরে ভীষণ অসম্ভবে
শুভ্র হাসি আঁকে এই কালো ছেলে।
ভীষণ গন্ধ ডুমুরফুলে!

বখাটে রাতে চোখ বুঁজি
ভূত নয় পাই স্বপ্ন ভয়
দেখি ভেঙচি কাটে
দেখি ভেঙচি কাটে
দেখি ভেঙচি কাটে
দেখি আধমরা সভ্যতা!

শুকনো পেটে যখন ছুঁচোয় দিচ্ছে ডন
মনে হয় আমি কোনো শিল্পী নই
আমি শিল্পী নই
নই রঙের ধারা কোনো
স্পর্ধার আগুনে গড়া বাঙালি দেহখানা
কাঙালের মতো কোনো স্বপ্ন দ্যাখে না।

ভীষণ গন্ধ ডুমুরফুলে
মাকালের লাল মেখে
শুকনো নদী বুকে
রাতের রোদ্দুরে
বুনেছি ঘাসফুল কবিতা
চতুর্দিকে
চতুর্দিকে ভীষণ আঁধার
বিষণ্ণ সবই
আমি তখন একলা ঘরে কাহারে ভাবি?
কাহারে ভাবি?

চতুর্দিকে ভীষণ আঁধার
বিষণ্ণ সবই
আমি তখন একলা ঘরে কাহারে ভাবি?
তাহারে ভাবি।

কালা পানি ভালা নয় তো
কেউ চায় না দিতে সায়
আমি দেখি তাহার ভিতর
কাহার মুখ দেখা যায়
মুখ দেখা যায় …

এমন আঁধার এমন কালায়
পথ হারাইয়া পথ
কিসেরও ভেতরে আমি পাবো যে তাহায়
পাবো যে তাহায় …

চতুর্দিকে ভীষণ আঁধার
বিষণ্ণ সবই
আমি তখন একলা ঘরে কাহারে ভাবি?
তাহারে ভাবি।

আমার শহর
আমার শহর খুব সহজে
একলা পাখির মতো ভিজতে থাকে;
কেউ জানে না কোন তীব্র স্লোগ্যান
মুখর হতে এই শহরে।

সেটা কোন সময়ে হঠাৎ চোখে,
বিজলীঝলক মুখর স্লোগ্যান
এই শহরে।

দূর মেঘ মেঘ মেঘ …
দূর মেঘলা আকাশ …

জানো কি
জানো কি কতটা ক্লান্ত হলে
পেছনের পথ পেছনেই পড়ে থাকে
জানো কি কি-করে স্বদেশ হারায়ে
কীভাবেই আমি কীভাবেই তুমি পরবাসী

আমি জানি সেই পথ দূর …
ঠিকানা খুঁজে আর লাভ কী!

আমরা কেবল বেড়ে উঠি
আকাশ ফুঁড়ে মেঘে মেঘে
দ্বন্দ্বময় বালিঘড়ি
প্রথম সকাল নাকি গোধূলি

তবু কেন ফিরে-পেতে চাওয়া
যা-কিছু আড়াল কুয়াশায়!

জানো কি তুমি জানো
হারালো যেথা শৈশব-কৈশোর
জানো কি তুমি জানো
কোন ভুলে হারালে তোমার স্বদেশ

জানো তুমি জানো, — নাকি সব অজানায়?
জানো তুমি জানো, — নাকি সব অজানায় …

চার-চার চৌকো
চার-চার চৌকো জানালায়
আমায় দেখে হাতটা বাড়ায়।
আকাশ দেখে দিচ্ছি ছুট
মাথার ভেতর শব্দজট
আমার চোখে লাগায়।

আকাশ আমার আমি তোমার কাছে যাব
আমার চৌকো আকাশ আমি তোমার …

মেঘ
আমি হেঁটে যাই মেঘের কাছে
আমি হেঁটে যাই মেঘের কাছে
প্রশ্বাসে ছুয়েঁছি আকাশ
দুঃখ ছুঁয়ে যায় বাতাসে বাতাসে

আমার সকল পাপ ক্ষমা করে দিও তুমি মেঘ
ভালোবাসা হয়ো তুমি পরজনমে

বুকের আকাশ খুলে দাঁড়িয়ে শূন্যে
সকল শূন্যতা চোখে নিয়ে
আমি হেঁটে যাই মেঘের কাছে …

আমি হেঁটে যাই মেঘের কাছে …

ক্রুসেড
মানুষের ক’জন ভগবান?
ক’জনে ভাগ্য লিখেন,
ক’জন জীবন সামলান?
আকাশে উড়ছে বোমারু ভগবান,
মানুষ ঝলসে যিনি গণতন্ত্র এনে দেন;
মাটিতে পোঁতা আছে ক্লাস্টারফুল,
ছুঁয়ে দিলে জ্বলে ওঠে — সে তো শিশুদের ভুল!

দু’হাত হারিয়ে ডানাকাটা পরী আজ যে-শিশু,
শুনতে কী পাও তার চিৎকার পশ্চিমা যিশু?

পৃথিবী জুড়ে চলছে যখন প্রতিবাদ আর প্রতিরোধ মিছিল
পিশাচের হাতে হাত মেলালেন
ব্লেয়ার, জ্যাক শিরাক, ভ্লাদিমির পুতিন

ওরা রক্তের হিস্যা বুঝে নিতে চায় বুঝি গ্যালন-গ্যালন!

ব্যবচ্ছেদ
চতুর্মাত্রিকায় ভূমণ্ডলায়ন নারায়ণী নমস্তুতে
প্রেতসর্বস্বতায় উলঙ্গ তরবারি নাচে ধমণীতে

“একটা ব্যবচ্ছেদযন্ত্র একটা হাইড্রোজেন ট্রফি নিয়ে যা-খুশি করো
দেখবে সম্ভব হয়েছে উৎকৃষ্টতম আনবিক বিস্ফোরণ
তারপর ভাব হোক ভ্রুণের মজাদার সব বিকৃতি
একেই বলে প্রসন্ন নরমেদ — এটা কিন্তু বেশ গণতান্ত্রিকও বটে!

ছিন্নভিন্ন মানুষ বিনা যে গণতন্ত্র হয় না
মুক্তবিশ্বে সমানভাবে প্রত্যেকে উন্নত ঊর্ধ্বমুখী হবে
অন্তিম সেই প্রোজ্জ্বল তেজস্ক্রিয়তার ভেতর
চতুর্মাত্রিকায় ভূমণ্ডলায়ন নারায়ণী নমস্তুতে
প্রেত সর্বস্বতায় উলঙ্গ তরবারি নাচে ধমণীতে

চুপসে-যাওয়া বেলুনমুখরতা
হায় হায় হায়! — মানবতা! মানবতা!

নিভে-যাওয়া বোধ আর জ্বলে-ওঠা ক্রোধ
গড়ে তোলে ধ্বংসের মহাকাল
শত শত ব্যবচ্ছেদে লেগে-থাকা ক্রন্দন
আর ভুলে-যাওয়া ইতিহাস
তোমাদের বুকের স্পন্দন

অস্থিরতায় নিমগ্নতায়
পুড়ছে স্বদেশ পুড়ছে সবাই
তবুও রুখে দাঁড়াই
আমরা ঘুরে দাঁড়াই
আমরা ফিরে দাঁড়াই

ছেলেবেলা
অ্যাই, জল কত?
কোন বাকশে কী বিস্কুট?
মারকুটে চেহারার বিষ্ণু বলে, দে ছুট …

ফ্লাস্কে জল কত?
কোন বাকশে কী বিস্কুট?
মারকুটে চেহারার বিষ্ণু বলে, দে ছুট …

স্কুলের গরাদ পেরোলে মার্বেল মাঠ
আজ ঠেকাচ্ছে কে বলো
আমরা চারে চারে আট …

মুরুব্বির ফেলে-দেয়া বিড়ির টুকরো
বারুদ রাঙতায় আমাদের নতুন আকাশ

বইয়ের প্যাকের ফাঁকে
ধার-দেয়া লাল সুতো
ব্হুদূরে উড়ে যেত
আমাদের খুশি কত কত!

অচেনা মেঘের ছাদে
কে যেন আজো লিখে পাঠায়
যদিও বদলায়নি আকাশ
ধুলো ঘনঘন রঙ বদলায়

পুরনো গানটা দূরসুরে আজো ভিজে যায়
ছোট্ট গ্রামোফোন — বনেদী আসবাব — নিশ্চুপ জলসায় …

প্যাস্কেলে আঁকা ঘরবাড়ি
কাঠকয়লায় বর্ণমালা
ধানক্ষেতে বই ছুঁড়ে ফেলি
শেষ হয়ে যায় অঙ্ক কষা …

পলকের এক ছেলেবেলা
পলকের এক ছেলেবেলা
পলকের এক ছেলেবেলা…

চেনা-অচেনা
চেনা-অচেনা আলোআঁধারে
চলতি পথে কোনো বাসের ভিড়ে
কালো ধোঁয়া — ধোঁয়ার এই শহরে
হাঁটছি আমি একা রোদ্দুরে

আমি এক দিগভ্রান্ত পথিক
হারাই শুধু হারাই তোমার অরণ্যে

তবুও অজস্র ক্রন্দন মেখে
মত্ত হয়েছি ব্যর্থ প্রলাপে
বুনে চলেছি অশ্রুপ্রপাত
এখানেই যেন জীবনধারাপাত

আমি এক দিগভ্রান্ত পথিক
হারাই শুধু হারাই তোমার অরণ্যে

নৈঃশব্দ্যে অমৃতলোকে
করেছি তোমায় রচনা
শব্দপ্রহর ঘুমিয়ে গেলেই
স্বপ্ন তুমি কামনা

তবুও অজস্র ক্রন্দন মেখে
মত্ত হয়েছি ব্যর্থ প্রলাপে
বুনে চলেছি অশ্রুপ্রপাত
এখানেই যেন জীবনধারাপাত

আমি এক দিগভ্রান্ত পথিক
হারাই শুধু হারাই তোমার অরণ্যে

চেনা-অচেনা আলোআঁধারে
চলতি পথে কোনো বাসের ভিড়ে …

কালো ধোঁয়া — ধোঁয়ার এই শহরে
হাঁটছি আমি একা রোদ্দুরে
আমি এক দিগভ্রান্ত পথিক
হারাই শুধু হারাই তোমার অরণ্যে

গানপার

COMMENTS

error: