দূর-পরবাসে ৭১ ও দুর্লভ ১ গীতিনাট্য || উজ্জ্বল দাশ

দূর-পরবাসে ৭১ ও দুর্লভ ১ গীতিনাট্য || উজ্জ্বল দাশ

SHARE:

৫ মার্চ ১৯৭১ । লন্ডনস্থ পাকিস্তান হাইকমিশন থেকে পতাকা নামিয়ে আগুন ধরিয়ে দেন বিক্ষুব্ধ বাঙালিরা। তাৎক্ষণিকভাবে দেয়ালের পিঠে লেখা হয় দৃষ্টিগ্রাহ্য বড়-বড় হরফে দেয়ালস্লোগ্যান — জয় বাংলা, জয় বাংলা!

দিনে দিনে মুক্তিকামী বাঙালিদের গগনবিদারী স্লোগ্যানে সরব হয়ে ওঠে বাঙালি-অধ্যুষিত বিলেতের নানা শহর। শুরু হয় ভিনদেশে সাকিন-হারানো মানুষের এক অনিশ্চিত পদযাত্রা।

স্বাধীন বাংলাদেশের দাবিতে উত্তাল বিলেতের রাজপথ। সমব্যথী হয়ে পাশে দাঁড়ালেন অসংখ্য অবাঙালি মানুষ। দুধের শিশুকে কোলে তুলে মিছিলে শরিক হন মা; আগপিছ না ভেবে অবলীলায় তারা তহবিলে খুলে দেন তাদের হাতের স্বর্ণবালা। রেস্টুরেন্ট-কারখানায় কর্মরত আমাদের পূর্বসুরিরা কাজ শেষেই শামিল হন সভায়-মিছিলে। বিশ্বসমর্থন আদায় আর জনমত গঠনে যার যার অবস্থান থেকে মুক্তিকামী মানুষ উদ্যোগী হন নানা আয়োজনে; লক্ষ্য একটাই — স্বাধীন বাংলাদেশ।

বিলেতের উত্তাল সেই সময়ে তেমনি একটি সাংস্কৃতিক উদ্যোগের নাম ‘বাংলাদেশ গণসংস্কৃতি সংসদ’ (বাংলাদেশ পিপলস কালচারাল সোসাইটি)। স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের শিল্পীরা যেমন উজ্জীবিত করেছেন যুদ্ধরত বীরসেনানীদের, তেমনি ভিনদেশ ও ভিন্নভাষী মানুষের কাছে গণসংস্কৃতি সংসদের পরিবেশনা প্রেরণা যুগিয়েছে দেশের টানে পথে-নামা মানুষদের। তাদের নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সমর্থন আদায়ের পাশাপাশি প্রবাসী জনগণকেও সাহসী করে তুলেছে; — এমনটাই বললেন সংগঠনটির সভাপতি, মুখ্য ভূমিকা পালনকারী ব্যক্তি, বাংলাদেশ জাতীয় যাদুঘরের সাবেক মহাপরিচালক, বীরযোদ্ধা এনামুল হক।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে থেকেই বিলেতপ্রবাসী বাঙালিদের মাঝে আন্দোলনের দানা বাঁধতে শুরু করে। দূরপ্রবাসে মুক্তিকামী মানুষদের নানা সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে উজ্জীবিত করতে একটি সাংস্কৃতিক দল গঠনের তাগিদ অনুভব করছিলেন তৎকালীন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও মহিলা সমিতির সংস্কৃতিমনা কর্মীরা।

১৯৭১ সালের মে মাসে লন্ডন ডব্লিউসি-১ এলাকার টেভিস্টক প্লেসের ৫৯ নং সেমুর হাউসে মিসেস মুন্নী রহমানের বাসায় প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। আর সেই সভাতেই সংগঠনের নামকরণ, উল্লেখিত ঠিকানায় অফিস পরিচালনার পাশাপাশি এনামুল হককে সভাপতি ও মুন্নী রহমানকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করে ২১ সদস্যের কমিটি গঠিত হয়। কমিটির অন্যান্য কর্মীরা ছিলেন — সহসভাপতি যথাক্রমে শফিকুর রহমান, ফজলে লোহানী (নন্দিত টিভিব্যক্তিত্ব) ও শাহিদুদ দাহার,  সহ-সাধারণ সম্পাদক মাহমুদ হাসান ও জাকিউদ্দিন আহমেদ, সাংগঠনিক সম্পাদক বুলবুল আহমেদ, কোষাধ্যক্ষ আনিস আহমদ (সাপ্তাহিক জনমত পত্রিকার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক); সদস্যবৃন্দ — নারীনেত্রী লুলু বিলকিস বানু, জেবুন্নেসা খায়ের, আহম্মদ হোসেন জোয়ারদার, শিল্পী আবদুর রউফ, এম এ রউফ, মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ, এ এফ এম নজরুল ইসলাম, এ রাজ্জাক সৈয়দ, জিয়াউর রহমান খান ও ড. হুজুত আলী প্রামাণিক।

জুন ১৯৭১ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ গণসংস্কৃতি সংসদের প্রচারপত্রে সংগঠনের উদ্দেশ্য ও কার্যাবলির সম্পর্কে বলা হয় — গণসংস্কৃতি সংসদ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন, বাংলাদেশের ঐতিহ্যমণ্ডিত সংস্কৃতি বিদেশে প্রচার ও পৃথিবীর সকল স্বাধীনতাকামী জনগোষ্ঠীর সাথে সম্পর্ক স্থাপনের উদ্দেশ্যে এই গঠিত হয়েছে।

বাংলাদেশ গণসংস্কৃতি সংসদ আয়োজিত নানা আয়োজনের মাঝে বিপ্লবী আলেখ্য ‘অস্ত্র হাতে তুলে নাও’ গীতিনাট্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যুক্তরাজ্যের শহর লন্ডনের বাইরে ম্যানচেস্টার, বার্মিংহ্যাম সহ আরও কয়েকটি শহরে গণজমায়েতে এই নৃত্যনাট্য পরিবেশন ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়।

০১ আগস্ট ১৯৭১, রবিবার, দুপুর ২টা; ‘স্টপ জেনোসাইড, রিকগ্নাইজ বাংলাদেশ’ শিরোনামে লন্ডনের ঐতিহাসিক ট্রাফালগার স্কয়ারে ‘অ্যাকশন বাংলাদেশ’ আয়োজিত মহাসমাবেশটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের সমর্থনে বিলেতে সবচেয়ে বড় গণজমায়েত। বিলেতের নানা শহর থেকে প্রায় দুই শো বাসভর্তি বাঙালি নারীপুরুষ যোগ দিয়েছিলেন সমাবেশে। বন্ধ ছিল বাঙালি মালিকানাধীন দেশটির সকল রেস্টুরেন্ট। বিশিষ্ট ভারতীয় সেতারবাদক মানেশ চন্দ্র ও মাধুকর কুঠারা-র দ্বৈরথে শুরু হয় সমাবেশ। স্বাগত বক্তা ছিলেন প্রবাসে বাংলাদেশ সরকারের নিযুক্ত প্রতিনিধি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। তাঁর দেয়া পনেরো মিনিটের আবেগঘন বক্তৃতা উপস্থিত বাঙালি সহ অসংখ্য অবাঙালি মানুষকে উজ্জ্বীবিত করে। সেই অনুষ্ঠানের মধ্যবর্তী সময়ে গণসংস্কৃতি সংসদ শিল্পীদের ৪০মিনিটের পরিবেশিত গণসংগীত সহ দেশের গান মুগ্ধ করেছিল উপস্থিত সকলকে। ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র’ ৪র্থ খণ্ডে প্রকাশিত সংগঠনটির সভাপতি এনামুল হকের লেখা চিঠি থেকে জানা যায়, বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর সেদিনের দেয়া বক্তৃতার গুরুত্ব বিবেচনা করে তারা সেটি ছেপে বিতরণের জন্য উদ্যোগী হয়েছিলেন।

১৮-১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭১। রেড লায়ন স্কোয়ারের কনওয়ে হ্যলে গণসংস্কৃতি সংসদ আয়োজিত দু’দিনব্যাপী উৎসবে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায় সংগঠনের সভাপতি এনামুল হকের রচনা ও সুরারোপে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের বিপ্লবী গীতিআলেখ্য ‘অস্ত্র হাতে তুলে নাও’ নৃত্যনাট্য ও গীতিবিচিত্রা। সাড়া-জাগানো সেই সাংস্কৃতিক উৎসবের উদ্বোধক ছিলেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন সদ্য বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাগত ব্রিটিশ রাজনীতিক পিটার শোর এমপি ও চিত্রপরিচালক জহির রায়হান। অনুষ্ঠানের প্রবেশমূল্য ছিল ০১ পাউন্ড।

লন্ডন সাংস্কৃতিক উৎসবের একদিন আগে ‘বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন’ (ল্যাঙ্কাশায়ার ও পার্শ্ববর্তী এলাকা) ম্যানচেস্টার-এর আমন্ত্রণে ১৬ অক্টোবর দুপুর দেড়-ঘটিকায় স্থানীয় ফ্রি-ট্রেড মিলনায়তনে ‘অস্ত্র হাতে তুলে নাও’ নৃত্যনাট্যটি পরিবেশন করে গণসংস্কৃতি সংসদ।

নৃত্যনাট্যের প্রধান দুই চরিত্র কিষাণ (মাহমুদ এ. রউফ) ও কিষাণী (মঞ্জু হাফিজ)।  আন্দোলনমুখর সেই দিনগুলোর কথা জানতে চাইলে স্মৃতিকাতর হয়ে ওঠেন কিষাণ রূপদানকারী এম.এ রউফ। লন্ডনের প্রতিষ্ঠিত অ্যাকাউটেন্ট এবং প্রগতিশীল আন্দোলনের পুরোধা এই ব্যক্তি বলেন, “জীবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর সময়টাই কাটিয়েছি বিলেতের সেই উত্তাল সময়ে। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাথে সম্পৃক্ত থাকার সুবাদে সভা, মিছিল আর জনমত গঠনের স্বার্থে নানা আয়োজনে নিজে জড়িত ছিলাম। ‘অস্ত্র হাতে তুলে নাও’ গীতিনাট্যের মুখ্য চরিত্রাভিনয় ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। পরিচালকের চেষ্টা আর আমাদের একাগ্রতায় প্রযোজনাটি হয়ে ওঠে অনন্য। বিলেতের নানা শহরে যেখানেই আমরা শো করেছি, তহবিল সংগ্রহ হতো বেশি। অন্যদিকে, এপ্রিল মাস থেকেই পাকিস্তান ক্রিকেট দলের বিলেতে সফরের প্রতিবাদে আমরা সরব ছিলাম। লন্ডন থেকে ছুটে গিয়েছি বার্মিংহ্যাম এজবাস্টন ক্রিকেট মাঠে। আমাদের প্রতিবাদী উপস্থিতি ঘাবড়ে দিয়েছিল দলটিকে, নজর কেড়েছে মূলধারার সংবাদমাধ্যমের।”

বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী তাঁর ‘প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলি’ বইয়ে এই সাংস্কৃতিক দলটি সম্পর্কে লিখেছেন, “এনামুল হক বাংলাদেশ গণসংস্কৃতি সংসদ নামক একটি সাংস্কৃতিক সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। এরা লন্ডন ও অন্যান্য জায়গায় কয়েকটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এনামুল হক রচিত ‘অস্ত্র হাতে তুলে নাও’ নৃত্যনাট্যটি পরিবেশন করেন। এটি ছিল বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের বিপ্লবী আলেখ্য। এরা ১৮ এবং ১৯ সেপ্টেম্বর কনওয়ে হ্যলে একটি অত্যন্ত সফল অনুষ্ঠান করেন। আমি এর উদ্বোধন করি। বাঙালি শিল্পীদের পরিবেশিত গীতিবিচিত্রা সকলেরই হৃদয় স্পর্শ করেছিল। এই সংস্কৃতি সংসদের সম্পাদিকা মুন্নী রহমানও যথেষ্ট পরিশ্রম ও একাগ্রতার সঙ্গে আমাদের আন্দোলনে কাজ করেছেন। ফাহমিদা হাফিজও এই সংসদের সদস্যরূপে আমাদের আন্দোলনের সাফল্যের জন্য পরিশ্রম করেছেন।”

১৫ নভেম্বর ১৯৭১; গণসংস্কৃতি সংসদের সভাপতি এনামুল হক বিলেতে একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেন এবং পরিচালনায় ছয়মাসের খরচ হিসেবে তেরোশ আশি পাউন্ড বাজেট সম্বলিত প্রস্তাবনা পাঠিয়েছিলেন। প্রস্তাবটি সম্পর্কে আবু সাঈদ চৌধুরী তাঁর বইয়ে লিখেছেন, “এনামুল হক একজন প্রতিভাবান লেখক। তাঁর প্রস্তাবিত সাংস্কৃতিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার বিষয়টি নিয়ে আমি স্টিয়ারিং কমিটির সদস্যদের সঙ্গে পরামর্শ করি। কিন্তু কমিটি আলোচনার পর সিদ্ধান্তে আসে যে, যেহেতু বাংলাদেশ ফান্ডের অর্থ মূলত অস্ত্র ক্রয়ের জন্য, সেহেতে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য এ অর্থ দেয়া হলে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হতে পারে। তাঁরা নিজেরাও যুদ্ধাবস্থায় এই খরচের পক্ষপাতী নন। যদি আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী হয় তখন এরূপ একটি পরিকল্পনা বিবেচনা করা যেতে পারে। উপরোক্ত কারণে কেন্দ্রীয় ফান্ড থেকে অর্থ বরাদ্দ দেয়া সম্ভব না হলেও আমাদের কোনো কোনো আঞ্চলিক সমিতি তাদের নিজস্ব ফান্ড থেকে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন।”

দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও গণসংস্কৃতি সংসদ সদস্যরা তাদের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা অব্যাহত রেখেছেন, উজ্জীবিত করেছেন বিলেতে বাঙালির মুক্তিসংগ্রাম।

স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর  সেইসব আগুনঝরা দিনের অনুভূতি জানতে চাইলে সংগঠনটির সভাপতি এনামুল হক বলেন, “বিলেতে গড়ে-ওঠা মুক্তিসংগ্রামে একজন নগণ্য সংস্কৃতিকর্মী হিসেবে সম্পৃক্ত থাকতে পারা জীবনের গৌরবময়, গরিমার অধ্যায়। সেইসব সুখস্মৃতি তো বেঁচে থাকার প্রেরণা।”

এনামুল হক রচিত ও সুরারোপিত ‘অস্ত্র হাতে তুলে নাও’ ঐতিহাসিক গীতিআলেখ্যটির মঞ্চায়ন প্রবাসে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অগুনতি কর্মকাণ্ডের মধ্যে একটি এবং সাংস্কৃতিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের জন্য বহির্বিশ্বে সমর্থন সমাবেশনে এই স্ক্রিপ্ট অবদান রেখেছে। এটি একটি দুর্লভ স্মারক। পাঠ-উপকরণ হিশেবে এই আখ্যানভাগের পঙক্তিগুলো আমরা এখানে দেখতে পাবো। সঙ্গে বেশকিছু দুর্লভ ছবিও। কয়েকটি স্থিরচিত্র তৎকালিক মঞ্চায়নের। অভ্যুদয়কালীন বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের বিপ্লবী আলেখ্য ‘অস্ত্র হাতে তুলে নাও’ যদি থিয়েটারগ্রুপ কিংবা ড্যান্সট্রুপ মঞ্চায়নের মাধ্যমে দেখানো সম্ভব হতো, বর্তমান ইতিহাসনিষ্ঠ পাঠকদের তাতে এর রসাস্বাদন ও সমুজদারিতায় আরও সুবিধা হতো।

ভূমিকাভাষ্য রচনাটি লেখকের প্রকাশিতব্য ‘লন্ডন ১৯৭১’ গ্রন্থের একটি অধ্যায় থেকে সংক্ষেপিত।

1971 gaanpaar

 

।। অস্ত্র হাতে তুলে নাও ।।
একটি গীতিআলেখ্য

রচনা  ও সুরারোপ : এনামুল হক
বাংলাদেশ গণসংস্কৃতি সংসদ প্রযোজনা

 

[বৃষ্টির শব্দ। মেঘের গর্জন।]

কিষাণীরা ।। বরষা নেমেছে যেন বন্যাধারা

মেঘেরা ডাকিছে যেন বাজে নাকাড়া।।

রিমঝিম রিমঝিম ঝরোঝরো সারাদিন

পড়িছে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি বিরামহীন

শ্যামল পৃথিবী হলো আত্মহারা।।

বিজুলী চমক দেয় জোনাকিরা ঝলসায়

বউ-কথা-কও পাখি এল বুঝি জলসায়

ভরে দিক গানে প্রাণ শ্রাবণধারা।।

[ভীষণ মেঘের গর্জন। আরো বৃষ্টি। বন্যা।]

কিষাণ ।। হায় হায় এইবার আমাদের কী হবে উপায়

ফসলের সব ক্ষেত ডুবে গেল বরষায়।।

মাঠে ছিল পাকা ধান যত

স্রোতে সব হয়ে অবনত

আমাদের রেখে গেল কঠিন ক্ষুধার তাড়নায়।।

কিষাণী ।। তবুও আসবে জোতদার

চাইবে ধানের ভাগ তার

কি করে ঠেকাব তাকে আশা দেবো কোন ভরসায়।।

 

[ভীষণ মেঘের গর্জন। ঢুলীর প্রবেশ।]

ঢুলী ।। টাকডুমাডুম বাদ্যি বাজে শোনো স্বদেশবাসী

পঁচিশ টাকায় বিক্রি হবে পাঁচশ টাকার খাসি।।

কিষান ।। বাজারে বেজায় সস্তা দেখি বলতে ভাই খুলে

এমনভাবে দাও বুঝিয়ে যাই না যেন ভুলে।।

ঢুলী ।।  দেশের যত সমস্যা ভাই উঠছে কেবল জমে

তাই দেখে সব খানসাহেবদের ঘুমটা যাচ্ছে কমে

সৈন্য-সেনা আর আমলা মিলে পাকাচ্ছে একজোট

ভূখা পেটে নাচতে নাচতে দিতে হবে ভোট।।

কিষাণ ।।    বলো কি হে ভোট দিয়ে কি পেটের ক্ষুধা যাবে।।

ঢুলী ।। ওই ভোটটা দিলেই গরম গরম পেটের খাবার পাবে

টাকডুমাডুম বাদ্যি বাজে শোনো স্বদেশবাসী

পঁচিশ টাকায় বিক্রি হবে পাঁচশ টাকার খাসি।।

 

[ঢুলীর প্রস্থান। ছাত্র ও যুবক দলের প্রবেশ]

যুবকদল ।। নৌকার দলে ভোট দে সবে ভাই

নৌকার দলে ভোট না দিলে বাংলার বাঁচবার উপায় নাই।।

এক ছাত্র ।। দেশ শাসনের কেতাব নাই

হিসাব করে লিখবে সবাই

তাই তো তোমার ভোটটা চাই

নৌকার দলে ভোট দে সবে ভাই।।

সকলে ।।    জয় বাংলা! জয় বাংলা!

(যুবকের প্রস্থান।)

 

[গোলাগুলির শব্দ। ঢুলীর প্রবেশ।]

ঢুলী ।। টাকডুমাডুম টাকডুমাডুম    টাকডুমাডুম

মার খেয়ে সবাই মরতে হবে জঙ্গী লাটের হুকুম

বাংলাদেশে থাকবে শুধু নফর চাকর দাসী

পাঁচশ টাকায় কিনতে হবে পঁচিশ টাকার খাসি

ও মিয়াভাই কি করি উপায় কিসে বাঁচাই প্রাণ

পশুর মতো আসছে তেড়ে পাঞ্জাবী আর পাঠান।।

কিষাণ ।। কেমন কথা আইনমতো সবাই দিলাম ভোট

তাতেও দেখি খানসাহবের বেজায় গরম চোট।।

ঢুলী।। খানসাহেবের মাথা মোটা ধার ধারে না কারো

সারাজীবন শিক্ষা তাদের খুন করো আর মারো

শাসন করে শোষণ করে নেইকো কোনোই দায়

সহজে কি কেউ সে-ক্ষমতা ছেড়ে দিতে চায়।।

কিষাণ ।। হায় বাঙ্গালী হায় বাঙ্গালী হায় বাঙ্গালী

বুকের তাজা রক্ত দিয়ে দেশ রাঙালি

ঘুম কি এবার ভাঙবে রে তোর

রাত কেটে ঐ আসলো যে ভোর

আরো রক্ত দিতে হবে-যে বাংলাদেশে আজ কাঙালী।।

 

[ঢুলীর প্রস্থান। ভীষণ গোলাগুলির শব্দ।]

কিষাণ ।। সহসা শুনি যে কোথাও বাজিছে যুদ্ধের কোলাহল

শিরায় শিরায় শোণিতে জাগিছে হিংসার দাবানল

যুদ্ধের হুঙ্কার আমি তুচ্ছ করি

অন্যায় শক্তিকে আমি ব্যর্থ করি

মৃত্যুকে করি-যে রুদ্ধ  মৃত্যু দিয়ে

হিংস্রকে করি-যে স্তব্ধ  বজ্র দিয়ে

জীবনের সৈনিক আমি অন্যায়ের সাথে মোর দ্বন্দ্ব

জীবন সার্থক হোক সত্য জেনে সেই তো আনন্দ।।

সকলে ।।    শক্তির যে করে অপব্যবহার

শক্তির হাতে তার হবে সংহার।

শৃঙ্খল পায়ে পায়ে পরায়ে

পশ্চাতে যে টানে জড়ায়ে

বিশ্বের ঘৃণা তার দহে বারবার

তাই তার প্রতিকার জন্মের অধিকার।।

কিষাণী ।।   এবারে উঠেছে ঢেউ

ঘরে বসে নেই কেউ

স্বাধীনতা সংগ্রাম

চলবে অবিরাম।।

সকলে ।।  শরীরের কোষে কোষে

প্রতিবাদ জ্বলে রোষে

আছে যারা পরাধীন

তাদের নতুন দিন।।

 

[মুক্তিফৌজের পোশাক পরে কয়েকজনের প্রবেশ।]

কিষাণী ।। কী যে উল্লাস জাগে দিকে দিকে

স্বাধীনতা নামে বুকে লিখে লিখে

তাপিত হাজার প্রাণ

প্রলয়ের মতো সারা দিনক্ষণ

বিদেশী প্রভুর সব আয়োজন

কিষাণী ।।   স্বাধীনতা বলবার

স্বাধীনতা চলবার

লিখবার গাইবার বাঁচবার

ভাগ্যকে ভাঙাতে

হাসতে কি কাঁদতে

চাই সব করবার অধিকার।।

সকলে ।।    জন্মভূমি ওগো বাংলাদেশ

তোমার ব্যথার কবর যে শেষ

খামারে অথবা যত কারখানা-কলে

আরো করো দাস হোয়ে খাটিঁ দলে দলে

মনে হয় এইবার সব উঠি ফুঁসে

করেছে যেমন ওই চীনে আর রুশে।।

কিষাণ ।।    হে —

মার জোয়ানো      হেঁইও

জোরসে টানো     হেঁইও

সাবাস জোয়ান    হেঁইও

হও আগুয়ান হেঁইও

সকলে ।।    সাবধানে ভাই

আমরা সবাই

মজুর কিষাণ

বাঁচাই পরান

কিষাণ ।।    পেটের টানে হেঁইও

সবাই জানে হেঁইও

সকলে ।।    হেঁইও রে     হেঁইও

কিষাণ ও কিষাণী ।। কারখানাতে   খেতখামারে

শহর গাঁয়ে     আর পাহাড়ে

বেলা অবেলা সকল বেলা

টানছি বোঝা ঠেলছি ঠেলা

মহাজনের মেশিন চালাই

সাহেবসুবার বাড়ি বানাই

সকলে ।।    এই কপালে কিছুই নাই

আমরা মজুর পথে বেড়াই

আমরা খাটি ফসল ফলাই

তাইতে গানে আগুন ছড়াই

কিষাণ ।।    হে —

নয়া জামানা হেঁইও

দেয় নিশানা হেঁইও

সাবাস জোয়ান হেঁইও

হও আগুয়ান হেঁইও

সকলে ।।    সাবধানে ভাই

আমরা ভাই

মজুর কিষাণ

বাঁচাই পরান

কিষাণ ।।    পেটের টানে   হেঁইও

সবাই জানে   হেঁইও

সকলে।।     হেঁইও রে হেঁইও

হেঁইও রে হেঁইও

কিষাণ ও কিষাণী ।। রাতের শেষে সূর্য যেমন

আলোয় ভরায় সারা ভুবন

আসবে আসবে সেই সুদিন

আসবে সমাজ শোষণহীন

আসবে আসবে সেই স্বরাজ

সাম্যবাদের শ্রমিক রাজ

সকলে ।।    এসো মজুর কিষাণ ভাই

এবার সবাই করব লড়াই

সবার মুক্তি অবশেষে

আসবে আসবে বাংলাদেশে

কিষাণ ।।    হে —

মুক্তি যদি পেতে চাও হেঁইও হেঁইও হেঁইও

অস্ত্র হাতে তুলে নাও হেঁইও হেঁইও হেঁইও

বুক ফুলিয়ে এগিয়ে যাও হেঁইও হেঁইও হেঁইও

মুক্তিফৌজে নাম লেখাও      হেঁইও হেঁইও হেঁইও

যার বুকে আছে দেশের টান  হেঁইও হেঁইও হেঁইও

সে দিতে পারে নিজের প্রাণ  হেঁইও হেঁইও হেঁইও

সাবাস বাংলার মজুর কিষাণ  হেঁইও হেঁইও হেঁইও

সাবাস বাংলার নওজোয়ান    হেঁইও হেঁইও হেঁইও

সব বেদনার শেষ হবে           হেঁইও হেঁইও হেঁইও

স্বাধীন হবে বাংলাদেশ           হেঁইও হেঁইও হেঁইও

মুক্তি যদি পেতে চাও             হেঁইও হেঁইও হেঁইও

অস্ত্র হাতে তুলে নাও             হেঁইও হেঁইও হেঁইও

  • অস্ত্র হাতে তুলে নাও
    গীতিনাট্য মঞ্চায়নের একটি দৃশ্য ১৯৭১, কনওয়ে হ্যল, লন্ডন || চিত্রসৌজন্য: মাহমুদ এ রউফ

… …

উজ্জ্বল দাশ

COMMENTS

error: