প্রকৃত সারস ও প্রণয়দীর্ণ দুইটি হৃদয়ের কীর্তন

প্রকৃত সারস ও প্রণয়দীর্ণ দুইটি হৃদয়ের কীর্তন

SHARE:

কন্সার্টে এন্ট্রি বিনাটাকায় ছিল, যদিও প্রবেশকার্ড সংগ্রহ করার একটা হ্যাপা আছে জেনে নিয়েছিলাম। কোথা পাই প্রবেশপত্র? বন্ধু বলতে কেউ আছে নাকি নাই তিনকুলে, ভেবে ভেবে বাইক ঠেঙিয়ে তেরোকিলো দূরসমুদ্দুর পারায়ে এসে হল্ট করি সিলেট জেলা ক্রীড়া সংস্থার ময়দানতোরণে। গেটে একটু থতমত হয়ে দ্বিধান্বিত অনুমানের চেষ্টা করছিলাম প্রহরী আটকাবে কি না, যা ভিড় মূল-ফটক ছাড়াও খোকা-তোরণগুলাতে! কেঁচিগেইট বলে চালুকথায় এই চিপা-নিচু প্রবেশপথগুলোকে। স্টেডিয়ামের বৃত্তাকার গ্যালারি ঘিরে এমন গেইটের সংখ্যা পাঁচ-ছয় তো হবেই। কিন্তু প্রত্যেকটায় স্ট্যাগ্ন্যান্ট ক্রাউড দেখে গায়ে ভাল্লুকের জ্বর ওঠে এই নিবন্ধকারের। বয়সকালে ঠ্যালাধাক্কায় বিন্ধ্যাচল পর্বতেরেও সরায়েছি পরিমাণমতো, বর্তমানে সেই বয়স ভাটি নিয়াছে, কনুইয়ের গুঁতো খেয়ে এখন কোনোমতে কর্মস্থলকলিগদের দয়াদাক্ষিণ্যে বেঁচে থাকা। কাজেই, কে আমারে ভরসা দেবে, কে দেবে বরাভয় ভিড় ঠেলে স্টেডিয়ামে সহিসালামতে এন্টারের, কে যোগাবে একটি টিকেট কন্সার্টের? সন্ধ্যা যায় যায়, বাপ্পা গায়, “দিন বাড়ি যায় / চড়ে পাখির ডানায়”, শিশিরের শব্দের মতো সমস্ত দিনশেষের শব্দ শোনা যায়, কে আমার হইবে সহায় এই আজদহা ভিড়বাট্টায়? দিন তো গেল, দয়াল, সন্ধ্যাও হলো, কন্সার্টের আওয়াজে দেহ আনচান করে, এখন হরি হয়ে কে আমারে এই ভিড়বাট্টার তোরণ ত্বরায়?

কেউ তো পুঁছেই না এমন একটা সাইটের তরফে প্রোগ্র্যাম কাভার করে বেড়াই, ইনভিটেশন পাই না, বিনোদনসাংবাদিকের আইডিও গলায় নাই যে একটু তোয়াজ পাবো বা করব মাস্তানি ডিএসএলআর বাগিয়ে। এইসব সাতপাঁচ ভাবছি রিকাবিবাজার রাস্তাকিনারে স্টেডিয়ামদেয়াল ঘেঁষে, হেনকালে উদয়িলা দুই হৃদয়সিদ্ধ নন্দকুমার-নন্দিনী! মিলিল প্রবেশপত্র দোঁহের বদান্যতায়। কিন্তু ধন্যবাদ দিব বলে এন্ট্রিকার্ড থেকে চক্ষু উঠায়েই দেখি হৃদয়বিহঙ্গদ্বয় হাওয়া! বাছুর ও প্রণয়াবদ্ধ যুগলের এই এক মিল যে এরা হাওয়ায় মিশে যেতে পারে নিমেষে, প্রেম করতে পারে বেহদ্দ ভিড়ে পূজাপ্যান্ডেলে হরিণচোখের ইশারায় কিচ্ছুটি না-ছুঁয়েও!

পরে স্টেডিয়ামের গোল নীলাভা আন্ধাইর রকক্রাউডে সেই হৃদয়বিশ্বের অঞ্জন-রঞ্জনা কাপলটাকে থ্যাঙ্কসগিভিঙের জন্য খুঁজি উত্তর-দক্ষিণ-পুরব-পশ্চিম গ্যালারিপ্রান্তগুলোতে। গেল কই কপোতজোড়া? আশ্চর্য! ময়দানের ঘাসে বাছাদেরে না-পেয়ে জেমসের কুড়ি-কুড়ি বছর আগেকার দুর্ধর্ষ একটা গানের চরণগুচ্ছ মনে পড়ছিল, তরুণদিনে আমাদেরে তাতিয়ে-তোলা গানটা আজ আর শোনা যায় না জেমসের কণ্ঠে, শুরুপঙক্তিগুলো এমন : “শত শত হাল-দেয়া জমিনে আমি / তোমাকে ভালোবাসব না / তাই আকাশকে করেছি তোমার-আমার / ভালোবাসার যৌথখামার” … ওরা ভালোবাসবার জন্য, পরস্পরের শুধু হাতটা ধরে একটিমাত্র মুহূর্ত বসে থাকবার জন্য, অস্বাভাবিক নয় আসমানে উড়ালেরও রিস্ক নিতে পারে প্যারাস্যুটবিহীন; নবীন প্রেমিকযুগলের বয়স এমনই যে এরা হার্ডরক কন্সার্টে এসে বেশি করে শুনতে পায় মিহি হৃদয়ধ্বনি!

কিন্তু গেল কই কপোতজুটি? সিকোরাক্স হেলিকপ্টারের সার্চলাইটের মতো মঞ্চ থেকে একটা বড়সড় আলো অনিয়মিত ইন্টার্ভ্যালে এসে স্টেডিয়ামের অডিয়েন্স খানিকটা আলোকিত করিয়া যায়। সেই আলোয় ছানিচোখে প্রেমিকজোড়েরে খুঁজিয়া বেড়াই। বিনয়ের পঙক্তি ইয়াদ হয়, বিনয় মজুমদারের, “মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” … হায়! এরা আমারে মানুষ ভাবল বুঝি!

ইতিউতি পায়চারি করছি, কিন্তু মমতাজে আর বাপ্পায় ঠিক যুৎ পাচ্ছি না। তালগাছের মতো নৈশ খরায় একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে দেখি গলাটাও শুকিয়ে প্যাঁকাটি। পিছন থেকে একটা পানির বটল আগায়ে এলে ব্যাঁকা হয়ে ফেরাই ঘাড়, দেখি নিখোঁজ সেই হৃদয়কাপল! দুইঢোঁক পানি গিলি, ফিরিয়া পাই বৃদ্ধ পায়ে প্যান্থারগতিতে নেত্ত করার চিত্ত। ধন্যবাদ জানাই না পানিযোগানো প্রাণবন্ধুদ্বয়েরে, কেবল দোয়া করি দিলের ভিতর থেকে; যেন ঘর খুঁজিয়া পায় এই হৃদয়জুটি, জীবনে যেন মুখোমুখি বসিয়া থাকবার অজস্র সন্ধ্যা আর অঢেল রজনীদীর্ঘ সন্ধিসাধনের নসিব তাদের হয়, যেন তারা কাকচিল-ভড়কানো ঝগড়া আর খুনসুটিতে ব্যস্ত রাখে এ-জীবনভর পরস্পরেরে, যেন রোজকার তুচ্ছতাগুলারে একতুড়িতে উড়িয়ে দিয়ে বেড়িয়ে আসতে পারে সুরমাপারে রিভারক্র্যুজের রেস্তোরাঁয়, যেন শহিদমিনারে ব্যাপক আওয়াজের অনুষ্ঠানে যায় তারা সাংসারিক তেলনুনরসুনের প্রয়োজনফোকরে কেবল কানের কাছে মুখ নামিয়ে কথা বলতে পারবে এই দূরত্বপ্রবণ দর্দহীন দুনিয়াডাঙায় এমনটা আশায়, যেন তারা আত্মজ সন্তানের মুখটি ধরে চুমা খায় ঈদের চাঁদের দিকে চেয়ে ব্যাকুল সাঁঝের মায়ায়, যেন দোঁহার লাগিয়া দোঁহে কেঁদে ফেরে কাছে থেকেও প্রতিদিন আরও কাছে থাকার আশা ও বাসনায় …

জেমসের গান শুনতে শুনতে এই পরিণয়বন্ধনসন্ধানী বিহঙ্গমের আসন্ন নবজীবন নির্বিঘ্ন হোক উয়িশ করছিলাম। ওরা ভালো অতীব, দয়ামায়া আছে, অসহায়েরে এগিয়ে দেয় মিনারেলবটল ও কন্সার্টপাস্। ওরা থাকুক ডিমে ও ডালে, সংসারে ও শহিদমিনারে, রেস্তোরাঁয় চকিত চুমুর সুবর্ণ সুযোগসন্ধানে, একের লাগিয়া থাকুক অপরে মায়াবিপন্ন … সঙ্গে থাকুক একে অন্যের, চিরটাকাল … সঙ্গে থাকুক চিরটাকাল, ভালোটি বাসুক জগজ্জোড়া, আর গাইতে থাকুক গান একে অপরের কাঁধ ঘেঁষে কানে কানে … জেমসের বা ঠাকুরের লেলিহান প্রণয়লিরিকে … “এই লভিনু সঙ্গ তব সুন্দর(ও) হে সুন্দর(ও) / ধন্য হলো অঙ্গ মম পুণ্য হলো অন্তর(ও) / সুন্দর(ও) হে সুন্দর(ও)” … অথবা, “থাকিস যদি কাছাকাছি / বাসিস যদি ভালো / বসিস যদি পাশাপাশি / যতটা চাই তত / চিরটাকাল সঙ্গে রবো / চিরটাকাল সঙ্গে রবো / চি র টা কা ল …

গদ্য : সুবিনয় ইসলাম

… …

COMMENTS

error: