বিগত সতেরো ও একটি বিদেশী লিরিকের তর্জমা

বিগত সতেরো ও একটি বিদেশী লিরিকের তর্জমা

আঠারো দুয়ারে খাড়া, অ্যাডিয়্যু জানায় সতেরো, আমরা আঠারো-সতেরো দুয়েরেই ডিয়্যু মর্যাদা দানিতে চাই। কিন্তু বলে নেয়া ভালো যে এরই মধ্যে আঠারো ঢুকে পড়েছে ঘরে, এই নিবন্ধ রচে খতম দিবার আগে; এবং ঢুকে বসে নেই, চলতেও শুরু করেছে। কে না জানে যে চলতি-কা নাম গাড়ি। আমরা আঠারোর সওয়ারী।

নিউ ইয়ার হ্যাপি হবে কি না, ভাবছিলাম। হবে, এইটুকু হোপ শুধু করা যেতে পারে। হ্যাপি না-হবার কোনো কারণ তো দেখি না; মানুষের এত উয়িশ, এত সিজন্স গ্রিটিংস্, এত মুনাজাত মমতামাখানো স্বজনদের! ফলে, হ্যাপি না-হবার কারণ নাই নতুন বছর, এত দোয়া এত উয়িশ বিফলে যাবার নয়।

আবার, যা-কিছু হারিয়ে গেছে ভেবে হাহাকার করছ তুমি, তা-ও তো হয়নি হারা। আছে, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কোথাও কোনো-না-কোনো ফর্মে সেসব রয়েছে, বেদনায় উজ্জ্বল মমতায় মেদুর সেই নিখোঁজ মায়ামানুষগুলো তোমারে ছেড়ে গেছে ত্যাজ্য ঘোষণা করে এমন তো নয়। এমন হতেই পারে না। সাহিত্য বলো, দর্শন বলো, সমাজবিদ্যা বলো বা বিজ্ঞান, কোথায় এগোলো তবে যদি মৃত্যুতেই মনে করো সমাপ্তি? কিছুই হারায়নি, কিছুই হারায় না, ইউনিভার্সে থেকে যায় এভ্রিথিং। উদ্ভিদরূপে, গ্যাসরূপে, ব্যাক্টেরিয়ারূপে, কীট ও পতঙ্গরূপে, এবং অবশ্যই মনুষ্য-ইভোল্যুশনরূপে থেকে যায় বেবাককিছুই। ফিল্ ইট, জাস্ট ফিল্ ইট! ক্লোজ্ ইয়োর আইজ্ অ্যান্ড ট্রাই করো, চক্ষে দেখতে পাবে সকলি ক্লিয়ার।

অতএব, বছরও চলিয়া যায় নাই। আমরা আবাহন করি নতুনের, পুরনোকে মনে রেখে। এগোই সামনের দিকে, পেছনের ছায়াটাকে বিস্মৃত না-হয়ে। এবং আমরা জানি যে প্রেমের বয়স বাড়ে না। আটকে থাকে প্রেম শুভ সতেরোয়। আঠারোর ভিতরে আছে সতেরো লুকিয়ে, যত দুঃখেই কাটুক তোমার প্রিভিয়াস্ দিনগুলো, যেমন রাতের সব তারারা থাকে দিনের আলোর গভীরে।

ডেইভিড গেইটস্ (David Gates) নামে এক শিল্পীর একটা গান আছে সতেরো বছর বয়সের মাহাত্ম্য উপজীব্য করে। প্রেমের গান। ইংরেজি ভাষায়। ইনডিড সব ভাষাতেই এই-রকম গান আছে। বাংলাতেও। তবে এই গানটার সঙ্গে মেমোরি রিলেইটেড রয়েছে বর্তমান নিবন্ধকারের। তার আগে বলি, ‘ল্যভ ইজ্ অলোয়েজ্ সেভেন্টিন’ হচ্ছে সেই গানের পয়লা লাইন এবং শিরোনামও। ওই শিরোনামেই শিল্পীর অ্যালবাম রিলিজ্ হয়েছিল ১৯৯৪ খৃস্টাব্দে, এই তথ্য উইকি থেকে দেখে নেয়া গেল। তবে আমরা এই গানটা শুনেছি ছিয়ানব্বই-সাতানব্বইয়ের দিকটায়। সেই-সময় বাংলাদেশে বিবিসি-সিএনএন ফ্রি দেখানো হতো সকালে-বিকালে দুইঘণ্টা মেয়াদে। বছর-দুয়েক মাগ্না এই মওকাটা পাওয়া গিয়েছিল। অনেক গান আর ফ্যাশন ও রান্নাবান্নার শো হয়েছিল দেখা সেই-সময়। এইভাবে গেইটসের এই গানটা কানে এসেছিল, মনে ধরেছিল, অক্ষয় মেমোরাইজ্ করে ফেলেছিলাম অন্তত পয়লা স্ট্যাঞ্জা। বারবার প্রচার করা হতো উইকের টপচার্টে-থাকা গানটা।

তারপর অনেকদিন এই শিল্পীকে দেখি নাই ফিরে। এমনকি নামও ভুলে গেছি। কিছুদিন আগে, এই ইউটিউবযুগে, গেইটসের গানটার পয়লা কলি কিবোর্ডে ঠকঠকিয়ে সার্চ দিতেই বেরোলো গোটা গানটা। তারপর উইকিপৃষ্ঠা থেকে বেশ জ্ঞানও আহরণ করা হলো উনার গান সম্পর্কে, এবং উনার জীবন ও সময় সম্পর্কে। এরচেয়ে বেশি ডিপে যাওয়া হয় নাই। ইভেন গানও শোনা হয় নাই দ্বিতীয় কোনো। শুনে নিতে পারেন যে-কেউ, পড়াশোনাও করে নিতে পারবেন শিল্পী ও সংগীত সম্পর্কিত, অতএব ওইদিকে এইযাত্রা না-যাই। ডিরেক্ট একটা বাংলা ভার্শন শুনি বরং গানটার।

সতেরো যখন বিদায় নিতেছে, এই গানের কথাটা মাথায় আসছিল। ফুরিয়ে যেতেছে ভালোবাসা? না থাকবে, থেকে যাবে, অলোয়েজ্?

তবে এই বছরটা বাংলায় অ্যাট-লিস্ট সুকান্ত ভট্টাচার্যের। সেই-যে, “আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ / স্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি, / আঠারো বছর বয়সেই অহরহ / বিরাট দুঃসাহসেরা দেয় যে উঁকি। # আঠারো বছর বয়সের নেই ভয় / পদাঘাতে চায় ভাঙতে পাথর বাধা, / এ বয়সে কেউ মাথা নোয়াবার নয় — / আঠারো বছর বয়স জানে না কাঁদা” … ইত্যাদি ইত্যাদি। খৃস্টাব্দ ২০১৮ অতএব সুকান্তবর্ষ। অতএব, হোথা আশা আছে। দ্যায়ার ইজ্ হোপ।

বাংলাটা কায়ক্লেশের। মূলের সনে সংযোগ কদাচিৎ। তবু এইটা ট্র্যান্সল্যাশন বৈ ‘অরিজিন্যাল’ কিছু নয়। পাঠক বিরক্ত হলে এইখানেই ফ্যুলস্টপ দিন মনে মনে। এগোবেন না। সামনে আরও অসহনীয় স্বেচ্ছাচার অপেক্ষায় আপনার জন্য।

সতেরো অক্ষয় থাকুক। আঠারো গতি পাক ফর্মুলা-ওয়ান দৌড়গাড়ির। হ্যাপি নিউ ইয়ার অ্যান্ড হ্যাভ ফান্!

_______________________________

একটি বিদেশী লিরিকের তর্জমা
অরিজিন্যাল : ল্যভ ইজ্ অলোয়েজ্ সেভেন্টিন (Love Is Always Seventeen)
শিল্পী : ডেইভড গেইটস্ (David Gates)
ভূমিকানিবন্ধ ও তর্জমা : জাহেদ আহমদ
__________________________

Devid Gates-gaanpaar

ল্যভ ইজ্ অলোয়েজ্ সেভেন্টিন

কতকাল আগে যেন মনে হয় এই-তো মাত্র সেদিন
আমিও ছিলাম ষোলোয় ভাসানো সতেরোয় উড্ডীন
উড়িয়া ভাসিয়া নাচিয়া গাহিয়া গেছে সেই দিনগুলো
ফরিয়াদ করে লাভ নাই তাই লিখি অতীতের ধুলো

সতেরো অতীত হয়েছে এখন হয়েছি বিগতপ্রায়
বাইশ-তিরিশ কবেই উধাও চল্লিশও যায় যায়
আলো কমিতেছে দিনের যেমন জীবনের আয়ু কমে
এরপরও চাই জীবন অগাধ গলিত ব্যাঙের দমে

এই বিরানায় কারোর জন্য রয়েছি দাঁড়ায়ে ঠায়
ভালো সে বাসিবে আমার যা-কিছু ভুলচুক দেনা-দায়
আঙুল ছুঁইয়ে যেই মেয়েটার সঙ্গে ভেঙেছি আড়ি
মিছেই ভেবেছি তুমি সেইজনা আমার জগৎবাড়ি

কত-কী করেছি জীবনে একুশ যখন এসেছে হাতে
ছেড়েছি দ্বিগুণ ধরেছিও কত অনুতাপ নাই তাতে
তেত্রিশে এসে দেখি নিকটের সারসেরা গ্যাছে উড়ে
প্রেমিকারা গ্যাছে প্রেমের প্রাসাদে ফেলিয়া আমার কুঁড়ে

এখন কোথাও কেউ নাই বলে একলাটি এইখানে
এতটা বয়স চলে গেল ভেবে একলা থাকার মানে
একলা যেমন থেকেছি তেমন দেখেছি সঙ্গ নিয়ে
প্রেমের বয়স বাড়ে না রাখে সে সতেরোয় আটকিয়ে

এবার তোমায় ডাকিয়া শুধাই প্রিয়া হবে এসো রানী
নিঃসঙ্গ এই তৃষিতরে এসে ডাবু ভরে দাও পানি
নিতে নয় শুধু আঁজলা পাতিয়া দিতেও তো মন চায়
লেনাদেনাহীন মুখোমুখি বসে থাকি চলো রেস্তোরাঁয়

এখনও কোথাও কেউ নাই বলে একলাটি এইখানে
এতটা বয়স চলে গেল ভেবে একলা থাকার মানে
একলা যেমন থেকেছি তেমন দেখেছি সঙ্গ নিয়ে
প্রেমের বয়স বাড়ে না রাখে সে সতেরোয় আটকিয়ে

… …

COMMENTS

error: