বৈশাখোৎসব, বিবর্ণা জার্নাল থেকে

বৈশাখোৎসব, বিবর্ণা জার্নাল থেকে

একদমই কিচ্ছু বোঝা যাচ্ছে না। হারাম এক-হরফও না। আগাচ্ছে না পিছাচ্ছে ঠিক ঠাহর করা যাচ্ছে না। একদিকে এই স্থিতাবস্থানির্জীবিত চলন-বলন, মন্দ-ভালো উভয়ত ওই একই রসুনের পশ্চাদ্ভাগ; কর্পোরেটোক্রেসি, এনজিওতন্ত্র, ব্যবসাব্যাকুল জনপ্রতিনিধি, অস্বচ্ছ প্রশাসন, রাস্তায়-রাজধানীতে হাঁটতে গেলে দেখতে পাবে হেজাব্ পরিধানের পরিমাণ তুলনামূলে বেড়েছে অনেক; অন্যদিকে বৈশাখোৎসবের এই দিন — বাংলা-বছরের প্রথম — কি বলবেন আপনি, মহাশয়, আগাচ্ছি না পিছাচ্ছি?

ঠিক বলা যাবে না যে এইবার স্বতঃস্ফূর্ত উৎসব হয়েছে। একদমই ভিড় বা যাকে বলে লোকারণ্য ছিল শহরে, এমন বলাটা বাহুল্য হবে। এখানে এই নিবন্ধে একটি ডিভিশন্যাল্ টাউনের নিউজ্ ব্রডকাস্ট হচ্ছে, ১৪২৩ বঙ্গাব্দ মহরৎদিনে এইখানকার সাইটস্ অ্যান্ড সাউন্ডস্ নিয়ে, ক্যাপিট্যালের নিউজ্ পাবেন অন্যান্য বহু জায়গায়, বলা বাহুল্য খবরের দৃশ্যমালা ব্যক্তিগত চক্করের ভিত্তিতে গৃহীত হয়েছে। এর পেছনে, এই ভিড়মুখরিত উৎসব না-হওয়ার নেপথ্যে, কে কলকাঠি নেড়েছে বা কি কি নীতিসূত্র ক্রিয়া করেছে সেসব নিয়া আলাপ না করে কেবল দিনপ্রতিবেদন উপস্থাপন করা যাক। অবশ্য হতেও পারে যে আগের দিনের সন্ধ্যার ভূমিকম্প লোকের স্পন্টেনিটি রদ করেছে, হ্যাঁ, হতে পারে অবশ্য। দুপুরের অব্যবহিত পরে, বেলা আড়াইটা থেকে, রাত এগারো অব্দি সিটি কর্পোরেশন অ্যারিয়ার কয়েকটা জায়গা রাউন্ড দিয়া যা যা বোঝা গেল তা তা নিয়াই বক্ষ্যমাণ প্রতিবেদন-নিবন্ধ। ১৯৯৪ সন থেকে এই নিবন্ধকারের চোখে এতাবধি দেখা কার্নিভ্যালপ্রতিম বৈশাখদিনের যে-উদযাপন, এবারে ব্যত্যয় কিছু চোখে পড়ল কি না ইত্যাদি। কিংবা আমরা তো ধুলায়-আন্ধার ব্যাপারস্যাপার দেখছি সকলেই সমভাবে। এখানে নিজের ভিয়্যু জুড়িয়া না-দিয়া আগানো যাক।

বৈশাখ

বেশ ক-বছর থেকেই অবশ্য সূচনাবৈশাখে এখানে এই মফস্বল শহরে (হোক-না তা বিভাগীয় শহর, কিন্তু গ্রামগন্ধ এখনো খুব-একটা খুঁজতে হয় না) বেশ সরগরম ক্রিয়াকলাদি হয়, বেজে ওঠে ঢাক-ঢোল-ঝাঁঝর। কিন্তু এ স্রেফ একটি বয়স-বলয়ে সীমায়িত ছিল একটা সময় পর্যন্ত, পরিসর ছিল শহরের কয়টি মাত্র বিদ্যায়তনিক আয়োজন-উদ্যোগের চৌহদ্দিতে আবদ্ধ। রমনায় বোমা হামলা এবং বাংলাভাই কিসিমের বোম্ববিদঘুটে সেই ভয়াল বছরগুলোতে এর একটা সামাজিক বিস্তার ঘটেছিল সংকোচনের পরিবর্তে এবং বুদ্ধিবিজ্ঞ অনেকেরই ফোর্কাস্ট ভ্রান্ত প্রমাণিত করে। এখনও যে খুব বৈপ্লবিক বিস্তৃতি পেয়ে গেছে দিবস-উদযাপনাটি, তা নয় আদৌ। তবু কোথাও যেন কিছু-একটা ঘটছে এইটা ভালো বোঝা যাচ্ছিল। ঘটছে, এবং তা যে খুব ধীর — যেমন আমরা কথার বার্তা হিসেবে ‘খুব ধীরগতির পরিবর্তন’ ইত্যাদি চালুকথা হামেশা বলে থাকি — তা কিন্তু নয়; ধীর নয়, দ্রুত — ধরতে পারছিলাম না আমরা হয়তো। যদ্রুপ আমাদের জাতীয় কর্ণধারগণ ধরতে পারছেন না জাতির-জনের-গণমনের পাল্স্ আজও, লেখক-সমাজব্যাখ্যাতাবৃন্দ নিরূপণে ব্যর্থ যদ্রুপ ব্যক্তির হৃৎস্পন্দ, গতি-অভিমুখ — তদ্রুপ; তদ্রুপ অধরা থেকে যাচ্ছে আমাদের সংস্কৃতির স্বাভাবিক পথচলা-পরিক্রমা, সংস্কৃতির শক্তি-সিদ্ধির দিকগুলো। বোঝা যাক না-যাক, বুঝতে পারুন চাই না-পারুন, মহোদয়গণ, দৃশ্য তো বদল হচ্ছেই!

বৈশাখ

কিন্তু, অবাক কাণ্ড, দৃশ্য হয়তো অচিরে আপনার অনভিপ্রেত দিকেই বদলাতে লেগেছে! স্টেইট মেশিনারিগুলো হয়তো বলদ বানাচ্ছে আপনাকে এবং আপনি নিজেই দিশাহারা সাপোর্টার ক্ষমতাকাঠামোর। অবশ্য কোনদিনই –বা তা না ছিলেন আপনি, বলেন? তবু ন্যূনতম প্রতিরোধের যে-একটা হাজির নজির ছিল প্রোক্ত ভয়াল বছরগুলোতে, এখন ঠিক উল্টো। নতজানু বুদ্ধিবলদ হয়ে আপনার, মানে আমারও, আব্দার-ধরা কালচার বজায় রেখে সবকিছু অটুট রাখবার বৈপ্লবিকতা আর কপালে জুটছে না। ট্র্যাপে আপনি পড়েছেন বুঝতে পারছেন কিন্তু স্বীকার করছেন না। সান্ধ্য আইন বলবৎ হচ্ছে দিকে দিকে আর আপনি বিটকেলে বগল বাজাচ্ছেন উচ্চতর দার্শনিক বিভেদ নিয়া, মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা সামাজিক নিরাপত্তা ব্যাহত-বিঘ্নিত হচ্ছে নিত্যি আর আপনি নিজের কম্ফোর্ট জোন্ বহাল তবিয়তে দেখে খুশি রইছেন, গ্যাস্-বিদ্যুৎ ইত্যাদি ছোটলোকের বিলাসিতার মাসকাবারি মূল্যবৃদ্ধিতে কিচ্ছু যায় আসে না আপনার বিকজ্ অফ রিডিউসিং পেট্রোলের দাম; এইবেলা দাদন দিয়া বাইক্ কিনতে পারবেন একখান মোটরচালিত, অথবা বাগিয়ে নেন গাড়িই একখান মর্টগেজ্ দিয়া। আর, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারিদের নগদা নারায়ণ বৈধ উপায়েই বৃদ্ধি পাচ্ছে যেহেতু, বছর ঘুরতে না ঘুরতেই নয়া নয়া বেতন কমিশন, অতএব অপর নিয়া আর কিসের চিন্তা? বাব্বা, বাকস্ফূর্তিতে আপনার গলা প্রায় বিকল হবার পথে! আর সংস্কৃতি, আর বিভাজন, এত সাধের ময়না আমার শেষমেশ বলে কি না বাকস্বাধীনতা আজিকালি হয়ে গ্যাছে ফ্যাশনের নামান্তর! হিপ্ নাচায়ে হোররে! হায় মুক্তি, হায় চিন্তা, হায় মুক্তচিন্তা! ক্ষমতার কাছে আমরা আব্দার জারি রাখিয়া যাই, নিশ্চয় নেক্সট ইয়ার থিংস্ গেটিং ওভার, ঠিক পরের বছর না-হলে তার পরের বা তারও পরে অ্যাট-লিস্ট টোয়েন্টিফোর্টি নাগাদ সব সমস্যার সল্যুশন্ হয়ে যাবে আলেম-ওলামাদের দোয়ায়। আই সাপোর্ট ইট। আমার কম্ফোর্ট জোন্ হ্যাম্পার্ড না-হলেই ঠিকাছে। ঠিকাছে বন্ধু? ‘ঠিকাছে, আমি বলি ঠিক আছে’ … এক্সপ্রেশনটা পাওয়া যায় জেমসের গানে।

বৈশাখ
এইবার, ১৪২৩ সালের এই বিভাগীয় নগরকেন্দ্রে, দেখা গেল উৎসবের ভিড়বাট্টা নাই। ঠিক আগের বছর বা তার আগে কিংবা বাংলা হইতে মোল্লা তাড়াবার বছরেও ঘটনা অতটা প্যাঁচ খায় নাই। গত বছরের সকাল-দুপুর বিছানায় চিৎ-কাৎ অবকাশযাপনকালে বাড়ির সামনেকার বড়রাস্তা দিয়া ব্যান্ডবাজিয়ে ভ্যান্ যাইতে শোনা গিয়েছিল। পোলাপানদের ভিড়ে পড়ন্ত দুপুরে বেরিয়ে আধাপথে আটকে থেকে বহু কষ্টে বাদ-সন্ধে ডেরায় ফেরত আসতে হয়েছে গন্তব্যে না-যেয়ে। গেল বছর-দশ ধরে এই দিনে রাস্তায় বেরিয়ে দেখা যেত মানুষ অনেক। শুধু চ্যাংড়াপ্যাংড়া নয়, সব বয়সেরই। যার যার মতো ঘুরছে-ফিরছে, দাঁড়িয়ে আছে একলা বা জটলায়। নতুন জামা সকলেরই। বিশেষ বিশেষত্ববহ জামা — মেয়েদের শাদা-লাল শাড়ি-কামিজ, মেরুন কিংবা হলুদও কোথাও কোথাও; ছেলে-পুরুষের গায়ে পাঞ্জাবি-ফতোয়া-টিশার্ট — নানান মোটিফ, নানান নকশা। মুসলমান-অধ্যুষিত দেশ, অধুনা কারো-কারো মনে এবং মাথায় চাড়া দিয়ে উঠছে একে ইসলামি প্রজাতন্ত্র বানাবার খায়েশ — অন্যদিকে যেমন মুসলমান হঠানোরও বৈজ্ঞানিক তন্ত্রমন্ত্র — তবু পয়লা বৈশাখকে থামানো যাচ্ছিল না কোনো কসরতেই, এত বোমাবাজির পরেও! সনাতন ধর্মের দিকে আড়চোখে অপাঙ্গে তাকানোর লোক এত সংস্কৃতিকর্মীর দেশে এখনও কমছে না কেন, লজ্জায় জিভ কাটা যাবার কথা। কাজের কথাটা হচ্ছে, কেউ বাদ যাবে না; আমি থাকব, তুমি থাকবে, সে থাকবে; নো ওয়ান উইল্ বি মিসড আউট; তসবি থাকবে, রুদ্রাক্ষমালা থাকবে, ক্রস থাকবে; পাহাড় থাকবে, জঙ্গল থাকবে, হাওর-সমতল সবই থাকবে; কেউ এসবের কিচ্ছুটি বিয়োগ করার বদচিন্তা করলেই বিপাকে সে নিজেও পড়বে, চারপাশটাকেও বিপাকে ফেলবে। যে এসবের কিচ্ছুটিই পার্ট অফ কালচার বলিয়া ভাবে না, তার থাকার হক আছে পুরাপুরি, তার এবং অন্য সকলের কোড অফ কন্ডাক্ট নিয়া কালচারকেই ভাবতে হবে।

বৈশাখ

এইসব তো বৈশাখদিনে ভাববার ফুরসতই নাই। ভীষণ রৌদ্ররঙিন দুপুর ও অপরাহ্ণটি! দিনটি যেন তৃতীয় ঈদের মর্যাদা পেয়ে গেছিল, অথবা দ্বিতীয় দুর্গাপূজার। ধীরে-ধীরে? চোখের মাথা না-খেয়ে থাকলে দেখতে পাবে, ধীরে নয়, দ্রুতই। অতি দ্রুত। সংস্কৃতির শক্তি, ঐতিহ্যের রেনেসাঁ বোধহয় বলা যায় একে। এখন? এইবার তো মুখোশে নিষেধ, মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়া ঠাট্টাতামাশা আর পাঁচটার পূর্বে সংস্কৃতি খতম করবার হন্তদন্ত, পরেরবার মুখের উপরেও নিষেধাজ্ঞা জারি হবে না মর্মে মুচলেকা বুঝিয়া পাইয়াছেন তো? মহোদয়গণ, সংস্কৃতিকর্ম দিনের আলো ফুরাবার আগে বেলাবেলি ফিনিশ্ করে ডেরায় ফিরবেন নয়তো নিজদায়িত্বে মরবেন। কে কারে মারে, কে-বা রাখে কারে, বলেন তো?

মূলত চক্কর দিয়েছি চিরদিন শহরের দুইটা জায়গায় ফিরে ফিরে, এমসি কলেজ আর য়্যুনিভার্সিটি অ্যারিয়ায়। এত জট হতো শহর জুড়ে! যানজট। জনজট। আনন্দমিছিলজট। নারীজট। পুরুষজট। নারীপুরুষজট। বন্ধুজট। প্রেমিক-প্রেমিকাজট। থোকা-থোকা অতর্কিত আনন্দমিছিল। গান গেয়ে, ঢোল-শোহরত পিটায়ে। সে-এক ব্যাপার বটে এই বৈশাখবাদ্য! স্রোতে স্রোত মেশে যেমন, মানুষে মানুষ। মিশেছে। মিলেছে। গেয়েছে গুচ্ছে-গুচ্ছে। এদ্দিন এ-ই ছিল গতিধারা। মানুষ দেখলে মানুষ আসে। মানুষ ভাসে। বাসে, মানুষ দেখলে মানুষ, ভালো। এ আমরা জানি সবাই, খালি ভুলে যাই। আর ভুলে যাই। আর পিছাই। আর ভুলে যাই, আর পিছাই, আর ভুল করি বেমক্কা। সাময়িক। মানুষের পিছানো সাময়িক, এগিয়ে-যাওয়া শাশ্বত-চিরকালিক। মানুষ উৎকর্ষের অভিলাষী। আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত। সত্য বলতে যদি কিছু থাকে, তো, এইটাই। কিন্তু ক্রমে আক্কেলগুড়ুম হয়ে আসছে হে! আক্কেল, ক্রমে, যাইছে প্যারালাইজড হয়ে! হরি দিন তো গেল, পাঁচটা বাজল, বাড়ি ফেরাও মোরে …

লেখা : জাহেদ আহমদ

… …

COMMENTS

error: