সমগীতের আড্ডায় কফিল আহমেদ :: দ্বিতীয়াংশ

সমগীতের আড্ডায় কফিল আহমেদ :: দ্বিতীয়াংশ

SHARE:

[কফিল আহমেদের সঙ্গে ‘সমগীত’ সংগীতদল ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর দীর্ঘ আলাপনের প্রথমাংশ গানপারে ছাপা হয়েছিল পক্ষকাল আগে; এইখানে এবার এর দ্বিতীয়াংশ প্রকাশ করা হলো।

আগের অংশে আলাপচালনায় ছিলেন আবীর পরশ, — যিনি ‘ধাবমান’ পত্রিকার সম্পাদক, যে-পত্রিকায় আলাপচক্রটা ছাপা হয়েছিল ২০০১ সনে; এই কিস্তিতে এসে আলাপে যুক্ত হয়েছেন অমল আকাশ এবং কাজল কানন। অমল আকাশ কবি, গীতিকার, গায়ক ও পালাকার; ‘সমগীত’ সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর অন্যতম সদস্য ও বর্তমান মুখ্য অধিকারী। কাজল কানন কবি।

দ্বিতীয়াংশ প্রকাশপ্রাক্কালে এই আলাপনের আয়োজক ‘সমগীত’, আলাপসঞ্চালক, আলাপকারী এবং আলাপনটির প্রকাশস্থল ‘ধাবমান’ পত্রিকার সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। বিস্তারিত প্রথম-প্রকাশতথ্য অবহিত হতে চাইলে এর গানপারপ্রকাশের পয়লা কিস্তি এবং পরবর্তী কিস্তিগুলোতে খেয়াল করতে বলি।

তৃতীয় কিস্তির জন্য অপেক্ষা করি। দ্বিতীয়াংশ পড়ার জন্য মনোনিবেশ করি। — গানপার]

 

kafil-ahmed.jpg

———————-

“এখন যারা গান করছে তাদের বেশিরভাগই মিডিয়ার দাস”

সমগীতআড্ডায় কফিল আহমেদ

আড্ডায় অংশগ্রাহীবৃন্দ :: অমল আকাশ ।। কাজল কানন ।। আবীর পরশ

আড্ডাস্থান :: ধাবমান ষষ্ঠ বর্ষ প্রথম সংখ্যা
পাব্লিশড ইন ফেব্রুয়ারি ২০০১
———————-

আবীর পরশ :: তো, আপনি এই সম্ভাবনার কথা বললেন, যেন বললেন সেই আড়াল-করা হাতকে যদি সরিয়ে দিতে পারি তাহলেই জনগণ জাগবে। আরো কিছু অন্ধকার জগৎ আরো কিছু আলোকিত হবে। এ-ব্যাপারে আপনি দু-বাঙলা মিলিয়ে, এপার বাঙলা ওপার বাঙলা মিলিয়ে, সেই বড়মাত্রার কাজটা অতীতে কে কে করেছে বলে ভাবেন? এবং বর্তমানে এর ধারাবাহিকতার কি অবস্থা? দুই দিকটা মিলিয়ে আপনি কাকে কাকে ইঙ্গিত করেন বা কেউ এভাবে ভাবছে কি না? ওস্তাদদের কথা ভাবলে দেখি যে, সেই বিভিন্ন জিনিসগুলোকে মেলানোর চেষ্টা করেছেন, ধরার চেষ্টা করেছেন, বিভিন্ন রাগসংগীতে চেষ্টা করেছেন — তৈরি করেছেন, গেয়েছেন। পণ্ডিত বিষ্ণু নারায়ণ ভাতখন্ডে, তিনিও অনেক ধরনের সংগীতশাস্ত্র লিখে গেছেন যা আমাদের সংগীতের ক্ষেত্রে যাদের পঞ্চপাণ্ডব বলা হয়, সেই রামনিধি গুপ্ত, অতুলপ্রসাদ, রজনীকান্ত সেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নজরুল ইসলাম — এই পাঁচজন হয়তো-বা পরবর্তীতে গানের সেই বিশাল জায়গার ছোটো ছোটো জায়গাগুলি একটু একটু ধরার চেষ্টা করেছেন। এই-সমস্ত নামের পাশে হেমাঙ্গ বিশ্বাসও একটা জায়গায়, গান দিয়ে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন। এবং লোকসংগীতকে আশ্রয় করেছেন। আমরা একটা লেখায় দেখলাম যে, সেটা মার্কসবাদের সরল প্রয়োগের সাথে মিলুক বা না মিলুক তিনি ঐ জায়গাটায় যাওয়ার চেষ্টা করেছেন, ধরার চেষ্টা করেছেন। এতে সমালোচনা হোক না-হোক আমরাও সে-ব্যাপারটাই মনে করি এবং আমরা দেখি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলো গণসংগীত বলতে সচরাচর যা ভাবেন, তার বাইরে আমাদের অন্য ধারার  গানগুলো কিন্তু মানুষ আবার শোনে। আপনি আমাদের ‘ধাবমান’-এর উল্লেখ করলেন; সেই গানগুলো শুনে জনগণ তাদের ভালোলাগার কথা বলছে, আন্দোলিত হবার কথা বলছে, কিন্তু ঐ সেই চাপিয়ে দেয়া প্রি-কন্সেপ্টগুলোই এখনও পর্যন্ত কাজ করছে।

কফিল আহমেদ :: আমাদের ভাবতে হয়, বিশেষভাবে ভাবতে হয় নিতান্ত জনপদের মাঝ থেকে  উঠে-আসা সুরধারার কথা। যা সময়ের মানুষ ও মানুষেরা তার বাঁচার, তার আনন্দ-বেদনার, তার ভালো লাগবার জায়গা থেকেই সে কথা বলে উঠেছে — সে গেয়ে উঠেছে। আবার, যে-কথা সে বলতে চেয়েছিল কিন্তু বলতে পারেনি, যে সুরে সুরে সে প্রকাশিত হতে চেয়েছিল  — কিন্তু সে আটকে গিয়েছিল, তাকে আটকে রাখা হয়েছিল। তারাই কিন্তু আমাদের বুঝবার জায়গা, বোঝাবার জায়গা। আর সেই দিক থেকে শিল্পকলার অ্যারেঞ্জড বা আরোপিত জায়গাটিকে একটা বড় অর্থেই অতিক্রম করবার চেষ্টা আমাদের থাকা চাই। সেই বুঝবার এবং বোঝাবার জায়গাটিকে বিষয়টিকে বাদ দিয়ে যদি শুধুমাত্র নামকেই বলি, বলি শিল্পী রবীন্দ্রনাথ, শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাস কিংবা আরো আরো অনেকের নাম  — তখন কিন্তু জনপদে বেড়ে ওঠা, জনপদে সংগ্রামরত সাধারণের অস্তিত্বের নিবিড়তম ঘটনাবলি বিষয়াবলি সংগ্রাম  ও সংঘাতগুলি একে একে চাপা পড়ে যেতে পারে শিল্পী ও শিল্পকলার আইডেন্টিটির মোড়কে। রবীন্দ্রনাথ, মনে হয়, সাধারণের মাঝে যে একটা অনন্তের বাঁশি আছে, তার লোকালিটির মাঠের যে একটা নিজস্ব রাখালিয়া আছে, মৌলিক সুর আছে, ছন্দ আছে সে-জায়গাটি আঁচ করতে পেরেছিলেন। আর হেমাঙ্গ বিশ্বাস তো আমাদের সংগ্রামের আমাদের প্রেরণার মহান ডাকনাম। আগেও বলেছি। এই ডাকনাম আরো ছিল। আছে। এখন তো প্রয়োজন সব একসাথে ডেকে ওঠা। ডুকরে ডুকরে ডেকে ওঠা। গ্রামে-গ্রামে শহরে-শহরে কারখানায়-কারখানায় ডেকে ওঠা। প্রয়োজন প্রথা ভাঙা। প্রকরণ ভাঙা। ব্যবস্থাকে ভাঙা। কিন্তু এখন প্রশ্ন আসে, তাহলে যে-জনপদের সুর কিংবা ছন্দকে রবীন্দ্রনাথ খুব কাছে থেকে প্রকাশ করতে চেয়েছেন — সেই জনপদের মানুষ রবীন্দ্রনাথকে কতটুকু নিয়েছেন? এমন একটা প্রশ্ন আসেই। দেখা যায় এই জনপদে যদিও রবীন্দ্রনাথকে শুনবার পরিধি একটু একটু করে বিস্তৃত হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিকতার আড়ষ্ট সীমারেখার মাঝ থেকেই। আর এসবের ভোক্যাল-ভাষ্যকাররাও প্রথা-প্রচলনের দেয়ালঘেরা লোক, তাই রবীন্দ্রনাথও এখন পর্যন্ত জনপদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের শক্তি ও মুক্তির অঙ্গাঙ্গি সংগ্রামে প্রাণবন্ত হয়ে উঠছেন না। তার গানের উপস্থিতিকে প্রাণবন্ত করবার জন্য আরো প্রবল আরো গভীর আরো খোলা মানুষজন দরকার। প্রতিষ্ঠানগুলির জড় আড়ষ্ট দশার থেকে রবীন্দ্রনাথকে মুক্ত করা দরকার — সংকট  ও সম্ভাবনার বাস্তবতার দিকগুলি খোলা করেই। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “তুমি যাচ্ছো পাল্কিতে মা চড়ে / দরজা দুটো একটুকু ফাঁক করে।” এখন পুরো দরজাটাই খোলা দরকার। সকল অবরোধ ও অবরুদ্ধ-দশার থেকে মুক্ত হওয়া দরকার।  এমনিতে জনমন আক্রান্ত হচ্ছে, তাকে আক্রান্ত করা হচ্ছে তার জীবনের সংগ্রামের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ও সম্পর্কিত নয় এ-রকম নানান অ্যারেঞ্জড সুর ও কথার দ্বারা, যা কি-না তার মুক্তির সংগ্রামের একটা নুয়ে-পড়া আচ্ছন্নতায় মানুষকে ডুবিয়ে রাখে। এ কাজটি করছে মিডিয়া। বাণিজ্য ও পণ্যবাদিতা। আধিপত্যবাদিতা। স্রেফ বিনোদনের নামে, সংস্কৃতির নামে গোটা পৃথিবীর মানুষকে এসবের সামনে বসিয়ে রাখা হচ্ছে। এখন যারা গান করছে তাদের বেশিরভাগই তো এসকল মিডিয়ার দাস। এই যে একটু আগে আমরা ব্যক্তিবাদিতার কথা বলছিলাম — ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে মিডিয়াবাদিতা, রাষ্ট্রবাদিতা, সর্বোপরি সাম্রাজ্যবাদিতার আগ্রাসনকে ধরবার সাথে রবীন্দ্রনাথকেও বুঝতে হবে মানুষে-মানুষে, প্রকৃতিতে-প্রকৃতিতে, প্রাণে-প্রাণে একটা মহা ঐকতানের সমগীত রচনার সকল উৎসমুখের সম্ভাবনাটুকু বিবেচনায় রেখেই, রাষ্ট্রে, সমাজে, প্রকৃতিতে ব্যক্তিবাদিতার সংকট ও সীমানার রূপটুকু টের পেয়েই। জনপদের, জনগোষ্ঠীর, অনন্তের, জীবনের, মহাজীবনের — অনেক কথা, অনেক সুর, সুরের ডাক রবীন্দ্রনাথের অন্তরে দোলা দিয়েছিল। সমাজ ও রাষ্ট্রের নানান প্রশ্ন, নানান টানাপোড়েন তার মনেও উঁকি দিয়েছিল। গোটা রবীন্দ্রনাথের পরতে পরতে মানুষে-প্রাণীতে-প্রকৃতিতে মিলেমিশে সমগীতের একটা বিশাল ঐকতানের প্রাঞ্জল প্রকাশ উঁকি দিয়েছিল। কথায়। সুরে। সুরের রূপে। কিন্তু এই মহা ঐকতান রচনার পথে — রবীন্দ্রনাথে — একটা বড় সংকটের কথাও বলি। তা বলা উচিত। এ-মুহূর্তে আমরা যদি তার শিশুতীর্থে যাই তখন দেখতে পাবো — যখন সুন্দর আসছে না, মাঠে ফসল হচ্ছে না, দুঃখ দূর হচ্ছে না, তখন সারা রাজ্যের লোক ক্ষোভে ফেটে পড়ল। লোকেদের সামনে ঠিক রাজা নয় কিন্তু রাজার মতোই একজনকে ডাকা হলো, অবস্থাদৃষ্টে যে কি-না এক-রকম নিরুত্তর, লোকেদের মাঝ থেকে কেউ কেউ একজন ক্ষোভে বিদ্রোহে হাত উঁচিয়ে এগোতেই একে একে অনেকগুলি উদ্যত হাত উঠে আসলো। দেখা গেল রাজার মতন লোকটি এভাবেই জনতার আক্রমণের মুখে মুখ লুকালো। এরপর সারা রাজ্যে আরও অসুখ আর অশান্তি আরও দুঃসহ অস্থিরতা। মাছে ফসল হচ্ছে না! গাছে ফুল ফুটছে না! নদীর গতিধারায় ক্লান্তি! নারীরা বিলাপ করছে। ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে বিচ্ছিন্নতার কারণেই এসব হচ্ছে, শিশুতীর্থে রবীন্দ্রনাথ তা দেখিয়েছেন। কিন্তু সমস্যাটা আমরা আঁচ করতে পারি যখন শিশুতীর্থে আমরা দেখতে পাই — মানুষে প্রকৃতিতে আবারও প্রাণ, প্রাণের সঞ্চারের আগে ক্লান্ত বিধ্বস্থ বিলাপরত লোকালয় হতে এক বৃদ্ধের কথাটি ছিল এ-রকম যে, আমাদের সামনে এখন একটাই করবার আছে, আমরা একটু আগে যাকে অপমান করেছি সে-ই আমাদেরকে পথ দেখাবে। তখনই সৌম্য চেহারার মুখে আলোর আভা নিয়ে সেই ব্যক্তি সেই রাজার মতন কারোর উপস্থিতি। অর্থাৎ সেই ব্যক্তিবাদিতা , রাজাবাদিতা, দেবতা বা ঠাকুরবাদিতার একটা ইশারা। ইশারায় জনতার মুখে হাসির বান, প্রকৃতির আনন্দনাচ, দিকে দিকে উলুধ্বনি! কিন্তু আমরা তো খুঁজছি সংগীত — সমগীত। আমাদের বোঝা দরকার প্রাণের আনন্দগান কারোর ইঙ্গিতে ফোটে না। ভূমিকায় ফোটে। বাস্তবায়নের প্রত্যক্ষ সংগ্রামে ফোটে। এই ভূমিকার সংগ্রামে ব্যক্তি অবশ্যই অবশ্যই গুরুত্বের। ব্যক্তির প্রাণের উপস্থিতি ও প্রস্তুতির সম্ভাবনাটুকু সম্পর্কিত হয়ে হয়েই একে একে অসংখ্যের আন্তঃসম্পর্কের দ্যোতনায়-দ্যোতনায় আমাদের পৌঁছাতে হবে বিশাল ঐকতানে। এই ঐকতানের সংগ্রামে আমাদের সাথে তো আমাদের হাজার বছরেরও আগের বৌদ্ধ সহজিয়া গায়ক বন্ধুরাও জড়িত। মধ্যযুগে চন্দ্রাবতী, চন্ডীদাস, উদ্ধবদাস; শতাব্দীরও আগের লালন, পঞ্চাশ-ষাট বছরেরও আগের দ্বিজদাস, মুকুন্দদাস, কিশোরগঞ্জের কৃষক গায়ক কমিউনিস্ট মিয়া হোসেন সহ আরো অসংখ্য প্রাণের সংগ্রামটুকু সম্পর্কিত হয়ে আছে। আর আমাদের আজকের বাংলাদেশে তারুণ্যের দুর্বার জায়গাটির  থেকেই সব ধরনের চাপ মোকাবেলা করেই নতুনদেরকে প্রকাশিত হতে হবে, মিলিত হতে হবে। আমি আশাবাদী।

আবীর পরশ :: হ্যাঁ, অনেক ধন্যবাদ। আমরা দেখলাম, ‘শিশুতীর্থ’-এ রবীন্দ্রনাথ যদিও শেণীগত সীমাবদ্ধতার থেকে মুক্ত হতে পারেননি তবুও আপনি রবীন্দ্রনাথের সম্ভাবনার কথা বললেন। এই-যে একটি বিশাল কাজ, সমস্ত সংগীতের মহা ঐকতান সৃষ্টি করার জন্য সম্ভাবনাময় জায়গা তৈরিটা একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ। রবীন্দ্রনাথের সেই সম্ভাবনার জায়গাটি ছিল, ক্ষমতা ছিল, কিন্তু তার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে সেই জায়গাটায় যাননি — সেই জায়গাটা ধরেননি। কিন্তু আমরা এত আগেও যে বিভিন্ন ওস্তাদদের আমরা দেখি-শুনি, যেমন আমাদের এখানে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ছিলেন, মিঁয়া তানসেন, আমীর খসরু — এঁরা সমস্ত সংগীতের সেই ভেতরের জায়গাটা ধরার চেষ্টা করতে পারতেন বা কিছুটা করেছিলেনও কিন্তু সম্ভবত তাদের সেই গভীরতাটা সেই মাত্রায় ছিল না বলে এটা মেলানোর চেষ্টা করেন নাই। তো, আমরা কিভাবে সে-জায়গাটায় যাওয়ার জন্য আরও একটু অগ্রসর হতে পারি। আপনি একটু আগে হাইতি দ্বীপের উদাহরণ দিলেন — আমরা এভাবে বিভিন্ন আদিবাসী নাচগানকে তাদের প্রাত্যহিক জীবনের অঙ্গ করার যে চেষ্টা, সে-ব্যাপারটা দেখি। তো এই জায়গাটা অর্থাৎ সীমাবদ্ধতার জায়গাটা — রবীন্দ্রনাথ যে-জায়গা পর্যন্ত আসলেন সেই অসীম অনন্তের জায়গায় যাওয়ার জন্য, ব্যষ্টি থেকে সমষ্টিতে যাওয়ার জন্য আমরা কি কি পদক্ষেপ নিতে পারি বা একটু আগে আমরা ঐ যে কোরাস গানের কথা বলছিলাম, সেভাবে সমবেত কোরাস গানে আমরা কি সেই জায়গাটা ধরতে পারব, নাকি অন্য কোনোভাবে?  সেই জায়গাটা বলুন এবং একটু আগে আপনি ‘ধাবমান’-এর নাম করে আশাবাদী কথা বললেন কিন্তু এখন যদি শুধু ‘ধাবমান’-এর নাম বলতে যাই এটা অনেকের কাছে মনে হতে পারে যে, নিজেদের প্রচার বা নিজেদের ঢাক নিজে পেটানোর মতো। কিন্তু আসলে তো আমাদের দেশে সৃজনশীল সুর সৃষ্টির ক্ষেত্রে বেশ-একটা সংকটের জায়গা আছে। সেখানে তো আস্তে আস্তে সেই অচলায়তনটা ভাঙতে হবে। একটু একটু তো পথ কেটে এগোতে হবে। কি কি ভাবে আমরা এই চেষ্টাটা করতে পারি, একটু বলুন।

কফিল আহমেদ :: এই অচলায়তন, জট কিংবা জড়তার থেকে মুক্ত হবার জন্য — মুক্ত করবার জন্য তাকাবার দৃষ্টিটা একটা বিরাট ব্যাপার। তাকাবার দৃষ্টি থেকেই তো তৈরি হয় সুর, সুরের আচরণ। আর সেই বিশাল ঐক্য বা সমগীত — সংগীত তৈরি করবার জন্য প্রথমেই দৃষ্টি থেকে, দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, চোখ থেকে চর্বি সরিয়ে ফেলতে হবে। চর্বি বলতে শ্রেণীশোষণের ব্যবস্থাযুক্ত সেই চর্বি। কথায়-সুরে আচরণে-প্রকাশে এসবের থেকে মুক্ত হতে হবে। কণ্ঠস্বরকে প্রস্তুত করতে হবে সকলের — সব মানুষের — সকল প্রাণেরÑমাঠের-প্রান্তরের-নদীর-আকাশের-পাহাড়ের-এদেশের-ওদেশের — সকল দেশের জন্যই মুক্ত করে। কেউ যখন গানের প্রকাশে সম্পর্কিত হয় তখন কিন্তু সে প্রথমেই কমিউনিকেট করে নিজেকে, নিজেকে কমিউনিকেট করার অর্থ হচ্ছে নিজের উপলব্ধির কাছে বিশ্বাসের কাছে মূল্যবোধের কাছে অঙ্গীকারের কাছে একশ ভাগ সৎ ও মনোযোগী হওয়া, সম্পূর্ণ অর্থেই নিবেদিত হওয়া। নিজেকে কমিউনিকেট করার ব্যাপারটি কিন্তু সঙ্গীর বাস্তবতাকে কমিউনিকেট করবার সাথে সম্পর্কিত। সংগ্রামে সকল সঙ্গীর বেদনা, বেদনার শূন্যতা, সংগ্রাম ও স্বপ্নের জায়গাটিকে মনে নিতে হয় গভীর অর্থেই। কমিউনিকেট করার জন্যই তো সুরের জাগরণ। একে একে অসংখ্যের কাছে সুরের এই জাগরণটুকু ছড়িয়ে পড়ে। আর মনে আসা দরকার, গানের লোক সে নিজেও কিন্তু একজন ব্যক্তি। সকলেই তাই। একটা অস্তিত্ব। একটা প্রাণ। মনে রাখা চাই, ব্যক্তিসত্তা আর ব্যক্তিবাদিতা কিন্তু এক কথা নয়। ব্যক্তিসত্তার আনন্দ-বেদনার অনুভবটুকু সংগ্রামটুকু এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগই সমগীতের সংগ্রামে নাই। ব্যক্তিসত্তাকে মিলিয়ে নিয়ে সঙ্গে নিয়েই সমগীতের প্রতিমুহূর্তের প্রতিদিনের প্রতিটা দিনরাত্রির শরীর সংগঠিত হয়, মুহূর্তগুলি মিলিত হয় অনন্তের অসীমে। সমগীতে ব্যক্তিসত্তার অস্তিত্ব এবং অস্তিত্বের সংগ্রাম ও আনন্দদোলটুকু — ব্যক্তিবাদিতার সকল কপট প্রবণতাগুলিকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। আর মনে রাখতে হবে ‘সমগীত’ কোনো ভিন্নতার বিশেষণে বিশ্বাসী নয়। কারণ ভিন্নতা আর বিভিন্নতা এক কথা নয়। ভিন্নতার অজুহাত থেকেই তো বিচ্ছিন্নতার জন্ম। জীবনে প্রকৃতিতে চর্চায় প্রকাশে মনোযোগে বিচ্ছিন্নতা থাকবে, বৈচিত্র্যে ভরপুর থাকবে, সে বিচ্ছিন্নতা ও বৈচিত্র্যের রঙ-রূপ-আর্তি সহই ব্যক্তি ব্যক্তিসত্তা একে একে অনেকের হয়েই, প্রকৃতির সকল অস্তিত্ব আপন-আপন স্বতস্ফূর্ততায় আন্তঃসম্পর্কিত হয়ে হয়েই সে সমগীতে পৌঁছাবে। সকল মানুষ সকল প্রাণ একটা বিশাল অনুভবে মিলিত হবে। উত্তীর্ণ হবে। রুচিশীল হতে হতেই সৃষ্টিশীল হতে হতেই সংগ্রাম করতে করতেই সেই ঐক্যে সেই ঐকতানে মানুষ পৌঁছাবে। সেই সংগ্রাম চিন্তার চর্চায় যোগ্যতায় সমগীত রচনার বন্ধুদের অনেক মুক্ত অনেক শক্তিশালী হতে হবে। কারণ আমরা সংগ্রামরত। সংগ্রামে সমষ্টির পক্ষের শক্তিকে অবশ্যই সজাগ তৎপর ও দায়িত্বশীল হতে হয়।

আবীর পরশ :: আমাদের এখানে অমল আকাশ আছে। এবার আমি অমল আকাশের কাছে আসব। আমরা এতক্ষণ সংগীতের সেই বিশাল ঐকতানের কথা বললাম, অনেক আহত-অনাহত নাদের কথা, প্রকৃতি থেকে সুরের কথা, ঐকতান নিয়ে গাওয়া এবং কোরাসভাবে গাওয়া এই জায়গাগুলি নিয়ে — শ্রমসংগীতের কথা, ইত্যাদি অনেক কথা বললাম। তো এই কথাগুলোতে অমল আকাশের কোথায় কোথায় আমাদের আলোচনার জায়গায় একটু দ্বিমত আছে, ভিন্নমত আছে বা একমত আছে বা এর সঙ্গে কিছু সংযোজন করতে চায় — এ-রকম করে তার নিজস্ব মত ব্যক্ত করার জন্য বলছি — এবার অমল আকাশ।

অমল আকাশ :: কফিলভাই যেভাবে গভীর থেকে গানের কথাগুলো তুলে আনলেন — গান শেষ পর্যন্ত ওয়ে ওঠার বিষয়, অ্যারেঞ্জ করার বিষয় না। এখানে আমি এ-বিষয়টা নিয়ে ভাবছিলাম শুনতে শুনতে। তাহলে আমরা এমন একটা সমস্যায় পড়ি এই বিষয়টাকে স্বীকার করে নিলে। আমি যখন ভাবি, আমি যখন নিজের গান নিয়ে চিন্তা করি যে গান অ্যারেঞ্জ করার বিষয় না; তাহলে কিন্তু এর আগে আমার সমস্ত গানকে আমি অস্বীকার করে আসি। আসলে এতদিন অ্যারেঞ্জ করেই গাওয়া হয়েছে গণসংগীতগুলো আর বিভিন্ন গানগুলো। খুব স্পষ্টভাবে যদি আমি বিশ্লেষণ করতে যাই তাহলে আমার মনে হয় যে লোকমুখে প্রচলিত, মানে ঐ ময়মনসিংহ গীতিকায় যেই সমস্ত পালাগানগুলো আছে, — প্রবচন, ছড়াগানগুলো আছে  — ওগুলোর বাইরে এমনকি লালন, জালাল সবই অ্যারেঞ্জড। এরপরে যা আছে সবই, মানে একেবারেই আমাদের খেটে-খাওয়া মানুষের সহজাত কণ্ঠ থেকে উঠে-আসা শ্রমসংগীত বা তার বেদনার সুর। এছাড়া আর কোনো গানকেই তাহলে কিন্তু আমি গান বলে ঠাঁই দিতে পারি না। এমনকি বাউলগান পর্যন্ত না। বাউলগানকেও তাহলে বলতে হবে আরোপিত, অ্যারেঞ্জ করা। এখানে সুফিজমের বিশাল প্রভাব আছে এবং যখন একটি ইজম কাজ করে তখন তো সেখানে আর বলার অপেক্ষাই রাখে না যে সেখানে আরোপিত অনেক বিষয়ই থাকবে। এখন তাই বলে আমার গানের ভেতরের দর্শন বা বাণীকেও তো বাদ দিতে পারছি না। শুধুমাত্র সুরের সারগামকে কেন্দ্র করেই তো এখন আর গান হতে পারে না। মানুষ তার একার সাথে অনেকের অনেককিছুর একটা যোগসূত্র স্থাপন করতে চায় বলেই তার ভাষাকে সুরের সাথে সেলাই করে দেয়। আরো বেশি বললে, প্রায় বাণীবিহীন যে উচ্চাঙ্গ রাগগুলো আছে তাহলে তো একমাত্র সেগুলিই সংগীত। আমরা তো সে-জায়গা থেকে চলে আসছি এখানে যে, সুরের সাথে কথাকেও বলতে চাই। কারণ সুর অবশ্যই সে-ক্ষমতাটা রাখে, যে-ক্ষমতা দিয়ে একজন মানুষকে বাঁধতে পারে, মানে মানুষের ডাকে অন্য প্রাণী, অন্য শ্রেণীর প্রাণী, ওই-যে সেই হাইতি দ্বীপের কাছে সমুদ্রের ভেতর থেকে কচ্ছপও উঠে আসতে পারে — সে-ক্ষমতা সুরের আছে। কিন্তু তাহলে তো আর সুরের পর আমাদের বাণীর প্রয়োজন ছিল না। সে-বাণীর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে আরো বেশি করে মানুষের জৈবিক, মানসিক প্রয়োজন থেকে। যখন নাকি আমার ক্ষুধার কথাটা না-বললেই নয়, যখন আর সুরে আমার ক্ষুধাটাকে জানাতে পারছি না, আমার আর্তিটাকে জানাতে পারছি না, তখনই কিন্তু মানুষ বলে উঠছে, কথা বলে উঠছে; সুরের সাথে সেই শব্দগুলোকেও উচ্চারণ করে ফেলছে। তো, আমার কাছে তাহলে এ-সমস্যাটা থেকেই যায় যে, এখন পর্যন্ত যা-কিছু সংগীত বলে আমরা চালিয়ে আসছি, তার মধ্যে কেবলমাত্র জনগণের মধ্য থেকে স্বতস্ফূর্তভাবে উচ্চারিত হওয়ার সুর, বেজে-ওঠা সুর বা ধ্বনিই একমাত্র সংগীত — তার বাইরে যা-কিছু আছে তার সাথে একটা আরোপিত ব্যাপার কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। তাহলে আরোপিত হলেই ক্ষতিকারক কি-না বা কখনো কখনো কোনো কোনো বিষয় আরোপনযোগ্য কি-না এই বিষয়গুলো আসলে আলোচনায় আসাটা দরকার। কফিলভাই নিজে একজন শিল্পী এবং নিজে গানও করছেন। সেহেতু এই প্রশ্নের মাধ্যমে এই বিষয়গুলোর মোকাবেলা তার নিজের গানের সাথেও করতে হবে। তাছাড়া, আমার মনে হয় চিন্তা আসলে কোনো-না-কোনোকিছুকে আরোপ করে বা কোনো কোনো বিষয় চিন্তাকে আরোপ করতে বাধ্য করে। তার আশপাশের ঘটনা বা অনেককিছুই। সেই হিসেবে যদি আরো গভীরভাবে আমরা আরোপ শব্দটাকে বিশ্লেষণ করতে যাই, তাহলে সেই লোককথা-লোকগীতির মধ্যেও স্বতস্ফূর্তভাবে বলা বা গাওয়ার পিছনেও কোনো আরোপিত হওয়ার বিষয় আছে। ঘটনা দিয়ে প্রভাবিত হওয়ার বিষয় আছে। তাহলে আরোপ-এর যে আরোপ শব্দটি আসলো সেই শব্দটারই আসলে সমাধান হওয়া দরকার।

আবীর পরশ :: অমল বেশ কতগুলো ভালো প্রশ্নের সূত্রপাত করেছে। চারপাশের যে-কোনো শব্দ, ধ্বনিই সুর কি-না, সেটা বলেছে। সুরের সাথে বাণীর প্রয়োজনের কথাও বলেছে। পূর্বে কফিলভাই আলোচনা করলেন যে, ট্রাকের হর্ন বা এ-সমস্ত বিভিন্ন ঝগড়া কোলাহল, বিভিন্নরকম কর্কশ ধ্বনি — এগুলি ঠিক সুর না; ওই সুরেলা জায়গায় নিয়ে পৌঁছানো সেই মহাসঙ্গমের জায়গাটায় অর্থাৎ সেই অনন্তের ব্যাপারটার কথা সমগীতে বলতে চাই আমরা। তো কফিলভাই বলার আগে একটু কাজল কাননের মতামত জানতে চাচ্ছি।

কাজল কানন :: ধন্যবাদ। আমাদের বিষয়টা আসলে গান-কবিতা এবং আরো কিছু। সেটাকে পরিবেশন করেই শুধু নয়, মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া, পৌঁছে দেয়ার পর তার একটা ধাক্কা, একটা দায়িত্বশীল খোঁচানি, ভিন্ন রকমের দোলা — যেটি তার ভেতরে ছিল, শুধু বাকি ছিল যথাযথ আবিষ্কারের; সেই আবিষ্কারটির আবিষ্কার করা এবং সবশেষে একটা মনমতো সাড়া তার কাছ থেকে ফিরে আসা পর্যন্ত আমরা চিন্তা করব এবং চিন্তা করার দায়িত্ব পালন করব — এই প্রতিশ্রুতি নিয়েই সম্ভবত এখানে বসেছি এবং এটা নিয়ে ভাবছি। তো, আমার মনে হয়, আমরা আজকে আমাদের মূল লক্ষ্যটা, যে-জায়গাটায় আমরা কাজ করছি এবং কথা বলতে চাচ্ছি, সেটিকে সমকালীন সংগীত বা আমাদের সমকালীন ভাবনা হিসেবে দেখতে পারি। কফিলভাইয়ের আলোচনায় যাওয়ার আগে অমল আকাশ যে-আলোচনাটা এখানে নিয়ে এসেছেন অর্থাৎ আরোপের ব্যাপারটা। আমরা কিন্তু এটা জানি যে, সুর নিয়ে আমাদের একসাথে হওয়ার বা মিলিত হবার যে চেষ্টা, যার কথা কফিলভাইও বলেছেন — শেষপর্যন্ত সেই মিলিত হবার চেষ্টাটা সুরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে নাই। সমগ্র জীবনব্যেপে চলে এসেছে। সেই জীবনকে নিয়ে চিন্তা করলে অনেককিছুর, অনেকের সম্পৃক্ততার ব্যাপার আছে। সেখানে রাজনৈতিক চেতনা একটা ব্যাপার। এখন সংগীত বা সুর কি মানুষকে বদলিয়ে দেবে আগে, নাকি তার যে পারিপার্শ্বিক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অবস্থা-পরিপ্রেক্ষিত, সেটি তাকে সেই বদলে-যাওয়া নতুন সংগীত শুনতে বা তার সহজাত সংগীত প্রকাশ করতে, প্রকাশিত হতে সহযোগিতা করবে? এই বিষয়গুলি কিন্তু আমাদের আলোচনায় সেইভাবে আসা দরকার। সামগ্রিকভাবে যদি এগুলো আসে  তখনই আমরা বুঝতে পারব এবং আমাদের আসল লক্ষ্যের দিকে যেতে পারব, যেটা অমল প্রশ্ন করেছে যে, কখনো কখনো প্রভাব বিস্তার করা কোনো কোনো স্বতস্ফূর্ততাকেও দেখা যায় ঢেকে দেয়ার বিষয় বা সেটা ঢেকে দেয়ার বিষয় না-হলেও প্রভাব যে বিস্তার করে, তার চেতনায় তার রুচিবোধে — এটার দরকার কি-না, পরিশীলিত করার যে বিষয়টি আছে সেটি কেন? সেটি আমাদের কাছে চলে আসে তখনই যখন — মানুষের চেতনার কোনো পরিবর্তন, পুনর্গঠন বা সামগ্রিক আরো আরো বিষয় প্রকাশের জন্য আমরা আকুল হয়ে উঠি। কারণ এতদিন ধরে সে যা প্রকাশ করছে, দেখছে, সবকিছুই যে সঠিকভাবে দেখছে এমন তো নয়। সেখানে ঔপনিবেশিক চোখ আছে, গোঁড়া চোখ আছে, সংকীর্ণ চোখ আছে, কালে কালে নির্যাতনে যে চোখটি ট্যারা হয়ে গেছে, সেই চোখটিও কপালের নিচে বা মনের ভেতরে ব্যথা সহ বা কখনো কখনো না-বুঝে আদর করেই সে রেখে দিয়েছে। তার সে-চোখটিকে বদলানোরও ব্যাপার আছে। সে-কাজটি একার নয়, একটি বিস্তৃত আন্দোলনের বা অনেকের। আমাদের বসাটা তো সেই লক্ষ্যেই। শুরু হলো। আমরা করি, আরো কেউ করুক, ভাবুক। ভাবতে ভাবতে দেখা হয়ে যাবে পথে, মিলেও যাবে অনেকের সাথে। আমরা মানুষের মিলটা খুঁজে বের করব। আর ব্যক্তিতাবাদী দর্শন কেবল মানুষের অমিলটাকে চাঙা করে, ফাঁক করে ধরে। মিলটাই মানুষের সহজাত এবং আপন। অমিলটা শোষকদের আরোপিত। সেই আরোপের বিরুদ্ধে আমাদের গলা ও গলার দ্যুতি বিদ্রোহ করুক। সাংগঠনিকভাবে  মিলিত হয়ে ‘সমগীত’ করে তুলবার আমাদের চিন্তাটাকে কেউ কেউ বলছেন — আমরা সমিতি করে সংগীতচর্চা করছি, সমিতি করে কবিতা লিখছি। অনেকে একসাথে মিলিত হচ্ছি, কারণ এটি এখনকার রাজনৈতিক সামাজিক বাস্তবতায় — বিশেষ করে শহরে একটা বেখাপ্পা ব্যাপার যে, এতগুলো মানুষই একসাথে কি করে কবিতা লেখে এবং তারা একসাথে থাকে, কথা বলে, গান করে? এই প্রশ্নের উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে আমাদের চিন্তাটাকে আমরা প্রকাশ করতে চাই। অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক প্রভাবটা শিল্পীকে বা যে-কোনো মানুষকে যেভাবে বাধ্য করছে, প্রভাব বিস্তার করছে, তার প্রভাবের বাইরে পাল্টা প্রভাব বিস্তার করতে হলে আমাকে সেই ধরনের মিডিয়ার অ্যারেঞ্জ বা আয়োজনের দরকার আছে কি না?

অমল আকাশ :: স্বতস্ফূর্ততার ব্যাপারে আমি আরো একটু যুক্ত করতে চাই। পূর্বে এক আলোচনায় কফিলভাই নিজে আলাপ করেছিলেন যে, একটা ছেলে খুব ভালো গিটার বাজায়। ছেলেটা অ্যাডিক্টেড। তো সেই ছেলেটা গান শোনে, খুব স্বতস্ফূর্তভাবেই গান শোনে। আর তার গান শোনার পদ্ধতিটি হচ্ছে, সে গানশোনার সময় হাতে একটা চাকু নেয়। তারপর সে চাকুটাকে ধার করে আর গান শোনে। এভাবে তার গান না শুনলে ভালো লাগে না। চাকুটি দিয়ে সে হয়তো কিছু করবে না। কাউকে সে হত্যা করবে কি-না সেটাও সে জানে না, কিন্তু সে চাকুটা ধার করে। এখন ঐ ছেলেটা যদি গেয়ে ওঠে, তাহলে তারও কিন্তু একটা স্বতস্ফূর্ত রূপ তৈরি হবে, যে-রূপটা থেকে সেই চাকু ধারাবার হিংস্র্রতা উঠে আসতে পারে। এখন আমি তাহলে কি দিয়ে সেই হিংস্র্রতা মোকাবেলা করব? নিশ্চয়ই আমারও একটা স্বতস্ফূর্ততার দরকার আছে। এখন সেই স্বতস্ফূর্ততার সাথে যুক্ত হবে রাজনৈতিক সচেতনতা এবং সামগ্রিক অবস্থাটাকে বোঝা। তাহলে কতগুলো বিষয় যুক্ত হচ্ছে — সম্পৃক্ত হচ্ছে। এই বিষয়গুলিকে সামনে রেখেই আমার এই প্রশ্নটাকে মোকাবেলা করার জন্য কফিলভাইকে দিচ্ছি আমি।

(চলবে)

সমগীতআড্ডায় কফিল আহমেদ :: প্রথম কিস্তি

 

COMMENTS

error: