সর্বভূতেষু

সর্বভূতেষু

সর্বত্র হয়তো-বা থাকা যায় না বাস্তবে, অ্যাট-লিস্ট দুইটা জায়গায় একই সময়ে যদি থাকা যেত, এনশিয়্যুর করা যেত অস্তিত্ব যদি ইহলোকে এবং পরলোকে একসঙ্গে একই সময়ে, কিন্তু তা তো আর সম্ভব হয় না, ব্যাপারটা ফ্যান্টাসাইজ্ করা যায় শুধু। অথবা ফ্যান্টাসিও নয় আজ আর। একটু উদার যুক্তির দ্বারস্থ হয়ে ব্যাপারটা বোঝা যাবে। এখন স্টিল ফোটোগ্র্যাফ আর ম্যুভেবল ভিশ্যুয়্যাল ইত্যাদির জমানায় একই সময়ে একসঙ্গে দুইলোকে থাকা না-মুমকিন নয় আর।

তারপরও মরণ আসে। বেচারা প্রাণ মাত্রেই মৃত্যুর শিকার হতে হয়। একদিন জলজ্যান্ত বেঁচে-থাকা মানুষেরে মরিয়া প্রমাণিতে হয় সে মরে নাই কিংবা মরিয়া গিয়াছে। বেঁচে-থাকা মাত্রেই মৃত্যুর হতে হয় ইজি ভিক্টিম। সহজ শিকার। জীবনকবিতার টার্ম। ট্রাম হোক বা বাথটাব — অথবা আর-কিছু — তো মরণের বাহন মাত্র। তবু অবিনাশী কিছু রয়েই যায়। শিল্প বলে লোকে, বলে শিল্পী, এই-রকম কিছু বোধহয় আছে যা আদৌ মরে না। আসলে কিছুই মরে না। আমরা পাশরিয়া যাই খালি।

শ্রীদেবী মৃত্যুর অগম গহন অন্যলোকে গেছেন সম্প্রতি। কিংবা আছেন মর্ত্যলোকেই ভিন্ন সুরত ধরে, কে জানে। একেকজন অভিনয়শিল্পী, তিনি যে-দেশেরই হোন, ইউটিউব টরেন্ট-লিঙ্ক ইত্যাদি বিবিধ প্রযুক্তিস্ফীতির এই দিবারাত্রি বিনোদনদুনিয়ায় এখন লিট্যারেলি মৃত্যুরূপান্তরিত হন বলিয়া আর মনে হয় না। যার ইচ্ছা যখন ইচ্ছা সাক্ষাৎপ্রায় দেখতে পায় যেহেতু পকেটফোনের বাটন টিপে যেখানে-সেখানে, কাজেই কীভাবে বলা যাবে যে এক্সপায়ার করেছেন অভিনয়শিল্পীটি? দৃশ্যান্তরালেও তো যাচ্ছেন না আজ আর এমনকি শিল্পী-সেলিব্রেটি ছাড়া সাধারণ মানুষটিও।

১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে দেবীর জন্ম। ২০১৮ ফেব্রুয়ারি জীবনান্তর। মাঝখানে তিনশতাধিক প্রোজেক্টে একটানা কাজ করে গেছেন। পঞ্চাশ বছরের ফিল্মি ক্যারিয়ার। তুলনায় দীর্ঘ পেশাজৈবনিক আয়ু, অন্যান্য নায়িকাদের সঙ্গে যদি কম্পেয়ার করা হয়, এত লম্বা ক্যারিয়ার সম্ভব হয়েছে একাধিক ভাষায় দেবী কাজ করেছেন বলে হয়তো। তামিল, তেলুগু, হিন্দি, মালয়ালম এবং কিছুসংখ্যক কন্নড় চলচ্চিত্রেও শ্রীদেবী কাজ করেছেন। বছরে তেরোটা ছায়াছবি সাইন্ করেছেন, রিলিজ হয়েছে রাতারাতি সেগুলো, সম্ভবত বছরে এত ছবি করার ব্যাপারটা রেকর্ড।

Sridevi

গত শতাব্দীর অন্তিম শতকের শেষ দুই দশকে দেবী নিজের অবস্থান গড়েছেন বলিউডে, একদম শীর্ষের তাজ মাথায় আপনাআপনি এসেছে, একদম নব্বইয়ের মাঝভাগ পর্যন্ত অপ্রতিদ্বন্দ্বী শ্রীদেবীর মুকুট যায় মাধুরীর মাথায় শেষমেশ। অস্বাভাবিক নয় যে ব্যক্তিজীবনে বেশকিছু ঘটনাঘটন সংঘটিত হয়েছে এরই ভিতরে। এর আগে একটানা একদশক শ্রীদেবী শীর্ষের সাফল্যসুখ বয়েছেন।

জুটি হিশেবে পেয়েছেন রাজেশ খান্না, জিতেন্দ্র, মিঠুন, অমিতাভ, অনিল, কমল, চিরঞ্জিত সহ অসংখ্য বলিউডস্টার ছাড়াও প্রাদেশিক আরও অভিনয়শিল্পীদেরে। এক বাঙালি নায়কের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল গোপনে, সেই নায়কের ঘরে সেই-সময়ে গিন্নী ছিলেন এবং পুরান গিন্নীর সঙ্গে সেপারেশনে যাবেন মর্মে সেই ডিস্কোড্যান্সার ঢিশুম-ঢিশুম নায়কটি শ্রীকে শাখাসিঁদুর পরায়েছিলেন, এমন সংবাদ সেই দিনগুলোতে প্রায় ওপেন সিক্রেটই ছিল বলা যায়। সেই অভিনেতার সঙ্গে ছাড়কাট হয়ে যায় রাহসিক জাল ছড়িয়ে রেখে। এরপর বনি কপুরকে বিয়ে করেন। বনিও পূর্বতন পত্নীকে ত্যাগ করেন আইনী কাগজপত্তরের মাধ্যমে। এই আগের তর্ফা বনির পুত্র বর্তমানের থ্রব অর্জুন কপুর।

অচিরে শ্রী গিন্নীপনায় মন দেন এবং দুই কন্যাসন্তানের জননী হন। অনধিক দুই দশক শ্রীদেবী ছিলেন পর্দার অন্তরালে। পেশাগত জীবনে নিজেদের প্রযোজনা ব্যবসায় সামলেছেন সংসারের পাশাপাশি। ফিরে এসেছিলেন সেকন্ড ইনিংস নিয়ে। চুয়ান্নয় রান-আউট।

সম্ভবত গীতার শ্লোক এইটা : “যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা / নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ” … শুধু শক্তিরূপেণ নয়, বুদ্ধিরূপেণ, শিল্পীরূপেণ, পত্নীরূপেণ, প্রণয়িনীরূপেণ, স্বপ্নচারিণীরূপেণ স্বর্গত শ্রীদেবী। পিচ্চি বয়স থেকেই সিনেমায় অভিনয় শুরু করেছিলেন, অনূর্ধ্ব কৈশোরেই হিরোয়িন হিশেবে ক্যারিয়ার তুঙ্গে উঠিয়া যায়। শ্রীদেবী মানেই ছিল একটা সময় পর্যন্ত দুরন্ত এক ব্যাপার। শ্রীদেবী যখন অভিনয় করেন, কিংবা নাচেন, তখন মনে হয় যেন উনার সমস্ত সত্তা মিশে গেছে সেই অভিনয়ে সেই নৃত্যের মধুরিমায়। এবং তার চোখ, ডাগর আঁখি, মুখের ডৌল, নৃত্যপর হাস্যোজ্জ্বল শরীর … সেই ‘হাওয়া হাওয়াই’ …

ঠিক আছে। অ্যানিওয়ে। যা দেবী সর্বভূতেষু …

নমস্তস্যৈ। নমস্তস্যৈ। নমস্তস্যৈ। নমো নমঃ।

রচনাকারী : মিল্টন মৃধা

… …

COMMENTS

error: