স্যং অফ্রিংস্ || জাহেদ আহমদ

স্যং অফ্রিংস্ || জাহেদ আহমদ

ওই শোনো জন্মদিনের তোড়া তোড়া বাজনা বাজে ফুলের। ওই দ্যাখো ভুবনজোড়া হ্যাপিবাড্ডে হাওয়া। ঘ্রাণ পাচ্ছো কড়ি ও কোমল অশ্রুত গান্ধারের? ওই দ্যাখা যায় বাড়ি তাহার চৌদিকে মালঞ্চের বেড়া। তার ঝরনাতলার নির্জনে গেলে কেবল কলস-ছাপিয়ে-ওঠা গান গগনছাওয়া। রাশি রাশি ভারা ভারা গান গেয়ে আত্মহারা হতে পারো সেথা। দাঁড়িয়ে থেকো শুধু যদি গাহিতে না চাহো তুমি, নিশ্চুপে টেনে যেও সুর আর গীতের চরণ সুবাসিতা, তার গানের ওপারে যেয়ে বসে থেকো অপার হয়ে, সুরগুলি তার খুঁজে নেবে ঠিকই তোমারে। এবং বুঝবে তখন কারে বলে সুরের শুশ্রূষা।

তার মানে এ নয় যে এই নিবন্ধে সেই সুরফোয়ারার সংশ্রব পাওয়া যাবে। এই নিবন্ধ জন্মদিনের পার্টিতে এন্ট্রি ক্লিয়ারেন্সের কার্ড মাত্র। রবাহূত, ফলে একটা-কোনো ছল করে এন্ট্র্যান্স এনশিয়্যুর করা। অ্যাকাডেমিয়ায় কিংবা কালচারাল অ্যারিনায় তিলপরিমাণ হোল্ড থাকলে তো জন্মদিনভোজের নেমন্তন্ন প্রত্যাশিত হতো। অগত্যা এই গিফটের উসিলা হাতে ঝুলিয়ে ঠাকুরবাড়ির কাচারিগৃহে প্রবেশের চেষ্টা, মালপোয়া আর লুচি ও সন্দেশ ভোগের লোভে, গান গাইবার মুরদ নাই বলেই গানের গল্প করা বা গান নিয়া ফানতামাশা। বার্থডেকেইক … রবিনাথের … ওই তো! ওই এল …   

অংশত উইন্টার

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নামে একজন ছিলেন যিনি গানটান লিখতেন, সুরটুর করতেন, একটা বয়স পর্যন্ত নাকি গাইতেনটাইতেনও। অনেক সভাসমিতিতে যেয়ে গেয়েছেন নিজের গলায় নিজের গান এবং শুনেছি নাকি গাইতেন ভালোই। বিভিন্নজনের স্মৃতিকথায় গায়ক রবির গলা ও গায়নশৈলী সম্পর্কে বেশ জানা যায়। অ্যাক্লেইমগুলো পোজিটিভ মোটামুটি। কিন্তু রবির ব্যাপারে নেগেটিভের চেয়ে পোজিটিভ অ্যাক্লেইমই বেশি বিধায় কণ্ঠশিল্পী রবি নিয়া আদৌ কোনো সহি সিদ্ধান্ত করা যায় না, আন্দাজ করা যায় বটে। রেকর্ড শুনেছি উনার আবৃত্তির, রেকর্ডকোয়ালিটি কিংবা স্টাইলের তৎকালিকতা যা-ই হোক কোনো কারণে সেই রিসাইটাল এখন শুনতে বেজায় আমোদ লাগলেও সম্ভ্রম জাগায় না, গানের কোনো রেকর্ড কানে পশে নাই অদ্যাবধি। কিন্তু উনি গাইতেন যে, অ্যাট লিস্ট নিজের গানরচনার মুহূর্তে পিয়্যানোতে সুরমালা ভাঁজতেন এবং তুলে দিতেন পরিবারের সদস্য ও বহির্ভূত অন্যদের গলায়, এ-ব্যাপারে সন্দেহ চলে না। ঠাকুরবাড়ির তারাহাটে রবি ছিলেন মহাতারা আর্লি দিনগুলোতেই।

বৃষ্টির সিজন্ শুরুর লক্ষণ এখনও ওইভাবে দেখা যাচ্ছে না এই অঞ্চলে। যদিও পঞ্জিকামতে এখন বোশেখের আগাম ঝড়বাত্যা স্টার্ট করবার কথা, নামনিশানাই নাই তার। না, খানিকটা কারেকশন দরকার আগের বাক্যটার। নিশানা খানিক দৃষ্টিগোচর হয়েছে বটে। ফেব্রুয়ারিপ্রান্তে এক-দুইদিন কেমন মেঘকোমল হয়েছিল অন্তরীক্ষ, ওইটা আবার বেশি আগুয়ান হয়ে যায় থিয়োরিটিক্যালি, পরে মার্চের পয়লা পাক্ষিকের অন্তে একটা ভালো রকমের ডিপ্রেশন দেখা গিয়েছিল নীলিমা আর নিসর্গ উভয় মাদমোয়াজেলের অবয়বে। দেখা যা-ই যাক, অন্তরে এখনও উইন্টার বিরাজিছে। অন্তরে শীতের লাউয়া বাজে যে-কয়জন বঙ্গপুঙ্গবের বছরভর, সংখ্যায় তারা যতই লঘু হন অসুবিধা নাই, এদের প্রতি একটা সাদর প্রশ্রয় এই রিপোর্টারের রয়েছে একটা-কোনো অজ্ঞাত কারণে। সে-যা-হোক, জলবায়ু পরিবর্তন মুকাবিলায় ফান্ড বাগাতে ব্যস্ত কতিপয় খিলাড়ি সিন্ডিক্যাট অবস্থাদৃষ্টে বেজায় আশান্বিত। রবিরও খুশমেজাজ লক্ষ করা যায় বর্ষাগমকালে। এন্টায়ার লাইফে যে-গানকবিতা ঠাকুর করে গেছেন সেসবের সমুদ্রভাগ বর্ষা ও তৎপারিপার্শ্বিক ঋতুচিত্রসম্বলিত। উইন্টার সেখানে, অ্যাট-লিস্ট রবিগানে তথা গীতবিতানে, নেহায়েত কয়েকটি পৃষ্ঠা মাত্র।

উইন্টার উপজীব্য করে এন্টায়ার লাইফে ধ্যান কন্টিনিউ করে গেছেন একজনই; — জীবনানন্দ দাশ। উনি কি বেঁচে আছেন আজও? রবির তুলনায়, অ্যাট-লিস্ট কবিতায়, আলবৎ! অথবা এই কিসিমে তুলনাবাজি ঠিক শোভন হয় না। তা বটে। ব্যাপার অশোভন। তবে কথা হচ্ছে যে প্রেমে, যুদ্ধে এবং শীতে শোভন-অশোভনের ওয়েইট করলে তো চলে না। দাশের শীত স্বপ্নকল্পনাসমেত এতদঞ্চলেরই শীত। অতীতের শীত সেটা? আজ আর নাই? রিপ্লাই কমপ্লিকেইটেড। অতএব নিরুত্তর আগাই।

কিন্তু কথা অতি সত্য না-হলেও অসত্য নয় যে এইবার শীত নাম্নী কোনো ঘটনা আদৌ ঘটে নাই। ইভেন এর আগের বছরেও ‘কবিদের কবিতা পাঠ’ ব্যানার ঝুলিয়ে ফেসবুকে একটা আমুদে ইভেন্ট লক্ষ করা গিয়েছিল শুমারিবিহীন প্রচুর, শীতেরই সার্কাস ছিল সেসব, সর্বোচ্চ ছাপ্পান্ন কবির নাম চোখে পড়েছে একটা ব্যানারে এবং সর্বনিম্ন বত্রিশ। এর মধ্যে তেরো থেকে তিন পর্যন্ত কবিতালোচক! প্রত্যেকেরই মুখে ফিলিপ্সবাত্তির ঔজ্জ্বল্য। পুরানা আমলের ফিলিপ্সবাত্তির আলো স্মর্তব্য। “ও মানিক! কী বাত্তি লাগাইলি? – ক্যা, ফিলিপ্স! – আসলেই, বাত্তির রাজা ফিলিপ্স, আর কবির রাজা …।” তা, বাকিটা পাঠকের জন্য ব্যক্তিগত। তবে ঋতুর রাজা কে? বেঙ্গলের কন্ডিশনড রিফ্লেক্সে এর রিপ্লাই স্প্রিং। তবে যেহেতু দিনকাল আগের ন্যায় নাই আর, ঋতুরিভিয়্যু দরকার শিগগির। জাঁকিয়ে এইবার হয়তো নামে নাই, কিন্তু তাতে কি, শীতের জোর সম্ভাবনা আছে নির্বাচনে জয়লাভ করবার।

চৈত্রমধ্যভাগ। দুইচাইরদিন গ্লুমি রেইনিডে গেল, অন্ধকার দিনজোড়া, তবু শীত চলে গেছে বলা যাচ্ছে না। রাতের বেলা পায়ের দিকটায় লেপ টানতে হয়, ভোরের আগে লেপ উঠে আসে বুকে। একদম শীতশুরুর ফুরফুরা হাওয়া দ্যায় বারান্দায় সকালের চেয়ারে। এর মানে, শীত এইবার দোটানায় দুলছে সে এসেছে কি আসে নাই, শীত যাবে কি যাবে না ভাবছে। কেন যাবে? থাকুক, কিছুক্ষণ আরও না-হয় রহুক কাছাকাছি। শীতের এহেন পরিস্থিতিতে ট্যাগোরের একটা গান মনে পড়ছিল। ছোট্ট চারলাইনের গীতিলেখা, শোনার সময় মনে হয় যেন অশেষ এর রেশ। কথাগুলো নিম্নলিখিত : “নয়ন মেলে দেখি আমায় বাঁধন বেঁধেছে । / গোপনে কে এমন করে এ ফাঁদ ফেঁদেছে ॥ / বসন্তরজনীশেষে বিদায় নিতে গেলেম হেসে — / যাবার বেলায় বঁধু আমায় কাঁদিয়ে কেঁদেছে ॥”

এবারকার শীত সেভাবে এলই না বটে, যেতেও চাইছে না ছেড়ে। লেট’স্ হোপ আরও ভালো নেক্সট। হোক শুরু হুড়মুড়িয়ে বর্ষার বিস্তার।

সন্ধ্যার শ্বাস

যদিও পঞ্জিকানুযায়ী তা নয়, ‘নামিল শ্রাবণসন্ধ্যা, কালো ছায়া ঘনায় বনে বনে’, এবং তার আগে ‘এসো গো, জ্বেলে দিয়ে যাও প্রদীপখানি / বিজন ঘরের কোণে, এসো গো’ প্রভৃতি পঙক্তি দিয়া স্টার্টিং ক্ষ্যাত মনে হয় লিরিক্যালি, কিন্তু জর্জ গাইলে বিশ্বাস হয় যে গানে লিরিক্সফিরিক্স অত জরুরি না, যত জরুরি ভেবে ভেবে সারা আমরা। ‘নামিল শ্রাবণসন্ধ্যা, কালো ছায়া ঘনায় বনে বনে’ এই কলিটুকু কার গলায় কেমন শুনতে যেয়ে একাধারে একগাদা শান্তিনিকেতনী ট্রেইন্ড গলা শুনলাম, প্রত্যেকেরই বৈচিত্র্য রয়েছে, আলতুফালতু বৈচিত্র্যের পাশাপাশি আজব আজব বৈচিত্র্যও বহু, জর্জ তবু গর্জিয়াস্। সব গানের জর্জিয়াস্/গর্জিয়াস্ ঘটনাবলি নিশ্চয় আপনারও ভালো লাগে না। হায়, নিকেতনী ইঞ্জাঙশন্ অন্ দেবব্রত বিশ্বাস!

এইটা গানশোনাশুনির বেলায় খুবই হয় দেখবেন যে একেকটা গানের সঙ্গে একেকজনের গলা প্রায় অবিচ্ছেদ্য অন্বয়ে গেঁথে যায়। এমন নয় যে সেই গলাটা দারুণ শক্তিশালী কিছু। নয় এমনও যে সেই গলার টিম্বার দুর্ধর্ষ বা গায়কী ভীষণ কোনো বাঁকবিভায় পূর্ণ। নট নেসেসারিলি কিন্নর কণ্ঠ হতে হবে সেই গলাধারীটিকে; ব্যারিটোন্ ভোয়েস্ কোয়ালিটি থাকতেই হবে এমনও নয়। গানটা আসলে মনে হয় ক্রিয়া করে অন্যভাবে। এইসব বড় বড় উপাদান, অত্যাবশ্যকীয় উপাদান, অজস্র গলায় নিয়েও যদি গানটা শ্রোতার কাছে ক্রিয়া করাতে না পারলেন আপনি তাইলে তো হলো না।

আর সবচেয়ে বড় যে-ব্যাপারটা, গানের সঙ্গে শ্রোতার স্মৃতিনিবিড়তা; — মানে, একটা গান শিল্পী নিখুঁতভাবেই গাইলেন হয়তো, শক্তিশৌর্য ফলিয়েই গাইলেন, কিন্তু শ্রোতার স্মৃতির সঙ্গে সেই শক্তিশৌর্য সংলগ্ন হতে ব্যর্থ হলো; অতএব, হলো না।

আজ থেকে অনেক-অনেক বছর আগে, এই শতাব্দীর সূচনালগ্নে, একটা গান শুনেছিলাম মিতা হকের কণ্ঠে। সেই গানখানা এর আগে এবং এর পরেও অনেকেরই কণ্ঠে নানান কারুবৈচিত্র্য সমেতই শুনেছি, কিন্তু মিতা যে-মিতালিটি ঘটিয়ে দিয়েছেন ওই বিশেষ গানের সঙ্গে এই শ্রোতাটার, তা আর ব্যাহত হয় নাই, ভেঙে যায় নাই। কিন্তু কোন গানটা?

আজকে সেই গানটাই শুনতে লেগেছিলাম। যদিও বিস্তর খুঁজে শেষে মিতাকে পেতে ব্যর্থ হয়েছি। কিন্তু শুনেছি তিন-চারজন অন্যান্য। সুমন তন্মধ্যে একজন। কবীর সুমন। মন্দ গেয়েছেন বলব না। ভারতীয় গলাগুলোর মধ্যে সুমনের বিশেষত্ব অনস্বীকার্য। স্বরপ্রক্ষেপণ, এবং বিশেষভাবেই উচ্চারণ, প্রভৃতি ক্ষেত্রে সুমনের কৌলিন্য অনুসরণীয় হতে পারে এখনও। তবু ওই গানটা, আমি সহশ্রোতাদের বলছিলাম, মিতা হকের কণ্ঠে শুনলে কেঁদে ফেলতে পারতেন তারা।

তা না-ও হতে পারত অবশ্য। কারণ ওই স্মৃতি। বিশেষ ওই শিল্পীর কণ্ঠে বিশেষ ওই গানটা শোনার সঙ্গে ব্যক্তিগত ওই বিশেষ সময় এবং ওই বিশেষ সময়ের জনৈকা পাত্রীমিত্রা জড়িত। সহশ্রোতাদের স্মৃতি নিশ্চয় এক ও অভিন্ন নয়।

কাজেই একদিক থেকে গান ব্যাপারটা ভালো গাওয়া আর মন্দ গাওয়া, ভালো সংগীত আর মন্দ সংগীত, ভালো কথাগীত আর মন্দ কথাগীত প্রভৃতির সঙ্গে যত-না তারচেয়ে বেশি স্মৃতিসংশ্লিষ্ট শ্রোতার। একই কথা খাটানো যায় কবিতার ক্ষেত্রেও। ফলে গান-কবিতা ইত্যাদি নিয়া আমাদের ক্রিটিক্যাল্ অ্যাপ্রিসিয়েশনগুলোর গোড়ার গলদ আমি দেখি এইখানটাতেই। ক্রিটিক নিজে তার স্মৃতিটাকে লেখায় বিনিয়োগ/লগ্নি করেন না। মেকানিক্যাল্ একটা ব্যাপার হয়ে যায় বেবাককিছু।

মিতার গানটার কথা ফাঁস করা যাক এইবেলা। গানটা যদিও ‘প্রকৃতি’ বিভাগে দেখা যায় গীতবিতানে, এইটা আমি চিরকাল প্রেমের গান হিশেবেই শুনে এসেছি। ভীষণ শরীরী প্রেমের গান। প্রণয়ের আর্তিমিশ্রিত করুণ কামমোহিত চরিতার্থ হবার বাসনার গান। আমি বরাবর ভুলই করে এসেছি জীবনের দীর্ঘ মরুভূমিতে। আমি ক্রিটিক না। আমি আজও অসংখ্য পূজাপর্বের গান শুনি ফিজিক্যাল্ ল্যভ মেইকিঙের আহ্বানগান হিশেবে। এইটা যারপরনাই দোষের। কিন্তু আমি তো গুনেগার বান্দা, ঠাকুর নিশ্চয় কিছু মনে করবেন না। আর কখনো শরীরী সেই গানগুলো লইয়া আলাপ করা যাবে যদি হায়াতে কুলিয়ে উঠতে পারি। কিন্তু মিতার গানটার গল্প করতে যেয়ে এখন কিশোরকুমারের একটা গান মনে পড়ে যাচ্ছে যে! ছেলেবেলায় ক্লাসমেইট মেয়েদের কারো কারো দিকে তাকিয়ে তখনকার শক্তিতে যথাসাধ্য করুণ নয়ন বানিয়ে যেই গানটা গাইতাম অনেকেই ভিন্ন ভিন্ন শহরে ভিন্ন ভিন্ন স্কুলে ছেলেরা আমরা : “আমার পূজার ফুল ভালোবাসা হয়ে গেছে / তুমি যেন ভুল বোঝো না / মালা গেঁথে রেখেছি পরাব তোমায় / তুমি যেন ছিঁড়ে ফেলো না” … ইত্যাদি। ইয়াল্লা! আচ্ছা, মিতার গান নিম্নে রেখে যাই :

আমারে যদি জাগালে আজি নাথ,

ফিরো না তবে ফিরো না, করো করুণ আঁখিপাত॥

নিবিড় বনশাখার ’পরে  আষাঢ়মেঘে বৃষ্টি ঝরে,

বাদল-ভরা আলস-ভরে  ঘুমায়ে আছে রাত॥

বিরামহীন বিজুলিঘাতে নিদ্রাহারা প্রাণ

বরষাজলধারার সাথে গাহিতে চাহে গান।

হৃদয় মোর চোখের জলে বাহির হল তিমিরতলে,

আকাশ খোঁজে ব্যাকুল বলে বাড়ায়ে দুই হাত॥

দেবব্রতডম্বরু, শরাফীনির্ঘোষ

অবশেষে দেখা পাওয়া গেল তার ভোররাতের দিকে। এক্স্যাক্টলি ইট ওয়্যজ্ কোয়ার্টার পাস্ট ফোর ইন দ্য আর্লি মর্ন। শোনা গেল তার মোহন মন্দ্র ডম্বরু। জর্জনির্ঘোষ। “বহুযুগের ওপার হতে আষাঢ় এল আমার মনে / কোন্-সে কবির ছন্দ বাজে ঝরোঝরো বরিষনে” … একটানা মাসব্যাপী যা তাণ্ডব গেল গনগনে গরমের! কাজেই বৃষ্টি এসে, ভোররাতের দিকে, ‘রেবানদীর তীরে’ যেন ছৈওয়ালা নাওয়ের নাগাল দেখিয়ে যায়, ‘শ্যামলশৈলশিরে’ যেন অঝোর বারিপাতের গায়ে কোমল পুলক লাগায়। গেল মাসব্যাপ্তির মধ্যে একেবারে হয়নি-যে তা না, হয়েছে এই তিনছটাকের মতন বৃষ্টি মাঝেমাঝে, আমাদের দেশে এই ছটাকমার্কা পানিপাতেরে কেউ বরিষন বলে না। রাতের অন্তিমে যেইটা হয়ে গেল, জর্জনির্ঘোষ বরিষন বলে এরে; হ্যাঁ, জর্জনির্ঘোষ; বজ্রনির্ঘোষ নয়। দেবব্রতডম্বরুশব্দে, জর্জনির্ঘোষ বরিষনে ভেসে গেল ভোররাতের তীর। বহুযুগের ওপার হতে আষাঢ় …

অবশ্য জর্জের যা সামর্থ্য, শক্তি যা, তা-ই সমস্যা বলেও মনে হয়েছে আমার কাছে চিরদিন। বাংলায় আমরা যারে বলি ব্যারিটোন ভোয়েস, বলি বজ্রনির্ঘোষ কণ্ঠস্বর, এর লিমিটেশনগুলো সম্পর্কে অ্যাওয়ার না-থাকলেই বিপত্তি। ঠিকমতো যদি, ঠিক সময়ে যদি, চুপাতে না পারেন, লুকাতে না পারেন, আপনার বজ্রঘোষালো কণ্ঠস্বর, যদি স্কিলের ব্যাপারটা উদোম হয়ে যায়, ক্ষ্যামতা দেখানো যদি শিল্পীর লক্ষ্য হয়ে ওঠে, এবং লক্ষ্য যদি শ্রোতার সমক্ষে ধরা পড়ে প্রকাশ্য অনায়াসে, ব্যারিটোন ব্যাপারটা ভালোগুণের পরিবর্তে দেখা দ্যায় বদগুণ হিশেবে। ব্যারিটোনওয়ালাদের ক্ষেত্রে এই বিপত্তি ঘটতে দেখা যাবে কোনো-না-কোনোভাবে, নানান গানে, নানান মাত্রায়। একেক সময় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে গলা, আর গায়কী হয় ব্যাহত, গোটা গানটাই নিরুদ্ধ হয়ে যায় গলার তজল্লায়। দেবব্রত বিশ্বাসের কথা মাথায় রেখেই কিন্তু কথাগুলো বলা হচ্ছে ভাবার কারণ নাই। যাদের ভোক্যাল কর্ড গডগিফ্টেড গমগমে, তাদের গান শ্রবণোত্তর কতিপয় সমুজদারের যে-একটা পাইকারি পোজিটিভ অ্যাপ্রিসিয়েশন, যেন গম্ভীরতাবাহী গলার সাতখুনত্রুটিও মাফ, এমনকি গমগমে গলার আননেসেসারি গলাবাজিও অ্যাপ্রিশিয়্যাবল, এহেন পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে চারপাশে দেখে দেখে বীতশ্রদ্ধ হয়ে উপস্থিত মুহূর্তে দেবব্রত ভর করে এই কথাগুলো টোকা গেল। পরে কখনো বিস্তারে যাওয়া যাবে এমন একটা আশা অন্তরে রেখে এ-যাত্রা পার হওয়া যাক লাফিয়ে।

ব্যারিটোন ভোয়েসের লিমিটেশনগুলো ধরা যায় আপনি নিজের মাতৃভাষায় যখন গান শুনছেন তখন। কথানির্ভর গান হোক, অথবা রাগপ্রধান গান — ব্যারিটোনের প্রোব্লেমগুলো ডিটেক্ট করা আদৌ কঠিন হয় না। ভাবের সঙ্গে সংগতি রাখতে পারছে কি না, আবেগ ছাপিয়ে ক্যার্দানি মুখ্য হয়ে উঠছে কি না, এইসব বিবেচ্য। গলাটা, ব্যারিটোনটা, গাইবার সময় ধাতব মনে হলেই মুশকিল। শুনবার সময় যদি মনে হয় সিমেন্টজমাট খাম্বার ভিতর থেকে একটা আখাম্বা আয়রন রড গাইছে, সেইটা যারপর-নাই যাতনার। হয়ে থাকে হামেশা এমন। জর্জের ক্ষেত্রেও হয়ে থাকে, এমনকি শান্তিদেবের ক্ষেত্রেও। কোনো কোনো রেন্ডিশনে, অবশ্যই, বিশেষভাবেই বিষয়টা শ্রুতিপীড়াকর হয়ে দেখা দেয়। এই মুহূর্তে এক্সাম্পল চয়িতে পারছিনে। চেনা ভাষার/ভাবাবেগের বাইরে অচেনা কারো ব্যারিটোন শুনে অবশ্য শুধু গলার কারুকাজেই বিমূর্ত পুলক পাওয়া যায়। যেমন পাভারোতি। ইটালিয়্যান অপেরাটিক টেনোর ল্যুসিয়্যানো পাভারোতি। অ্যানিওয়ে।

যেমন ধরা যাক শিল্পী বৃষ্টিবাদলাদিনের গান গাইছেন। এখন, বৃষ্টিদিন মানেই একচ্ছত্র গম্ভীরতা মনে করে শিল্পী ভীষণ গম্ভীরতা আঁকলেন গলা দিয়া, ত্রাহি অবস্থা হলো শ্রোতৃমণ্ডলীর সেই গাম্ভীর্য শ্রবণোত্তর, তাইলে তো হলো না। গাম্ভীর্যই বৃষ্টিদিনের একমাত্র চিহ্নায়ক নয়। আর গাম্ভীর্য মানেই নয় গভীরতা। চালু মিথটা এমনই যে গম্ভীরতা মানেই মহানুভবতা। গাম্ভীর্যই দামী মনে করেন বেশিরভাগ শিল্পী ও শ্রোতাসমুজদার। কিন্তু গম্ভীরতা ফাঁপাও হতে পারে। এবং ফাঁপাভাব ঢাকতে যেয়েও গম্ভীর হয় লোকে। ফাইন্যালি শিল্পকর্মের, সেইটা গান হতে পারে বা আর-দশটা মাধ্যমের যে-কোনোকিছু, ফ্লাইটটা জরুরি। সেই ফ্লাইট অনেক বডিঝাঁকানাকায় যেমন আসতে পারে, তেমনি গম্ভীরতাতেও উড়ান ঘটতে পারে। কিছুই পূর্বনির্ধারিত নয়।

কাজেই ব্যারিটোন হলেই মিউজিকমেলোডি আপনাআপনি এসে যাবে, নেভার এভার। ব্যারিটোন হ্যান্ডল করাটাই হচ্ছে ব্যাপার। আপনা মাঁসে হরিণা বৈরী — কথাটা ব্যারিটোনওয়ালাদের ইয়াদ রাখা ফর্জ। কিন্নরকণ্ঠের অধিকারী যারা, তাদের ঝঞ্ঝাট অন্য জায়গায়, তাদের বিপদ আলাদা। ব্যারিটোনের কারণে ফ্লেক্সিবিলিটি ক্ষুণ্ন হবার, মডিউলেশন খর্ব হবার, ভাবগতিকের মধ্যে একটা আলগা আরোপিত অস্বস্তির বিপদটা তাদের থাকে না। তারা গাইলেই ন্যাচারাল লাগে মোস্টলি। প্রথম শ্রবণে অ্যাট-লিস্ট অস্বস্তিটা থাকে কম।

কয়েকদিন আগে আমাদের এক সহকর্মী তার আবাল্যযৌবনের নায়ক জর্জদার গান শুনতে যেয়ে প্রশংসা করছিলেন গলার পৌরুষের। খটকা লাগল তখনই। মনে হলো, গলায় কি কখনো ‘পুরুষ’-‘নারী’ থাকে? সেই সহকর্মীটি ভীষণ কোকস্টুডিয়োপাকিস্তানভক্ত। সন্নিকট উদাহরণ হিশেবে আব্দা পার্ভিনের গলা মনে করিয়ে দিয়ে জিজ্ঞাসু হতেই উনি বললেন, হ্যাঁ, আলবৎ, আব্দা পার্ভিনের গলায় ইউনিক এক পৌরুষ ফুটে ওঠে। আমি আর কথা বাড়াই নাই। প্রাণভয়ে। কিন্তু আব্দা পার্ভিনের গলা শুনে চিরদিনই আমার কসমিক এফেক্টের কথা মনে হয়। যে-কোনো ব্যারিটোন ভোয়েসের ভালো রেন্ডিশন শুনে এই মহাজাগতিকতার বোধটা আসে ভেতরে। যেমন রশিদ খানের গলা শুনে মনে হয়, বেশিরভাগ সময়, একটা ধাতব আওয়াজ গমগমিয়ে তেড়েফুঁড়ে আসছে আমার দিকে। তেমন যুৎসই কোনোদিনই মনে হয় নাই রশিদ খান। উদাহরণ হিশেবে জেনারালাইজ করেই বললাম কথাটা।

ব্যারিটোন ভোয়েসের প্রশ্নে হেমন্ত মুখুজ্জে, কবীর সুমন প্রমুখ অনেক বাংলা গানকারের কথা পাড়া যাবে। এখন না কব কথা। অ্যানিওয়ে। একজন শিল্পীর নাম নিয়েই ক্যাপ টানব কলমে। খুব কম গেয়েছেন তিনি। ব্যক্তিগত জৈবনিক ট্র্যাজেডির কারণেই কি না জানি না উনি জীবনের মধ্যপর্যায় থেকেই গান একপ্রকার ছেড়েই দিয়েছিলেন টুকটাক গাওয়া ছাড়া। বাংলাদেশপর্বে উনি বিশেষ কিছুই গান করেন নাই। অভিমানবশত? হয়তো। অথচ উনি স্টলোয়ার্ট ছিলেন প্রথমজীবনের সেই আইপিটিএ স্টেজ থেকে। তিনি কলিম শরাফী। রবীন্দ্রনাথের গান থেকে শুরু করে আধুনিক বাংলা গান, গণসংগীত, অনেকদিকেই উনার গলা খেলানোর নজির আমাদের সামনে আছে। এত শক্তি নিয়েও অল্প গেয়েছেন, অবাক লাগে। শুনেছি বাংলাদেশে এসে রেডিয়োর প্রতি কী-একটা ব্যক্তিগত অভিমান হয়েছিল উনার, পারিবারিক জীবনেও একটা আনএক্সপেক্টেড ঘটনার কথা জানি। কিন্তু উনার সম্পর্কে কেউ কোনো বই লিখেছেন কি না, পাচ্ছি না খুঁজে। দেহাবসানের পরে কি একটা স্মারক গ্রন্থ হয়েছিল? মনে পড়ছে না, তালাশ করছি।

রবীন্দ্রনাথের পৌরুষ!

এই লাইনটা যখন লিখতে শুরু করেছি এইমাত্র, আমি জানি না পরবর্তী লাইনে কী লিখব। অন্ধকার দিক বলতে, লেখালেখির কিংবা আঁকাআঁকির, এ-ই বুঝি আমি। কিন্তু দেখা যাবে, হেরে-তেরে লিখে পাতার কিনারায় পৌঁছে যাব খানিক পরে। এ এক অপচয় বটে। এইভাবে পাতা-পাতা অপচয় একসময় বিশাল সিন্ধুর রূপ নেবে, তীরে ফিরবার আর তরী থাকবে না তখন। অথচ প্রথম থেকে যদি একটু হিসাব-কিতাব করে শুরু করতাম জীবন, শুরু করতাম একটু ভেবেচিন্তে এই চিলতে এন্ট্রিটা লেখা, কত ভালোই-না হতো! যা-হোক, মিতব্যয় যদি স্বভাবেই না-থাকে, মিতাচার না-থাকে যদি শরীরী ভাবে ও ভঙ্গিতে, ডায়রিপৃষ্ঠাগুলো তো ডাস্টবিনের বদগন্ধ ছড়াবেই।

তা, ও নিয়া অত মায়াকান্নায় কাজ নাই। বরং এখন এক কাজ করো, ঠিক এইখানে এই প্যারায় — হ্যাঁ, এই লাইনের ঠিক অব্যবহিত পরেই আপাতত যতি টানো, কান পাতো যতিহীন বৃষ্টিপাতের প্রতি। সেইটা বরং অনেক বেশি সৃষ্টিশীল হবে। সেই কালিদাসের পর মন-উপুড় বৃষ্টির শব্দ, হৃদিভাসা বৃষ্টিগীতিনৃত্যনাট্য, শুনেছে কোনো উপমহাদেশবাসী? কেন, রবীন্দ্রনাথ! হ্যাঁ, কথায় কথায় বর্ষা-বইয়ে-দেয়া ছিঁচকাঁদুনে রোম্যান্তিক এক। খুব জোলো, পুঁতানো মুড়ির মতো, অনুত্তেজ বর্ষা ঠাকুরের। যথেষ্ট পুরুষালী নয় তাঁর বর্ষা। আজব! রবীন্দ্রনাথের পৌরুষ! বর্ষার ব্যাটাগিরি! স্রষ্টার আবার পুরুষত্ব-নারীত্ব কী হে? বেকুব! ছাগচিন্তক! রোক্কে, রোক্কে — ঠিক এই লাইনে প্যারা ভাঙো। প্যারা ভেঙে লিখতে শুরু করো প্রেম, গাও প্রেমের গান, শোনাও বৃষ্টিভেজা বাংলাভাষার সুর। গাও, তবে এট্টু রেখে-ঢেকে গেও। অধুনা, আজকাল তো তুমি-আমি আমি-তুমি চলছে লাগামহারা। কোনো রাখঢাক নাই। রহস্য নাই। এই রাখঢাক, এই রহস্য, এই রঙ-না-চড়ানোর নাম শিল্প। শিল্পসৃজন। অথবা রঙ যদি চড়াতেই হয়, তবে বৃষ্টির।

Nat E

তরুণ রবীন্দ্রনাথকে

তরুণ রবীন্দ্রনাথকে মনে পড়ে খুব। রবির কর বড্ড প্রভাতে কেমন দ্যুতি নিয়া পশেছিল পরানে তাঁর, জাগিয়া উঠেছিলেন রূপনারাণের কূলে তিনি একদম পার্ফেক্ট টাইমে, এইসব মনে পড়ে। এই জীবন ও এ-জীবনের ভেংচি ও মুখব্যাদানগুলো তরুণ রবীন্দ্রনাথ কেমন করে সামলেছিলেন, করেছিলেন হিংটিংছট হ্যান্ডল ও হায়েনাবাতাসের সনে ডিল্ কেমন সুচারু কায়দায়, এইসব ভাবি। জীবনের এই মিথ্যেসত্যিমিটিমিটি মিমিক্রি ও গিমিক-গিটকিরিগুলো তরুণ রবিকিরণ মনে পড়ায়ে দেয় খুব। মহীনের ঘোড়াগুলি  সম্পাদিত ‘কত কী করার আছে বাকি, সময় বয়ে যায়’ শীর্ষক হাহাকারাকীর্ণ মধ্যগগনে এসে সেই কচমা দাড়িগোঁফগজানো উত্তমকুমারমুখো তরুণ রবীন্দ্রতসবির চোখ থেকে তাড়াতে পারি না। হায়! জীবন গইয়া যায়, রেনেসাঁ আমার হলো না আর! আমার হইল না জাগৃতি, ঈশ্বর, ওগো জীবনদেবতা, সিরাজ সাঁইয়ের চ্যালা ওগো সময়মতো-সাধনসিদ্ধা লালন! তরুণ রবীন্দ্রনাথকে মনে পড়ে খুব … নিয়োলিথিক সভ্যতার ন্যায় কেমন দূরের ও স্বপ্নের ও আচ্ছন্নের মনে হয় সেই দিনগুলো, আমার, তরুণ রবীন্দ্রনাথের … মহাভারত  রচনাকালীন ব্যাসদেব সেই পিটার ব্রুকের সিনেমায় … এবং উপনিষদের তপোবন … নমাজ আমার হইল না আদায় ও আল্লা … আমার যেসব দিন গিয়েছে ট্রেনের সনে পাল্লা দিয়ে পেছনে, একেবারেই কি গেছে? দিনের আলোর গভীরে দেশলাই জ্বালায়া খামাখা তালাশ … তরুণ রবীন্দ্রনাথকে মনে পড়ে খুব, মধ্যমরণে, এই বিরানায় … বৃথা যায়, হায়, বৃথা যায় …

হিমের হাওয়ায় ব্যাকুল রোদন

রবীন্দ্রনাথ কি শীত পছন্দ করতেন না? আমি ঠিক জানি না, মানে জিগ্যেশ করা হয়নি কোনোদিনই তাকে বা তার কোনো অফিশিয়্যাল্ প্রোমোটারকে, বাট সিম্স টু বি যে তেমন পছন্দ বোধহয় ঠাকুর করতেন না শীত বেচারীকে। এমন হতেই পারে। এইটা আলাদা ফাইন্ডিংস্ হিশেবে ফোকাস্ করার কিছু হয়তো না। তাই বলে একডজন গানেই শীত কাভার করিয়া ঠাকুর পার পেয়ে যাবেন? না-মামুর চেয়ে কানামামু তরিকায় এই ধরি শিশির না-ছুঁই নিউমোনিয়া টাইপের নমো-নমো ডক্যু তৈয়ারির দিকে না-গেলেও ক্ষতি কিছু হতো বলে মনে হয় না। আর তার বর্ষা ও বসন্তপ্রীতির কথা কে না জানে, সেক্ষেত্রে শীতের দিকে দৃষ্টি দেয়া তার হয়ে ওঠে নাই সেভাবে। ন্যাচারালি তিনি বর্ষার প্রতিই লয়্যাল্ থাকতে চেয়েছেন আগাগোড়া। আর রোম্যান্টিসিজমের আওতাধীন অন্য দশ-পঁচিশ কবির মতো উনার মধ্যেও বসন্তপ্রণয় জাগ্রত থাকবে এতে আশ্চর্যের কিছু নাই।

গীতবিতানে প্রকৃতিপর্ব অধ্যায়ে পৃথক ছয়ঋতুর গান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে বর্ষাগান সংখ্যায় বেশি সবচেয়ে, সেকন্ড পজিশনে স্প্রিং। শীতের স্তোত্র সংখ্যায় সাকুল্যে তেরো/চোদ্দ হবে, বেশি নয়, কমও হতে পারে। হেমন্ত আর শরতের ভাগা দুইটা মিলিয়ে আরও কয়েকটা বাড়ানো হয়তো প্রস্তাব করবেন কেউ, তবে সেক্ষেত্রে বর্ষার বা বসন্তের সংখ্যাও তো উঁচা হবে ব্যাপক। কাজেই এই নিয়মে পুনঃসম্পাদনা আদৌ দরকার নাই।

‘শীতের হাওয়ায় লাগল নাচন আমলকির এই ডালে ডালে’, ‘শিউলি-ফোটা ফুরোল যেই ফুরোল শীতের বনে’, ‘এল যে শীতের বেলা বরষ-পরে’, ‘পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে, আয় রে চলে, আয় আয় আয়’, ‘শীতের বনে কোন সে কঠিন আসবে বলে’ ইত্যাদি ছাড়া আরও গুটিকয় গান আছে বটে। এর মধ্যে ‘একি মায়া, লুকাও মায়া জীর্ণ শীতের সাজে’ গানটাও রয়েছে, যেখানে এমন পঙক্তিটা পাওয়া যায় ‘হিমের হাওয়ায় গগন-ভরা ব্যাকুল রোদন বাজে’ ইত্যাদি।

শীতের সন্তান সন্দেহাতীতভাবেই জীবনানন্দ দাশ। শীতের সন্তান? শীতের বরপুত্র? হোয়াই, শীতের স্বামী/ফিয়াসেঁ বলা যাবে না? যাবে না কেন, যাবে। লেবেলের গায়ে লেখা দেখে তো আর কেউ ওয়াইন খায় না। কাজেই কী-বা হায় আসে যায় লেবেলের অভিধায়? শীতপতি/শীতনাথ/শীতযোনিসম্ভূত ইত্যাদি যা-ই বলুন, বঙ্গে এক এই জীবনানন্দেই শীতের দেখা পাবেন আপনি। জীবনের শীতবিতান অবশ্য রবি-অপারেটরের গীতবিতান নয়, লিরিক্সের সঙ্গে স্বরলিপি ফিক্সড্ নাই। শীতশিল্পীরা কাজেই ইচ্ছেমতো ব্ল্যুজ্ টিউনে এইটা গাইবার মওকা পাচ্ছেন। স্বর্গীয় অজিত রায়ের ন্যায় কীর্তন-ভাটিয়ালি বানাইতেই হবে, নেসেসারিলি নট।

তবে এইটা মনে হয় একবার খুঁজে দেখা যেতে পারে যে, বেচারা ঠাকুর সত্যিই শীতভীতু/শীতসন্ত্রস্ত ছিলেন কি না। আন্দাজে কথা বলার চেয়ে তখন বেশ গবেষকডাঁট নিয়া আলাপ-ঝালা চালানো যাবে। কেবল এই আন্দাজটুকু বলার ইজাজত আমায় দিন, মালকিন! মনে হয়, ঠাকুর যেভাবে বেসম্ভব গরমেও জোব্বাজাব্বা গায়ে চেপে হাঁটতেন, তিনি শীতসন্ত্রস্তই ছিলেন। ঠাণ্ডা-লাগার ধাত ছিল উনার, সম্ভবত। যৌবনে এক-দুইবার দেখেছি উনারে ফ্যাশন্যাবল্ দুইয়েকটা পাঞ্জাবিকিসিম কুর্তা পরিধান করতে, তা-ও তো লং স্কার্ট, এরপর তিরিশ হতে-না-হতেই বিবেকানন্দের সঙ্গে পাল্লা দিয়া ঠাকুরের ঋষিফ্যাশন্ মার্কেটে চলে আসে। বিবেকের অবশ্য গরমসহিষ্ণু গেরুয়া ম্যাটেরিয়্যাল্ দিয়া বানানো, রবিরটা দেখেই শীত পালায়। ঠাকুর কি গ্রীষ্মেও কুসুমোষ্ণ জলে সিনান সারতেন? খোঁজ নিতে হবে।

শরৎ, তুমি, অরুণ, আলো ও অঞ্জলি

ইনারা কারা? মানে, এদের সঙ্গে একটু আলাপ-পরিচয় হওয়া আশু দরকার। এরা কোথাকার? আস্তে হে, আস্তে, এত ত্রস্ত হইয়ো না। আলাপের আদব মান্য করিও ওগো সদালাপী সপ্রতিভ সুন্দর যুবা নারী ও পুরুষ! ত্রস্ততায়, দ্যাখো, একেকটা দিন একেকটা রাত একেকটা ঋতু একেকটা গোটা মানবজীবন যায় বিফলে হে! দ্যাখো চড়ুই আর সারসগুলোকেও সুযোগ দাও, ভাতশালিক আর মরিচখেকো পাখিটিকে একটুকু দাও অবসর, গিভ পিজিয়ন্স অ্যা চান্স! খালি নিজের জিন্দেগি জিনিতে চাইলে এই বিটকেলে ত্রস্ততাড়া থেকে মুক্তি মিলবে না। আলাপের আতিথেয়তা মানে ‘এককাপ চায়ে আমি তোমাকে চাই’ নয়, ‘লেটস্ হ্যাভ অ্যা চ্যাট ওভার অ্যা মার্টিনি’ নয়, আলাপের আতিথেয়তা মানে হলো যত-না তুড়বুড়িয়ে বলা তারচেয়ে বেশি বরং শোনা।

আচ্ছা, তা না-হয় বুঝলাম। বলো দিকিনি, অঞ্জলিটা কে? অ্যাইদ্দ্যাখো, অঞ্জলিরে চেনো না মিয়াঁ! শারুখের কত কত ম্যুভিতে দ্যাখো নাই ঘুরেফিরে এই কিত্না হাসিন্ মু’তারিমারে? ও, বুচ্চি বুচ্চি, তনুজাতনয়ার কথা বলছ? কাজলজি? আরে ধুর! কাজলজি হবে কেন? অঞ্জলি, অঞ্জলি, ঠিকাছে? একেক সময়ে একেকটা নাম খুব মার্কেট পায়, বুঝলা, যেমন শারুখের সিনেমাতেই একসময় সিমরান্ নামটা ব্যাপক পরিচালকপ্রিয়তা পায় এবং গণ্ডায় গণ্ডায় সিনেমাকাহিনিতে খালি সিমরান্ আর সিমরান্। তা, এই সিমরান্ তো ভাই কাজল মুখুজ্জেই, বাংলাবংশ। ধুর! একবার বলে অঞ্জলি, আবার সিমরান্, কীভাবে যে পারো তোমরা! অ্যানিওয়ে। এইবার এই আলোটা কে ভাই? পিসতুতো বোন? না ‘আলোর মিছিল’ ম্যুভির সেই ছিপনৌকোতনু ববিতাজি? কিছু বছর আগে ক্যালক্যাটায় একটা ম্যুভি হয়েছিল, সেই ‘আলো’, সেইখানে তো রাঙাবউখ্যাত ঋতুপর্ণা আলোর পার্ট নিলেন। উনার কথা বলতেছেন? ছিঃ ছিঃ ভাই! অ্যাই, ছিঃ ছিঃ বলিস না, ছিঃ ছিঃ বলতে নাই। কামে ও কালচারে ছিঃ ছিঃ নাই, যেমন যুদ্ধে এবং প্রেমে নাই অন্যায়। ইত্যাদি। কিন্তু ভাই ইন্ট্রো তো পরিস্কার হওয়া আশু দরকার। আচ্ছা যাক, পাস্ট ইজ্ পাস্ট, আগে বাড়েন। অরুণ? হু’জ্ হি? ফিজিক্সে পড়ত? ফোর্টিন ইয়ার্স ব্যাক শেষদেখা যার সনে? এখন প্রাইমারি ইশকুলের হেডু মনে হয়। সিগ্রেট খেত গতর কাল্লু বানিয়ে। গোল্ডলিফ। বাচ্চাকাচ্চার বাপ হয়েছিল তখনই। ‘অল্প বয়সে পিরিতি করিয়া হয়ে গেল জীবনের শেষ’। মনপুরা আইটেম। অরুইন্যা কি আগের মতোই বডি ভরে ভুসভুস চুরট খায়? ক্ষেমা দে এইবার বাপ! তা, ওই অরুণ? ভাই, আওয়াজ দ্যান! আচ্ছা ঠিকাছে ভাই, তাইলে বলেন দিকিনি শরতের মামলাটা কি? খুলি কন তো ভাই, ইট্টু খোলসা করেন এইবার। শরচ্চন্দ? শুদ্ধবঙ্গে শরৎচন্দ্র হবে, হ্যাঁ, ঠিকাছে। কোন চন্দ্র? পোলিটিশিয়্যান যিনি? না ওই দেবুদাদু? ও ভাই, কী ম্যান্দা মাইরা থাকতেছেন, উত্তর দ্যান বা দক্ষিণা কিছু-একটা দ্যান নগদবিদায়। কে এরা? মামা, তাইলে এই তুমি কে, এই তুমির কথা তো কবা, কবা না? মামা, ও, বুচ্চি ভাই বুচ্চি … শীতকাল আসিতিছে ভাই, মাম্মা, বুচ্চি বুচ্চি …

শরৎ তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি …

ঋতুর‌্যাঙ্কিং, ঋতুপ্রতিযোগ

বর্ষা ভালো নাকি শীত, — এই বিচারটুকু করার আগে একবার ভাবা দরকার হয় যে জীবজগতে যেমনটা ডারউইনের তত্ত্বপ্রশাসন লক্ষ করা যায়, ঋতুজগতে সেই জিনিশ গোচরীভূত হয় কি না। ডারউইনজির ন্যাচার‌্যাল্ সিলেকশন্ যদি ঋতুজগতের প্রায়োর কন্ডিশন্ না হয়, সেক্ষেত্রে এইভাবে একটি ঋতু অন্য আরেকটি ঋতুর চেয়ে ভালো/মন্দ বলবার বৈচারিক প্রক্রিয়া/আয়োজন কতটুকু যুক্তিযুক্ত, এইটাও বটে এক দশাসই প্রশ্ন।

তবু ভোক্তাদের ভোটাভুটির মাধ্যমে একটা আলতো উদ্যোগ হয়তো নেয়া যাইতে পারে কে বেশি বেটার, শীত না বর্ষা, হু ইজ্ দি বেস্ট। তবে ঋতুভোক্তাদের ব্যাপারে এইখানে একটা কথা পাড়া যায় এইভাবে যে, এখন কি ঋতুভোক্তার সংখ্যা ক্রমলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে? সিজন্-সমুজদার কি বিলীনপ্রায়? বাংলা কবিতার দিকে তাকান, দেখবেন যে এককালে ঋতুবন্দনাভিত্তিক কবিতা লেখা হতো দেদার, সমস্ত কবিই ডিরেক্ট ঋতুগুণগান রচনা করেছেন, সরাসরি ঋতুশ্রেষ্ঠ ঘোষণাকরণের দিকেও কবিরা পিছপা ছিলেন না। আর একেক কবির পক্ষপাত একেক ঋতুর দিকে থাকলেও মোস্টলি বর্ষা আর বসন্তের পাল্লাই ওজনে বেশি ভারী ছিল। যদিও অন্যান্য সিজনের অ্যাপ্রিসিয়েশনেও কবিদের অনীহা ছিল না। মোদ্দা কথা, ঋতুবন্দনা তখনকার কবিদের সমগ্রত কবিতাকারবারে একটা কমন্ আইটেমই ছিল।

বর্তমানে, অ্যাট্ প্রেজেন্ট, কবিরা আর সরাসরি ঋতুগান কম্পোজ্ করেন না। ফিউশন্ করেন, যদিও, কেউ কেউ। বর্তমানে, অ্যাট্ প্রেজেন্ট, ঋতুর তরফদারি করতে সেভাবে কবিরা আগ্রহী নন। ওদিকে ক্লাইমেট চেঞ্জ নিয়া হাঁউকাউ প্রচুর হচ্ছে, ক্লাইমেট-রিফিয়্যুজি নিয়া নানান রঙের সেমিনার আর পেপার লঞ্চ হচ্ছে হররোজ, কার্বন-এমিশনের ক্ষতিপূরণ নিয়াও খাতা খুলে হিসাবনিকাশ বেদম চলছে। ডেভেল্যপমেন্টওয়ালারা সোচ্চার খুবই, ঋতু নিয়া, কিন্তু কবিবৃন্দ জলবায়ুজলসায় নীরব। অবশ্য বাংলার দৈনিকওয়ালারা দ্বিমাসিক একটা আয়োজন করিয়া থাকেন হেমন্তে-বসন্তে-বর্ষায়-শীতে, সেই ঋতুদোকানে আপনার-আমার সওদাপাতি বিশেষ থাকে না। মানে, সেই দোকানে আপনি কি খরিদ করবেন তা নিয়া ভাবতে ভাবতে ঋতুর উপরেই বিরক্তি ধরিয়া যায়।

কিন্তু নানা কারণেই শীতঋতুর শ্রেষ্ঠতা সম্পর্কে দূতিয়ালি করা যায়। সেইটা যথাস্থানে যথাকালে করা যাবে, এখন বরং বিবৃতি আকারে কথাটা টুকে থুয়ে রেখে পার হওয়া যাক। কবিতায় ঋতুবন্দনা আজকের দিনে ফেরানো হয়তো সম্ভব হবে না সরাসরি। বিকজ্ কবিতা তো অনেক পথঘাট হেঁটে বন্দনাপর্ব অতিক্রম করে এদ্দুর এসেছে। ভেরি স্যুন্, শোনা যাচ্ছে, জলবায়ু-উদ্বাস্তু কবিদের দেখা আমরা পাবো। তখন হয়তো সরাসরি ঋতুস্তোত্র প্রণয়নের দিন ফিরবে যেভাবেই হোক। ভবিষ্যতে কাজেই, ইন্ ফিউচার, ঋতুকবিতা আবারও পড়তে পারব আমরা ক্লাইমেট-রিফিয়্যুজি পোয়েটদের বদৌলতে। ভবিষ্যতে, ইন্ ফিউচার, আমরা অনেককিছুই দেখতে পাবো অবশ্য।

বর্ষাও মন্দ না। আননেসেসারি বিরক্তিকর হলেও বর্ষা থাকুক এককোণে। নেসেসারি না হলেই-যে ফেলে দিতে হবে, এমন কথা আমরা বলছি না। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বা তারও আগে, ধরা যাক কালিদাসের আমলে, রেইনি সিজনের একটা আবশ্যকতা আছিল হয়তো, তখন তো বাংলার বাড়িঘরগুলোতে শাওয়ার ছিল না, আর শাওয়ার আস্বাদিবার তরে বেঙ্গল রেজিমে রেইনি সিজন লোকে বেশ ভালোও বাসত। এখন তো ওই কাজ, স্নানঝর্ণার কাজ, অল্প পরিসরের ঘেরের ভেতরে সারা যাচ্ছে। কাজেই বৃষ্টিদিনের হুজ্জুতি নিষ্প্রয়োজন। তবে উইন্টার সিজনের কোনো কৃত্রিম রেপ্লিকা আজও তৈয়ার হয় নাই। শীত তাই ইউনিক্, আনপ্যারাল্যাল, অনন্যলোকসামান্য। বর্ষার সবকিছুই মোটা দাগের। শীত সেইদিক বিচারে সূক্ষ্ম। শীতের গুণগানের অন্ত নাই। শীত অতিথির ন্যায় প্রিয় ও সমাদরযোগ্য।

খেলে যায় রৌদ্রছায়া, শীত এসেছে, হেমন্ত

আমার এই পাতা-ভরাতেই আনন্দ, রবীন্দ্রনাথের যেমন ছিল পথ-চাওয়াতেই। কেবল যে পথ-চাওয়াতেই আনন্দ ছিল তাঁর, ঠাকুরের, তা নয়; — ছিল আরো বহুকিছুতেই। চিত্রাঙ্কনে যেমন, গানে, নাচে ও নাটকেও। গল্পগাছায় তো ছিলই, ছিল উপন্যাসে, দর্শনে ও বিজ্ঞানে, বিজ্ঞাপনী স্ক্রিপ্ট রচনায়, চিঠিচাপাটিতে, ব্যাকরণ ও পরিভাষা প্রণয়নে, বিশ্ববিদ্যালয় বানানোয়, এখানে-ওখানে অভিভাষণ-প্রতিভাষণ দিয়ে বেড়ানোয়, ব্রাহ্মধর্ম প্রচারে এবং সর্বোপরি কবিতায়। কে অস্বীকার করবে যে, পৃথিবীর সর্ববৃহৎ পাতা-ভরাটকরণ প্রকল্পগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থানীয় একটির নির্বাহী পরিচালক এই ভদ্রলোক, কোনো এক্সটার্নাল কন্সালটেন্ট ছাড়াই তিনি একহাতে একসঙ্গে একশ প্রোজেক্ট ডিজাইন থেকে শুরু করে ইমপ্লিমেন্ট করেছেন, এই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর! সব মিলিয়ে ক-হাজার পাতা তিনি গিয়েছেন ভরিয়ে আশি-বছর-হ্রস্ব তাঁর সারাটি জীবনে! গুনে দেখুক গণিতবিদ কেউ, গো-এষণা করুক মাথাওয়ালা ঝানু কোনো বাংলা নারিকেল, অথবা মরুক গে তেইশ কি তিরিশ খণ্ড রবীন্দ্র রচনাবলি পড়ে পড়ে। দেখুক ঢুঁড়ে সর্বমোট কয় লক্ষ শব্দ তিনি বুনে গেছেন, কত কোটি বর্ণ তিনি ব্যয় করেছেন কত অর্বুদ অনুভূতি প্রকাশিতে যেয়ে। আমি ততক্ষণে দেখি, রবীন্দ্রনাথ নামের এই পিরালি ব্রাহ্মণ জমিদার বাবুটিকে পাতা-ভরানোর খেলায় পেরিয়ে যেতে পারি কি না, পরাস্ত করতে পারি কি না প্রেমগীত রচনায়।

এবং, ওই যে বললাম-না, আমার এই পাতা-ভরাতেই আনন্দ! রহি রহি খেলে যায় রৌদ্রছায়া, বর্ষা আসে বর্ষা যায়, বসন্ত ঘনায়, হেমন্ত তার আগে, এবং উইন্টার, পাতা-ভরানোর খেলা আমার তবু ন-ফুরায়। রবীন্দ্রনাথের ফুরিয়েছিল আশি বছরে, তেমনি নজরুল চল্লিশে এবং জীবন চুয়ান্নয়, আমি কি অতদিন পারব টেনে যেতে খেলা! আশির আগেই কি ফিরে যেতে হবে হাঁস হয়ে পরম সেই প্যাভিলিয়্যনে, সেই অমোঘ অসীম অন্ধকারে! যখন যাবার তখন দেখা যাবে, যেথা যখন থাকি আমি সেথাকার গান গাই, কাজেই আপাতত পাতা ভরায়ে যাই। ক্রীড়ানৈপুণ্যের কোনো নখরামি আমার নাই, শিল্পরচনার রোদন নাই, যেহেতু অলীক কোনো স্পন্সরের নিকট শেকলবন্দী আমি নই, অতএব পাতা ভরিয়ে যেতে আমার বাধা তেমন নাই। আমি পাতাই ভরায়ে যাই, বৃদ্ধ-প্রৌঢ়-জোয়ান মম সর্বস্তরের বোন্ ও ভাই, নিঃশূন্য পাতা আমি ভরায়ে চলি শিশুর মতো একাগ্রচিতে একমনে। সেই বিরাট শিশুটা — যাকে দেখা গিয়েছিল নজরুলের গানে — যে-কিনা করেছিল খেলা এই বিশ্ব লয়ে, আনমনে, নিরজনে, প্রভু, নিরজনে …

চৈত্রে শোনা ফাগুনগান ও একটি যতিচিহ্ন

“ফাগুন, হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান — / তোমার হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান — / আমার আপনহারা প্রাণ, আমার বাঁধনছেঁড়া প্রাণ। / তোমার অশোকে কিংশুকে / অলক্ষ রঙ লাগল আমার অকারণের সুখে / তোমার ঝাউয়ের দোলে / মর্মরিয়া ওঠে আমার দুঃখরাতের গান।। // পূর্ণিমাসন্ধ্যায় তোমার রজনীগন্ধায় / রূপসাগরের পারের পানে উদাসী মন ধায়। / তোমার প্রজাপতির পাখা / আমার আকাশ-চাওয়া মুগ্ধ চোখের রঙিন স্বপনমাখা / তোমার চাঁদের আলোয় / মিলায় আমার দুঃখসুখের সকল অবসান।।”

উড়ছিল ওই বাণীগুলো, ওই গানপঙক্তিগুলো, অজ্ঞাত কোথাও। অথবা জ্ঞাত, নো ম্যাটার এট্-অল কোথায় এবং কতক্ষণ, কুল-কাল সম্পর্কে কিউরিয়োসিটি যারা প্রকাশ করেন তারা গবেষক অথবা আর-কোনো গোত্র। রবিমিউজিক শোনে পাতক ও পূণ্যবান সবে সম কিংবা বিষমভাবে। এবং শোনেও না কেউ, অথবা না-শোনে অনেকেই, শোনা ম্যান্ডেটোরি কিছু তো নয় নিশ্চয়। এমন গ্রুপ অফ পিয়োপলও তো প্রজাতন্ত্রে দুর্লভ নয় যারা কিনা রবিটোন ম্যান্ডেটোরি করিবারে বদ্ধপরিকর। উহারা কেমন করে হেজেমোনি ক্রিয়েটিয়া যায়, হে গুণী, আমি অবাক হয়ে হেরি। অ্যানিওয়ে। দিনভর লতিয়ে উঠছিল, ঝরঝর ঝরছিল, সুরপুঞ্জ ওই। বিশেষ ওইটুকু, ওই তো ‘মর্মরিয়া ওঠে আমার দুঃখরাতের গান’ … ওই তো ‘তোমার অশোকে কিংশুকে / অলক্ষ রঙ লাগল আমার অকারণের সুখে’ … উড়ছিল ঘুরে ঘুরে একেলা আকাশে। বেজে বেজে যাচ্ছিল বিপুলা বাতাসে। এই  নিরাকার সুরের সাম্পান। ওই ‘ফাগুন, হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান’ … মনে মনে ভেবেছি দিনভর এই কথাটা যে, বেচারা ফাগুন কী-এমন নিয়েছে বা পেয়েছে, বাঙালির ব্যক্তিজীবনে ফাগুনেরই-বা কী-এমন রসগোল্লা অবদান তথা কন্ট্রিবিউশন তা নিয়া জোর আলোচনা দরকার। এখন তো চৈত্র — ‘এখন এটি চৈত্র মাস শিমুল গাছে ফুল / এখন গাছে ধরেছে খুব দাঁত-টকানো কুল’ … সৈয়দ হকের লাইন এইটা, যা-হোক — বৈঠক একটা আয়োজন করা যাবে না-হয় আগামী ফাল্গুনে। এখন, তবুও এখন, তুমি-যে কেন পড়ছ মনে হে ফাগুন, হে হাওয়া-হাওয়া! ‘হাওয়া! এই হাওয়া! হাওয়া এসে দুলে-দুলে যায়’ … এইটা আবার আরেক গান, ‘সমগীত’ শিল্পীগোষ্ঠীর, অমল আকাশ ও সম্মিলিত কণ্ঠের। পরে এক-সময় এই নিয়াও তোলা যাবে আলাপ। ‘তোমার হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান’ … ফাগুন, ওগো ও কমাচিহ্ন-সমেত ফাগুন, কত-না রহস্য ধরো তুমি অনঙ্গ তব অঙ্গে! রহস্য ধরে কতই-না তোমার ওই কমাচিহ্নখানি! একেবারে শুরুর লাইনে, একেবারে পয়লা তোমার নামের কোমরের কাছে, যেমন কোমরবিছে জেওর থাকতে দেখা যায় বেদেনারীদের শরীরে, এবং দ্যাখো, বোঝাই যায় না বিলকুল তোমাকে, এতই আলতো তুমি, যখন শান্তিদেব ঘোষ গলায় নেন তোমায়! এত রহস্য! ওগো কমাচিহ্ন কন্যে! এত্ত রহস্য! সমস্ত দিন জুড়ে ভেবে সারা আমি আজ ওই নিষ্পলক যতিচিহ্নটি নিয়ে! ফাগুনান্তে জুড়ে-দেয়া ঠাকুরের ওই কমা যতিচিহ্নখানি নিয়ে! দ্যাখো, অথচ, গাইবার সময় একদম বোঝা যায় না! বিপুলা এ-ধরণী, অয়ি, কী বিচিত্র রহস্যে-যে ভরপুর!

ফ্রাইডে ব্লুজ্

“তখন কে বলে গো সেই প্রভাতে নেই আমি / সকল খেলায় করবে খেলা এই আমি — / নতুন নামে ডাকবে মোরে, বাঁধবে নতুন বাহুর ডোরে / আসব যাব চিরদিনের সেই আমি।”
এই একটা গান একইসঙ্গে স্বচ্ছসত্যে শাশ্বত সৌন্দর্যমণ্ডিত এবং বিষাদব্যঞ্জনায় ভরা। রবীন্দ্রনাথ, আমার ধারণা, সারা পৃথিবীর রোম্যান্তিকদের মধ্যে অতুলন ঈর্ষণীয়। সেইটা তার রচনাপরিমাণে তো অবশ্যই, রচনাগুণে তো অবশ্য-অবশ্যই, রচনাদর্শনে তো অবশ্য-অবশ্য-অবশ্যই; এবং আরও কিছু কারণেও। এক গীতবিতানে রবীন্দ্রনাথ একলা যা করেছেন, আমাদের চেনাজানা আংরেজি সাহিত্যের রোম্যান্তিকেরা সকলে মিলে সমবায়েও তা করেছেন বলে মনে হয় না। এ অবধারিত স্বীকার্য সকলেরই, যারা — যে-সমস্ত অনুভূতিপ্রিয় মানুষেরা — অনেককিছু পড়ে-শুনে-দেখে-বুঝে সেরে একটা সময়ে যেয়ে গীতবিতান উল্টাতে শুরু করবে; সঙ্গে সঙ্গে তারা — শ্রান্তধ্বস্ত সেই মানুষেরা — যে-ট্র্যাপে পড়বে, সে-ট্র্যাপ্ থেকে বেরোনো তাদের ইহজনমে সহজসাধ্য হবে না। এ নয় কোনো বকলোভী কুচক্রীর ফাঁদ, এই ফাঁদ সহজিয়া, এ-ফাঁদ সুরের ফাঁদ, সকল কোলাহলের মাঝে থেকেও সকল কোলাহল থেকে সমাহিতি লাভের এই সুর, এ-ফাঁদ তাবৎ উদ্ব্যস্ততা থেকে উপশমের, শনি ও অশনিদশায় শুশ্রূষার ফাঁদ। আর এইসব অনানুষ্ঠানিক অনুভব এসেছে সম্প্রতি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত প্রয়োজনে অনাড়ম্বরভাবে গীতবিতান পড়তে যেয়ে। পড়ছিলাম টেক্সট হিশেবে গীতবিতানের গীতপঙক্তিগুলো; এবং পড়তে যেয়ে দেখতে পাচ্ছি, সুরের পাখনা ছেঁটে দিয়ে এগুলো পড়তে কেমন ভিন্ন ব্যঞ্জনা পাওয়া যাচ্ছে তো! দারুণ অভিজ্ঞতা এটা। যে-কথাটা আজ এইখানে টুকে রাখা যায় তা হলো : ‘আজি হতে শতবর্ষ পরে কে তুমি পড়িছ বসি’ আর ‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে’ — একটা কবিতা, অন্যটা গান — এ-দুয়ের মধ্যকার মিল লক্ষণীয়। সেল্ফ-স্টেইটমেন্ট হিশেবে বা সেল্ফ-কনফিডেন্ট একজন কবির স্টেইটমেন্ট হিশেবে এ-দুটো যে-কোনো কবির জন্য, যে-কোনো কালের কবির জন্য, আরাধ্য। এ-প্রসঙ্গে মনে আসছে আরেক কবির মুখ, তিনি গালিব, মির্জা আসাদুল্লা খাঁ গালিব। স্বকৃত কাজের ওপর এই কবির সকৌতুক-সবিনয় আত্মবিশ্বাস আমরা তার কবিতায় ফিরে-ফিরে পাই। আবু সয়ীদ আইয়ুব আর আয়ান রশীদ ও শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সসৌজন্য মধ্যস্থতায় ইনি আমাদের অভিজ্ঞতায় এসেছেন তার পূর্ণ সৌরভ নিয়েই সম্ভবত। গালিব বলছেন : ‘মিহরবাঁ হো কে বুলা লো মুঝে চাহো জিস্ ওক্ত হো / মৈঁ গয়া ওক্ত নহি হুঁ ফির আ না সকূঁ’। মেহেরবানি করে কেবল তাঁকে ডেকে নিতে বলছেন গালিব যখনেচ্ছা, আর বলছেন তিনি তো বিগত সময় নন যে একবার বিদায় নিয়া আবার আসা তাঁর পক্ষে সম্ভব হবে না। ডাকা মাত্রই তিনি সাড়া দেবেন, তৎক্ষণাৎ, অবিলম্বে। আমরা জানি, এঁরা, এই দু-জনে, ডাকের উত্তরে এঁদের উদাসীনতা নাই। ডাকলে সাড়া দেন, না-ডাকলেও এঁরা আমাদের পাশেই থাকেন, বসত করেন পড়শির মতো, দু-জনেই, হর ওক্ত, সবসময়।

গুরুকে সেলাম অথবা ভানু ও বিবেকের গল্প

সেলাম গুরুজি, পেন্নাম আপনেরে, পঁচিশে এই বৈশাখে একটা পেল্লাই সাইজের পুষ্পতোড়া পাঠাইনু তব করকমলে। ক্যায়সা হাল হ্যায় আপনার, ট্যাগৌরজি, কাইফা হালুকা বাবু রবীন্দ্রনাথ! জন্মদিনে বেশি ত্যাক্তাব না আপনেরে, এমনিতেই বছর জুড়ে একগাদা আলোচক-গবেষক-কুম্ভীলকের খাই মিটাইতে যেয়ে আপনার তো ঘুমনিদ্রা হারাম হয়ে যায় দেখতে পাই। সেলেব্ হইলে যা হয় আর-কি। কিন্তু কবি হিশেবে সেলেব্ একটা লাইফ তো আপনে বেশ আর্লি ডেইজ্ থেকেই পেয়ে এসেছেন। সবসময় প্যানোস্ তথা স্পটলাইটের আলো চেয়েছেন, পেয়েছেনও, তরুণ বয়স থেকে সমবয়সী বিবেকানন্দের সঙ্গে একটা ধাক্কাধাক্কি ছিল এ-বাবতে। এইটা নানাভাবেই মৃদু অনুযোগমেশা ঠাট্টাচ্ছলে বেরিয়ে এসেছে গুরুদেবের কথাবার্তা-আড্ডা-আচরণে। জন্মসালগত দিক থেকে বছর-দুয়েকের বড় ছিলেন রবীন্দ্রনাথ, বিবেকের চেয়ে, সমবয়সী বলতে অতএব বাধা নাই। বিবেকানন্দের জন্মসাল ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দ, রবীন্দ্রনাথের ১৮৬১; রবীন্দ্রনাথের লাইফস্প্যান অনেক লম্বা, বিবেকের হ্রস্ব অতি। মিস্টার বিবেক মারা গেলেন চল্লিশ পুরাইবার আগেই, সিক্সটিথ্রিতে বর্ন এবং ডায়েড ঊনিশশো দুই। অন দি আদার হ্যান্ড ট্যাগৌর ডাবল চল্লিশ হাঁকিয়েছিলেন মহাসমারোহে এবং সৃজনমুখরতার সঙ্গে। গ্রেইট দুইজনেই, সিটি কোলকাতার আরিস্তোক্রাত ফ্যামিলিতে দুইজনেরই জন্ম ও ডেভেল্যপমেন্ট, কিন্তু রবি লাকি ছিলেন আয়ুর দিক থেকে। খ্যাতি বিবেকানন্দের হাতে এসেছিল রবির ঢের আগে। চ্যালা ছিলেন তিনি মশহুর রামকৃষ্ণের। কাজেই পরমহংসদেবের ওফাতের অব্যাবহিত পরেই ওস্তাদের পুরা সালতানাত হাতে এসে যায় বিবেকের। পরে অবশ্য দুটি পথ খানিকটা বাঁকিয়া যায়, একসময় দুজনার আলাদা খানকা স্থাপিত হয়, পৃথক মঠ ও পৃথক স্কুল অফ থট। আমরা ওই বিবাদে না-যাই। আমরা থাকি বিবেক-রবি দ্বৈরথে। রীতিমতো ঈর্ষাই করতেন আমাদের কবিসূর্য নরেন্দ্রনাথ দত্ত ওরফে বিবেকানন্দজির খ্যাতি। এইটা ঠাকুরের কাছের-দূরের অনেকেই ইঙ্গিতে-আকারে জানিয়েছেন আমাদিগেরে। একেবারে স্টার্টিং পিরিয়ডে রবি ছিলেন স্যুটেড-ব্যুটেড পাক্কা সাহেব। পরে দেখতে পান যে এতে তো ভবি ভোলানো যাবেনাকো, যতই তুমি ভালো গাও বা লেখো, ভবি ভুলাইতে গেলে কিন্তু অন্য ব্যবস্থা আয়োজন করা লাগবে। লাইনে হাঁটতে হবে বাপু, নইলে ভবি ভুলিবে না জ্যান্তকালে। যেই ভাবা সেই কাজ। ফলে শেরওয়ানি, পাগড়ি ইত্যাদি। ক্রমে একসময় সেল্ফ-ডিজাইনড আলখাল্লা, মালা, উপনিষদ, ধর্মদর্শন, ব্রাহ্মব্যস্ততা। সমস্তই বিবেকানুসরণ, সমস্তই বিবেকখ্যাতিঈর্ষাজাত। বিবেক যখন য়্যুরোপ-আম্রিকা জয় করে বেড়াচ্ছেন ধর্মপ্রেমবাণী প্রচারিয়া, রবি তখন ইয়ারবখশিদিগের মধ্যে খেদ প্রকাশিয়া ব্যথা প্রশমিতে চেষ্টা করছেন, এমন চিত্র অনেকের স্মৃতিচারণে-লেখায় এবং অন্য নানান উৎস হইতে আমরা জানতে পেরেছি। কিন্তু বলতে বাধো বাধো ঠেকলেও বলতে আমরা বাধ্য যে রবির দেবত্ব, গুরুদেবত্ব, খর্ব হয় এইভাবে। এবং আমরা তা চাই না। রবিকে দেবতা বৈ মানুষ ভাবলে আমাদের ব্যবসা ব্যাহত হইবেক। অতএব রুটিরোজগারের মামলা বিধায় এক্ষেত্রে ছাড় দিনু, খামোশ রইনু, চাপিয়া যাইনু। তবে এইটা — ঈর্ষা — মানবিক গুণ এক। যদি কেউ কারো কর্মগুণে ঈর্ষিত হয়ে নিজের কাজে অধিক ব্রতী হয়, সেইটা স্বাস্থ্যকর। কিন্তু অন্যের শ্রীবৃদ্ধি দেখে কাতর হইলে, অন্যের শানশওকাতখ্যাতিপ্রতিপত্তি হেরিয়া ঈর্ষাক্রান্ত হইলে ব্যাপারটা সুখের না। যা-ই-হোক, রবির ক্ষেত্রে এইটা ব্যাপার না। রবি আমাদের আগুনের গোলা। ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ ‘পোলা তো নয় যেন আগুনের গোলা’। আমাদের মনে পড়বে এইসবের অনেক পরের এক মায়াবী উন্মাদের মুখ। ঋত্বিক ঘটক নাম তার। বউকে বলছেন, — ঘরে একটা টাকাও নাই তাই বউ স্বামীকে গঞ্জনা করছেন, — সর্বাগ্রাসী অভাবে মূর্ছা না-যেয়ে আরও গনগনে কয়লার আগুন হয়ে সেই উন্মাদ ঘটিবাটি বেচেবুচে সিনেমা বানিয়ে চলেছেন, বউকে বলছেন, — সংসারে টাকা থাকবে না দুগ্গা, তুমি দেখে নিয়ো, কাজগুনো থেকে যাবে। … এই-যে ‘কাজগুনো’, রবি এইখানে ঢিলে দেন নাই একফোঁটা, বাঁচিয়া গিয়াছেন তাই। খালি যদি ঈর্ষাই করিয়া খালাস হইতেন দুনিয়া হইতে, বিবেকের ন্যায় খ্যাতি চাহিয়াই দিনাতিপাত করিতেন, তো আজকে তার জন্মদিনে আমি কি তারে পেল্লাই গতরের এহেন পুষ্পতোড়া পাঠাইতাম! অভাবের সংসার, তদুপরি ফুল তথা ফ্লাওয়ার্স ইনভেস্ট করার লাভজনক জায়গা তো আপনার-আমার আরও আছে। কাজেই, হ্যাপি বার্থডে টু য়্যু ডিয়ার রবি, হ্যাপি বার্থডে টু য়্যু …

পঁচিশে বৈশাখ দিচ্ছে ডাক সুরের ভ্রমণে একপাক

পঁচিশে বৈশাখ দিয়েছিল ডাক রবীন্দ্রনাথকে, ডাক দিয়া আনিয়া বসাইয়াছিল উনারে ধরিত্রী তার হৃদয়ের পাশে, এবং ক্রমে একদা বাবু রবি বনিয়াছিলেন বিশ্বের শায়ের। এবার আরেক পঁচিশে বৈশাখ দিতেছে ডাক আপনারে, মহাশয়, ডেকে এনে বসাইতে চাহিছে সে তার শ্রীহট্টমন্দিরে। মহাশয়, এ-বছর ঝমঝমে রেইনি সিজনে এই শ্রীহট্ট নন্দনবিতানে সপুত্র-সকন্যা-সস্ত্রী পরিব্রাজনের আজ্ঞা যেন হয়, যেন তৌফিক হয় রেইনি টি-গার্ডেনে একপাক ঘুরাণ্টি দিয়া যাইবার, নব বঙ্গবর্ষ প্রাক্কালে এহেন দোয়া করি। শ্রীহট্টভূমির বিবিধ গুণাগুণের মধ্যে একটা হইল এর কড়া-লিকার বারিপাত, মহাশয় নিশ্চয় সেই বিষয়ে অবগত। তবে যে-ব্যাপারটা বেশিরভাগ প্রোফেশন্যাল ট্যুরিস্ট জানেন না, এই জেলার গোপন ও অনালোচিত পর্যটনবিষয়, সেইটা হচ্ছে, রেইনি সিজনে যে-কোনো টি-গার্ডেনের ভেতরদেশে একটা ছাউনিটাইপ জায়গার আশ্রয়ে দাঁড়িয়ে বা বৃষ্টিছাঁট হইতে গা বাঁচিয়ে চেপেচুপে বসে সমুখের সমুদ্রজলরাশির ন্যায় ব্যাপ্ত সবুজের শরীরে বর্ষাধারাপাত দরিশন — কি বলিব, মহাশয়, ল্যাঙ্গুয়েজে প্রকাশিবার নয়, সাইলেন্টলি নিরখিয়া যাইবার শুধু। অথবা হাওরপারের কোনো ছাপড়া চা-বিস্কুটের বাদল-অন্ধকার দোকানঘুপচিতে অবস্থান গ্রহণপূর্বক সমুখস্থ নিধুয়া পাথার জুড়ে একটানা ঝাপসা ভুবনের ছবি, মহাশয়, নিষ্প্রাণ অক্ষরের পঁচিশ খণ্ডবিখণ্ড রবিরচনাবলির একটা প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাস যেন। রবিন এসেছিলেন একবার বটে এই-না হার্দ্য ভুবনডাঙায়, এই-না বাটে, বোট ভিড়াইয়াছিলেন সুরমাগাঙের ঘাটে, সুন্দরী শ্রীভূমি শ্রীহট্ট বলা ছাড়া আর-কিছু উল্লেখযোগ্য বলেছিলেন ইয়াদ হয় না, আরো দুইয়েকটা বিশেষণ প্রয়োগিয়াছিলেন যথা নির্বাসিতা প্রভৃতি, ইতিহাস কেবল নয় তেনার কবিতাও সেই কথা কয়। আন্দাজ করছি কাজেই সিলেটে আসিয়া বাইর হন নাই তিনি বিশেষ গেস্টহাউস হইতে দুই-পা আগুয়ান হইয়া, আশেকান-ভক্তকুল অনাথ করিয়া কোনো যোগগুরুই ইহা পারিতেন না অবশ্য। বহু দেশ ঘুরিয়াছেন কবিগুরু, দলিয়াছেন বহু নদ, দাবি তিনি করিতেই পারেন, আমরা আপত্তি তুলিব না তাহে, লেকিন শ্রীহট্ট ভ্রমিয়াছেন বলিবামাত্র জরুর বোগাস্ হাঁক পাড়ি’ উঠিবেক অন্তত এই শর্ম্মা, তাহা আপনার মারফতে ঠাকুর ও তার মহাকালিক খেশকুটুমদিগেরে হেথা জানাইয়া দিনু। মহাশয়, আপনিই বলুন, ট্যাগৌর শ্রীহট্ট সফর করিয়া যাইলেন, তথাচ হোথাকার বৃষ্টিঝিরুনি টিলা আর তৎপরিপার্শ্বস্থ জলের ঝোরাগুলো, জলছড়াগুলো, কবিতায়-চিঠিচাপাটিতে একটা লাইনেও অঙ্কিলেন না, এইটা আদৌ রবীন্দ্রনাথীয় কম্ম হইল, বলেন দিকি! কী বলিবাম আপনাকে, মহাশয়, হেথায় টিলাগুলো বর্ষাঝাপসা রাজদুলারির রূপে এমনতর প্রতিভাত হইতে থাকে যে এমনকি ইন্দিরা দেবীর রৌপ্য এলিগ্যান্সও উহাতে ট্যাপ খাইয়া যায়, কেবলমাত্র — হ্যাঁ, মহাশয় — কেবলমাত্র দুঃখিনী বৌঠান — প্রত্যন্ত দক্ষিণডিহি জিলার অত্যন্ত আটপৌরে সেই ছিপছিপে গেছো গোছের লক্ষীমন্ত মেয়েটি, বাপ যার বাজারসর্দার সেই নৃশংস লোমহর্ষা সাংস্কৃতিক ঠাকুরবাড়িটির — প্রমিত রবীন্দ্রপৈতৃক ভাষায় পাল্টায়ে-রাখা নাম যার কাদম্বরী দেবী — শ্যামশ্রী সেই চিরনতুন বৌঠানের শরীরী মেদুর আভার সনেই তুলনীয় হইতে পারে এই বৃষ্টিটিলাগুচ্ছের দেহের জৌলুস ও জেল্লা। আপনাকে তো বলা হয় নাই এখনো, মহাশয়, অনেককিছু বলিয়া যাইলেও অনেককিছু বলা আভি বাকি হ্যায়, যেমন বলা হয় নাই বৃষ্টিবিঘ্নিত দুপুরবেলার টিলাপাদদেশে একঝাঁক লুটকি ফলের টুকটুকে চেহারা কিৎনা হাসিন হয়ে ওঠে, কেমন করে গান করে এক দুর্গাটুনটুনি টিলার বিরিখে বিরিখে বৃষ্টিবিহারপূর্বক, বলা হয় নাই বিস্তর হাওর জুড়ে একলা ও জটলায় দাঁড়ায়ে-থাকা শ্যাওড়াগাছের শাওয়ার-ঝরঝরে এক্সপ্রেশন, বলা আভি বাকি হ্যায় জারুলের জলমগ্ন জন্মজন্মান্তর, বলি নাই এখনো কমলগঞ্জের সুবিস্তীর্ণ বেণুবন জুড়িয়া দিনভর-চৌপর রেইনি রিসাইট্যল, অথবা জাফলং যাইবার পন্থে মাইল মাইল রেইন ফরেস্ট, অথবা আপনি যদি সুনামগঞ্জ অভিমুখে যাত্রা করেন তো কয়েকটা ব্যাপার ঘটিতে দেখিবেন পথিমধ্যে — যথা আপনার রথের বাতায়নে এসে ঝাপট দিয়া যাইবে বৃষ্টিক্রিমমেশা হাওয়া, হাইওয়ে দিয়া যাইবার কালে দেখিবেন আপনার রথচক্র ছুঁয়ে ছুঁয়ে নেত্তরত ছলাৎছল জলের ঊর্মিশিশুকিশোরীরা, সারাটা যাত্রারাস্তা জুড়ে রথের চালায় মিউজিক কনফারেন্স অফ রেইনফল তো চাহিবামাত্তর উপরি পাওনা, আপনি জলের ঘ্রাণ পাইবেন, মহাশয়, এই ঘ্রাণ অন্যত্র কুত্রাপি পান নাই আপনি, কিন্তু বঙ্গের দক্ষিণ দিগন্তে একটা উপসাগরে যাইবার এক্সপেরিয়েন্স নিয়া হ্যাপি যারা, তাহাদের নিকটে এইসব যুক্তিতক্কোগপ্পো অবান্তর আলাপ অথবা পাগলের প্রলাপ বৈ বিশেষ ভিন্ন মনে হইবে না, মাগার আপনি জরুর জানিবেন, হাওরের জল অত্যন্ত অপার্থিবা পার্ফিয়্যুমড, সমুদ্রজলের যাহা নাই, সমুদ্রের জলে কোনো সৌরভ নাই জনাব, হাওরের জলে এহেন ঔদাস্যের অদ্ভুত সৌরভ রয়েছে যে গেহত্যাগী হইবারে একটা আদিম অব্যাখ্যেয় টান আপনি টের পাইবেন ভেতরে, সেক্ষেত্রে সাবধান রইবেন ও নিজেরে যথাসময়ে সামলাইয়া লইবেন। দুনিয়ার বহুবিধ বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন জলধর্ম সম্পর্কে যা যা আপনি জেনেছেন, এইখানে আসিয়া তাহা সবই রিভিয়্যু করিতে বাধ্য হইবেন, যথা জল বর্ণ ও গন্ধহীন যৌগ দ্রব্যবিশেষ বলিয়া আপনি যেমনটা জানিতেন এতাবধি, শ্রীহট্টের জলের ক্ষেত্রে সেই বিদ্যার্জন অতি অল্পই প্রযোজ্য। অবশ্যই সিলেটের হাওর ও বৃষ্টিজলের রয়েছে পৃথক বর্ণ ও গন্ধ। … ফলে সেই-যে ঠাকুরকথিত ‘অন্য কোথা অন্য কোনোখানে’’ — ব্যাপারটা আদতে হেথা, আলবৎ হেথা, আপনে একবার অত্র প্রেস্ক্রিপশন মোতাবেক ঘুরিয়া যাইলে হাতেনাতে ফল পাইবেন, বিফলে কিমৎ চুকাইয়া দিমু কথাটি রইল। তবে হেথা আসিয়া আপনি যদি পর্যটকলুণ্ঠিত মাধবকুণ্ড জিয়ারত করিতে ছোটেন, অথবা হামহাম ঝর্ণা বা হালে-ক্রেইজ-হইয়া-ওঠা রাতারগুলের সোয়াম্প ফরেস্ট তাওয়াফ করিবারে বেচইন হইয়া ওঠেন, ফলত যদি নিরাশ ও ভগ্নমনোরথ হইয়া বাংলা গাইড সিনেমার এই ভূঁইফোঁড় দেবানন্দটিরে না-হক গঞ্জনা দানে শক্তি নিয়োগ করেন, উহাতে আমার কোনো দায়দায়িত্ব নাহিকো। তথাস্তু। মহাশয়ের নববর্ষ নন্দিত হউক। মহাশয়ের বর্ষাকাল মন্দ্রিত হউক। মহাশয়ের পঁচিশে বৈশাখ পরিপূর্ণ সংস্কৃতিসুখাভিভূত হউক। আর ইয়াদ রাখিবেন বিলক্ষণ যে, এই কর্পোরেট জমানায় সকলকিছুরই রেপ্লিকা বা চার-পাঁচ-ততোধিক আউটলেট রহিয়াছে, কেবল এই শ্রীহট্টের কোথাও কোনো শাখা নাই।

দেখা দিক আরবার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ, হে নূতন

পঁচিশে বৈশাখ যায়, আর আমি রবীন্দ্রস্মরণে আবোলতাবোল দু-তিনখোঁচ লিখব না মার্ক জাকার্বার্গের এই বিচিত্রাধামে, ফেবুস্তম্ভ রচিব না মাধুরী ও প্রীতি মিশায়ে গুরুদেবসম্মানে — তা কী হয়! কত-না ইতলবিতল খেলোকথায় ভরিয়ে তুলছি এই ব্যক্তিগত মুখবইপৃষ্ঠাগুলো, তো অধিকন্তু ন দোষাবে নিশ্চয়! অবশ্য, রবীন্দ্রনাথ নিয়ে লিখবার কিছু বাকি আছে কি না, বা জানবার কি কি বাকি আছে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে — সেও এক ভাববার বিষয়। রবীন্দ্রনাথের কোন দিকটি নিয়ে অদ্যাবধি লেখা বা ভাবা হয় নাই, তা নিয়া রীতিমতো সমীক্ষা চালানো সম্ভব। গবেষণা চালাক গিয়া ঘাগু যত গবেষকের ছা, আমাদের ওসব পোষাবে না। আমরা আপাতত লিখি যে, রবীন্দ্রনাথ আমাদের দৈনন্দিনের সমস্ততেই রয়েছেন। বেশিরভাগ সময় অবচেতনেই আমরা রবীন্দ্রনাথের আশ্রয় নিই। আমরা বেশিরভাগ বাঙালিই টের পাই না যে কেমন করে দু-কথার ফোকরে রবিনঠাকুর উঁকি মারেন, ঢুকে পড়েন আমাদের সকল দুখের সকল সুখের মাঝে। বাঙলার প্রায় সমস্ত প্রহর-পাখি-ঋতু-রীতি নিয়া, বাঙালির তাবৎ তন্ত্র-মন্ত্র-চরিত্র-চর্যা-চারিত্র্য নিয়া, হাতখুলে লিখে গেছেন রবীন্দ্রনাথ। দুপুরে উদাস ও একাকী মূহূর্তে, উদাহরণ হিশেবে বলছি, একটা পাখি কাছের গাছে লাফালাফি করছে। গীতবিতান টানলে দেখা যাবে, নিখুঁতভাবে এই দৃশ্যটিই তার মর্ম ও শাঁস সমেত অঙ্কিত আছে তথাকার কোনো-না-কোনো গানে। অথবা মানুষের কোনো রোদন, কোনো অচিন ব্যথা, নাজুক কোনো মূহূর্তে ব্যক্তিক টানাপোড়েন — রবীন্দ্ররচনায় এর/এসবের কোনো-না-কোনো ফর্মে নিদান পাওয়া যায় কি না, পরীক্ষা করে দেখা যাক। পঁচিশে বৈশাখে পরীক্ষার আসনে বসানোর মতো রবীন্দ্রবৈরী নিষ্ঠুরতা আমার মতো পুতুপুতু দুর্বলচিত্ত দ্বারা হবার নয়। বেচারার জন্মদিন আজ, জন্মের প্রথম শুভক্ষণে বেচারাকে রেহাই দিই আমরা, আনন্দফুর্তি করি বরং।

তাঁর প্রসঙ্গ এলেই মনে পড়ে বৌঠানের মুখ। বড় বেদনার মতো  বেজে-ওঠা কাদম্বরী দেবী, আমাদের নতুন বৌঠান, আহা! আর মৃণালিনী দেবীকেও যে মনে পড়ে না, তা নয়। নিজের স্ত্রীকে রবীন্দ্রনাথ ভাই ছুটি  বলে সম্বোধন করতেন, চিঠিপত্রে, দেখেছি আমরা। দারুণ সম্বোধন! এবং তাৎপর্যপূর্ণ। পরে এই সম্বোধনের তাৎপর্য নিয়া আলাপ করা যাবে কখনো। পত্রিকায় দেখেছিলাম, বেশ-কিছুদিন আগে, রবীন্দ্রনাথের শ্বশুরালয় নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। দক্ষিণডিহিতে অবস্থিত সেই বাড়িটি অব্যবস্থাপনা আর অবহেলায় বেহাল হয়ে রয়েছে। এর সংস্কার ও সংরক্ষণ দরকার।

আমরা রবীন্দ্রনাথের এক্সপ্রেশন ব্যবহার করি না, আমি জানি, বরং উল্টোটি। রবীন্দ্রনাথই আমাদের এক্সপ্রেশন ব্যবহার করে লিখে গিয়েছেন সারাজীবন, বহুকাল আগে, প্রায় সত্তর-একশ বছর আগেই! রবীন্দ্রানুভব ও রবীন্দ্রাভিব্যক্তি এত সুস্থায়ী হতে পেরেছে কেন, কোন উপাদানের উপস্থিতিতে, গবেষকদের শরণাপন্ন হউন যদি জানতেই চান।

… …

COMMENTS

error: