ট্যাগোর তোমার কড়া আলোর অঞ্জলি

ট্যাগোর তোমার কড়া আলোর অঞ্জলি

কী প্রখর রইদের চেহারা! শ্রাবণ যায়, কিন্তু গুচ্ছমেঘ কই? দিন-চারেক আগে একটা হাল্কাপাৎলা আঙ্গিকের শ্রাবণী বৃষ্টিপাত হয়েছে অবশ্য, অর্কেস্ট্রেশন নাই বিশেষ, দুর্বল গলা আর গায়কীর সোলো পার্ফোর্ম্যান্স। সকালবেলা আলোর তজল্লা দেখে মনে হয় এইটা খাড়া দু-পহর, মনে হয় এইটা ভাদ্দুরে রোদ। অথচ রইদের প্রাখর্য অথবা অন্য যে-কোনো কারণেই হোক এই তীব্র অস্বস্তিকর উত্তাপের মধ্যে একটা ম্যাজিক দেখা যায় আকাশের পানে নয়ান তাক করলে। একদম শরতের আকাশ! মুখ ফস্কে শুভ শারদীয়া আশীষবাক্য এসেই যাচ্ছিল প্রায়! পেঁজা তুলোর মতো ঝকঝকা আর ডিটাচড ক্লাউড, ছেঁড়া ছেঁড়া, স্ক্যাটার্ড। এই মেঘ বন্ধ্যা, আঁটকুড়া, এর নাই বৃষ্টি প্রসবের সামর্থ্য। যদিও-বা থাকে তা এতই অল্প যে পেট ঢাকলে পিঠ ঢাকে না তাতে। এই নির্বৃষ্টি মেঘ দিয়া আমরার কিচ্ছুটি নাই করবার। ব্যক্তিগতভাবে আমার দাবি, ডিরেক্ট উইন্টার আসুক এইধারা আকাম্মা খণ্ডমেঘের ভণ্ডামি বাদ দিয়া।

মাসখানেক ধরে এই শ্রাবণকালীন আকাশের শারদীয় সুরত দেখে একটা ব্যাপার মনে হচ্ছিল থেকে থেকে। ব্যাপারটা কবিতার সঙ্গে সম্পর্কিত, দূরবর্তী-হলেও-সম্পর্কিত, বলা বাঞ্ছনীয় দূরসম্পর্কিত। একক নিঃসঙ্গ মেঘখণ্ড দেখে, প্রায় পাদটীকার ন্যায় ছেঁড়া ছেঁড়া বিবিক্ত মেঘ দেখে, নব্বই-দশকী কবি ও কবিতার কাণ্ডকারখানা মনে পড়ছিল। ওই সময়টায়, অনেকেরই স্মৃতি সায় দিতে পারে আমার সঙ্গে, ডেইলি নিউজপেপারের উইক্লি লিট্যার‌্যারি সাপ্লিমেন্টগুলোতে গুচ্ছকবিতা ছাপানোর একটা তামাশা আমাশয়ের ন্যায় স্প্রেড করছিল। গুচ্ছকবিতা ছাপানো নিয়া জওয়ান ও বুইড়া নির্বিশেষে কবিরা নানা পাতিরাজনৈতিক কেলেঙ্কারি সংঘটন করিয়া যাইছিলেন। সেইসব আবার হপ্তান্তে লিক্ করছিল সংবাদকাগজস্থ শুক্রবাসরীয় গল্পকবিতাসাহিত্যসাময়িকীর পত্রপ্রতিক্রিয়া বিভাগ মারফতে। এহেন বেহাল দশা দাঁড়িয়েছিল, অনেক কবি তখন গুচ্ছকবিতা ছাড়া খালি-খালি কবিতা লেখায় ইস্তফা দিয়ে সেরেছিলেন। অনেকে মুখেও বলতে শুরু করেন, গুচ্ছকবিতা না-হলে আমি কবিতা ছাপতে দেই না! আবার সিরিজ কবিতা নামে আরেক মাকালপনা আরম্ভ হয় লিটলম্যাগমাধ্যমে। কবিরা প্রায় স্ট্যাটাস সিম্বল হিশেবে পৃষ্ঠা-কে-পৃষ্ঠা দখল করে সিরিজ কবিতা ছাপতে থাকেন। এইসব হুজ্জোতের তোড়ে যে-দুইতিনজনের ছোটখাটো বেঁটেমতন কবিতা জায়গা পাইত সম্পাদকের বিরল সহৃদয়তায়, সেই কবি ও কবিতা বেচারাদিগেরে নিয়া হাসিঠাট্টা হইত বেদম। আকাশের দিকে তাকিয়ে গুচ্ছমেঘ না দেখে, সিরিজ মেঘ না দেখে, আমার তাই বিরল বিদঘুটে তাচ্ছিল্যের ভাব মনে উদয় হলো। করুণামায়ামাখা তাচ্ছিল্য। নব্বই-দশকী কবিদের গুচ্ছকবিতা ছাপাবার সৃজনশীল কাঙালপনা মনে পড়ল।

বাইশে শ্রাবণে এসে নির্বৃষ্টি স্কাই দেখে মনে পড়ছিল রবীন্দ্রনাথের মুখ। উনার মৃত্যুদিন নিয়ে একটা স্মৃতি অনেকেরই অটোবায়োগ্রাফিতে পেয়েছি। সত্যজিৎ রায় এইটা নিয়া লিখেছেন, কমলকুমার উল্লেখ করেছেন, অশোক মিত্তিরের ‘আপিলা চাপিলা’ বা সুনীলের ‘অর্ধেক জীবন’ একই স্মৃতি ধরে রেখেছে। সেইটা বাঙালির ভক্তিজাত অসভ্যতার স্মৃতি। ঘটনার বিবরণে প্রকাশ, রবীন্দ্রনাথের মরদেহ যখন অন্ত্যেষ্টিযাত্রায় কেওড়াতলায় নিয়া যাওয়া হচ্ছিল, ভক্তবৃন্দের হিংস্র রোদন ও অন্যান্য শোকচিহ্ন প্রদর্শনীর এক-পর্যায়ে কবির মরদেহ খাটিয়া থেকে ভূলুন্ঠিত হয়ে যায়। শ্মশ্রুমণ্ডিত কবির গণ্ড ও মস্তকের কেশ ধরেও টানাটানি হয় ‘যেতে নাহি দিব’ কায়দায়, যেতে যদি দিতেই হয় তাইলে একটাকিছু চুল হোক গুম্ফ হোক গুরুজির থাকার চিহ্ন সজোরে ছিনাইয়া রাখিয়া তারপরে যেতে দেয়া যাইতে পারে, এই স্মৃতি অনেকেই ঘৃণার সঙ্গে উল্লেখ করেছেন তাদের পরিণত বয়সের আত্মজীবনীতে। এহেন অসভ্যতা আরেকবার দেখলাম হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর অব্যবহিত পরে। এইখানে অসভ্যতাকারী মিডিয়া মাদারি নিয়া আরেকদিন আলাপ করা যাবে। উল্লেখ্য, হুমায়ূনের মৃত্যুও শ্রাবণেই।

মৃত্যুমাস হিশেবে একটা আলাদা আভিজাত্য বোধহয় শ্রাবণ বহন করে এই বাংলায়। অ্যাট-লিস্ট কাব্যি করে অনেকেরেই বলতে শোনা যায়, আহা, আমার মরণ যেন হয় আকুল শ্রাবণে! কেন? অঝোর ধারায় বৃষ্টি হবে, ইয়ারদোস্তরা খানিক মনখারাপ-মেঘগ্লুমি ইম্প্রেশন অবয়বে রেখে সেল্ফি খিঁচবে খাটিয়া ঘিরে, ফেসবুকে-ইন্সটায় সেই পিকগুলা আপ হবে দেদারসে, রেইনি কুলখানিদিনে খিচুড়ি-হিলশাফিশে বেদম সোয়াদ হবে, হ্যাপিনেসের বলক উঠবে খিচুড়িহাঁড়ির মস্ত মুখটায়।

কেবল রবি কিংবা হুমায়ূন নয়, শ্রাবণে ইন্তেকাল করেছেন বাংলার স্টলোয়ার্ট অনেকেই, শ্রাবণেই বিদায় নিয়েছেন আহমদ ছফা। আরও অনেকেই। জীবনাবসান হয়েছে, এই শ্রাবণে, শেখ মুজিবর রহমানের। শোকচিহ্ন-বহন-করা শ্রাবণ কাজেই বৃষ্টিবিপুল হবে এতে এমন আশ্চর্যের কিছু নাই। ভীষণ প্রাণস্ফূর্ত মুহূর্তনির্মাতা মানুষগুলোকে বুকে নিয়ে এই বৃষ্টিমাস শোকার্ত মর্সিয়া গাইবে এইটা ন্যাচার‍্যালই। শ্রাবণে মৃত্যুবরণ করা বাংলাদেশের বিখ্যাত ব্যক্তিদের তালিকা আদৌ হ্রস্ব নয়।


সিনামাটার নাম সকলেই জানেন। বাইশে শ্রাবণ। তবে নাম দেখে কেউ ঋতুপর্ণের ঊনিশে এপ্রিল ম্যুভিটার কথা ভাববেন না। ঋতুর ছবিটা আলাদা জাতের। সৃজিত মুখুজ্জে একের-পর-এক কম্যার্শিয়্যাল ভেঞ্চার উপহার দিচ্ছেন বেঙ্গলি ভোক্তাদেরে, গোটা-দুই হিন্দিও ব্লকবাস্টার হয়েছে এই বাঙালির হাত ধরে বহুদিন বিরতির বাদে, বাইশে শ্রাবণ গোড়ার দিককার সৃজিতসৃজন। ২০১১ সালে রিলিজড। সম্ভবত এরই সাফল্য ধরে এই কায়দার সাইকোসাস্পেন্সনির্ভর থ্রিলার বানানোর বেশ একটা বন্যার তোড়ে ভেসে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ। মন্দ না। আমাদের ফারুকীমার্কার চেয়ে বেটার কি না তা অবশ্য তর্কসাপেক্ষ। তবে এই ম্যুভিটা, বাইশে শ্রাবণ, না হয়েছে থ্রিলার না হয়েছে দুঃখবেদনার।

এক সাইকোপ্যাথ সিরিয়ালকিলারকে দেখা যায় সিনেমায় একের-পর-এক অ্যাসাসিনেশন ঘটিয়ে যেতে। সে আবার সম্ভবত কবি, কিংবা ব্যর্থ কবি, সমাজটমাজ বদলাতে চেয়েছিল ইত্যাদি। কিলিংগুলোর ক্লু হিশেবে সেই কিলার হাংরি জেনারেশনের কবিতা ব্যবহার করে দেখতে পাই। কিন্তু সব মিলিয়ে সিনেমাটা জবরজং রং ধরেছে শেষমেশ। না আর্ট না ফার্ট টাইপের জিনিশ। প্রশ্ন হচ্ছে, আল কাপোন, এই সিনামাখানার সঙ্গে নিখিলবঙ্গীয় মর্তবাসম্পন্ন বাইশে শ্রাবণের যোগ কোথায়? লিঙ্কেজ আছে একটা, অবশ্য, তা এ-ই যে এই কিলার একটানা ডজনখানেক কিলিংকাণ্ড ঘটায় আমাদের চোখের সামনে চেহারা আড়ালরহস্যে রেখে এবং হিন্দি কায়দার গোয়েন্দারা জাসুসিরিসার্চ করে বের করেন যে সেই খুনঘটনাগুলো ঘটছে বাংলার কোনো-না-কোনো কবির মৃত্যুদিনে। তেরো নম্বর অ্যাসাসিনটা কাজেই বিশ্বপোয়েট সূর্যনাথের ওফাতদিবসে হ্যাপেন হবে এতে ক্যালকাটা জাসুসদের পোক্ত পূর্বানুমান হয়। এবং পূর্বানুমান পাক্কা।

আচ্ছা, ব্যাপারটা হচ্ছে, ছায়াছবিতে ইম্যাজিনেশনের কারিকুরি থাকবে, ভেঞ্চার যদি হয় বাণিজ্যিক তবে মেলোড্রামাটাও জবরদস্ত হবে, এবং থাকবে যৎপরনাস্তি গিট্টু বা কাহিনির ট্যুয়িস্ট, সমস্তই ঠিক ছিল। তবে একটু কড়া পাকের হয়ে গেছে যাবতীয়। চড়কগাছ হয়েও চক্ষুদ্বয় রেহাই পায় নাই। রথের মেলায় যেমন চড়কপূজার ভোজবাজি, তেমনতর ভোজবাজিই হেরিয়া যাইতে হয় সিনামায় আগাগোড়া।

তা, আমার এইসবেই জমে অবশ্য, আমার অনভিজ্ঞ জিভে এই খিচুড়িও উপাদেয় লাগে। অ্যাট-লিস্ট কথা বলা যায় এইসবের ফার্স ও ফাঁকফোক নিয়া। যা-হোক, গৌতম ঘোষের অভিনয় দেখেছি এইখানে, এবং জেনেছি তিনি প্রায় থার্টি ইয়ার্স পরে অ্যাক্টিং দিয়া কামব্যাক করেছেন এই ম্যুভিতে। ব্যাক দ্যেন, থার্টি ইয়ার্স আর্লিয়ার, গৌতমজির অ্যাক্টিং দেখার সুযোগ হয় নাই। সিরিয়াল কিলারের সাইকো রোলটা গৌতম করেছেন সমীহ করার মতো। মনে হয়েছিল তখন, গৌতমজি ডিরেকশন ছেড়ে অভিনয়টা চালিয়ে গেলেই ভালো করতেন। যদিও বলতে নেই এইভাবে। আর অনুপম রায়ের লিরিক্স ও মিউজিক ডিরেকশন বাইশে শ্রাবণ ম্যুভিতে এবং এর পরের একনাগাড় কয়েকটা ম্যুভিতে দেখেছি আমরা। ভালো করেছেন। অনুপমের দিব্যরথ চলছে এখনো অবশ্য। টালিউডের প্লেব্যাকে বেশ নবতরঙ্গ এসেছে অনুপমের হাতবাহিত হয়ে। এই সিনেমায় অনুপম ছাড়াও অনিন্দ্য, রূপম, রূপঙ্কর, রাঘব, সপ্তর্ষি, শ্রেয়া গান করেছেন এবং শ্রুতিসুন্দর হয়েছে। গেল দশকের ইন্ডিয়ান বাংলা প্রাদেশিক সিনেমায় মিউজিক ও বিশেষভাবেই লিরিক্স উন্নত মোড়ের দিকে এগিয়েছে এইটা স্বীকার্য। স্বাধীন বাংলা এইখানে পেছায়ে আছে এবং আগানোর লক্ষণগুলোও অঙ্গুলিমেয় ও অধর্তব্য।

১০

রবিপ্রয়াণে এই মেমোরিয়্যাল নিবন্ধটা কাজী নজরুল ইসলামের একটা গান গায়া খতম দেয়া যাক। ইন্তেকালের খবর পেয়ে কে না লিখেছিলেন তখন? কল্লোলদলের সক্কলেই লিখেছেন নিবেদিত কবিতা, সাহিত্যিক পর্যালোচনাবাহী নিবন্ধপ্রবন্ধের তো ফ্লাড বইয়ে দিয়েছিলেন তখনকার কিসিম কিসিম সাহিত্যযশোপ্রার্থী কিংবা খ্যাতিমান নির্বিশেষে সকলেই, কাজী লিখেছিলেন একাধিক গান ও কবিতা, যেমন বাদ যান নাই জীবনানন্দও। শুধু কাজীগীতখানা গাইতে গাইতে এই স্মরণসভার সংহার করি এবার। গানটা টাচি, বিখ্যাতও, নিশ্চয় আমরা শুনেছি আগেও সকলে :
“ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত রবিরে জাগায়ো না জাগায়ো না, / সারাজীবন যে আলো দিলো ডেকে তার ঘুম ভাঙায়ো না।। / যে সহস্র করে রূপরস দিয়া / জননীর কোলে পড়িল ঢলিয়া / তাঁহারে শান্তিচন্দন দাও ক্রন্দনে রাঙায়ো না।। / যে তেজ শৌর্যশক্তি দিলেন, আপনারে করি ক্ষয় / তাই হাত পেতে নাও। / বিদেহ রবি ও ইন্দ্র মোদের নিত্য দেবেন জয় / কবিরে ঘুমাতে দাও। / অন্তরে হেরো হারানো রবির জ্যোতি / সেইখানে তারে নিত্য করো প্রণতি / আর কেঁদে তাঁরে কাঁদায়ো না।।”

১১

ট্যাগোর মরিয়া প্রুফ করেছেন তিনি মরেন নাই। কিন্তু উত্তরসূরিরা? ট্যাগোরবংশের অমরতালোভী নিত্য ঝগড়ুটে ফেসবুকসোসাইটির কবি-ক্রিটিক-মিউজিশিয়্যানরা? তারা কি বিছড়াইয়া পাইবেন কোনোকালে ট্যাগোরের রাস্তা?

১২

শ্রাবণে কি আর আশা আছে? ভাদ্রে? আশ্বিনে?

 

[এই নিবন্ধটি লিখেছেন জাহেদ আহমদ। রবিপ্রয়াণের দিনে এই স্মারক নিবন্ধটা গানপারের পক্ষ থেকে পাব্লিশ করা হলো। — গানপার]

… …

COMMENTS

error: