৮৫তম অস্কার ও আর্গো || ইমরান ফিরদাউস

৮৫তম অস্কার ও আর্গো || ইমরান ফিরদাউস

SHARE:

If we wanted applause, we would have joined the circus” — Argo

অস্কার মানেই পৃথিবীর তাবৎ ডাকসাইটে অভিনেতাদের হাসির কোণে ঝুলে-থাকা সংশয় আর সুন্দরী তিলোত্তমা অভিনেত্রীদের চোখ-ধাঁধানো গ্ল্যামারের সাথে সাইনবোর্ড মুচকি হাসির মেহফিল। অস্কার বলতে টিভিদর্শকরা বোঝেন দুই ঘণ্টার তারাঝলমলে একটি অনুষ্ঠানের চারঘণ্টাব্যাপী প্রদর্শন। অস্কার মানে রুদ্ধশ্বাস টেনশন; টেনশন — কে কোলে তুলবে এবারের ‘সেরা’ (সিনেমার) খেতাবটি। তবে আরবারের মতন এবার হলিউডের কোডাক থিয়েটারে উপচে পড়েনি চাপা উত্তেজনা, কারণ এক দশকের বেশি সময় ধরে নির্ধারিত কোডাক থিয়েটারের বদলে লস অ্যাঞ্জেলেসের নোকিয়া থিয়েটারে আয়োজন করা হয়েছিল অস্কার বৈতরণীর অনুষ্ঠানটি।

বরাবরের মতন এবারো তাই ঢাকা, মুম্বাইয়ের কাটিং চায়ের আড্ডা থেকে শুরু করে নিউইয়র্ক, প্যারিসের ক্যাফে তক কফির কাপে বা চায়ের পেয়ালায় চুমুকে চুমুকে তুমুল ঝড় উঠেছে অস্কারের সেরা ছবির মনোনয়ন ও অন্তিম রজনীতে কার ভাগ্যে শিঁকে ছিঁড়বে তা নিয়ে।

৮৫তম অস্কার — আগের সংস্করণগুলির তুলনায় কিছুটা ভিন্ন এই অর্থে যে এবারো পাঁচটির বদলে নয়টি সিনেমাকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। সেরা ছবির মনোনয়নতালিকায় এবার যেসব ছবির নাম বারবার এসেছিল সেগুলি হলো — অস্কারজয়ে অভ্যস্ত স্টিভেন স্পিলবার্গের লিংকন, নির্মাতার চেয়ে অভিনেতা হিসেবে সমাধিক পরিচিত বেন অ্যাফ্লেকের আর্গো, ‘ক্রাউচিং টাইগার হিডেন ড্রাগন’, ‘লাস্ট’, ‘কোশন’ দিয়ে দর্শক-সমালোচকেদের চক্ষু চড়কগাছে তোলা অ্যাং লি-র লাইফ পাই, ২০১০ সনের সেরা ছবি ও সেরা পরিচালকের খেতাবজয়ী ‘হার্টলকার’ নির্মাতা ক্যাথরিন বিগেলো-র জিরো ডার্ক থার্টি, আরো ছিল ২০১০-এ ‘দ্য ফাইটার’ খ্যাত ডেভিড ও’ রাসেলের কমেডি ঘরানার বিপ্রতীপ ভালোবাসার ছবি সিলভার লাইনিংস প্লেবুক

মনোনয়নের টালি ও অন্যান্য ওজনদার প্রতিযোগিতায় পুরস্কার অর্জনের নিক্তিতে লিঙ্কন, আর্গো, জিরো ডার্ক থার্টি — এই ত্রয়ের দাপটই দেখেছে এবারের অস্কার। আর এই ত্রয়ের ঘাড়ের উপর বিগবাজেট কিন্তু আন্ডারডগ হিসেবে নীরব অথচ পর্দাকাঁপানো নিশানা নিয়ে হাজির ছিল ‘লাইফ অফ পাই’। ভালোলাগার ছবি ‘লাইফ অফ পাই’ হলেও পুরস্কারের র‌্যাটরেসে বাজিটা ধরতেই হয়েছিল আর্গোর উপর। কেন? তার উত্তর অস্কার কর্তৃপক্ষ অলরেডি এলান করে দিয়েছেন। জানি আমার মুখের কথায় সিনেমার প্রকৃত সারস উড়ে যায় না তদুপরি দেখা যাক এই কথামালা আপনাকে সিনেমাটার (কতটা) নিকটাপন্ন করে তুলতে পারে।

গ্রিক পুরাণমতে অ্যাসনপুত্র ও মেডিয়ার স্বামীপ্রবর জ্যাসন এবং অ্যারগোনাউটস পান্ডবরা লোল্কস দ্বীপ থেকে সোনালি মেষের লোম উদ্ধার অভিযানে বের হয় যে জাহাজে করে তার নাম ছিল ‘আর্গো’। তবে এথায় জাহাজ নেই আছে উড়োজাহাজ। সিআইএকর্মকর্তা বেন অ্যাফ্লেক ও তার দল কিভাবে বন্দীদের উদ্ধার করে আনে, মোটা দাগে সেই গল্পই জমাট বেঁধেছে এই ম্যুভিতে। ‘আর্গো’ হলিউডের প্রচলিত স্টোরিটেলিঙের ইতিহাসে সামান্য হলেও সহজে পরিদৃষ্ট অভিনব মাত্রা যোগ করেছে। সেটা দর্শকদের মুহুর্মুহু তাক-লাগানো থেকে শুরু করে একটি নিখুঁত ওয়েলমেড প্রোডাকশনের বিবেচনা, যে-কোনো অর্থেই প্রযোজ্য। এবং বিবেচনাধীন শর্তগুলো যে আসমান থেকে প্রাপ্ত নয় অস্কারের মঞ্চে তা হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় জানিয়ে দেন মার্কিন ফার্স্টলেডি মিশেল ওবামা। এইবার প্রথম কোনো মার্কিন ফার্স্টলেডি অস্কার ঘোষণায় অংশ নিলেন। কিন্তু কেন অংশ নিলেন সেই প্রসঙ্গের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত না হয়েও বিধান রিবেরুকে ক্যোউট করে বলি, “আরগো সম্পর্কে এতকিছু ভেঙে বলার কিছু নেই। আজকালকার সচেতন মানুষ জানেন, তেহরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি করছে এমন অভিযোগ তুলে একের পর এক অর্থনৈতিক অবরোধ চাপানো হচ্ছে ইরানের ঘাড়ে। অর্থনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক চাপ দুইই বাড়ানো হচ্ছে, এবার সাংস্কৃতিক চাপ, হলিউডি ছবি দিয়ে। এমন চাপ অবশ্য বন্ড ম্যুভি দিয়ে প্রায়ই তৈরি করতে দেখা যায় হলিউডকে।”

১৯৭৯-’৮০ সনে ইরানে কানাডা দূতাবাসের বন্দীদের দুর্দশা নিয়ে নির্মিত আর্গো  ২০১২ সনে মুক্তি পাওয়ার পর সবচেয়ে বেশি আলোচিত-সমালোচিত হয়েছে। বিগত বছরগুলির সেরা সিনেমা বিভাগে অস্কার জয়ের তালিকা একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে সিনেমাশৈলীর দিক থেকে অনেক উচ্চমানের ছবিকে পিছিয়ে পড়তে হয়েছে/হচ্ছে গড়পড়তা গল্পের সিনেমার কাছে এবং সেই ছবিগুলি অবশ্যই মার্কিন সরকারের প্রোপাগান্ডা ধারণ করে থাকে যেমন ‘ক্র্যাশ’, ‘সোশ্যাল নেটওয়ার্ক’, ‘কিংস স্পিচ’ বা ‘হার্টলকার। সেই অবস্থান থেকে আর্গোকেও আমরা দেখতে পাই রাষ্ট্রযন্ত্রের অন্যতম সহযোগী প্রতিষ্ঠান সিআইএর তথাকথিত রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনার গপ্পোটি কইতে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, লিঙ্কন  বা জিরো ডার্ক থার্টিও রাষ্ট্রকে সেবা করেছে তাদের ছবি দিয়ে তাহলে কেন আর্গোকে বিবেচনায় এগিয়ে রাখতে হবে। এগিয়ে রাখতে হবে এই কারণে — এটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত হলেও পর্দায় তা দর্শকদের দিয়েছে টানটান এস্পিওনাজ ফিল্মের মাদকতা। পাশাপাশি বেন অ্যাফ্লেকের দুর্দান্ত অভিনয় সমালোচকদের চোখকে করেছে ছানাবড়া। আর্গো  শুধুই বেন অ্যাফ্লেক নির্ভর সিনেমা নয় বরং সিল্ভার স্ট্যালোনের ‘রকি’ সিনেমার মতন তুখোড় সব অভিনেতাদের অনসাম্বল আয়োজন যা পরিচালনাও করেছেন একজন অভিনেতা। আর্গোর এই দিকটি স্টুডিয়োনির্ভর চলচ্চিত্রবাণিজ্যে আবারো প্রমাণ করে অভিনেতাই শেষকথা। হলিউডে প্রচলিত আছে — সাধারণত যে-ছবি স্ক্রিন গিল্ড অ্যাওয়ার্ড, প্রোডিওসারস গিল্ড অ্যাওয়ার্ড জয় করে সেই ছবি যে অস্কারে জিতবে তা সময়ের ব্যাপার মাত্র।

২০০৭ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত পাঁচবার অস্কার মনোয়ন পাওয়া ফরাসি মিউজিক কম্পোজার আলেক্সান্দার দেস্পাটের আবহসংগীতের মূর্ছনা আর্গোর চিত্রকল্পমেলায় যুক্ত করেছে অদ্ভুত পেলব সান্দ্রতা। সংগীত বিভাগে তাই ‘লাইফ অফ পাই’, ‘লিঙ্কন’, ‘স্কাইফল’-এর মতো ছবিগুলির সংগীত-আয়োজক মিশেল ডানা, জন উইলিয়ামস, থমাস নিউম্যানদের কপালে অটোম্যাটিক ভাঁজ পড়েছিল সেটি বলাই বাহুল্য। সংগীতের পাশাপাশি সম্পাদনায় উইলিয়াম গোল্ডেনবার্গ অমায়িক কেরদানি দেখিয়েছেন। এবং সেমতে অস্কার মনোনয়ন তালিকায় নামও উঠেছিল তার এবং জয়মাল্যটিও পরেছেন গলেতে। প্লটের জায়গা থেকে আর্গোর মতন একটি বুনো ক্যানভাসের অপসরণশীল টোনকে একসুতায় গাঁথতে পারাটা আদতেই মুনশিয়ানার মামলা।

বেন অ্যাফ্লেক পরিচালিত ‘আর্গো’ পঁচাশিতম অস্কারে মনোনয়ন পেয়েছিল সেরা সিনেমা, সেরা অ্যাডাপ্টেড স্ক্রিনপ্লে, সেরা সাপোর্টিং চরিত্র সহ সাতটি শাখায় ও পুরস্কৃত হয়েছিল তিনটি শাখায়। অভিনেতা হিসেবে জনসমাদৃত বেন অ্যাফ্লেকের পরিচালনায় এটি তৃতীয় ছবি। বাংলায় একটি লোককথা আছে ‘দানে দানে তিন দান’ — হয়তো-বা এ-কারণেই সিনেমাগুরুরা ভাবছিলেন এবার বেন অ্যাফ্লেকের সিনেমা উৎরে যাবে প্রতিযোগিতায়। যদিও নির্মাতা খানিকটা মুষড়ে পড়েছিলেন সেরা ছবির পাশাপাশি সেরা পরিচালকের মনোয়ন না পাওয়ায়। সমালোচকরা বলাবলি করছিলেন ‘আর্গো’ যদি সেরা ছবির তকমা পেয়েও যায় তারপরেও এটি হবে একটি দৈব ঘটনা। কারণ, অস্কারের পঁচাশি বছরের ইতিহাসে এমন ঘটনা ঘটেছে মাত্র তিনবার, যার মধ্যে শেষবার এমনটি ঘটেছিল ১৯৮৯ সনে ‘ড্রাইভিং মিজ ডেইজি’-র ক্ষেত্রে। তবে ঘটনা এমনটা ঘটলেও, আর্গো  কোনো দৈবগুণে অস্কার করায়ত্ত করে নাই তা এক আর এক দুইয়ের মতোই সত্য।

বাই দ্য ওয়ে, প্রোডাকশন ডিজাইনের দিক থেকেও এই সিনেমা হলিউডের প্রচলিত কেতা থেকে বের হয়ে নতুন মাত্রা হাজির করেছে। সচরাচর বড় স্টুডিয়োর প্রোডাকশনে আর্গোর মতো টপিককে বেশ ক্লিশেভাবে ট্রিট করা হয় … সেখানে ‘প্রোডিউসার’ যখন জর্জ ক্লুনি তখন তা ‘আমেরিকা মহান বাকি সব জাহান্নাম’ এই ভ্রান্ত ধারণার বাইরে এসে মানবিকতাবোধের নতুন প্রেক্ষিতের ধারণা দেয় (পশ্চিমা জিম্মিদের পানে)। প্রযোজক জর্জ ক্লুনি ভালোবাসেন স্টুডিয়োকে বাধ্য করতে সিনেমার চাহিদা অনুযায়ী আচরোণ করতে — তার জবানিতে শোনা যাক, “I have a real interest in pushing some of the limits of things that studios don’t want to make.” তাই, প্রোডাকশনভ্যালুর হিসেবেও আর্গোকে একহাত এগিয়ে রাখতে হয় অন্যান্য সিনেমার তুলনায়।

এতদ পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে ধরেই নিয়েছিলাম আর্গো  (হয়তো-বা) অস্কারের অন্তিম রজনীতে জয়মালা গলায় তুলে নিতে পারবে। অবধাতিরভাবে আর্গোকে লড়াই করতে হয়েছে ‘লাইফ অফ পাই’, ‘সিল্ভার লাইনিংস প্লেবুক’-এর মতন ছবিগুলির সাথে। যদিও বাজারবিশেষজ্ঞরা সবসময়ের মতো এবারো বলেছেন অস্কার সাধারণত সেই ঘরে যায় যে-ঘর থেকে হলিউড সবার উপর আম্রিকা সত্য শোকেসে সাজানোর মতো সামগ্রী সংগ্রহ করে উঠতে পারে। আর এই বিবেচনায় আর্গো  ছিল সমালোচক-দর্শকদের শ্যেন দৃষ্টিতে।

পাঠক/পাঠিকা, ছায়াচিত্রটা যদি আপনাকে আমোদিত করতে পারে তবে বাজারবিশেষজ্ঞগণের সাথে এবার আপনিও হাসুন।

দোহাই
১. বিধান রিবেরু, অস্কার (২০১৩) তুমি কার: লিঙ্কন লাদেন না ওবামার
২. আর্গো (২০১২) ছায়াচিত্র
৩. ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব

[প্রথম প্রকাশ : লুক, মার্চ ২০১২; দ্বিতীয় প্রকাশ : লাল জীপের ডায়েরী, মে ২০১৩]

… …

COMMENTS

error: