রবীন্দ্রনাথের দুটি গান : ব্যক্তিগত পাঠ || সুমনকুমার দাশ

রবীন্দ্রনাথের দুটি গান : ব্যক্তিগত পাঠ || সুমনকুমার দাশ

কে বলে গো সেই প্রভাতে নেই আমি
যখন        পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে,
আমি        বাইব না মোর খেয়াতরী এই ঘাটে,
চুকিয়ে দেবো বেচাকেনা,
মিটিয়ে দেবো গো,   মিটিয়ে দেবো লেনাদেনা,
বন্ধ হবে আনাগোনা এই হাটে —
তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে,
তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাইবা আমায় ডাকলে।

যখন        জমবে ধুলা তানপুরাটার তারগুলায়,
কাঁটালতা উঠবে ঘরের দ্বারগুলায়,                      আহা,
ফুলের বাগান ঘন ঘাসের     পরবে সজ্জা বনবাসের,
শ্যাওলা এসে ঘিরবে দিঘির ধারগুলায় —
তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে,
তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাইবা আমায় ডাকলে।

তখন       এমনি করেই বাজবে বাঁশি এই নাটে,
কাটবে দিন কাটবে,
কাটবে গো দিন আজও যেমন দিন কাটে,          আহা,
ঘাটে ঘাটে খেয়ার তরী     এমনি সে দিন উঠবে ভরি—
চরবে গোরু খেলবে রাখাল ওই মাঠে।
তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে,
তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাইবা আমায় ডাকলে।

তখন       কে বলে গো সেই প্রভাতে নেই আমি।
সকল খেলায় করবে খেলা এই আমি—               আহা,
নতুন নামে ডাকবে মোরে,        বাঁধবে নতুন বাহু-ডোরে,
আসব যাব চিরদিনের সেই আমি।
তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে,
তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাইবা আমায় ডাকলে।।

আমার স্ত্রী কখনোই এ রবীন্দ্রসংগীতটি আমাকে শুনতে দিতে চান না। যখনই এ গানটি বাজাই কিংবা বাজানোর চেষ্টা করি, তখনই তার আপত্তি শুরু হয়। দ্রুত গানটি বন্ধ করার অনুরোধ জানান। বন্ধ করতে একটু দেরি হলে কখনও-সখনও ঝগড়াও শুরু করে দেন। নিশ্চয়ই তার কাছে এ গান বিষাদমাখা ভাব নিয়ে হাজির হয়। নতুবা তার তো এমনটি করার কথা নয়। টের পাই কিংবা বলা চলে অনুভব করি, এ গান বাজার সঙ্গে সঙ্গে স্ত্রীর মনে সম্ভবত স্বামীকে হারানোর ভয় জেগে ওঠে! গানটি যখনই আমি বাজাতে শুরু করি, তখন সম্ভবত তিনি সেটিকে নিজের অনুভূতির সঙ্গে না-মিলিয়ে স্বামীর অনুভূতির সঙ্গে একাকার করে দেন! আর তাই তো, এ গান যেন না-বাজাই, তা নিয়ে স্ত্রীর যত আপত্তি শুরু হয়। তবে আমাদের পরিচয়/বিয়ের আগে তাহলে কী তিনি এ গান শুনতেন না! রবীন্দ্রসংগীত যেহেতু তার প্রিয়, মাঝেমধ্যে এক-আধটু গেয়েও থাকেন, তাই গানটি তার না-শোনার বা না-গাওয়ার তো কথা নয়। যদি তিনি গাইতেন বা শুনতেন, তাহলে তখন তার অনুভূতি কেমন হতো? নাকি কেউ এ গান বাজালে এখনকার মতোই তিনি ওজরআপত্তি তুলতেন? এ প্রশ্নটা বিয়ের বেশ কয়েক বছর চলে যাওয়ার পরও তাকে করা হয়ে ওঠেনি। তবে অনুমান করতে বিন্দুমাত্রও অসুবিধা হয় না যে — মূলত গানটি বাজার সঙ্গে সঙ্গে তার মধ্যে স্বামীকে হারানোর একটা ভয় হৃদয়াকাশে উঁকিঝুঁকি দেয়।

স্ত্রীর মনে কী আবেগের জন্ম হয়, তা অনুমান করা আমার পক্ষে স্বাভাবিকভাবেই সম্ভব নয়। তবে যৎসামান্য যা অনুমান করি, তার সঙ্গে মেলানোর উদ্দেশ্য নিয়ে এ গদ্য লেখার প্রাক্কালে স্ত্রীর কাছে যখন প্রশ্ন রাখি, তখন তার উত্তরে এক বিষাদগ্রস্ততা সত্যি সত্যি আমার মধ্যে ভর করে। স্ত্রী দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রশ্নের জবাবে বলেন — ‘আপনজন হারানোর বেদনা এখনও আপনি সে-অর্থে বুঝে উঠতে পারেননি। ছোটোবেলায় আমি মাকে হারিয়েছি, বড় হয়ে ঠাকুরমার মৃত্যুও আমার চোখের সামনে হয়েছে। তাই এ গান বাজলেই আমার মনোজগতে প্রচণ্ড ধাক্কা দেয়। সে-ধাক্কা সহ্য করতে বড়ই কষ্ট হয়!’

আমি স্ত্রীর জবাব পেয়ে নিরুত্তর থাকি। কথা আর বাড়াই না। ভাবি — একই গান, অথচ তা ঘিরে প্রত্যেকের আলাদা গল্প, আলাদা অনুভূতি! আবার সময়ে-সময়ে গান নিয়ে নিজস্ব অনুভূতিও তো পালটে যায়। এ গানটি ঘিরেও তো আমার একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে যখন জন্ম-এলাকা শাল্লা ছেড়ে শহর সিলেটে পাকাপোক্তভাবে চলে আসি, তখন এ গানটির চরণগুলো খুব কাঁদাত। মনে হতো, হয়তো একই রকম আবেগের মুখোমুখি হয়ে গানটি লিখেছিলেন কবিগুরু!

শাল্লা ছেড়ে আসার পর আমার প্রায়ই মনে হতো, সেখানকার কেউ বোধহয় আর আমার কথা ভাবছে না! হয়তো আমার কথা ধীরে ধীরে ভুলে যাবে দাঁড়াইন নদ, মাহুতির বিল, ঘুঙ্গিয়ারগাঁও বাজার, শাহীদ আলী স্কুলের মাঠ আর প্রিয় বন্ধু-স্বজনেরা। বহুকাল এ বিষয়টি আমাকে পোড়াত খুব। ভাবতেই খারাপ লাগত — শাল্লার সবাই একসময় ভুলে যাবে আমাকে, কেউ আর মনে রাখবে না! তখন একদলা কষ্ট যেন বমি হয়ে বেরিয়ে আসতে চাইত। মানুষজন মন্দ ভাবতে পারেন ভেবেই বহু কষ্টে কান্না লুকাতাম। তখন সদ্যকেনা আটশ টাকার একটি টেপরেকর্ডার হয়ে উঠত আমার সঙ্গী, বাজাতাম এই গানটি। ঘুরে-ঘুরে বারবার সেই একই গান শুনতাম। একবার, দুবার, তিনবার, অনেকবার। অথচ তৃষ্ণা যেন মিটতই না!

খুব ছোটবেলায় যখন এ গান শুনি, তখন বয়স বারো কি চোদ্দো হবে। দেবেন্দ্র চন্দ্র দাশের কণ্ঠে প্রথম শুনেছি এ গান। তিনি ছিলেন আমার বড়বোনের গানের ওস্তাদ। এরপর যখন সিলেটে আসি, কলেজে ভর্তি হই, তখন পরিচয় ঘটে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় আর সুচিত্রা মিত্রের কণ্ঠের সঙ্গে। মনখারাপ হলে কিংবা বাড়ির কথা মনে পড়লে উমেশচন্দ্র-নির্মলাবালা ছাত্রাবাসের কড়া নিয়মকানুনের ফাঁকে টেপরেকর্ডারে এঁদের কণ্ঠে এ গানটি চুপিসারে শুনতাম। চুপিসারে গান শোনার বিষয়টি একসময় ছাত্রাবাসের পরিচালিকা দিদিমার (প্রয়াত সুহাসিনী দাস, ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতাসংগ্রামী) কানেও পৌঁছয়। এরপর একদিন তিনি ডেকে নেন তাঁর রুমে। ভয়ে অস্থির! কী জানি কী হয়। আমাকে অবাক করে দিয়ে দিদিমা জানালেন, আজেবাজে গান ছাত্রাবাসে বাজানো চলবে না। তবে অবসর সময়ে কেবল রবীন্দ্র-নজরুলের গান শোনা যাবে। এরপর তিনি বলেন, এ গানটি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও গেয়েছেন। তাঁর কণ্ঠের গানটিও শোনা যেতে পারে।

দিদিমার পরামর্শের পর বহুদিন রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠে রেকর্ডিং-করা এ গানটি শোনার চেষ্টা করে ব্যর্থ হই। কোথাও সে-গানের রেকর্ডিং খুঁজে পাইনি। অবশ্য দীর্ঘদিন পর যখন রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠের রেকর্ডিং শুনি, তখন গানটি যেন নতুনভাবে আমার কাছে হাজির হয়। কী আবেগ নিয়েই-না গানটি তিনি গেয়েছিলেন! পরে, সেই অডিও-ক্যাসেটযুগের অভিজ্ঞতা পেরিয়ে যখন একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকের মাঝামাঝি পৌঁছি, তখনই মূলত আরও শিল্পীর কণ্ঠে এ গানটি শোনার সুযোগ হয়েছে। একেকজনের কণ্ঠে গানটি একেক রকম আবেগ নিয়ে হাজির হয়।

শিল্পী শান্তিদেব ঘোষ, শ্রীমতী এমএস শুভলক্ষ্মী, কাদেরী কিবরিয়া, সৈয়দ আব্দুল হাদী, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, বাবুল সুপ্রিয়, জয়তী চক্রবর্তী, লোপামুদ্রা মিত্র, দেবাবৃত চট্টোপাধ্যায়, শিবাজি চট্টোপাধ্যায়, চিত্রলেখা চৌধুরী, শ্রাবণী সেন — অনেকের কণ্ঠেই এ গানটি শুনেছি। খ্যাত-অখ্যাত আর অনতিতরুণ/যশপ্রার্থী কত শিল্পীর কণ্ঠেই তো গানটি শুনলাম। এর মধ্যে বিশেষ করে মনে পড়ে, কুষ্টিয়ার শিলাইদহে অবস্থিত কুঠিবাড়িতে শোনা এক বাউলের কণ্ঠের গান। তাঁর নাম আর মনে নেই। কেবল মনে আছে — ভুল উচ্চারণ, ভুল পঙক্তি বলা আর প্রচলিত সুরের বাইরে গিয়ে গাওয়া তাঁর গানের সুর। এত ভুলের মধ্যেও কত সারল্য ছিল, কত দরদ ছিল ওই বাউলের কণ্ঠে! কিন্তু এখন এ গানটির প্রসঙ্গ এলেই আমার সবসময় কানে বাজে — স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কণ্ঠই। কী বিষাদ গ্রাস করে রেখেছে গানটিকে! আহা, শুনলেই যেন শূন্যতা ভর করে।

কোনো-এক নিরালা রাতে যখন ভালো লাগে না কিছুই, তখন প্রায়ই এ দুঃখের গানটি বাজাই। সুরহীন আমি সুর মেলাই তাতে। ফিরে ফিরে যাই শৈশবে, ফেলে আসা পথে। কত মানুষ এল-গেল, নিয়মের পরম্পরায় জীবন-সংসার ছেড়ে যেতে হবে আমাকেও। নিশ্চয়ই পুরোপুরি বিস্মৃত হব একসময়, নিশ্চিহ্ন হবে আমার যাবতীয় স্মৃতি আর অস্তিত্ব। এসব জেনেও খুব করে ভাবি — সাদা মার্বেল পাথরের মধ্যে কালো হরফে বড় বড় অক্ষরে লেখা থাকুক আমার এপিটাফ, ‘কে বলে গো সেই প্রভাতে নেই আমি’।

মাঝে মাঝে তব দেখা পাই
মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাই না।
কেন মেঘ আসে হৃদয়-আকাশে, তোমারে দেখিতে দেয় না।
(মোহমেঘে তোমারে দেখিতে দেয় না।
অন্ধ করে রাখে,         তোমারে দেখিতে দেয় না।)
ক্ষণিক আলোকে আঁখির পলকে তোমায় যবে পাই দেখিতে
ওহে   ‘হারাই হারাই’ সদা হয় ভয়, হারাইয়া ফেলি চকিতে।
(আশ না মিটিতে হারাইয়া — পলক না পড়িতে হারাইয়া —
হৃদয় না জুড়াতে হারাইয়া    ফেলি চকিতে।)
কী করিলে বলো পাইব তোমারে, রাখিব আঁখিতে আঁখিতে —
ওহে   এত প্রেম আমি কোথা পাবো, নাথ, তোমারে হৃদয়ে রাখিতে।
(আমার সাধ্য কিবা তোমারে —
দয়া না করিলে কে পারে —
তুমি আপনি না এলে কে পারে         হৃদয়ে রাখিতে।)
আর-কারো পানে চাহিব না আর, করিব হে আমি প্রাণপণ —
ওহে   তুমি যদি বলো এখনি করিব বিষয়-বাসনা বিসর্জন।
(দিব শ্রীচরণে বিষয় — দিব অকাতরে বিষয় —
দিব তোমার লাগি বিষয়-বাসনা বিসর্জন।)

কবে প্রথম শুনেছিলাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা এ গান? মনে পড়ে না। তবে কলেজে ভর্তি হওয়ার পর গুনগুন করে একসময় এ গানটি বেসুরো গলায় গাইবার প্রচেষ্টা করতাম। সময়ে-অসময়ে। এখন, যখন কাজের ফাঁকে কিংবা মনের খোরাক জোগাতে গান শুনি, তখন প্রায়সময় এ গানটিই বাজাই। একেক সময় একেক শিল্পীর কণ্ঠে গীত গানটি শুনি। বড় অদ্ভুত আর বিস্ময় নিয়ে প্রতিবারই গানটি আমার কাছে হাজির হয়। কখনও আখরযুক্ত কীর্তন-সুর আবার কখনও আখরহীন কীর্তনের সুর। দুটো সুরই ভীষণভাবে টানে। তবে দু-রকম অনুভূতি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাহিত্যপর্বের সূচনাতেই কীর্তনাঙ্গিকের গান নিবিড়ভাবে পাঠ করেন। বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাসদের বৈষ্ণব পদাবলির সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল ভালোই। সম্ভবত তাই এসব পদাবলিতে অনুপ্রাণিত হয়েই তিনি কীর্তন পর্যায়ের গান রচনায় উৎসাহিত হয়েছিলেন। তবে কীর্তন সম্পর্কে সরাসরি রবীন্দ্রনাথের বক্তব্যও রয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘কীর্তন সংগীত আমি অনেককাল থেকেই ভালোবাসি। ওর মধ্যে ভাবপ্রকাশের যে নিবিড় ও গভীর নাট্যসংগীত আছে সে আর কোনো সংগীতে এমন সহজ ভাবে আছে বলে আমি জানি নে। সাহিত্যের ভূমিতে ওর উৎপত্তি, তার মধ্যেই ওর শিকড়, কিন্তু ও শাখায় প্রশাখায় ফলে ফুলে পল্লবে পল্লবে সংগীতের আকাশ স্বকীয় মহিমায় অধিকার করেছে। কীর্তন সংগীতে বাঙালির এই অনন্যতন্ত্র প্রতিভায় আমি গৌরব অনুভব করি।’

যে ‘কীর্তন সংগীত’ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ‘গৌরব অনুভব’ করতেন, সে-রীতিতে গান তিনি সাহিত্যপর্বের সূচনাতেই রচনা করেছিলেন। ১৮৮৫ সালে রবীন্দ্রনাথের বয়স যখন মাত্র ২৪ বছর, তখনই তিনি লিখেছিলেন ‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই’ গানটি। মাঘ মাসে পারিবারিক এক অনুষ্ঠানে কীর্তন রীতিতে তরুণ রবীন্দ্রনাথ এ গানটি গেয়েছিলেন। তবে আনুষ্ঠানিক রীতির এ গান এখন তরুণ প্রজন্মের মুখে মুখে প্রেমের গান হিসেবেই বেশি ঘুরেফিরে। বুঝে কিংবা না-বুঝে উভয়ভাবেই শ্রোতা/শিল্পীরা এ গানের এমন নবরূপায়ণ ঘটাচ্ছেন। অবশ্য ব্রহ্মসংগীতের রূপকে এটিকে প্রেমের গান ভেবে নিতেও খুব একটা আপত্তি থাকার কথাও নয়। একেকজনের কাছে গানটি একেক বার্তা নিয়ে যাচ্ছে, এটাই তো বড় আশ্চর্যজনক বিস্ময়!

গানটি নিয়ে আমার কাছে বড় বিস্ময় ছিল, ভারতের শিল্পী রাশিদ খানের গায়নরীতি। ফেসবুক কিংবা ইউটিউবে সম্ভবত একবার, কেবল একবার এ গানটি শুনেছিলাম। পরে, অনেক ঘাঁটাঘাঁটি করেও তাঁর এই গায়নরীতি আর খুঁজে পাইনি। তিনি গানটি টপ্পার সুরে গেয়েছিলেন। উচ্চাঙ্গসংগীতের ব্যতিক্রমী ভঙ্গিতে গাওয়া তাঁর এই গান এখনও কানে বাজে! তবে এরও অনেক আগে যাঁর কণ্ঠে এ গানটি শুনি, এখনও বারবার যেটি শুনি, তা হলো, শিল্পী গীতা ঘটকের কণ্ঠ। ১৯৭৫ সালে রেকর্ডিংকৃত তাঁর এই কণ্ঠ এখনও কত পেলবতা নিয়ে হাজির হয় আমাদের কাছে। তবে কোনওভাবেই অবশ্য সুচিত্রা মিত্রের কণ্ঠসুধাও ভুলে যাওয়া যাবে না। সুবিনয় রায় কীর্তন সুরের বাইরে গিয়ে যে ব্যতিক্রমী সুরে গানটি গেয়েছিলেন, তাঁর প্রসঙ্গও না-বলি কীভাবে? কিংবা বাঁশি, হারমোনিয়াম, মন্দিরা আর কিবোর্ড সহযোগে গাওয়া রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার কণ্ঠসুধাও তো অন্তরে চিরভালোলাগা বোধ তৈরি করে। অদিতি মহসিন, সর্বানি সেন কিংবা মিতা হকের কণ্ঠ অথবা জয়তী চক্রবর্তী, অদিতি মুন্সি, ঋতু গুহ, বর্ণ চক্রবর্তী ও ইমন চক্রবর্তী — সবার কণ্ঠেই তো এ গানটি কমবেশি নিয়মিতই শুনি। তবে ইদানীং বেশি টানে অর্ণবের কণ্ঠই। কেন, কী কারণে — এর কোনও জবাব নেই। কিবোর্ড আর তবলার সঙ্গে একটু আধুনিক ধাঁচে গেয়েছেন অর্ণব। কিন্তু কী যেন এক বিরহ, কী যেন এক মনখারাপের গল্প ঘিরে রয়েছে অর্ণবের পুরো কণ্ঠ জুড়ে। শোনামাত্রই ‘মেঘ’ যেন দ্রুত জমা হয় ‘হৃদয়-আকাশে’। ‘মোহমেঘ’ যেন আমাকেও ‘অন্ধ করে রাখে’। গানটি শেষ হলে পুনরায় শুনি। তবু যেন অতৃপ্তি দূর হয় না!

এতটা প্রাসঙ্গিক নয়, তবু শেষ করার আগে গল্পটা বলি। এক টিভিসাক্ষাৎকারে প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের দ্বিতীয় স্ত্রী শাওন জানাচ্ছিলেন, বিদেশ-ভুঁইয়ে নদীতে নৌকায় বসে শাওন গাইছিলেন, ‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই’ গানটি। শ্রোতা ছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। গানটি শুনতে শুনতে হুমায়ূনের চোখ দিয়ে টপটপ করে অশ্রু ঝরছিল। তাঁর কণ্ঠে গানটি শুনেই নাকি হুমায়ূন তাঁর প্রেমে পড়েছিলেন, তাঁকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। বিয়ের পর প্রায় রাতেই হুমায়ূনকে শাওন এ গানটি শুনাতেন।

গানের ভেতরেও গল্প আছে। আর গল্পের ভাষ্যকার যদি হন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তাহলে হুমায়ূন আহমেদদের মতো মানুষের দুর্নিবার প্রেম ফেরানোর সাধ্য কার!

… …

COMMENTS

error: