কাগজের অ্যারোপ্লেন বিষয়ে একটি চির্কুট-সন্দর্ভ || জাহেদ আহমদ

কাগজের অ্যারোপ্লেন বিষয়ে একটি চির্কুট-সন্দর্ভ || জাহেদ আহমদ

যার সাতে হয় না, তার সাতাশিতেও হবে না : এমন একটা লোককথা চালু রয়েছে গ্রামদেশে। এই মোক্ষম জনপ্রবচন মনে রেখে এখন এ-মুহূর্তে একটু খোঁজ করে দেখা যাক ছোটকাগজ কতটুকু দুঃখসুখে দিন অতিপাত করছে। এটা আর প্রমাণ করার দরকার নাই অবশ্য ছোটকাগজ কত মহান-মহান অবদান রেখেছে এবং রেখেই চলেছে। লেখালেখিবিকাশে নাকি লিটলম্যাগাজিনের কন্ট্রিবিউশন অকথ্য, মানে কথায় বলে কুলাবার নয়। এর উল্টোটা, মানে লেখকেরা কাগজের কৌলিন্য বৃদ্ধি করেন কি না, জানতে চাওয়া মানা। বাংলাদেশে ছোটকাগজের গতি-প্রকৃতি, বিত্ত-বেসাত, ভূত ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একাধিক অ্যাঙ্গেল থেকে ভিয়্যু উপস্থাপন করা যায়। সেদিকে আমরা না-যাই। নিদেন ছোটকাগজের সংজ্ঞাটা ঝালাই করে নিবা না আরেকবার? না, তারও দরকার নাই। বরং এইসব ইশ্যু নিয়ে একাদিক্রমে একশ স্কলার্লি আর্টিক্যল রচনার সম্ভাবনা জারি থাকুক। পণ্ডিতেরা তাদের মতো কোম্বিং সার্চ প্রোগ্রাম অপারেট করুন, আমরা পাত্তা চালাই আমাদের মতো।

কথা হলো, দুনিয়া আগাগোড়া বদলে গেছে। এটা যদিও লোকমুখে শোনা কথারই রিপিটেশন, চারপাশে চেকনাই বেড়েছে বেশ, অন্তত আপনি-আমি এই কথিত বদলানো জমানার ফল রসেবশে খেয়ে যেতেছি। ইন্টার্নেট ইত্যাদির কথা বলছিলাম আর-কি। কিন্তু কয়জন অ্যাভেইল করছে এই প্রিভিলেজ, প্রশ্নটা চাপা থাক আপাতত। তবে এদিকে এরশাদ ওদিকে গর্বাচেভ পতনের সময় এটা আমাদের কল্পনারও অসাধ্য ছিল, কোনদিকে যাচ্ছে চেনাজানা গ্রাম ও শহরগুলো মোটেও যাচ্ছিল না ঠাহর করা, বিশ্বায়ন বা ন্যাংটা বাজার অর্থনীতি ইত্যাদি টার্মিনোলোজি শোনা যাচ্ছিল যদিও। অনলাইন/ইন্টার্নেট অ্যাক্সেস অ্যাভেইলেবিলিটির ফলে এই সময়ে অন্য অনেক ক্ষেত্রের মতো বুদ্ধিবিদ্যা-কল্পনাবৃত্তির জগতটাও বদলেছে। এর একটা চাক্ষুষ লাভ হয়েছে এ-ই যে লেখালেখির মতো ব্রাহ্মণ্য মন্ত্রানুশীলনে শরিক হয়েছে অসংখ্য শূদ্র; তবে তারচেয়েও অসংখ্য পরিত্যক্ত পড়ে রইল কি না পেছনে, প্রবেশাধিকারহীন, তা আমরা তালাশে নামছি না। আমাদের অত দায় নাই, আমরা নির্দায়, আমরা ‘সুন্দরের পূজারী’। কিংবা ব্যাকরণসম্মত সুন্দরীর। সময় বড় কম। মেরেকেটে একসেকেন্ডের তরে হলেও সেলেব্রিটি হওয়ার আগে মরিতে চাহি না আমি সুন্দর এ-ভুবনে।

এসব কথা উঠছে কেন বাছা! আন্দাজি আলাপ। কথা হলো, ছোটকাগজের বড্ড মরো-মরো দশা। আগের সেই দিল্লাগি দিন নাই। অনেকটা এফডিসির বানানো বাংলা সিনেমার অবস্থা। সারাবছরে দুই-আড়াইটাও রিলিজ হয় কি হয় না। মেগাহিট কি ব্লকবাস্টার তো দুরাশা। তাহলে এত বড় ইন্ডাস্ট্রি কি ইকোপার্কওয়ালারা কিনে নেবে শেষমেশ? প্রোডিউস্যর-ডিরেক্টর-ইনভেস্টরদের ঘুমনিদ্রা হারাম। নায়ক-নায়িকাদের, মানে কবি-কথাশিল্পীদের, অবশ্য দুশ্চিন্তার কিছু নাই। কতরকম মিডিয়া এসেছে, কালে কালে কত-কী দেখবে খালা, যেথায় খুশি নেমে পড় কোমর কষে বেঁধে! অ্যাড বানাও ধুমায়ে, অ্যাড/টিভিসি বানায়ে ক্লেইম করো প্রোডিউস করেছ সুহাসিনীর স্বর্গীয় পমেটম তথা আর্টকাল্চারের এক্সিলেন্স, চকোলেটি টিভিফিল্ম বানায়া ভান করো বানায়েছ বার্গম্যানের বাপঠাকুর্দ্দানাম-ভুলানো ফ্যুললেন্থ ফিচার ম্যুভিফিকশন, স্পন্সরের পেছনে সমস্ত শিল্পোদ্যম খর্চে একফোঁটা মাল মাটিতে ফেলে পকেটে তোলো দুইটা কাজুবাদাম খরিদিবার পয়সা, আর প্রোমোক্যাম্পেইনে ফাটিয়ে প্রেইজ করো হবু/গুপ্ত ঘরণী প্রকাশ্য প্রোডাকশন মডারেটর কাম নায়িকার, বাকিটুকু উদ্যম খর্চা করো উগান্ডার লোক্যাল ম্যুভিফেস্ট আর স্বদেশী মিডিয়ায় প্রেজেন্স এনশিওর করবার লাইনঘাট তৈয়ারের ফিকিরে কত্তাব্যক্তিদিগের ধামা ধরে। লিটলম্যাগাজিনের হিস্ট্রি ও হালফিল, প্রিসাইস্লি, এ-ই তো!

বইপুস্তকে সেকাল প্রশংসিত সবসময়, এবং পক্ষান্তরে একাল ধিক্কৃত। সত্যিকার চেহারাটা কেমন ছিল সেকালের? বইপুস্তক তো বলবেই ওয়েস্টার্ন-ইস্টার্ন-সাউদার্ন-নর্দার্ন সমস্ত ফ্রন্টই ছিল ফুল্ল চমৎকারা, মাঝেমধ্যে একাধটু ঝড় ও শিলাবৃষ্টি ছিল যদিও। অতএব বই নয়, একজন ব্যক্তির বয়ান শুনি বরং। ইনি একজন বর্ষীয়ান কবি কাম সম্পাদক, খুবই লিটলম্যাগ-লয়্যাল, বছর-পঁচিশ আগে একটা কাগজ অনিয়মিতভাবে বেশ কয়েক সংখ্যা বার করেছিলেন। কথা হচ্ছিল তার সঙ্গে, একটা ডিজিটাল অডিও রেকর্ডার মাঝখানে রেখে, নাম প্রকাশ না-করার শর্তে। এই প্যারার ইমিডিয়েট পরের প্যারা পুরোটাই সেই আলাপের সারসংক্ষেপ, যথাবশ্যক এডিটেড, ব্যক্তিনাম-ধাম ইত্যাদি সেন্সরপূর্বক। ভুক্তভোগী যারা, তাদের হাসি পাবে পুরনো দিনের বেদনা স্মরণে; আর যারা আমার মতো কমন কুমড়োপটাশ, তারা বিস্মিত হবেন। তবে প্যারাগ্র্যাফের পুরো বয়ানটাই উত্তমপুরুষে ট্রান্সক্রিপশন করা হয়েছে যেহেতু, বক্তার সঙ্গে কেউ যেন বক্তব্যপরিগ্রাহক/রেকর্ডকিপার বেচারাকে গুলিয়ে না ফেলেন। বিধিবদ্ধ সতর্কতা।

প্রসঙ্গত উল্লেখের যোগ্য হয়তো নয় — এ-কথা আমরা কে না জানি যে জগৎ ভরে রয়েছে অপ্রাসঙ্গিক উল্লেখে, যেখানে আমরা শুধু সেই অনুল্লেখযোগ্য প্রসঙ্গগুলোকে যার যার অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে নিয়ে সেগুলো প্রসঙ্গানুষঙ্গ করে তুলি ফিরে ফিরে — এখানে আমাকে সেকাল বিষয়ে বলতে যেহেতু পীড়াপীড়ি করা হচ্ছে, নেহায়েত বাধ্য হয়েই বলছি। স্মৃতিচারণ করছি আসলে। সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ছে, পেছনের সেই দিনগুলো, যখন আমার ইচ্ছা হয়েছিল ‘খুব ভালো সৎ ও দায়বদ্ধ’ লেখালেখি করবার। ভালো কিছু বন্ধু পেলে বুঝিবা বিপ্লবই ঘটিয়ে ফেলব বাংলা সাহিত্যে, বিশেষত কবিতায়, সেইসময় মনে হয়েছিল। সঙ্কোচ ঝেড়ে বলেই ফেলি, তখন তাড়িত ছিলাম কবিতায়। সারাদিন কবিতাতাড়িত, সারারাত কবিতা-পাওয়া ভূত। আহা, সেই দিনগুলো-রাতগুলো! সেই গরিব-গরিব গনগনে আগুনের আঁচে সেদ্ধ আমার জীবনযাপন! তো, লিখতেটিখতে গেলে লেখার চেয়েও জরুরি হচ্ছে লেখকদলে ভেড়া। লেখকদল বলতে তোমার আশেপাশে যারা লেখাটেখা প্রকাশ করছে, তারা, তাদের সঙ্গে মেশা। ভিড়লাম, মিশলাম। বেশিদিন ‘ভেড়া’ থাকা পোষাল না আমার, “হায় রে কপাল মন্দ / চোখ থাকিতে অন্ধ”, নিজ মুদ্রাদোষে। সেসব অন্য ইতিহাস। প্রসঙ্গত উল্লেখও হয়তো অসৌজন্য হবে, তবু উল্লেখ করি, দেখলাম সেই পালের ভেতর একটা ছোটখাটো গোদা বিরাজমান যিনি কবি মনোহরআলি নামে মশহুর। ওর বাপদাদাদত্ত নাম অন্য যদিও, যাগ্গে। সে দৈনিকে লেখে না, খুব ছোটকাগজনিষ্ঠ, একেবারেই  অপ্রাতিষ্ঠানিকতা-অন্তপ্রাণ লেখক। সর্বঘটে কাঁঠালির মতো সমস্ত ছোটকাগজে তার লেখাজোখা ছাপা হয়। ওই মফস্বল শহরে তখন মনোহরের বছর-তিন পরে যারা লিখতে এসেছে, তারা তাকে প্রকাশ্যে গুরু জ্ঞান করে। বিস্ময়ে রবীন্দ্রনাথের জেগে উঠেছিল গান, আমার হলো উল্টাটা।  কারবার দেখেটেখে, ভাই, বিস্ময়ে ও বিবমিষায় তাই বন্ধ হয়ে গেল অচিরেই আমার গাওয়া। মূঢ় ও হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম আমি, মূক ও বধির প্রায়, এত মোড়লপনা দেখে, ঘৃণায় রি-রি করে উঠেছিল আমার কবি-যশোপ্রার্থী সত্তা ওই মোসাহেবদের মজমায়। এরপর অনতিবিলম্বে আমি ওই পাল থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিই, যদি জানতেই চাহেন তো বলা যায়, সেও প্রায় একযুগ হয়ে গেল। খুব কাছ থেকে দেখেছি তো ঘটনাবলি, মিউমিউ মূষিকবৃন্দের মামদোভূতগিরি, ধান্দাবাজিগুলো ধরতে সময় লাগেনি ফলে। সেই মফস্বল শহরে যারা নতুন লিখতে আসত, মনোহরের পরোক্ষ প্ররোচনায় তারা নানান ক্লেশকর প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে রেস্ত জোগাড়পূর্বক পত্রিকা বার করত। ওইসব পত্রিকায় গুচ্ছ-গুচ্ছ কবিতা ছাপা হতো সে একজনেরই, তিনি মনোহরআলি। এভাবে বছরশেষে স্তূপ জমে যেত মনোহরের প্রকাশিত কবিতার। কিন্তু সেই কবিতাপাগল সম্পাদকের, মনোহরের কবিখ্যাতি এনে দিতে লবেজান সেই প্রমোটার তরুণের, নিজের সম্পাদিত কাগজে ছাড়া ছাপা হয় নাই কবিতা কোথাও। গত পঁচিশ বছরে পনেরোটাও ছাপাতে পেরেছে কি না সন্দেহ। বেচারা! আজ, সব যখন স্তিমিত হয়ে এসেছে, যখন মফস্বলগুলো থেকে নানানামী ছোটকাগজের প্রকাশস্রোত ক্ষীণ হয়ে এসেছে, যে-কয়টা বেরোচ্ছে তারা মনোহরের কাছে সেভাবে গোছা-গোছা কাব্য চাইছে না আর, তখনই সে দৈনিকে-মাসিকে নৈবেদ্য প্রেরণ করছে প্রেমসুধারসভক্তিভরে। এই আমাদের অপরূপ লিটলম্যাগ বায়োস্কোপ! হায় ছোটকাগজ-বড়কাগজ দ্বন্দ্ব, হায় দায়বোধ প্রতিষ্ঠানবিরোধ, হায় সাহিত্যবিপ্লব!

জগতের যাবত জনৈক-জনৈকার জন্য গভীর সমবেদনা। আপাতত শব্দসংরক্ষক যন্ত্র বন্ধ রেখে সন্দর্ভে ফেরা যাক। আসলে আমাদের এখানকার বেশিরভাগ উদ্যোগ-আন্দোলন গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে এইসব কতিপয় লোকের ধান্দাবাজির কারণে। এরা থাকে অগ্রভাগে যেহেতু, মহৎ-হয়ে-উঠতে-পারত এমন সমস্ত কাজই শেষমেশ খেলো ও অমহৎ করে ফেলে এরা, নিজের আখেরটুকু গুছিয়ে বেওয়াফা উল্টাগান গায়। আর বাকি সবাই হতাশ হয়ে গুটিয়ে নেয় হাত-পা। যেমন হয়েছে এখানকার ছোটকাগজ-করিয়েদের ক্ষেত্রে। ছোটকাগজে তরুণ লেখকদের নিরীক্ষা প্রকাশ পাবে, প্রচল ও প্রথা ভাঙবার একটা প্রয়াস লক্ষ করা যাবে, এইটাই ছিল অভিপ্রেত। ছোটকাগজে লিখবে নতুন লিখিয়েরা হাত খুলে, এইটা সর্বাগ্রে নিশ্চিত করা কর্তব্য ছিল। কিন্তু তা হয়নি, নিশ্চিত করা যায়নি প্রাইমারি লেভেলের সেই প্রত্যাশাটুকু। ছোটকাগজ বরং হয়ে উঠেছে গুটিকয় পরিচিত লেখকদের ঘুরেফিরে লেখা ছাপাবার জায়গা। দেখা গিয়েছে যে একই লোকের বৃত্ত থেকে পাঁচটা পত্রিকা বেরোয়, এবং পাঁচ পত্রিকার পাঁচ সম্পাদক। কোনো পত্রিকার একটা সংখ্যা বেরোনোর ছ-মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সম্পাদক পরের সংখ্যা বার করতে প্রস্তুত, কিন্তু নানান ইন্টেলেকচ্যুয়্যল ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ আর অহেতুক তত্ত্ব কপচিয়ে সেই বৃত্তপ্রধান কবিগাণ্ডু পত্রিকাপ্রাণা তারুণ্যতৎপর সম্পাদকের উৎসাহের রাশ টেনে রাখেন।  যেহেতু তার, ওই সার্কেলচিফের, গ্রিপের ভেতর ন্যূনসংখ্যায় পাঁচটা কাগজ রয়েছে এবং প্রত্যেকটায় লিখতে হয় তাকে কমপক্ষে পনেরো-ষোলোটা কবিতা গুচ্ছাকারে; — এর বাইরেও রয়েছে এন্তার কাগজে লেখার আমন্ত্রণ, স্টক সীমিত, অত লেখা হাতে নাই তার। আর তিনি ছাড়া, তার লেখা গর্ভে ধারণ না করে, পত্রিকা প্রসব হবে এই সর্বনেশে ব্যাপারটাও তিনি চান না। তাই ওই উৎসাহী সম্পাদকের লাগাম টেনে ধরা। এতে লাভবান হন তিনি, ক্ষতিগ্রস্থ হয় সমগ্রত ছোটকাগজান্দোলন। অবশ্য ওইরকম কোনো আন্দোলনের অস্তিত্ব কখনো ছিল কি না, এও এক প্রশ্ন। অতীতের গালগল্পে যেমন কব্জি ডুবিয়ে পায়েস খাওয়া, বা কাজির গরু, হয়তো ছোটকাগজান্দোলন ওইরকমই কিছু।

প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার ধুয়া তুলে একটা বড় সময় জুড়ে কিছু ধূর্ত ও চতুর লোক ওদের ব্যক্তিক স্বার্থই উদ্ধার করেছে কেবল। শত ফুল ফুটবার কথা যেখানে, শুনবার কথা শত জলঝর্ণার ধ্বনি, কুক্ষিগত করে রেখেছে তারা সব-কয়টি বিকল্প পাটাতন। ফলে যারা তাদের নিজেদের কায়দায় নিজেরা চেয়েছিল নাচতে, তাদের নৃত্যমঞ্চে শিশিবোতলের ভাঙা কাচ বিছিয়ে রাখা হয়েছে। আর চতুরেরা ফায়দা লুটেছে সর্বপ্রকারে। এরা তাদেরই রুচি প্রাধান্যে রেখে নিয়ন্ত্রণ করেছে কাগজ-করিয়েদের। তাদের রুচি আর-কিছু নয়, পশ্চিমবঙ্গের কিছু কবি ও লেখকের অন্ধ অনুসরণ। ওইভাবে যারা অনুসরণ করেনি, তারা জায়গা পায়নি নানাবাহারী দশকনৌকায়। যারা নিজেদের মতো করে নিজেদের অনুভূতি প্রকাশে তৎপর হয়েছে, হোক-না তা ভাষা ও শৈলীতে পুরনোগন্ধী, একসময় তারা আশারিক্ত সংকোচে গুটায়ে নিয়েছে হাত। ফলে অনুকারদের বিকাশ ঘটেছে, অনুকৃতিতে ছেয়ে গেছে আমাদের এলাকা। অথচ ওই গুটিগুটি হাতে পুরানা স্টাইলে যারা শুরু করেছিল লিখতে, এরা তাদের নিজের-নিজের গতিতে অকুণ্ঠ লেখার সুযোগ যদি পেত, হয়তো আজ ইতিহাস অন্যরকম হতে পারত। আর এমন তো নয় যে ছোটকাগজে একদল এবং বড়কাগজে সম্পূর্ণ ভিন্ন আরেকদল লেখক লিখে থাকেন। এটা তো দিবালোকের মতো চক্ষুগোচর যে ছোটকাগজে লিখে বড়কাগজের দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকেন ওই লেখকেরা। আর নিজের নাম যতক্ষণ নিয়মিত নির্বিঘ্নে ছাপা হচ্ছে ছোটকাগজে, অন্য কোনোদিকে ফিরে তাকান না তারা। উল্টে গলাবাদ্যি করেন, বিষোদ্গারও করেন কেউ কেউ, মুখে ও সম্পাদকভাষ্যে খিস্তি ছুটিয়ে ঘটান বড়কাগজের বাপদশা।

আজ হোক কাল হোক, লেখা প্রকাশের একটা সুস্থ পথ ও প্রক্রিয়া নিয়া ভাবতেই হবে। যারা লিখতে চাইছে, এসেছে বা যারা আসছে লিখতে, ভাবতে হবে তাদেরকেই। আরেকটু মর্যাদার সঙ্গে লেখা প্রকাশের জন্য, অন্যধারা হাতড়ে বেড়ানোর প্রয়োজনে হলেও, বিকল্প এক বা একাধিক প্রকাশ-পাটাতন সামনে থাকা দরকার। এবং বিকল্প এই প্রকাশায়তনগুলো পুষ্ট হবে নিরীক্ষাপ্রাচুর্যে, অথবা তরুণেরা লিখবে তাদের আপন খেয়ালে। ইচ্ছেমতো গড়বে, ফের ইচ্ছেমতো ভাঙবে। এভাবে প্রতিনিয়ত প্রচল থেকে মুক্তির খিড়কি খোলা থাকবে। পুষ্টিঋদ্ধ হবে সমগ্র সাহিত্য। এখন যেভাবে চলছে, বেশিদিন চলা যাবে না এভাবে। এ-মুহূর্তে, ঠিক এই মুহূর্তে, কেউ কেউ ঠিকই বোধ করছে এহেন অচলায়তন থেকে বেরোবার তাড়া। বিশ্বাস করি না যে শুধু আমিই এমন দুর্ভাবনায় তাড়িত, অস্বস্তি হচ্ছে আরও অনেকের নিশ্চয় এ-প্রচলায়তন নিয়ে। দেখো, গাদাগুচ্ছের কবিতা ছাপা হচ্ছে ফি-হপ্তায় পাতার পর পাতা, যেগুলোর নেই কবিতামূল্য আদৌ। গল্পের পর গল্প ছাপা হচ্ছে, যেসবের নেই স্থানচ্যূতি ঘটাবার নান্দনিক ক্ষমতা বা সামর্থ্য। প্রবন্ধে পাবে না আদৌ যুক্তি কিংবা প্রতর্কপ্রবণতা, প্রাবন্ধিকে দেশ সয়লাব যদিও। ডক্টরের ডামাডোলে নিশ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে, তেমন খুঁড়ে-তোলা আবিষ্কার-উদ্ভাবন-অভিনবতার খোঁজ কোথায়! এ যদি না-হয় মোক্ষম সময় মরিয়া হওয়ার, দেখিয়া-শুনিয়া ক্ষেপিয়া উঠিবার, তো কবে হবে আর?

লেখা ছাপানোর বিকল্প প্ল্যাটফর্মগুলো কতটা তাৎপর্যপ্রবাহী আর শক্তিশালী হতে পারে, এর নজির পাওয়া যাবে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশে। এক-দুই নয়, একসঙ্গে অনেক সমান্তরাল প্রকাশনাপাটাতন সেখানে চালু রয়েছে যে বিস্মিত হতে হয় এদের কাজের বহর দেখে। একই ভাষাভাষী, পাশের দেশের, পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশে সেই অল্টার্নেটিভ প্ল্যাটফর্মগুলো বিরাজমান। কোনোটা এমনকি পঞ্চাশ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্ন চলছে। এমনই একটা, উদাহরণ হিশেবে নাম মনে করা যাক, ছোটকাগজের উপস্থিতি আমরা দেখি যেমন ‘কৌরব’। রয়েছে ‘কবিতাক্যাম্পাস’, আরেকটা যেমন ‘কবিতাপাক্ষিক’। ‘এবং মুশায়েরা’, ‘অনুষ্টুপ’ এগুলোই-বা তালিকা থেকে বাদ যাবে কেন? কিংবা ‘তিরপূর্ণি’, ‘তীব্র কুঠার’, ‘তাঁতঘর’? কত-সমস্ত পপ্যুলার-প্রোলিফিক লেখকের ভিড় এড়িয়ে এই পত্রিকাগুলো বুকে টেনে নিয়েছে অভিমানী অসংখ্য সৃজনপ্রতিভা, চাইলে এর একটা হিসাব সহজেই বের করা যাবে। লক্ষণীয়, আমি উচ্চারণ করেছি ‘অভিমানী অসংখ্য সৃজনপ্রতিভা’। এইসব ক্ষেত্রে আমরা শুনে অভ্যস্ত ‘নিভৃতচারী’ ‘প্রতিষ্ঠানবিরোধী’ ‘বাজার-অস্বীকার-করা বীরবাহু’ ‘সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ ও শিল্পে পূর্ণমনস্ক’ প্রভৃতি বিচিত্র বিজ্ঞাপনব্যঞ্জক তকমা। আমি ইচ্ছে করেই, স্থির চেতনে, সেইসব অভিধা এড়িয়ে গেলাম। এটা অভিমানই, বেলেল্লাপনা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিজেতে নিমগ্ন থাকার আত্মাভিমান। এ-রকম আত্মাভিমানী লেখকদের স্থান মর্যাদার সঙ্গে সংকুলান করার জন্যই অল্টার্নেটিভ প্ল্যাটফর্ম। উপায় নেই, ওইরকম একটা জায়গা এখন অবিলম্বে তৈরি করা দরকার। একটা নয়, একাধিক, অসংখ্য। গোকুলে বাড়িছে নিশ্চয়!

এবার দেখা যাক বিদেশে লিটলম্যাগের দিনকাল কেমনতর। পদ্মাপারের ইলিশবেপারিদের কাছে বিদেশ বলতেই তো পশ্চিমবঙ্গ, উল্লেখ বাহুল্য। ওখান থেকে এক-দেড়জন ‘সুসাহিত্যিক’ নিয়ে এলেই হয়ে যায় আমাদের ‘আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন’! গরিব দেশের গরিবানার পেছনে একটা দায় এর জনগোষ্ঠীর মনোজাগতিক দাস্য মনোভাবের, কলোনিয়াল মাইন্ডসেটের, গরিবেরা রাজাত্যাজ্য হলেও নিজেদের মতোই ইতর সুরতের একজনকে তারা রাজা বানায়া হ্যাপি হতে চায়, বানাইতে চায় কাল্পনিক রাজ্য। অতএব শুধু ‘বিদেশ’ নয়, পশ্চিমবঙ্গই আমাদের ‘বিশ্ব’! ওদের অবশ্য লম্বা লিগ্যাসি লিটলম্যাগ চর্চার। সো, লেট আস টেইক অ্যা ল্যুক। সুবোধ সরকার সম্পাদিত বছর পঁচিশ আগের ‘ভাষানগর’ পত্রিকা থেকে একটা গোলটেবিলের কিয়দংশ নিচে পেইস্ট করছি। টেবিল ঘিরে বসেছিলেন চারজন কবি। সুবোধ সরকার, জয়দেব বসু, রাহুল পুরকায়স্থ, মল্লিকা সেনগুপ্ত। দুজন সম্প্রতি, স্বল্পকালের ব্যবধানে, ইহলোকান্তরিত। জয়দেব বসু ও মল্লিকা সেনগুপ্ত। বোঝা যাবে সেখানেও ছোটকাগজের ইতরপনা ভালোরকমেই বিদ্যমান।

সুবোধ : লিটল ম্যাগাজিন সম্পর্কে আমি একটা কথা বলতে পারি। লিটল ম্যাগাজিনের কাছে আমি যে অপমান পেয়েছি তা কোথাও পাই নি। মিডিয়া থেকে যে-ভালোবাসার ইঙ্গিত পেয়েছি তার দ্বিগুণ অপমান লিটল ম্যাগাজিন থেকে পেয়েছি। লেখা দিতে দেরি হলে এরা থ্রেট পর্যন্ত করে।
জয়দেব : কিন্তু একটা কথা বলি, তুমি লিটল ম্যাগাজিনের সন্তান হয়ে এই কথা বলছ। এর মানে কি দাঁড়ায়?
সুবোধ : লিটল ম্যাগাজিনের ছেলেদের নিয়ে একটা প্রশিক্ষণ শিবির খোলা দরকার। তাদের ব্যবহার ও বানান শেখানো দরকার।
জয়দেব : আচ্ছা ‘ধরন’ বানান কি?
সুবোধ : ধরণী দ্বিধা হও, ওদিকে যেও না (হাসি)।
জয়দেব : এই কথাটা অন্তত ছাপা থাক। যে তুমি বলেছো লিটল ম্যাগাজিনের প্রশিক্ষণ শিবির খোলা উচিত।
সুবোধ : হ্যাঁ, তবে আমিও সেখানে ছাত্র হব।
রাহুল : কবিতা প্রকাশের ক্ষেত্রে একটা সমস্যা আছে। আমরা যারা সেই অর্থে বড়বাবুদের কাছে যাই না …
সুবোধ : আচ্ছা আমি একটা কথা বলছি। এমন একটা গিল্ড করা কি সম্ভব যেখানে অনামী অখ্যাতদের বই প্রকাশ করা যায়?
রাহুল : হ্যাঁ, আমি তাই বলছি, প্রয়োজন বই প্রকাশ, কবিতা উৎসব নয়।
সুবোধ : একটা কথা বলে আমি পুরোনো বিষয়ে যেতে চাই, ছোটকাগজেই আমি সবচেয়ে বেশি কবিতা লিখি। সারা বছরে আমার সেখানেই বেশি লেখা ছাপা  হয়। আমি নিজে একটা ছোটকাগজ করি। বহু লড়াই করে ছোটকাগজ বেরোয়।
জয়দেব : মল্লিকা, লিটলম্যাগ সম্পর্কে তোমার অভিজ্ঞতা বলো।
মল্লিকা : আলাদা কিছু নয়। বেশিটাই ভালো অভিজ্ঞতা। লিটলম্যাগাজিনই বাংলা কবিতাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। বড়কাগজ বাংলা কবিতার গতি নির্ধারণ করতে পারে না। তবে লিটলম্যাগাজিনও কিন্তু অর্ডারি লেখা চায়। যে-অভিযোগ তারা করে বড় কাগজের ক্ষেত্রে।
রাহুল : দেখ, আমি এইসব অস্বস্তিকর প্রসঙ্গ এলেই ‘তিন পয়সার পালা’ নাটকটিকে স্মরণ করি। ওই নাটকে দুটো আদর্শ চরিত্র ছিল। মহীনবাবু ও যতীন পাল। সেই একটি গান ছিল না — চেষ্টা করলে হাঙরেরও দাঁত দেখতে পাবে, কিন্তু যখন মহীনবাবুর ছুরিটা চমকাবে কেউ দেখতে পাবে না, পাবে না …। আর যতীন পাল, সে ছিল ভিখারি তৈরি করার বিদ্যালয়-প্রধান। তো আমি সরকার ও যাবতীয় সংবাদ মাধ্যমকে মহীনবাবু এবং অধিকাংশ লিটলম্যাগকেই যতীন পাল হিশেবে চিহ্নিত করতে চাই, সচেতনভাবেই।
জয়দেব : আমি তিনটি লিটল ম্যাগাজিন ক্রসেড, রক্তমাংস, কবিতাকথা — এদের বাদ দিয়ে বলছি। আমি লিটলম্যাগের কেউ নই। লিটলম্যাগ আমার কেউ নয়। আমরা কেউ কাউকে বানাই নি। আমি তাদের দেখি দূর প্রতিবেশীর মতো। আমি তাকে ডিস্টার্ব করতে চাই না। উল্টোটাও চাই।
মল্লিকা : তাহলে তুমি যে অজস্র কাগজে লেখো —
জয়দেব : লিটলম্যাগ একটিও নয় —
মল্লিকা : কিন্তু কেন এই  দূরত্ব? একটু ব্যাখ্যা করো।
জয়দেব : আগাগোড়াই এই দূরত্ব। আমি এবং লিটলম্যাগ কেউই কারো সম্পর্কে আগ্রহী নই। আমার ধারণা ছোটকাগজে বড়কাগজের থেকে ভালো কিছু ছাপা হয় না, বরং খারাপ। বড়কাগজ বলতে আনন্দবাজার, গণশক্তি।
মল্লিকা : দ্যাখো বড়কাগজে তোমার লেখা যে-পরিমাণে বেরোয় তা অন্যদের ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। তার মানে তোমার দরকার নেই। কিন্তু যার দরকার সে কি করবে?
জয়দেব : আমার জানা নেই। তবে আমার সব লেখা তো বড়কাগজে বের হতো না। আমার অধিকাংশ লেখা ছাপাই হতো না। লিটলম্যাগাজিনও আমার কাছে চাইত না।
মল্লিকা : এটা অবিশ্বাস্য।
সুবোধ : কেন চাইত না? তুমি কি লি. ম্যাগের অবৈধ সন্তান?
জয়দেব : আমি লি. ম্যাগের সন্তানই নই। আমি লি. ম্যাগ-এর কেউ নই। এই শতকে অন্তত একজন এটা বলে যাক যে লি. ম্যাগ-এর কেউ নয়। তবে আমি তার শ …… নই।
মল্লিকা : এটা তুমি আর কোনোভাবে ব্যাখ্যা করবে কি?
জয়দেব : আমাদের মধ্যে সম্মানজনক দূরত্ব বজায় থাকুক।

রসিয়া পাঠক মনে মনে বেজায় ত্যক্ত হচ্ছেন, বিগম্যাগ আর লিটলম্যাগ ডিফাইন করবি তো ব্যাটা আগে! হ্যাঁ, করছি। বিগম্যাগে লিখে টাকা পাওয়া যায়, লিটলম্যাগে লিখতে হয় টাকা দিয়ে। এখানেও তবে চান্দাবাজি! ঠিক তা নয়। ব্যাপারটা হলো ছোটকাগজে লেখাটা বহোৎ সম্মানের, যত উমদা আদমি এর সভ্য, সম্ভ্রান্ত ও সিরিয়াস লেখকেরা এখানে লেখেন। সমাজে ডিগ্নিটি কিনতেই তো হয় একালে, এমনি এমনি বিনিপয়সায় ডিগ্নিটি কি কেউ কাউরে দ্যায়? এর একটা খর্চাপাতি আছে। যেমন খালি লিখলেই তো হলো না, লেখাটা কম্পোজ করানো, প্রুফ দেখা, তারপর এডিটর অ্যাড্রেস করে পাঠানো। ওসব ক্ল্যারিক্যাল জব সম্পাদক করতে যাবেন কেন! কয়জন লেখক কম্পিউটার অ্যাভেইল করে এদেশে? কত পার্সেন্ট কবির ইন্টার্নেট অ্যাক্সেস আছে? অতএব নিখর্চায় যায় না লেখা লিটলম্যাগাজিনে। এটুকু খরচ? না, আরও আছে। লেখাটা যে ছাপা হলো, যদিও সম্পাদকেরই আমন্ত্রণে প্রেরিত হয়েছিল, পত্রিকাখান খরিদ করে একটু স্বনাম দর্শনের লোভ কোন লেখকের নাই বলেন? সৌজন্য সম্পাদকের কাছে আশা করছেন কেন? সম্পাদক কি পিয়ন কোনো? পত্রিকাটা আপনারেই পার্চেজ করতে হবে তো! শুধু লিখলেই হলো? তো, মর্যাদারই ব্যাপার বটে ছোটকাগজে লেখা।

ছোটকাগজের প্রকাশনা আজ আর কতটা আবশ্যক, যখন অনেকগুণ শক্তিশালী সৃজনকর্ম প্রকাশ হচ্ছে সোশ্যাল সাইটগুলোতে, প্রশ্নটা ফেলে দেয়ার মতো নয় একেবারে। এত হুঙ্কারের প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা, যা নিয়া লিটলম্যাগওয়ালারা প্রায় অবসেসড ছিলেন এতকাল, আজ আর বিড়ালকণ্ঠেও শোনা যায় না। আজকের সামাজিক ভাববিনিময়ের মাধ্যমগুলোতে কম্পারেটিভলি অনেক বেশি স্পষ্ট ও বোধগম্য বরং প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা বা অ্যান্টি-এস্টাব্লিশমেন্ট সংক্রান্ত সচেতন তৎপরতা। তাহলে নেসেসিটি অফ এডিটিং অ্যান্ড পাব্লিশিং লিটলম্যাগ তো অদ্য অনুপস্থিত। তবু কেন  ছোটকাগজ ছাপছি আমরা, লিখছি এবং পড়ছিও কেউ কেউ? শৌখিনতা, নাম্বার ওয়ান কারণ। পরের কারণ, সম্ভবত, পুরনোকে পুরোপুরি ছাড়তে না পারার সংস্কার। তাছাড়া বিশেষ বাঁধাই ও বিশেষভাবে কাটা মাপজোখের কাগজে লেখক নিজের লেখাটা দেখে একপ্রকার বিমলানন্দ বোধ করেন।

তবে কি লিটলম্যাগাজিন ছাপব না আমরা আর? এর এককথায় প্রকাশযোগ্য কোনো উত্তর দেয়া যাবে কি? চিনুয়া আচেবে একবার একটা প্রবন্ধে এই ধরনের সঙ্কট নিয়ে ভেবেছিলেন, যখন মুদ্রিত বইয়ের মৃত্যু সম্পর্কে সবাই নিশ্চিত হয়ে যাচ্ছিলেন এবং ভিশ্যুয়াল মিডিয়ার জয়গাথা গাইছিলেন। সমাধান হিসেবে একটা কাল্পনিক পরিস্থিতি উপস্থাপন করে তিনি বলেন, ‘‘ধরা যাক একজন গুণী গায়ক বিরাট প্রেক্ষাগৃহে গান গাইবার জন্য দাঁড়ালেন এবং শেষ মুহূর্তে জানতে পারলেন যে এই প্রেক্ষাগৃহের চারভাগের তিনভাগ দর্শকই সম্পূর্ণ বধির। তার প্রযোজকরা তখন তাকে প্রস্তাব করলেন তিনি গান না গেয়ে বরং সবাইকে নাচ দেখান। বধিররা গায়কের গান শুনতে না পেলেও নাচ তো দেখতে পারে। এই গায়কের কণ্ঠ দেবদূতের মতো কিন্তু পা পাথরের মতো ভারী। তাহলে এখন এই গায়ক কি করবেন? তিনি কি প্রেক্ষাগৃহের মাত্র এক-চতুর্থাংশ দর্শকের জন্য চমৎকারভাবে গান গেয়ে শোনাবেন নাকি প্রেক্ষাগৃহের সব দর্শককে বিশ্রীভাবে নাচ দেখাবেন?” — পরিষ্কার ইঙ্গিত। ছোটকাগজের লেখক-সম্পাদক বুঝবেন সন্দেহ নাই। সঙ্কট রয়েছে, থাকবেই, যেন হুঁশ না হারাই। সীমাবদ্ধতা আছে বলে বেহুঁশ পত্রিকা করে যাওয়ারও কোনো জরুরৎ নাই।

সীমাবদ্ধতা টাকাকড়ির নয়, এটা বলার তো কোনো উপায় নাই। ভাতকাপড় সংস্থানের পর শিল্পচর্চার পথ সুগম রাখার পক্ষে জেবের ভেতর অল্পই উদ্বৃত্ত থাকে, সেইটুকুই সম্বল বছরে এক-দেড় সংখ্যা ছাপাখানায় চড়াতে, এবং তাছাড়া লিটলম্যাগসদৃশ পত্রিকা-করিয়েদের কেউই তো ওইরকম শিল্পপতি নন। তবু টাকার টানাটানি ওভারকাম করাই যায়। তারপর সময়ের সীমাবদ্ধতা আরেকটা, বাঘের মতন, ভয়ানক বিপন্নকর পরিস্থিতি। সে-ও ম্যানেজ করে নেয়া যায় কোনো-না-কোনোভাবে। এমনি আরও অজস্র সঙ্কট ও সীমাবদ্ধতা থাকলেও উল্লেখ অনাবশ্যক এখানে। কেননা আমাদের এলাকায় লোকে সাহিত্যপত্রিকা করে একটা আহাম্মক প্রেম থেকে, একটা তীব্র প্যাশন থেকে, ব্যক্তিগত একটা ভালোবাসার বোবা তাড়না থেকে। জেনেশুনেই যদি বিষ পান করা, তাহলে ফরিয়াদ কেন! সমব্যথীদের সঙ্গে শেয়ার করা আসলে, ফরিয়াদ বা ফিরিস্তি এটা নয়।

যোগাযোগের সীমাবদ্ধতাটা সবচেয়ে বড় অন্তরায়। মুখ্য সঙ্কট সংযোগের। অবাক কাণ্ড! তথ্যপ্রযুক্তিবিপ্লবের এই যুগে এইটা আদৌ যুক্তির কথা হলো! লক্ষ করে দেখুন, কেমন করে একটা আগ্রাসী বিচ্ছিন্নতা আমাদের আমুণ্ডু গিলে ফেলছে। একদিকে গোলোকায়িত হচ্ছে বটে নগর-গেরামগাও, ওই গোলোকায়নের চাক্ষুষ ফল তো কেবল মুঠোফোনকোম্প্যানিগুলোর একচেটিয়া মুনাফা, আবার একটা মানুষ থেকে আরেকটা মানুষের দূরত্ব দিনেদিনে অথৈ অন্যদিকে। এক মানুষ থেকে আরেক মানুষ সরে যেতে যেতে আলোবর্ষদূর চলে গেছে যেন। অসম্ভব অসহ অ্যালিয়েনেশন, সর্বত্র, সবখানে। এইসবের ভেতরেই আমাদের সমাজ, সভ্যতা, সাধের লাউ সংসার ও শিল্পসংস্কৃতি। অ্যালিয়েনেশনের শিকার আমাদের বাংলা কবিতা, কবি ও কবিতাপাঠক।

জন্ম ও স্বভাবসূত্রে কবিরা অ্যালিয়েন, বেশিরভাগ বিভোর কবিতাপাঠকের ক্ষেত্রেও ওই বিবৃতি প্রযোজ্য, সর্বকালেই। ওই স্বভাব সৃজনানুকূল বলে বিবেচিত হয়ে এসেছে এতদিন। সহনীয় মাত্রায় অ্যালিয়েনেশন কবিতা ও অন্যান্য শিল্পের বেড়ে ওঠা ও পরিশীলনে উপকারী ছিল বটে। এখন যখন অ্যালিয়েনেশনই সময়ের শীর্ষপরিচয়, ভুবন জুড়ে সর্বজনের ভূষা, যা ছিল এতকাল কবিস্বভাবীদের ললাটে রাজটিকা, সঙ্কট তখন তীব্রতর। কবির সনে দেখা নাই কবির, পাঠকের সনে তো সোমালিয়ার চেয়েও দূর, আর সম্পাদকের সঙ্গে যেন পাকাপাকি বিচ্ছেদ ঘটে গেছে কবি ও পাঠক উভয় গোত্রের। যে কেবল কথা কয় জলের মতো ঘুরে-ঘুরে সম্পাদক বেচারার সঙ্গে, সে কেউ নয় আর, পাওনাদার প্রেসমালিক।

অথচ সম্পাদক তো সাঁকো হবেন, লেখক ও পাঠকের মাঝখানে। কেন তবে এই যোগাযোগহীন যাতনা? আজকাল পাঠক, লেখক ও সম্পাদক একেকটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। দেখা হয় কদাচিৎ, কালেভদ্রে, এক-দেড়বার বছরে এই বার্ষিক দেখাসাক্ষাতানুষ্ঠান। ফলে কতিপয়ের সঙ্গে কতিপয়ের কচলাকচলি কেবল, বছরভর, করুণ কলরব করে চলেছি সবাই মিলে। এহেন পরিস্থিতির জন্য দায়ী কে, এই প্রশ্ন অবান্তর। বরং প্রতিবেদিত ওই পরিস্থিতি বিরাজমান, এই সত্য সবাই স্বীকার করি কি না সেইটাই জিজ্ঞাসা। এবং স্বীকার যদি করি, তাহলে এহেন শ্বাসরোধী বিবিক্ত পরিস্থিতির পবনে প্রবাহিত রইব নাকি মুকাবিলার পথ ও পন্থা খুঁজব, সিদ্ধান্ত দরকার।

সেলফোন-ফেসবুক-ব্লগ-ওয়েবজিন ইত্যাদির মারকাটারি দিনে কেন ও কোন আক্কেলে যোগাযোগের অভাব বোধ করছি এবং শীর্ষসমস্যা বলে প্রচার করছি, বিশদে বলা চাই। দেখুন, মুখ্যত কবিতা-করিয়েদের হাতে তথা ধাত্রিত্বে পত্রিকা ছাপা হয় তিনশ বা পাঁচশ বা সাতশ বা হাজার মেরেকেটে। কে পড়ে এগুলো? উত্তর, পাঠক। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, সাহিত্যের বা কবিতার প্রাণপণ পাঠক। জিজ্ঞাসা আসে, কয়জন? জবাব সংখ্যায় না দিয়ে একটু অ্যানালিটিক্যাল চিত্র হাজির করা যাক। এই পত্রিকাগুলো কোথায় পাওয়া যায়, মানে এগুলোর প্রাপ্তিস্থান কোথায়, একবার ঢুঁ মেরে আসি। ঢাকা শহরের শাহবাগ জেলা, হাসবেন না, বাদ দিলে কয়টা জেলায় যায় এগুলোর দু-চারটা নমুনা কপি? দুই বা তিন, নাকি এক-দেড়টা বাদ গেল ক্যাল্কুলেশন থেকে? হালে অবশ্য জেলা-কাভারেজ কিঞ্চিৎ বেড়েছে, কাঁটাবন কনকর্ড ডিস্ট্রিক্ট। উন্নতি, বাংলা কবিতার, মন্দ নয়। আচ্ছা। কাব্যের বাইরেকার হাজার হাজার শিল্পসম্ভার বাংলার জলহাওয়ায় আন্দোলিত ছোটকাগজে জায়গা পায়? অ্যান্সার জানেন একমাত্র আল্লায়।

ভেবে দেখুন, কোথায় আমরা, আমাদের বড়াই। বাৎসায়নের কলা আর বাংলাদেশের জেলা, সমান সংখ্যক, চৌষট্টি উভয়েই। কতদূর রিচ করতে পেরেছি আমরা, পরিসংখ্যানের পুনরুল্লেখ দরকার আছে? কেউ কেউ কৌতূহলী হয়ে ফের জিগ্যেশ করতে পারেন, জেলার কার কাছে বা ঠিক কোন জায়গাটায়  যেয়ে পেতে পারি জিনিশগুলো? হকার ছেলেটার কাছে চেয়ে দেখব? না, আপনি এই ভীষণ বিশেষ পত্রিকাগুলো যত্রতত্র পাবেন না, পাবেন বইয়ের দোকান বা বুকশপগুলোতে। যেনতেন বইদোকান না, আমাদেরকে পাওয়া যায় নির্দিষ্টধরন কিছু বুকশপে, সেগুলোর ডাকনাম ‘সম্ভ্রান্ত লেখক ও মননশীল পাঠকের বইয়ের দোকান’। সে-রকম দুয়েকটায় উঁকি দিয়ে যদি না-পান আমাদের দেখা, জানবেন তবে, জেলার সর্বত্র সুলভ নই আমরা। খুঁজেপেতে জেলাশহরের একটা বা দুইটা বুকস্টোরে পেয়ে যদি যান, তবে আপনার সাতজন্ম সফল হলো। অবশ্য শাহবাগ বা আধুনিক কাঁটাবন জেলার একাধিক গ্রন্থমণ্ডপে বছর জুড়েই ঝুলে থাকি আমরা। তার বাইরের রেসলিঙরিঙগুলো লড়াইয়ের পক্ষে তেমন সুবিধাজনক মনে করি না আমরা। আমাদের একটা স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান রয়েছে, এটা আপনাকে বুঝতে হবে, এলেবেলে ব্যাটলফিল্ড এড়িয়ে চলি আমরা। আমরাই নেভিগেইট করে থাকি সাহিত্যসংস্কৃতির গতিপথ, হ্যাঁ, আমরা!

এদিকে, এত গর্জনের পর বর্ষণের মাত্রা মাপতে যেয়ে মাথায় বাজ। কথিত ছোটকাগজান্দোলনের চালশে বয়স, অথচ এদ্দিনে ন্যূনপর্যায়ের একটা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারা যায় নাই। বিপণনের একটা মিনিমাম কাঠামো, একটা কার্যকর কম্যুনিকেশন, হলো না আজও। হয়েছে বটে, মেলা, আহা মরি মরি লিটলম্যাগাজিন শোভাযাত্রা! কাছা যায় খুলে, সেদিকে খেয়াল নাই, আছে আত্মম্ভরী পায়রা ওড়ানোর বাবুবিলাস। সর্বসাকুল্যে সাতখানা সতেল-সগর্ব মুখের শোভাঢ্য পদযাত্রা, সাত পা আগায়েই ডিক্লেয়ার্ড সাফল্যমণ্ডিত লিটলম্যাগ ম্যুভমেন্ট, স্থিরচিত্রার্পিত কবিতাসাহিত্যের কলম্বাসবৃন্দ। মিশন অ্যাকম্প্লিশড। রাত্তিরে গেহে ফিরে ফেসবুকে আপলোড করলেই কেল্লা ফতে।

কে ভাববে এদের কথা, — যে-ছেলেটি যে-মেয়েটি পল্লিবিদ্যুতের লুকোচুরির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে খেলে চলেছে হাঁটু ও হৃদয় জখম করে শব্দে নৈঃশব্দ্য ধরার খেলা? তার সঙ্গে, তাদের সঙ্গে, কে পাতাবে সখ্য? নতুন কবিতা, নতুন কবি, কীভাবে পয়দা হবে? সেতুটা কোথায়, সংযোগের? সেতু আছে, অবশ্য, সম্পিরিতির। যেমন নায়কের ছেলেমেয়ে নায়ক-নায়িকা, যেমন ডিরেক্টরের শালা-সমুন্দি ডিরেক্টর, যেমন রানীর তনয় রাজা, যেমন মন্ত্রীর ভাগ্নে-ভাইস্তা মন্ত্রী, তেমনি কবি হবে কবিদেরই ভাইবিরাদর। বেশ, বহোৎ খুব, অল ইজ ওয়েল।

এভাবে, আর-যা-ই-হোক, অভাবিতের দেখা পাওয়া যাবে না কখনো। এভাবে, আর-যা-ই-হোক, অনাস্বাদিতের স্বাদ চাখা যাবে না কখনো। এভাবে, আর-যা-ই-হোক, অভূতপূর্বের উদ্ভাসন হবে না কখনো।  এভাবে, আর-যা-ই-হোক, অজানারে বাহুডোরে পাবে না কখনো। এইভাবে, আর-যা-ই-হোক, বাংলা কবিতার বাঁকবদল হবে না কখনো। হবে; বাকবাকুম হবে, পায়রা উড়বে, মাথায় টায়রাও জুটবে। সেইসঙ্গে লেপ্টে রইবে আমাদের পিঠে বাংলা সাহিত্যকবিতাপাঠকের ভেংচি ও বুড়ো-আঙুল।

সময়ের সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীরা, আমাদেরই আত্মজ অথবা সহোদর, লিটলম্যাগের কথা শুনে ফ্যালফ্যাল তাকায়া রয়। বুঝতে পারে না, সদ্য প্রবর্তিত মাইনর বা মেজর হয়তো, ভাবে। সে দেখেই নাই কোনোদিন জিনিশটার রূপ। লিটলম্যাগাজিন মামুজির মুখখানাই সে দেখেনি ইহজন্মে। আমরা তার সামনে সেটা নিয়ে যেতে পারিনি। কিসের এত বড়াই আমাদের? শিক্ষিত শহুরে মধ্যবিত্ত, সংস্কৃত ও সমুজদার,  লিটলম্যাগের লম্বাচওড়া গালগল্প শুনে বাতচিতকারীর কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্ব নিশ্চিত করেন। পাবনা-গমনোপযোগী কিংবা আজকেই ডিসচার্জড, তার শরীরী ভাষাভঙ্গিতে সুস্পষ্ট সেই পাঠ, ঠাওরেছেন নির্ঘাৎ। তার দোষ নেই। তিনি হপ্তান্তে একটা সাপ্তাহিক রাজনীতিবিশ্লেষণী, পক্ষান্তে একটা পাক্ষিক পাঁচমিশালী আর মাসান্তে একটা মাসিক সাহিত্যপত্রিকা রেগুলার সাবস্ক্রাইব করেন। তদুপরি দৈনিকের নানাবাহারী ম্যাগাজিন তো রয়েছেই। কিন্তু অমৃতসমান লিটলম্যাগাজিনের কথা তিনি এই প্রথম শুনলেন, এর আগে দেখা দূর শোনেনও নাই। কিসের জোরে এত এত তাফালিং আমাদের? এত ফালাফালি-লাফালাফি?

বেফায়দা ফিরিস্তি এসব। বন্ধ করে একটু কল্পনাপ্রতিভা অবলম্বনে দু-চারটা বাক্য বুনে এবার বিদায় হই। নিয়ে যদি যেতে পারতাম তাদের সামনে, জাস্ট ইম্যাজিন, কেমন হতো ছবিটা? পূর্ণদৈর্ঘ্য রঙিন, ফ্যুল অফ অ্যান্থুসিয়্যাজম, প্রেক্ষাগৃহ হাউসফ্যুল! ওই য়্যুনিভার্সিটির ঝকঝকে যুবা/নাতিবৃদ্ধ শিক্ষক, পড়তেন না? স্কুলের হেডমাস্টার, হাতে একবার নিতেন না? ব্যাঙ্কের লোন-সেকশনের অফিসার কিংবা স্তব্ধকরুণ ক্যাশিয়ার, লাঞ্চাওয়ারে একাধটু উল্টাপাল্টাতেন না? ওই মুদিবিক্রেতা, ঠোঙা বানানোর আগে একটু ঠুকরে নিতেন না কান্নাহাসির চিহ্নগুলো? ওই মাছের আড়তদার কিংবা গোডাউনের গানপাগলা দারোয়ান, ওরাও তো রবীন্দ্রনাথ-নজরুলকে চেনেন। কিংবা ওই ডেইলি-সোপ-অপেরার ব্যাকুলা দর্শক, গৃহিণী ও গানের শিক্ষিকা, নাচের কোরিয়োগ্র্যাফার, ফেয়ার-অ্যান্ড-লাভলি বিদূষী বনিতা, কিংবা ওই বিষণ্ণবর্ণিল রোগিণীর প্রেমে-পড়া ডাক্তার, কিংবা ওই সংস্থাপনসচিবের সহকারিণী, কিংবা ওই এস্পায়োনাজ অ্যাজেন্ট … ইহাদের কারো কাছেই আমরা পৌঁছাতে পারিনি।

কী হবে দুঃখ করে, আমরা তো এতেই খুশি … ইহকালে কেউ না-জানুক, আমরা তো এ-ই চেয়েছি … বাপব্যাটা দু-ভাই মিলে, পিককের পর্যটনে … আমরাই শেরেবাংলা, আমরাই শেরশায়েরি … গোসাঁইয়ের নুন   কবিতায়, আমাদের গোলাপচারা … ফুল কি হবেই তাতে, সে-কথায় আসছি না আজ … বাবুদের তালপুকুরে, হাবুদের ডালকুকুরে … সে যে কী মনোলোভানো, অপরূপ রাইবিনোদন … ছেপেছে দৈনিকেতে, গোটাতিন পদ্য আমার … কী দারুণ বক্সট্রিটমেন্ট, কী দারুণ কাইয়ুমরেখা … মাঝে মাঝে প্রেম ছুটে যায়, মাঝে মাঝে রাগগোস্বা … মাঝে মাঝে মান-অভিমান, ফেসবুকে গোষ্ঠী কিলাই … কিন্তু অতলে-তলে, উমেদারি ঠিকই চলে … ফের আবার প্রেম এসে যায়, ফের আবার স্বামীর সোহাগ … ফের আবার স্পেস পেয়ে যাই, ফের আবার বুকরিভিয়্যু … হা হা হা তালিয়া বাজাও, থ্রিচিয়ার্স তাকধিনাধিন … কী হনু কবি হে আমি, কী হনু বুকরিভিয়্যুয়ার … হো হো হো কামালপাশা, তু নে কী কামাল কিয়া … আমরা তো এ-ই চেয়েছি, সুতো থাক আমার হাতে … নয়া মসনবদার আমি, দৈনিক সুপ্রভাতে … পেয়েছি সিঁড়ির হদিশ, ও-ই তো পরম পাওয়া … যে আমায় কয় না কবি, দে ধোলাই কর্ রে ধাওয়া … আমরা তো অল্পে খুশি, ভান করি দুঃখী দারুণ … জিন্দেগি জিনে-কে-লিয়ে, অতএব গাই প্রভুগুণ … তবু যারা লাইন মানে না, তারা সব মহা উজবুক … মহাকালে জুম্মাবারে, আমাদের নাম ছাপা হোক॥

বহু পুরনো বকাবাদ্যি ওইসব, তফাৎ যাই, ইয়ে জেহাদ ঝুটা হ্যায়। অন্তত ছোটকাগজের ইতিহাস সেই কথাই বলছে। এ-মুহূর্তে এই কথাটাই উইথ অনেস্টি স্বীকার করি যে, ছোটকাগজ নয়, এঁটো-যোগানদার দৈনিক পত্রিকার হপ্তাহিক আড়াই-সাড়েতিন পৃষ্ঠার সাহিত্যসাময়িকীগুলোই রস হোক আর কষ হোক কিছুটা সাপ্লাই দিয়ে চলেছে। কেবল ফাল্গুনে এক-দুইটা পুরনো ইঁদুর কোটরের থেকে বেরিয়ে তেঁতুলতলার হুল্লোড়ে এসে মজমা বসায় মাকসুদের মেলায় যাই রে   গানের তালে নেচে। বেহুঁশ সেইসব ইঁদুর/ছোটপত্রিকার পেল্লাইপোষ্টাই গা-গতর দেখে বেদনা মধুর হয়ে যায় । দেখি দেখি, নতুন কবির মুখখানা দেখি! নাই। নতুন গদ্যকার কই, দেখি বাছা বুকের ছাতিখান? নাই। ওবেসিটি ইশ্যু সব, অ্যাকোর্ডিং ট্যু মেডিকেল টার্ম। মোটাগাট্টা পাছা-থাই-পেট-বক্ষ। তবু বেরোচ্ছে বলে এক-দুইটা আজও দেখা যায়, নেড়েচেড়ে আমরা তাই রোমন্থনের সুযোগ পাই আমাদের স্মৃতিস্বপ্নভবিষ্যৎ, কবে আবার বুড়ি চাঁদ যাবে চলে বেনোজলে ভেসে!

এত অসংখ্য কবিতার-গল্পের ছোটপত্রিকা বেরোত, অজস্র রোগাপটকা কাগজপ্রবাহ, কই সেই পাখিগুলো? কোথা গেল উড়ে, কেন ফিরিল না আর? সেই স্রোত, সেই জোয়ার, কেন গেল থেমে? কেন, কোন সেই ভুল, কোন অপরাধে? কে দায়ী? জুডাস, জেসাস, জগদম্বা? স্টপ ইট! হিস্ট্রিবিশ্লেষণ অনেক হয়েছে, হিস্ট্রিটা পাল্টানো দরকার। পারো তো পাল্টাও, নয় আমাদের বগলবাজনাটাই মনোযোগ সহকারে শুনে যেতে দাও! তবে একটা ট্রু স্টেটমেন্ট এখানে উৎকীর্ণ থাক : অত সাধের ময়না আমাদের টুইঙ্কল-টুইঙ্কল লিটলম্যাগাজিনগুলো ডুবোতেলে-ভাজা দৈনিকের সাহিত্যসাময়িকীর সঙ্গে গাণিতিক সংখ্যায় কিংবা গুণগত মানে কোনোভাবে পেরে উঠছে না আর; ফ্র্যাঙ্কলি স্পিকিং, অধুনা আমাদের মতো ছোটপত্রিকা/সাহিত্যপত্র/লিটলম্যাগাজিনওলাদের অবস্থান উহাদের থেকে অ্যাট-লিস্ট হাফইঞ্চি নিচে। এই নিয়েই মোদের গরব মোদের আশা, আ মরি ছোটপত্রিকা খাসা! মাইরি বলছি, আমি নিজে ওই অচলায়তনের পৃষ্ঠপোষক। লিটলম্যাগাজিন আজ একটা স্ট্যাটাস-ক্যু, স্থিতাবস্থা, আমরাই এই ক্যুদেতা ও অদৃশ্য কালাশ্নিকভ্ হাতে এমতাবস্থা জারি রেখে চলেছি। কী ট্র্যাজিক আয়রনি, দেখো, সবার আগে সেই ক্যুদেতারাই আজ সাফোকেশনের সাফারার! আমরা পত্রিকা করি, পিঁপড়াও পুঁছে না। আমরা কবিতা লিখি, কীটেও কাটে না। আমরা নিজেরাই ছাপি, নিজেরাই পড়ি, নিজেরাই নিজেদেরে বাহবা দেই, নিজেদেরে নিজেরাই গালিগালাজ করি। কিন্তু তবু ভুলেও পাঠকের মুখোমুখি হই না আমরা, পাঠক এড়িয়ে চলি, পাঠক-সাধারণকে আমরা গ্রাহ্যেই নেই না। আমরা এতটাই নার্সিসাস! ফলে এহেন জনবিচ্ছিন্ন, পাঠকবিচ্ছিন্ন, অবধারিতভাবেই অবক্ষয়িত আমাদের ছোটকাগজবাহিত লেখালেখি ও ছাপাছাপি ও পড়াপড়ির জগৎ। ফলে একটা সময়ে এসে, ন্যাচারাল কারণেই, একেবারে তেজহীন ও স্তিমিত হয়ে এসেছে একদল মানুষের বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার সাংস্কৃতিক তৎপরতা। আজ, সারাবছরে, সাতটাও ছোটকাগজ বের হয় কি না গোনা লাগবে।

এটা একদিনের ঘটনাব্যাপার নয় মাসিমা, ওভারনাইট অমন অচলাবস্থা তৈয়ার হয়নি মেসোমশাই! ডোর-লকড্ লিটলম্যাগাজিনের চর্চা আমাদেরকে এ-নোম্যান্সল্যান্ডে নিয়ে এসেছে। এখনো অবশ্য সময় আছে, যেতে যদি চাই ফের লোকালয়ে ফিরে। কেননা আমরা তো ঘোষণা দিয়ে মানুষের যোগদান রুখে দিয়েছি, বিশেষ-দ্রষ্টব্যে এহেন অশ্লীল নিষেধাজ্ঞা ছাপিয়েছি যেন আমাদের ঠিকানায় স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কেউ লেখা না পাঠায়! মনে পড়ে, মিস্টার এডিটর? ‘আমরা আমাদের নির্বাচিত সম্ভাবনাময় তরুণ লেখকদেরকে স্বীয় পত্রিকায় লিখতে আমন্ত্রণ জানিয়ে থাকি’, হুম্! কোথাকার কোন নাটোর না ছাগলনাইয়ার নাড়ুগোপালদের নেকাজোকা পাঠের সময় বা সদিচ্ছা আমাদের নাই। আর তাছাড়া, আমরা দাপ্তরিক নাকি, আমরা তো সম্পাদক! ডাকে-আসা কাঁপাকাঁপা গাদাগুচ্ছের কবিতা বাছাইয়ের কেরানিগিরি করে শেষে প্রিয়তমে-প্রেমিকা হারাব? অতটা আত্মবলিদান, অতটা জানকুর্বান, পসিবল নয়কো। বহেড়াগাছের বেদিমূলে ফেব্রুয়ারি-ডিউরিং কত কত কুক্কুটের আনাগোনা, সারমেয়-ঘেউঘেউ, মেকুর-মিউমিউ, ওইতেই সম্বচ্ছরের যোগান, ওইতেই কুর্বানি; মহাকালেশ্বর নিশ্চয় কবুল করেন! অতএব, এই দোষ আমাদেরই … হে প্রিয় ব্রুটাস, পাপ কোনোদিন আকাশে থাকে না।

তাহলে উপায়, আজ যদি জিগ্যেশ করা যায়, শ্রদ্ধেয় সুকুমারবৃত্তিজীবী রুদ্ধদ্বার কাগজাবতার! তাহলে উপায়? বার করুন, সম্পাদক মশাই, উপায় বার করুন। অন্তত নিজের এবং বাংলা সাহিত্যের নিউট্রিশনের প্রয়োজনে একটা উপায় বার করতেই হবে। আপাতত খুলে দাও দ্বার, গাহো বন্দনাগান অজানার; আপাতত দ্বার খুলে দাও, অচেনারে আহ্বান জানাও; আপাতত দ্বার দাও খুলে, ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল এসে ঢুকুক সমূলে; খুলে দাও দ্বার আপাতত, অসূয্যম্পশ্যা-অবরোধবাসী সক্কলে সদলবলে হোক স্বাগত। শতজলঝর্ণা হোক আবার ধ্বনিত, শত হস্তে বাংলা কাব্য ও অন্যান্য প্রকাশপ্রকরণসমূহ হোক মুখরিত। ওই যে-মেয়েটি যে-ছেলেটি ভিড়ের বাইরে চুপচাপ, শোনো তাকে, বলতে দাও ওর বলার কথাটি। ওকে ভাষা দাও, ভাষার উঠোনে ওকে সাদরে নাও টেনে। আমাদের প্রকাশনাসমূহ সম্মানিত হোক বক্ষে ধারণ করে ওদের সংবেদনারাশি। ওই অচেনার ওই অজগেঁয়ের রাশি-রাশি ভারা-ভারা গান বাজুক সারাবছর শাহবাগ থেকে শান্তাহার, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, জাফলং থেকে শুভলং, কাঁটাবন থেকে সুন্দরবন জুড়ে। অজস্র কবির অসংখ্য কথাসাহিত্যিকের লোহু-দ্রোহ-হর্ষে ফের হারানো প্রাণ ফিরে পাক বাংলাদেশের ছোটপত্রিকাগুলো। ভূমিহীন ক্ষেতমজুরের বাংলা কবিতা পাক প্রকাশ ও বিকাশের অপরিমেয় ভূমি। ভীষণ অসম্ভবের, অচিন্ত্য অভাবিতের, স্বর শোনা যাক। পত্রিকায়-পত্রিকায় প্রাণবন্ত হয়ে উঠুক পুনরায় বাংলাদেশ, দুঃখিনী বর্ণমালায় বোনা কবিতামালিকা, বাংলা সাহিত্য।

ছোটপত্রিকার প্রতিটি সংখ্যায় পূর্ণাঙ্গ পোস্টাল অ্যাড্রেস, সেইসঙ্গে সেলফোন কন্ট্যাক্ট নাম্বার ও ইমেইল ঠিকানা, ছাপা হোক প্রথমপৃষ্ঠায় স্পষ্টাক্ষরে এ-আশায় যে এর মাধ্যমে সেই হারানো সুর, হৃত ওই সংযোগরেখাটি কিছু জোড়া লাগানো যাবে। আবারও নিধুয়া হাওর থেকে, হরিজনপল্লি থেকে, ধীবরজনপদ থেকে, পর্বতগ্রাম থেকে, সমুদ্রকূল থেকে, দুনিয়ার উত্তর ও দক্ষিণ সমস্ত মেরু থেকে উড়ে আসবে বাংলা গলার স্বর, বাংলা অক্ষর। পত্রিকায় অংশগ্রহণ করবেন পাঠক-লেখক-সমালোচক সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে, কখনো শব্দে কখনো নিশব্দে শরিক হবেন পত্রিকার সঙ্গে, কেননা ছোটপত্রিকা চালায়া যাওয়ার কাজ সম্পাদকের একার নয়। ছোটপত্রিকা প্রকাশ ও পরিচালনা একটি সমবায়ী শিল্প। অতএব, হে কিশোর কবি হে তরুণ ভাবুক হে চঞ্চল আলোচক হে স্থিতধী পাঠক হে প্রাজ্ঞ পরামর্শক, ছোটপত্রিকা সকলেরই লেখার ও পড়ার পত্রিকা। আবারও সংযোগ রচিত হোক, লেখক-পাঠক-সম্পাদক, তিন পাগলে মেলা হোক পত্রিকাপাতায়।

কিন্তু, সম্ভবত, মৌসুম বিগড়ে গেছে এতদিনে। এখন আর আগের মতো ছোটকাগজ বার করা যাবে না, বা গেলেও তা বাচ্চামিই হবে। এখন প্রকাশের বহু গলিঘাট সামনে এসেছে, সেসব সড়ক সদ্ব্যবহার করবার দিকে লেখক-এডিটর ও ছোটকাগজের শুভানুধ্যায়ী সকলেরে নজর দিতে হবে। এখনও নজর ওইদিকটায় কারোরই যায় নাই, কিছুটা-বা যা গিয়েছে তা ব্র্যান্ডনিউ বোতলে সেই তিতপুরানা সুধা ঢালবার পাঁয়তারা। খানিক আগের অনুচ্ছেদে লিটলম্যাগের ল্যাজেগোবরে দশা থেকে উত্তরণের নিমিত্তে যে হৈদরি হাঁক দেয়া হয়েছে, এইটা আদৌ এফিশিয়েন্ট কোনো পথ নয়, এইটা আকাশকুসুম আসলে, এইটাও ওই দিবাস্বপ্নই। লিটলম্যাগের এক্সপেরিয়েন্স থেকে যেটুকু বর্তমানে-ব্যবহারযোগ্য স্টকটেইক করা যাবে, সেইসব দিয়া আবার লিটলম্যাগ করতে গেলেই বিকট ব্লান্ডারটা ঘটবার আশঙ্কা। মাধ্যম বদলে গেলে পুরানা মালের মায়া ত্যাজিতে হয়। নাইলে সেই লিটলম্যাগটাইমের বিতিকিচ্ছিরিতারই রিপিটেশন ঘটবে।


এই নিবন্ধটা ২০১৩ জুলাই মাসে হোসেন দেলোয়ার সম্পাদিত ‘কবিতাপত্র’ সংকলনে ছাপা হয়েছিল। অবিকল এই নিবন্ধটাই নয়, এর আদি ভার্শন। পরে ২০১৫ জুলাই মাসেই ইমরুল হাসান সম্পাদিত ‘বাছবিচার’ ওয়েবম্যাগে এইটার আরেকটুখানি রিটাচড এডিশন ছাপা হয়। এইবারকার প্রকাশেও মূলের বক্তব্যগত অভিমুখ ক্ষুণ্ণ না করে বেশকিছু পরিমার্জন ও সংযোজন সম্ভব হয়েছে। — লেখক

… … 

COMMENTS

error: