ইলেকশনের সময় বিজ্ঞাপনী প্রচার নিয়া || ইমরুল হাসান

ইলেকশনের সময় বিজ্ঞাপনী প্রচার নিয়া || ইমরুল হাসান

SHARE:

চিলিতে পিনোচেট রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন ১৯৭৩ সালে। ১৯৮৮ সালে তিনি একটা গণভোটের ব্যবস্থা করেন এই বিষয়ের উপর যে, আরো ৮ বছর ক্ষমতায় থাকতে চান। সেই গণভোটে ৫৬% ‘না’ ভোট পান তিনি এবং পরের বছর জেনারেল ইলেকশনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা হারান।

এই গণভোটের জন্য ‘না’ এবং ‘হ্যাঁ’ সমর্থকরা টিভিতে  ১৫ মিনিট কইরা প্রচারণা চালানোর সুযোগ পায়, ইলেকশনের আগে। ‘না’ ভোটের পক্ষে যে নির্বাচনী বিজ্ঞাপন বানানো হইছিল,  সেইটা নিয়া একটা সিনেমা (ফিচার ফিল্ম, ডকুমেন্টারি না) বানানো হইছিল, ‘নো’ নামে, ২০১২ সালে। সিনেমাটা বেশ প্রংশসা পাইছিল। হইতে পারে বিজ্ঞাপন জিনিশটারে যেইভাবে গ্লোরিফাই করা হইছে, সেই কারণেই।

সিনেমাটাতে দেখা যায়, মূল থিম হিশেবে হ্যাঁপক্ষ এবং নাপক্ষ দুইটা ভিন্ন ভিন্ন ফোকাসপয়েন্ট বাইছা নিছিলো। হ্যাঁপক্ষ দেখাইল যে,  পিনোচেটের সরকার গত ১৫ বছর কি কি উন্নয়ন করছে, জিডিপি কেমন বাড়ছে, কত ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন হইছে, এইসব। আর এখন এই টেকসই গভর্নমেন্ট যদি না থাকে তাইলে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে, উন্নয়ন থাইমা যাবে। মানে, কি কি হইছে এবং না-হওয়ার ভয় – এই দুইটাই ছিল তাদের বলার বিষয়।

অন্যদিকে, নাপক্ষ সুন্দর এবং ড্রিমি ফিউচারের বিজ্ঞাপন বানাইল; যে, চিলিরে নতুন কইরা গইড়া তুলতে হইলে সবাই মিইলা কাজ করতে হবে, নতুন চিলি হবে সবার লাইগা, বাচ্চা মে’রা করবে নাচাগানা, আনন্দে — এইসব পজিটিভ জিনিশপত্র দিয়া ঠাসা।  বিরোধীদলগুলার জোট এই থিমটারে কোক-পেপসির বিজ্ঞাপন বইলা প্রথমে নিতে চায় নাই,  কিন্তু শেষমেশ মোটামুটি এইরকমের প্রচারণাই চালায়। অবশ্য খালি বিজ্ঞাপন না আরো অনেক কিছুই করে, ভোটারদের নাম এনলিস্টেড করা, ভোট দিতে কনভিন্স করা, ভোট দিয়াও যে চেইঞ্জ করা পসিবল, এইসব।

যেহেতু সিনেমাটা বিজ্ঞাপনটা নিয়া, সে ওই ইশ্যুটারেই সেন্টারপয়েন্ট করে যে, মানুষ কি হইছে সেইটা নিয়া খুব-একটা চিন্তিত না; কারণ পাব্লি জানে যে তারা জানে। এইটারে খুববেশি চেইঞ্জ করার উপায় নাই। কোনো রাজনৈতিক পক্ষ যদি মনে কইরা থাকে যে, পাব্লি জানে না, তারা আসলে নিজেদের নাজানাটারেই রিফ্লেক্ট করে

‘উন্নয়ন’ করাটা ভোটে জিতার জন্য মুখ্য বিষয় না। পিনোচেট অর্থনৈতিকভাবে খুব কম কিছু করেন নাই। অথবা এরশাদের কথাই ধরেন না, ‘উন্নয়ন’ যদি মুখ্য ব্যাপার হইত, তাইলে সেই সময়ে বাংলাদেশের ইকোনমিক ইন্ডিকেটরগুলা পজিটিভের দিকেই ছিল এর আগের সরকারের তুলনায়। (যদিও এই ইন্ডিকেটরগুলি খুবই ইনসাফিশিয়েন্ট কিছু জিনিশ, এইটা এতদিনে আমরা জানি।)  আওয়ামী লীগ যদি দেখে যে, মানুষজন জানে না  উনারা কি কি ভালো কাজ করছেন, তার মানে এই না যে, পাব্লি খালি জানে না; তার মানে এইটাও যে জনগণ এইসব কিছু জানাটারে পলিটিক্যালি খুববেশি ইম্পোর্টেন্ট মনে করে না

এই অর্থনৈতিক উন্নয়নের কনফিডেন্স আসলে একটা রাজনৈতিক ইল্যুশন। পাব্লিকের কনজামশনপাওয়ার যত বাড়তে থাকে, তাদের নিজেদের ততটাই কনফিডেন্ট হয়া উঠার কথা; নিজেদের ক্ষমতারে আরো বেশি কইরা বুঝে উঠতে পারার কথা। সরকার যদি মনে করে যে,  এই ‘উন্নয়ন’ তার কারণেই সম্ভব হইছে, জনগণের কোনো কন্ট্রিবিউশন নাই, তাইলে ত আরো বিপদ!

তার মানে এই না যে, আওয়ামী লীগ এইসব পয়েন্ট হাইলাইট করব না; কিন্তু ভোটে জিতার লাইগা যদি এইটারেই মূল অ্যাজেন্ডা হিশেবে হাজির করে তাইলে তাদের ক্যাম্পেইন দুর্বল হওয়ার কথা। ভয়ভীতি দেখানোর প্ল্যানটা আরো ব্যাকফায়ারই করবে। কিন্তু ক্ষমতা এমন একটা জিনি, যেইটা অপারেটই করে একটা ফিয়ারফ্যাক্টররে তাজা রাখার ভিতর দিয়া। ১৯৯৬-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জিতার মূল কারণ তাদের আন্দোলন-সংগ্রাম না, বরং কাইন্দা দেয়ার ভিতর দিয়া শেখ হাসিনার ডেডিকেশনরে স্পষ্ট করাটা। গত ইলেকশনেও উনারা উনাদের অ্যাজেন্ডাগুলারে অনেকবেশি বিশ্বাসযোগ্য কইরা তুলতে পারছিলেন বিএনপির তুলনায়, অ্যাপার্ট ফ্রম অল আদার পলিটিক্যাল কন্সপিরেসিস।

একইভাবে, বিএনপি যদি ক্যাম্পেইনের ফোকাস রাখে শুধুমাত্র আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যর্থতাদে আর শিওর টু ফল ইনটু দ্য ট্রাপ। আওয়ামী লীগের বাজে কাজগুলা মানুষ ভালোই জানে, কিন্তু বিএনপির বিজ্ঞাপনী প্রচারটা থাকা দরকার যে, কোন কোন জায়গায় এবং কিভাবে তারা আওয়ামী লীগের চাইতে বেটার হইতে পারে, সেই জায়গাগুলারে বিশ্বাসযোগ্য কইরা তোলা

উনারা যখন উনাদের দলের বিজ্ঞাপন বানাইবেন বা প্রচারণা চালাইবেন তখন কি কি উন্নয়ন করছেন তার চাইতে কি কি উন্নয়ন করবেন, সেইটারে বিশ্বাসযোগ্য কইরা তোলাটা ভোটে জেতার জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়া উঠব, পাব্লিকরে ইনফ্লুয়েন্স করার লাইগা — এইটাই ‘নো’ সিনেমার ভিতর দিয়া অ্যাডইন্ডাস্ট্রির প্রপোজাল, — পলিটিকসের কাছে। পজিটিভিটি শুধুমাত্র এই কারণেই দরকার না যে, এইটা রাজনৈতিক দল সম্পর্কে জনগণরে একটা আরাম দিবে; বরং আমি ‘ভালো’ কাজ করতে চাই — এইটা বিশ্বাসযোগ্য কইরা তোলাটাই রাজনৈতিক প্রচারণার জন্য ক্রুশিয়াল হওয়ার কথা। আর বিজ্ঞাপনের কাজ তো এইটাই, ঘটনা যেইটাই হোক তারে মোর বিলিভেবল এবং ডিজায়ারাবল করতে পারাটা।

Movie-title: NO ।। Genre: historical drama ।। Director:  Pablo Larraín ।। Starrings: Gael García BernalAlfredo CastroAntonia Zegers  ।। Origin: Chile ।। Running time: 118 minutes ।। Released in 2012

… …

ইমরুল হাসান

COMMENTS

error: