কষ্ট ১৯৯৫ ও একজন আইয়ুব বাচ্চু || গ্যাব্রিয়েল সুমন

কষ্ট ১৯৯৫ ও একজন আইয়ুব বাচ্চু || গ্যাব্রিয়েল সুমন

SHARE:

নব্বইয়ের শুরুতেই বাংলাদেশের শিল্পসাহিত্য, সিনেমা এবং সংগীত একটা দুর্দান্ত গতি পায়। এর কারণ সম্ভবত রাজনৈতিক স্বতঃস্ফূর্ততা। এরশাদ সরকারের পতনের পর হতাশাগ্রস্থ যুবসমাজ একটা আলোর পথ খুঁজে পায়, এবং সেই পথ ধরে এগোতে থাকে। শিল্পী কবি সাহিত্যিক সবাই যেন একটা বসন্তের বাগান খুঁজে পায়, সৃষ্টির। শিল্পসাহিত্যের ভোক্তা যারা, তারাও একটা দারুণ সময়ের ভিতর দিয়ে যেতে থাকে।

প্রেম ও ছ্যাকা খাওয়ার সাথে কী রাজনৈতিক অস্থিরতার কোনো সম্পর্ক আছে? থাকতে পারে আবার নাও পারে। তবে নব্বইয়ের সময়টাতে যখন প্রেমের সম্পর্ক ছিল চিঠি ও টেলিফোনকেন্দ্রিক। দেখা হবার জন্য প্ল্যানগুলোও এই পথেই। আর দেখা হবার ব্যাপারটা খুব কম। ফলে আকুতিটা অধিক ছিল। একই সাথে প্রেমিক বা প্রেমিকাকে হারাবার বেদনাটাও একটু বেশি ছিল। কিছুটা ক্ল্যাসিকও।

নব্বই-পরবর্তী সময়টাতে ছ্যাকা খাওয়া বড়ভাইদেরকে দেখা যেত চুল-দাড়ি রেখে একটা দেবদাসভাব আনার চেষ্টা করছেন। নব্বই পর্যন্ত যে ডিপ্রেশন, তাতে ছ্যাকা খাওয়া বড়ভাইদের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। যে-ধরনের গান উৎপন্ন হচ্ছিল ইন্ডাস্ট্রিতে, সেখানে আসলে সব ধরনের গান ছিল। এইসব বেদনা উদযাপনের গান, রাজনৈতিক হতাশামূলক গান। এইখানে একটু বলা যায় ফিলিংস-এর ‘জেল থেকে বলছি’ গানটার কথা, যেখানে এই নব্বই-পরবর্তী রাজনৈতিক হতাশা জেলখানা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। ওয়ারফেজ  বলতেছে, তুমি কি দেখেছ দুঃসময়ের সকাল, চিৎকার করে পা বাড়ায় অধিকারের কথা। এলআরবি  ‘ধুন’ নামক মিক্সড অ্যালবামে একটা গানে বলতেছে, “লোকজন কমে গেছে রাস্তাঘাটে / ধরাধরি চলছে সমান তালে” …

এ-রকম পরিস্থিতিতে শহরের, শহরের বেদনাআক্রান্ত প্রেমিকদের কথা হালকাভাবে কিছু গানে বলা হলেও খুব ব্যাপকভাবে আয়োজন করে আবার বলা হয় নাই। ১৯৯৫ সালে ‘কষ্ট’ ক্যাসেট আসার পর দেখা গেল, খুব আয়োজন করে এইসব বেদনাআক্রান্ত প্রেমিকদের বেদনা আর কষ্টকেই মোটামুটি উদযাপন করে ফেলা হয়েছে।

“অই রাত ঘুমালো
অই চাঁদ ঘুমালো
নিভে গ্যাছে একে একে সব আলো
আমি জেগে আছি একা
ঘুম নেই নেই চোখে
এ জীবন আমার এলোমেলো”

অই সময়টাতে এমন কোনো ছ্যাকা-খাওয়া তরুণ পাওয়া মুশকিল যে আইয়ুব বাচ্চুর ‘কষ্ট’ ক্যাসেট শোনে নাই। এইভাবে প্রেম সংক্রান্ত কষ্টের কথা পুরো ক্যাসেট জুড়ে আর অইভাবে বলা হয় নাই। তো অইসব প্রেমিকদের কাছে এই ক্যাসেট একটা প্রার্থনালয় কিংবা বেদনা প্রশমনকেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে। “আমার একটা নির্ঘুম রাত / তোমার হাতে তুলে দিলেই / বুঝতে তুমি কষ্ট কাকে বলে” (লতিফুল ইসলাম শিবলীর লিরিক) … তার আগে এই কথা এইভাবে কেউ বলে নাই। যখন কেউ কারো মনের কথাটা বলে দ্যায়, বেদনা তখন অই পথে রিলিজ পাইতে চায় হয়তো।

আমরা জানি বেদনা হচ্ছে এমন এক অনুভূতি, যেটাকে যে-কোনো পথেই হোক বেরিয়ে যেতে দিতে হয়। গানের কথায় যখন বলা হচ্ছে, “আমি কষ্ট পেতে ভালোবাসি তাই তোমার কাছে ছুটে আসি” বা “অবাক হৃদয় নিয়ে থমকে গেছি আমি” — এখানে বেদনাআক্রান্ত তরুণদের মনের কথাটাই চমৎকার সুর আর ইনোসেন্ট গায়কীতে গাইতে পেরেছেন রকস্টার আইয়ুব বাচ্চু তার তিন নাম্বার সলো ক্যাসেট কষ্টতে। “যদি ভুল করে তোমাকে চাই / বলো আমার কী দোষ / যদি মন ভালোবাসে তোমায় / বলি আমিও মানুষ।” নব্বইয়ের প্রেমিকের দল আসলে প্রথম জেনারেশনও না। মুরব্বিরা প্রেমভালোবাসাকে খুবই নেতিবাচকভাবে দ্যাখেন। প্রেম চালাতে হয় লুকিয়ে। সেই কারণে কষ্টের ব্যপ্তিটাও অতিমানবিক। প্রেমিকাকে ভুলতে পারছে না কিছুতেই। তার জন্য এই গান ছিল একদমই বেদনানাশক মলমের মতো।

‘আমার জীবন কাটে’ নামে একটা জ্যাজ গান রয়েছে এই ক্যাসেটে। এইটাও যেন ফুঁ দিয়ে দিয়ে বুদবুদের মতো বেদনা উড়াবার এক গান।

এইখানেই শেষ না, আইয়ুব বাচ্চু অই ক্যাসেটে এইটাও বলতেছেন, “বহুদুর যেতে হবে / এখনও পথের অনেক রয়েছে বাকি”। এইটা মনেহয় একদম লাস্ট ডোজ। ক্ষত সেরে যাবার মুহূর্তে যে-রকম ভিটামিন দরকার হয়, অনেকটাই সেরকম।

রূপালি গিটার থেমে যাবার পর এই দেশের সব ধরনের মানুষ কেন যেন থমকে গিয়েছিল। নব্বইয়ে যখন ব্যান্ড মিউজিকটাকেই অইভাবে স্পেস দেয়া হচ্ছিল না, কিন্তু এত মানুষ এইভাবে শোকের নদীতে স্নান করবে এইটা কেউ কী ভাবতে পেরেছিল! এইসব তরুণেরা আজ হয়তো চল্লিশোর্ধ্ব, তারা কিন্তু থমকে গিয়েছেন! মুহূর্ত যেন থেমে গিয়েছিল। আর যারা কিশোর অই সময়টাতে, তারা কেউ বিশ্বাসই করতে পারেনি আইয়ুব বাচ্চু নেই।

এই ক্যাসেটটির গায়ে লেখা ছিল সুর ও সংগীত : রবিন, যেটা আইয়ুব বাচ্চুর ডাকনাম।

সুরের কখনো মৃত্যু হয় না, সুর এই পৃথিবীতে থেকে যায়, মহাকালের পৃষ্ঠায় সোনালি রেখার মতো। সুর হচ্ছে সত্য। তাই সুরের যেমন মৃত্যু নেই, এইসব অনাবিল সুরস্রষ্টারও কোনো মৃত্যু নেই। আইয়ুব বাচ্চু আপনি ছিলেন, আপনি আছেন, আপনি থাকবেন। শুধু ঠিকানাটা বদলাবে, আপনাকে লেখা চিঠিগুলো আমরা এখন থেকে আকাশের ঠিকানায় পোস্ট করব …

… …

COMMENTS

error: