ভিনসেন্ট : বইরিকালেকশন

ভিনসেন্ট : বইরিকালেকশন

বুকরিভিয়্যু নয়, সেইজন্য বইটা নাকের ডগায় রেখে কথা বলা বাঞ্ছনীয়, এখানে যে-বইটা নিয়া আলাপে উদ্যোগী হয়েছি এ-মুহূর্তে, এইটি পড়েছিলাম ২০০৮ সাল নাগাদ, কোনো-এক সূত্র থেকে পেয়ে, অ্যানিওয়ে, এবং পড়ে ফেরৎ দিয়াছি মার্ক টোয়াইন অগ্রাহ্য করে এইটাও মনে পড়ে। এখন পস্তাচ্ছি যদিও, কয়েকটা বছর বেশি রেখে দিতে পারলে আজকে একটা বুকরিভিয়্যু রচিতে পারতাম নিশ্চয়ই। ইস্! তবু স্মৃতিনির্গলিত কথাবার্তার ভিত্তিতে প্যারা-দুয়েক লিখে সেইটাকে বুকরিভিয়্যু বলিয়া চালানো অসম্ভব হয়তো নয়, অনৈতিক হইলেও। তবে ল্যাঠা অন্যত্র, যেইটা আবার আমার জানিদুশমন, কোটেশন চয়ন করা ছাড়া বাংলায় বুকরিভিয়্যু হয় না। আমি অবশ্য দৈনিক পত্রিকার বুকরিভিয়্যু পড়ে বিদ্বান, এর বাইরের দুনিয়া ব্যাপারে এক্কেবারেই নিরালোক। তবু যদি বুকরিভিয়্যু লেখার সহজ তরিকা বিষয়ক ম্যানুয়াল টাইপের কোনো বইয়ের নাগাল পাইতাম, উপকৃত হইতাম। অন্তত নিজের জন্য, নিজের পঠিত ও প্রিয়, বইগুলি রিভিয়্যু করতাম কখনোসখনো অবকাশ পেলে। এইখানে এখন, কাজেই, যা করতে লেগেছি তা অ্যানিথিং বাট বুকরিভিয়্যু। বইস্মৃতিচারণ, শুনতে কেমন হইলেও, পঠিত বই নিয়া স্মৃতিনিবন্ধ। ফলে এখানে তেমন কড়া, হার্ডকোর বলে যারে, বুকপাঠকের খোরাক কিচ্ছুটি পাওয়া যাবে না।

আজকের বই ‘ভিনসেন্ট’, ছোট্ট এইটুকু নাম, এর বাইরে যেইটা জানানো সম্ভব শুরুতেই সেইটা হইল যে বইটা রয়্যাল বুকসাইজ। যথেষ্ট বড় কলেবর, কম করে হইলেও সাড়ে-তিনশ হবেই পৃষ্ঠাসংখ্যা, হরফ যথেষ্ট বড় বড় তথা সিনিয়র-সিটিজেনফ্রেন্ডলি এবং ফর্ম্যাটিং নন্দনগুণসম্পন্ন ও কাগজের কোয়ালিটি এক্সিলেন্ট। বইটা ছাপানো হয়েছে ইন্ডিয়ায়, ইন ক্যালকাটা, সেখানকারই লিখিয়েদের লেখাপত্তর অ্যাকোমোডেইটেড। সম্পাদিত গ্রন্থ, কয়েকজনের লেখা একসঙ্গ করে বের-হওয়া। আমাদের দেশে যেমন দেখা যায় এডিটেড গ্রন্থাবলিতে তেরোজন লেখক সন্নিবেশিত হইলে সেখানে পাঁচজনই ইন্ডিয়ান, অধুনা এক পাঁচটাকা দামের পত্রিকার শুক্রবাসরীয় সম্পূরক সাহিত্যপাতায় ইন্ডিয়ান লেখকেরা পাত্তা ভরে ভরে লেখেন, ওদের দেশে এই সিস্টেম কালেভদ্রেও নজরে পড়ে না। আমরা উদারনৈতিক, ওরা সাহিত্যসংস্কৃতি ও সমাজনৈতিক। উদারচেতা আর সমাজচেতা, দুইটার কোনটা ভালো ও উন্নত খ্যাতা, তা নিয়া ডিবেইটে পুড়িয়া আংরা হয়া যাক সংসার ও সভ্যতা — আমাদের তাতে কিচ্ছুটি ফালানো যাবে না। যা-হয় হোক, আমরা ভালো ও সজ্জন লোক, আমরা খাতিরতোয়াজপ্রবণ হিমার্দ্রীশিখর স্পর্শনে ইচ্ছুক। কথা কম। কাম বেশি। কিন্তু বইয়ের প্রকাশনাগৃহ অথবা দাম কিংবা প্রাপ্তিস্থানই-বা কই ইত্যাদি ইনফর্মেশন গাঁটে নাই।

ভিনসেন্টের, মানে ভ্যান গগ অথবা ভ্যান গখ উচ্চারণ যেমনই হোক তার, ছবি-আঁকা আর তার জীবনযাপনলগ্ন লড়াই, তার হয়ে-ওঠাকালীন শিল্পানুশীলন, প্রস্তুতির প্রত্যুষ ও প্রদোষ ও অপরাহ্ন-মধ্যাহ্নগুলা, পাশাপাশি তার স্বল্পায়ু জীবনে এঁকে-রেখে-যাওয়া বিস্ময়সংখ্যক চিত্রকর্ম, সুতীব্র তার জীবনলিপ্সা, লাস্ট ফর লাইফ, লঙ্গিং ফর আর্ট, ল্যভ টু পেইন্টিং, তার ক্ষ্যাপামো ও সর্বোপরি তার শিল্পাভিপ্সা আর  শিল্পপরিশ্রম — ছবি আঁকার জন্য অসম্ভব, প্রায় অমানুষিক, শ্রমনিষ্ঠা আর অতিমানুষিক ক্লেশসহা ধ্যান ও অধ্যবসায় — এই সমস্ত নিয়াই সম্পাদিত-সংকলিত বই ‘ভিনসেন্ট’, সংকলন-সম্পাদনকর্তা অনির্বাণ রায়। পদবী ভুল হইতে পারে, আ’য়্যাম অ্যাফ্রেইড, নাম নৈব চ।

বইটিতে রাখা হয়েছে ভিনসেন্টের কয়েকটি বিখ্যাত কাজ, চিত্রকর্ম, ‘আলুভোজীরা’ যার মধ্যে একটি। পোট্যাটো ইটার্স। অন্যান্য যেমন গমক্ষেতে কাউয়া বা কানকাটা ভ্যান গগ স্বয়ং অথবা নাক্ষত্রিক রাত্রির সেই ঊর্মিমুখর ক্যানভাস বা সূর্যমুখী ইত্যাদি। কিপ ইট ইন মাইন্ড দ্যাট এইটা সেই সময়ের বই যখন গ্যুগলসার্চবিহীন বর্বর এক আইয়ামে যাহিলিয়ার যুগে ছিলাম আমরা। কাজেই বইয়ের পাতা ছাড়া ছবি দেখা, মানে শিল্পতৃষা নিবৃত্ত করা, পসিবল ছিলনাকো। ফলে এখন যে-ছবিগুলা পাগল-নিরপেক্ষ-শিশু সকলের সমভাবে কমন পড়বে, তখন সেভাবে গণহারে কমন পড়ত না। আর ২০০৮ সাল অব্দি আমি ভিনসেন্টের সমগ্র চিত্রকর্মাদি গ্যুগল তল্লাশিয়া দেখিবার মওক়া লাভ করিয়া উঠি নাই। বিখ্যাত ও বহুল দর্শিত ‘পোট্যাটো ইটার্স’ ছবিটার চূড়ান্ত রূপধারণের পূর্ববর্তী আরও চারটে রূপ বা ভার্শন বইটিতে দেখেছিলাম ওই প্রথমবার, আজকাল তো দেখতে দেখতে হদ্দ, উপরন্তু কোনটা আসল কোনটা নকল বোঝাটাও দুষ্কর হয়ে উঠল, ফলে একটা মহৎ ছবির জন্মেতিহাস জেনে নেয়ার আনন্দ বইটি থেকে পেয়েছিলাম পয়লা। ‘আলুভোজীরা’ কাজটি ঘিরে দীর্ঘ কয়েকটি লেখা জুড়ে দেয়ার ফলেও গরিমা বেড়েছে বইটির। ভিনসেন্ট-লিখিত অজস্র পত্রাবলির বিশালাংশ থেকে একটা ভালো আয়তনের অংশ গ্রন্থিত হয়েছে এখানে, যে-পত্রাবলি লিখিত হয়েছিল ভিনসেন্টের প্রিয় বন্ধু ও পৃষ্ঠপোষক সহোদর থিয়ো ভ্যান গগকে অ্যাড্রেস্ করে। শিল্পীর শেষদিন পর্যন্ত ছোটভাই থিয়োর কাছ থেকে পেয়েছেন অকুণ্ঠ সহায়তা ও সমর্থন, অনুপ্রেরণা আর সাহস, অবাক ব্যাপার যে ভিনসেন্ট নিজের হাতে নিজের জীবন থামিয়ে দেবার ঠিক ছয় মাসের মাথায় থিয়োও ফিরে যান স্বাভাবিক মৃত্যুর কোলে!

এই বইয়ের কন্টেন্ট সত্যিই ভালো, সুসংবদ্ধ, মনন ও নন্দনগ্রাহ্য। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের প্রতি এডিটরের আস্থা গ্রন্থধৃত অন্যান্য রচনাকারের চেয়ে একটু নয় দৃষ্টিকাড়াভাবেই বেশি। তাতে অবশ্য পাঠকের ক্ষতি হয় নাই। ইন্ডিয়ান বাংলা কবি অলোকরঞ্জন অবশ্য পণ্ডিত মানুষ, বহুভাষাদক্ষও, ফলে একাধিক ধাঁচের লেখায় অলোকরঞ্জনের ইন্টার্প্রেটিভ গদ্যে লেখাগুলো পড়তেও মন্দ লাগে না। প্রাসঙ্গিক লেখাগুলাই গৃহীত হয়েছে। অন্যান্যদের নিবন্ধপ্রবন্ধ ধরনের লেখা সংকলিত হবার পাশাপাশি অলোকরঞ্জনের সঙ্গে এডিটরের ইন্টার্ভিয়্যু-পত্রালাপ ইত্যাদিও সংকলিত হয়েছে।  প্রেইজ করতে হবে এডিটরের মুনশিয়ানা। আগেই বলে নেয়া হয়েছে, এই বইটার হোল্ড আমার হাতে অধুনা না-থাকায় এবং গ্যুগলের ইমেইজ সেকশনে বইপ্রচ্ছদচিত্র না পাওয়া যাওয়ায় নিদর্শন দেখানো সম্ভব হলো না। খালি এডিটরের নামটা বলতে পারলাম, বইটা ভারতীয় বাংলা পাব্লিক্যাশন বললাম, এবং আমি নিঃসন্দেহ যে এইটা বাংলাদেশের চালু বইদোকানগুলায় কিনতে পাওয়া যায়। ইয়াদ আছে যে এর গায়ে সেঁটে দেয়া দামও বইয়ের শরীরগতরের তুলনায় কিছুই না।

আজীবন অপ্রকৃতিস্থ, প্রকৃতিনিমগ্ন এই শিল্পী আজকের যে-কোনো পরিশ্রমপ্রিয় সৎ শিল্পীমানুষের নিকট অনুপ্রেরণাস্থল। ৩০ মার্চ জন্মদিন তার। সেইটা এমন-কিছু ব্যাপারও নয়, এমনি একটা তথ্য, জাস্ট ইনফর্মেশন। তবে এরচে বেশি ভিনসেন্ট সম্পর্কে লেখার নতুন করে নেসেসিটি নাই। বিশ্বসুদ্ধা সবাই জানে। এবং গ্যুগলের তো মরণ নাই। ‘ভিনসেন্ট’ বইটা, বা তার আগে একই শিল্পীর জীবন উপজীব্য করে লেখা আর্ভিং স্টোনের উপন্যাস ‘লাস্ট ফর লাইফ’ যার একাধিক বঙ্গানুবাদ বাজারে সুপ্রাপ্য ও অন্যত্র অন্যান্যকিছু সংকলনভুক্ত ভিনসেন্টের পত্রসম্ভার ও তার উন্মাদনা ইত্যাদি নিয়ে একাট্টু পড়তে যেয়ে একসময় বৃদ্ধবয়সে এসে ফাইন আর্টসের একটা ইন্সটিট্যুশন খুলিয়া নিজেই তথাকায় শিল্পাচার্য অধ্যক্ষ পদাবৃত হইয়া বসিবার ইচ্ছা হয়েছিল, তখন খুব ট্রেন্ডি ছিল এই ব্যাপার আমার চারপাশে, এখানকার লোক্যালিটিতে সেইসময় জীবনেও-অঙ্কন-না-করা পয়সাওলা তারুণ্য ‘আটিশকুল’ খুলে দলে দলে অধ্যক্ষ হয়ে বসছিল, অনেক আয়াসে নিজেরে সে-যাত্রা সংবরণ করি। নিজেরে বুঝিয়েছি যে, বাঁচি যদি আশিবর্ষ, তো শেষপাদে যেয়ে এই ইনিশিয়েটিভ নেয়া যাবে নে। ট্যাগরের পদাঙ্ক অনুসরণ হোক অন্তত, গুম্ফধারী মিচকি বিলাইয়ের চেয়ে শ্মশ্রুমণ্ডা ঠাকুর তো অনুসরণযোগ্য অধিক।

কথা কমাও, কথার ঠাকুর, বাঁচো তো আগে। বেশি কথা আয়ুনাশী।

লেখা / জাহেদ আহমদ ২০১৪

… …