বাঁশি ও বিচ্ছেদী

বাঁশি ও বিচ্ছেদী

SHARE:

বিরহ ও বিচ্ছেদের পরিস্থিতিটা বাংলায় বাঁশিতেই ফোটে ভালো। সম্ভবত এই ল্যান্ডের মানুষের ব্লাডের ভিতরেই, শিরায় ধমনীতে, ইনকর্পোরেটেড রয়েছে এই বাঁশি বাদ্যযন্ত্রটা। বাঁশের বাঁশি, ইলেক্ট্রনিক কোনো যন্ত্র নয়, ইলেক্ট্রিক ফ্লুট নয়। বাঁশের বাঁশি। তরল্লা বাঁশের বাঁশি ছিদ্র গোটাছয়। ছিদ্র কমিবেশিও হতে পারে। কাস্টোমাইজড বাঁশি তো অনেক কিসিমেরই হতে পারে। অ্যানিওয়ে। একটা বাঁশি দিয়াই ন্যাশনের সাউন্ডস্কেইপটাকে, ল্যান্ডডুয়েলারদের কান্নাহাসা কামনাবাসনাটাকে, ডেপিক্ট করা সম্ভব সবচেয়ে পার্ফেক্টলি।

বিচ্ছেদের মিলনের উভয় সিচুয়েশনই বাঁশিতে আমরা যেই তীব্রতায় পাই, তেমন তীব্রতায় আর-কিছুতেই তা পাই না। যারা চায় নিজের অন্তরটা গানের ভিতরে দেখতে, চায় ছিঁড়েখুঁড়ে কলিজার সুবাস ছড়াতে চারিপাশে, তাদের জন্যেই বাঁশি। মিথ থেকে শুরু করে মাটির ডেলায় বাঁশি কার্যকর। বাঁশি বাংলার সবখানে। কেষ্টভূখণ্ডে চেইঞ্জ হয়েছে ঢের, লুপ্ত হয়েছে বহুকিছু, তবে বাঁশি রয়েছে। এখনও অন্তরে এই যন্তর সবচেয়ে এফেক্টিভ। সমব্যথী বাদ্যযন্ত্র। এই যন্ত্রেরই এক জাদুকর বারী সিদ্দিকী। তিনি শুধু বাঁশিতেই নয়, পাতালের হলাহলটাকে একটানে তার গলা দিয়ে তিনি অমৃত বানিয়ে দিতে পারতেন।

কণ্ঠসম্পদ বর্তমান বাংলায় ব্যাপক আকালের ভিতর দিয়া যাচ্ছে। কণ্ঠ আছে বেজায়, গায়ের জোর আর গলাবাজিও আছে এন্তার, কিন্তু গলা দিয়া আবিশ্বব্রহ্মাণ্ড অধিকৃত করা প্রায় সন্তর্পণে, এমন কণ্ঠসম্পদ কই? ছিল যা, তা আস্তেধীরে নাই হয়ে যেতেছে অমোঘ ভাটার টানে। মৃত্যু এসে সেই সম্পদগুলা মাটিতে টেনে নিচ্ছে একে একে। এই যেমন কিছুদিন আগে গেলেন সুবীর নন্দী। ফিলআপ হচ্ছে না সেই ব্ল্যাঙ্কগুলা। সামনে জোর আশার আলোও দেখা যাচ্ছে না। বারী সিদ্দিকী তেমনই একজন, যিনি পেশাদার বাঁশিশিল্পী হয়েও পরিণত পরিচয় এল কণ্ঠশিল্পী হিশেবে। এমন কণ্ঠ, মর্মচেরা এমন দমের অদম্ভ প্রয়োগ আর এমন দেহমন-নিংড়া টান, এ পৃথিবী বারবার পায় না তারে। এসেছেন, রেখে গেছেন কিছু সময়চিহ্ন সময়জয়ী, চলে গেছেন।

বাংলায় বিচ্ছেদী গানের বাঘ তিনি। কিংবা বাঘ নয়, ভাষার অভাবে কেবল বলা বাঘ তিনি, চিরকালকালান্তরী বিচ্ছেদী বাংলা ভাববোধির বিপন্ন মরাল তিনি। বিপন্ন ময়ালও, অজগরের মতো বুভুক্ষা তার বাঁশিছিদ্রিগুলায়, অনন্ত চরাচরে ব্যাপ্ত তার হাহাকার। বাঘের হাহাকার, সিংহীর হাহাকার, বজ্রপোড়া হাড়ের হাহাকার। ভুবন আচ্ছাদিয়া ফ্যালে তার ব্রহ্মবৈরাগ্যভরা গানের কণ্ঠ। সংগীতোৎসার তার। প্রযুক্তিস্ফীত বর্তমানের টেক্নোকিডটাও প্রণত হয় বারী সিদ্দিকীর বিষাদমদমত্ত অগ্নিবিভূতিদীপ্র কণ্ঠসংগীতপ্রতিভার কাছে। এই বারী সিদ্দিকী তার গানের বাইরেকার চেহারায় এখনও অনুপস্থিত। কতিপয় টিভিট্যক অত ধর্তব্যের নয় আপাতত।

অত্যন্ত নরম ও অন্তরঙ্গ অন্যরকম আদলের একটা বারী সিদ্দিকীর দেখা পাওয়া যাবে একটা বারীজীবনী প্রকাশিত হলে। এখনও এই কাজটা বাকি আছে। একটা বারীজীবনী প্রকাশ।  বাঁশিকৃষ্ণের দেশে একজন বাঁশিশিল্পীকে এখনও মূল্যায়ন করা বাকি। কিন্তু শুধু বাঁশিই তো নয়, গানের গনগনে এবং একইসঙ্গে মেদুর মোমনম্র প্রতিভা বারী সিদ্দিকীর জীবনীগ্রন্থ প্রকাশিত হলে দেখতে পেত জনপদবাসীরা তাদের অন্তর্যন্ত্রবাদকের জীবন ও সাধনা। বাঁশি, বিরহে মিলনে এবং মাঝখানকার বোধভ্রান্ত বাস্তবতায়, মিউজিকের এক মোহন মগ্নচৈতন্যপুরুষ বারী সিদ্দিকী কীভাবে রপ্ত করলেন, কতটা কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে তাকে তার সাধনযন্ত্র রপ্ত করতে যেয়ে, এই জিনিশটা বোঝাপড়ার মওকা পাওয়া যেত বারী সিদ্দিকীর লাইফভিত্তিক বই প্রকাশিত হলে।

এই জীবনের চাবিশব্দটাই বিচ্ছেদ। প্রতি মুহূর্তে ছেদ ঘটছে আমাদের প্রতি মুহূর্তের সঙ্গে, ছেদ ঘটছে পরিপার্শ্বের সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে মানুষের ছেদ সেই মহাবিস্তারী বিচ্ছেদমালার একটা দশা মাত্র, একমাত্র নয়। বিচ্ছেদেই জীবন। বিচ্ছেদেই প্রগতি। বিচ্ছেদই জীবনের নামান্তর। অন্তিম বিচ্ছেদ বরঞ্চ অন্যতর জীবনের শুরু। অনন্ত অনাদি বিচ্ছেদের একটা আশ্চর্য রূপোদ্ভাস আমরা পেয়েছিলাম বারী সিদ্দিকীর বাগযন্ত্রে, বারী সিদ্দিকীর বাঁশিতে।

লেখা / মিল্টন মৃধা

… …

মিল্টন মৃধা

অবদায়ক, গানপার 

COMMENTS

error: