কুর্বানিসিজনে লেখাদুটো মনে পড়ে

কুর্বানিসিজনে লেখাদুটো মনে পড়ে

একটা কবিতা আর একটা গান প্রতিবছর কুর্বানি এলে মনে পড়ে, এবং কিছুটা হলেও অস্বস্তিতে ফ্যালে আমাদেরে। ব্যাপক অস্বস্তিতে ফেলবার কথা, চামড়া আমাদের হাজার বছরের পুরু ও গর্জনকাঠের তক্তার চেয়েও শক্ত বলেই হয়তো অস্বস্তি ঠিক যতটুকু হবার কথা তারচেয়ে অনেক কম হয়। কিন্তু অস্বস্তি ঠিকই হয়, পায়ের তলার মাটি কিছুক্ষণের জন্য হলেও নড়ে ওঠে, ফের আমরা ব্যাপারটাকে টেইকেন ফর গ্র্যান্টেড ভেবে ধাতস্থ হই। কিন্তু কবিতাটা আর গানটা আমাদের ভিতরে কোথাও ঠিকই ক্রিয়া করে, অন্তর্গত রক্তের ভিতরে খেলা করে, আমাদেরে ক্লান্ত করে। ক্লান্ত … ক্লান্ত …। করে নাকি?

নিশ্চয় বছরের অন্যান্য সময়েও মনে পড়ে লেখাদুটো। কুর্বানিসিজনে এদের পটভূমিটা বাস্তবে দেখতে পাই ভীষণ প্রকট প্রত্যক্ষ। তবু বোধহয় বাক্যটা কালেক্টিভ প্রোনাউনে না-বলে ব্যক্তিক টোনে বলাটাই বিধেয়। বলছি, দাঁড়ান। কবিতাটা আর গানটা আমারে ব্যাপক অস্বস্তিতে ফ্যালে। আমি তাদেরে পারি না এড়াতে। অ্যান্টিথিসিস দুইটাই। ঈদের উদযাপনটা বা আনন্দটা পার্ভার্ট প্র্যাক্টিসে গড়াচ্ছে কি না, ব্যালেন্স বজায় থাকছে কি না, ব্যাপারটা মনিটর করতে হেল্পফ্যুল হতে পারে এই দুই থিসিস যদি সমাজের সামষ্টিক স্মৃতিচৈতন্যে ইঞ্জেক্টেড থাকে। এর সঙ্গে কনভেনশন্যাল রিলিজিয়ন জড়িত, খুবই ফান্ডামেন্টাল বিলিফের একটা টোটেম জড়িত, ফলে এই জিনিশ নিয়া ঢালাও বলাটা আদৌ চটজলদি বিবেচনাসম্মত নয়। ঘাড়ের উপর কল্লা সাকুল্যে একটা।

কাজেই ডিরেক্টলি কবিতাটা আর গানটা পড়ে ফেলি। বিচার যার যার। কবিতাটি লিখেছেন মাহবুব কবির। গানটি লিখেছেন, সুর করেছেন, সংগীতে ফেলেছেন এবং গেয়েছেন কফিল আহমেদ। দ্য মাইটি কফিল আহমেদ। পয়লা কবিতাটা পড়ি, তারপর কিছু প্যজ দিয়া গানটা। মাহবুব কবিরের কবিতাটা আমরা পাবো ‘কৈ ও মেঘের কবিতা’ শীর্ষক কবির অভিষেকপুস্তকে। এর আগে একটা বই ছিল কবিরের, ‘ধূলির বল্কল’ শিরোনামে সম্ভবত, কোনো-এক ঘটনাবশত বইটা তামাদি ঘোষণা করেছিলেন কবি নিজেই। কিন্তু প্রসঙ্গলগ্ন রইবার গরজে সেইদিকে আমরা আলাপ নিচ্ছি না। আমাদের জন্যে এইটুকু তথ্য যথেষ্ট যে পঠিতব্য কবিতাটার নাম ‘হত্যামুখর দিন’, ২০০৮ সনে বইয়ের দ্বিতীয় প্রকাশ হয়েছিল ঢাকা ‘ভাষাচিত্র’ প্রকাশনাগার থেকে, যেখানে তামাদি ডিক্লেয়ার্ড ১৯৯৬-সনে-প্রকাশিত বইয়ের কবিতা ছাড়াও নতুন কিছু কবিতা যুক্ত হয়ে বেরিয়েছিল বইটা। আসুন, পড়ে দেখি, ‘হত্যামুখর দিন’ :

আজ ঈদ। আজ ছুরিদিবস।

উল্লাসে ফেটে-পড়া ছোট ছোট ছুরি
আর চাকুদের পিতা রক্তাপ্লুত নেশায় চুর,
ঝিম মেরে বসে আছে কাছেই,
তার চোখ হিলহিলে তৃপ্তিতে ঢুলুঢুলু, আঁকাবাঁকা।

এদিকে ছুরিদা ও চাকুদা চামড়া ছাড়াতে ছাড়াতে
কী দ্রুত ছড়িয়ে দিচ্ছে
ফরফর ধ্বনি।
এইভাবে দিকে দিকে ছুরি আর চাকুদের
উৎসব আজ। আজ ঈদ।
হত্যামুখর দিন।
আহা,
নতুন পোশাকে আনন্দে মেতেছে শিশুরা।

চাবানো চোয়ালের ব্যাখ্যা-আলোচনার কোনো দরকার নাই। ডিরেক্ট কবিতাটা পড়েন, যত দ্রুত সম্ভব ভুলে যেতে চেষ্টা করেন, পরহেজগার থাকেন আমার ন্যায় জানকুর্বান। শুধু লক্ষ করেন যে এই কবিতা আদৌ কোনোকিছুই প্রস্তাব করছে না, খারিজ করছে না সামাজিক-ধার্মিক কিচ্ছুটি কিংবা বাতিলকরণের আব্দার জানাচ্ছে না কিছুই, খালি সিচ্যুয়েশনটা ভিশ্যুয়্যালাইজ্ করেই ছেড়ে দিচ্ছে। এই সাহিত্য মর্দ-এ-মিল্লাতের মজমায় আস্তিক-নাস্তিক জজবাতিয়ায় বিশেষ ভ্যালু অ্যাড করতে পারে না। ফায়দা নাই বাছাদের এইসব শান্ত অথচ অন্তর্শানিত কবিতার খোঁজপাত্তায়। তাদের চাই নিত্যিদিনের কাটাকাটি-ফিৎনাফ্যাসাদের খোরাক, ঘুরপথে ক্লেশ সয়ে ক্রমশ গভীরে যাওয়া আর স্তরে স্তরে ছড়ায়ে পড়ায় তাদের তর সয় না। কাজেই মন্ত্র নষ্ট হয়। আমরা তো “ছোট ছোট ছুরি আর চাকুদের পিতা”, আরও উপরন্তু হররোজ ‘রক্তাপ্লুত’ ও ‘উল্লাসে ফেটে-পড়া’, আমাদের “চোখ হিলহিলে তৃপ্তিতে ঢুলুঢুলু” সদ্য-সমাপ্ত যজ্ঞের আবেশে, এইসব কথাবার্তায় মাংশভাতে-উদরপূর্ণ আমাদের দুপুরঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। কাজেই অফ যাই।

বিদায় নেবার আগে একবার গানটা শুনে নিতে পারি। ইউটিউবে ব্যাপক কম্বিনেশন-অ্যান্ড-পার্মিউটেশন কায়দায় সার্চ দিয়াও গানটা পাই নাই। লিটার‍্যালি গানটা শোনানোর ব্যবস্থা কাজেই করা যাচ্ছে না এই মুহূর্তে। এইটা আমি শুনেছিলাম বছর-পাঁচেক আগে, সিলেটে একটা সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘নগরনাট’ তাদের কোনো-এক বর্ষপূর্তি উদযাপনের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়ে এনেছিল কফিল আহমেদকে। সেইখানেই কফিল আহমেদ ‘সমগীত’-এর বাদ্যযোজনায় গেয়েছিলেন গোটা-পাঁচেক গান, যার মধ্যে ‘একটা বাছুর যাচ্ছে উড়ে / ঘণ্টাঘুঙুর বাজল লোকালয়ে’ গানটাও ছিল। ওইবারই প্রথম এবং ওইবারই শেষ এই গানটা শুনেছি। কফিলের একটামাত্র স্টুডিয়োসংকলন ‘পাখির ডানায় দারুণ শক্তি গরুর চোখে মায়া’-তে এইটা নাই। ইউটিউবেও সুলভ নয়। অ্যালবামে নেই এমন বেশকিছু গান যেমন ‘প্রেসনোট’ ইত্যাদি ইউটিউবে অ্যাভেইলেবল হলেও ‘ঘণ্টাঘুঙুর’ গানটা পাওয়া যায় না। গানটা পড়ে দেখা যেতে পারে :

একটা বাছুর যাচ্ছে উড়ে
ঘণ্টাঘুঙুর ঘণ্টাঘুঙুর বাজল লোকালয়ে
বাছুরের গলে চুমু খেয়েছিল কোন রাখালে?

ছুরি চালাবার আগে আগে
ঘুঙুর খুলে নিও গো গলার ঘুঙুর খুলে নিও
চুমুটুমু খুলে নিও গো গলার চুমুটুমু খুলে নিও

ঘণ্টা বাজছিল পায়ে পায়ে পলে পলে
ঘণ্টা বাজছিল কারাগারে ইশকুলে
ঘণ্টা বাজছিল মন্দিরে লোকালয়ে

ঘণ্টাঘুঙুর ঘণ্টাঘুঙুর
ছুরি বাজল চিৎকারে

কফিলের গানের এই এক অনন্য বৈশিষ্ট্য যে আশ্রাফ-আত্রাফ নির্বিশেষে তামাম মখলুকাত যেন কথা কয়ে ওঠে। এবং গরু তো অবলা নয় তার গানে, এক মায়াভরা প্রাণ কফিলের গানে এই গরু। শুধু গরু নয়, গাছ-ঘাস-ফুল-হনুমান সহ সমস্ত পশুপক্ষীজন্তুকুল যারা মানুষের জুলুমে জেরবার কোণঠাসা তারা ভাষা পায় কফিলের গানে। বুদ্ধিদর্পিত মনুষ্যকুল যারা হামবড়াই করে বেড়ায় সৃজনের আর প্রকাশের, তারা কফিলের গান শুনলে একটু হলেও থমকাত, বুঝতে পারত যে একটা বাছুরের স্পষ্টবোধ্য ভাষা আর একটা ঘাসহারা মাঠের হাহাকার কী ভীষণ সংক্রামক! দুপুরবেলার ভাতঘুমে ব্যাঘাত ঘটে এমন গান অবশ্য কর্পোরেট-কোলাবোরেটর হাউজিং ব্যবসার প্রোমোটর আমরা মার্কেটে-অ্যাডভার্টে অ্যাভেইল করি না বলেই বাঁচোয়া।

না, এই গানেও কোনো নিষেধাজ্ঞা বা শাসনবারণের আওয়াজ নাই। কিন্তু কোথায় এর ফ্লাইট, কোথায় কোন লেভেলে এ আপনাকে নিয়ে যেতে চাইছে, একবার ভাবেন। না, ভাববেন না। ভাবনা নিয়ে একা রাস্তা পেরোবেন ঠিকই, কিন্তু সুসামাজিক থাকবার খাতিরে চেপে যাবেন জনসমক্ষে। এই গান, এই কবিতা, তোমাকে ভাবাবেই ভাবাবে, সে-তুমি মুখে যা-ই বলো না, এই গান এই কবিতার দোসর তুমি আধুনিক গানে আধুনিক কবিতায় আর উত্তরাধুনিক বাকোয়াসিতে খুঁজে যেও। যদি পাও, জানিয়ো। কফিল ও কবির এই কুর্বানিদিনে একটু হলেও স্বস্তির গতরে চিড় ধরান, নতুন ভাবনায় প্ররোচিত করেন, বহুশত বছরের অন্ধ নয়নে একটু হলেও আলোর সম্পাত ঘটান। কিছুতেই বাধা নাই, কিন্তু রয়েসয়ে, সিদ্ধ হয়ে, ঠাকুর রামকৃষ্ণের ভাষায় সেদ্ধ আলুর মতো নরম হয়ে এইসব ধর্মকর্ম-তর্কশাস্ত্র-বুদ্ধিবিদ্যাবারফট্টাই কোরো, হুদা ফালাফালিটা ছাড়ো। মহাপরাক্রমে, বেনিয়ার বিক্রমে, যেইভাবে চালাচ্ছ ধর্মাধর্ম, মনে হয় এইবার ফিরে দেখবার সুযোগটা কাজে লাগানো দরকার। কফিল ও কবির এই কাজে দুই সিদ্ধিদাতা হিশেবেই গণনীয়।

প্রতিবেদন : জাহেদ আহমদ

… …

COMMENTS

error: