গান ও কবিতা || জাহেদ আহমদ (পর্ব ২)  

গান ও কবিতা || জাহেদ আহমদ (পর্ব ২)  

আজকাল অত কাঁচা আবেগ তো আর নাই অবশিষ্ট, অকালে পেকে এক্কেরে ঝুনা নারকেল হয়ে গেছে বেবাক আবেগানুভূতি, ছন্দে-ছন্দে-দুলি-আনন্দে বনফুলদিন নাই আর। বয়সও তো ঝড়িঝাপ্টায় একেবারে কম হলো না। কাজেই গান লেখা বা গাওয়া, বা কবিতা কল্পনালতাপাতা বোনা, আজকাল ঝক্কির যথেষ্ট। অবরেসবরে, কালেভদ্রে, এক-দুই লাইন পুরানা হাঁপানির টানটুকু ওঠে কেবল।

অথচ একটা সময় ছিল যখন মনে হইত যথেষ্ট পারি তো আমি লিখিতে, এবং থোড়া-সা গাহিতে, ভেতরে-ভেতরে একটা ভাব ছিল ‘আমি বনফুল গো’ ধরনের, মনে মনে আকবর বাদশা আর-কি। কিন্তু অত কাঁচা আবেগ তো আর নাই অবশিষ্ট, কচিকাঁচা উমরটাও গিয়েছে ভাটিতে, এই বয়সে সেই কচমা আবেগ আশা করাও যায় না। যা-কিছু অনুভব-আবেগাকুলতা সমস্ত ফুরিয়ে ফেলেছি, খুঁইয়ে বসে আছি, জীবিকামাঙন মাছিবিদ্যাপারঙ্গম হইতে যেয়ে। সেইটাও হওয়া আর হয়ে উঠল কই, নিতান্ত কায়ক্লেশে এক-রকম চালিয়ে চলেছি। দিন তো গয়ংগচ্ছ, উঠছেও না আবার নামছেও না, কোয়ায়েট গ্যুড।

তো, কিছুই যখন হচ্ছে না, তারপরও হচ্ছে তো অনেকতা, গানকবিতা না-হোক গালগোপ্পের তো বিরাম নাই। কিন্তু গান আর কবিতার পার্থক্য কোথায়, কিংবা আদৌ রয়েছে কি না ফারাক, থাকলে সেইটা কতটুকু ও কোনখানে, এইসব ভাবতে যেয়ে ভারি গোলমেলে লাগছে। এখন গরিবের মতের তো দুই-পয়সারও দাম নাই দুনিয়ায়, না-থাক, জেনেশুনেও অচল অভিমত পুনরায় এইখানে রেখে যাই একটা।

আমার মতে, টু মাই মাইন্ড, নাই কোনো পৃথকতা গানে ও কবিতায়, এই প্রত্যয়ে পুরাপুরি ইমান আনার দরকার না থাকলেও কথাকাণ্ড শুরুয়াতের নিশান হিশেবে এইটা ইয়াদ রাখা যায়। যে-কোনো কবিতায় সুর বসাতে পারেন একজন সৃজনশৌর্যশালী সুরকার। তা সে-কবিতা যেমনই হোক-না কেন, যত খটখটে গদ্যে লেখা হোক অথবা হোক ছন্দোবদ্ধ তুলনা-উপমায় মিলান্ত তুরীয়, সুর দিয়া গাওয়া সম্ভব সমস্তই। জীবনানন্দের কবিতার গানও তো শুনেছি আমরা, অনেকেই সুর বসিয়েছেন, আমাদের অজিত রায় বেশ প্রচুরসংখ্যক সুর করেছেন জীবনকবিতার। তেমনি জীবনকবিতায় সুরের পালক পরায়েছেন সানী জুবায়ের থেকে শুরু করে হালের ‘জলের গান’ সংগীতদলটি পর্যন্ত। শুনতে ভালোলাগা/মন্দলাগা তো ভ্যারি করে একজন থেকে আরজনে, কিন্তু সুর দেয়া যে সম্ভব সেইটা তো বোঝা যায় এইসব নজর করে দেখলে।

বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কিংবা অরুণ মিত্রের এমনকিছু কবিতায় প্রতুল মুখোপাধ্যায় টিউন করেছেন এবং এত দুর্দান্তভাবে করেছেন যে এসব গদ্যস্পন্দে লেখা কবিতায় যে এমন সুর লুকিয়ে ছিল ঝর্ণার মতন পাথরচাপা, ভাবতেই পারি নাই আগে আমরা, আবিষ্কারই তো বলব দস্তুরমতো। লোপামুদ্রা যে-ধাঁচের কবিতা বেছে নেন গাইতে যেয়ে, কিংবা আরও কেউ কেউ, সেসবে তো সুর থাকেই লিরিকধর্মানুসারে। কিন্তু আমরা ভাবছি যেসব কবিতা টাইটফিট প্রোজ সর্বার্থে, মিত্রাক্ষর-অমিত্রাক্ষর নির্বিশেষে, সেইসব কবিতার সুরসম্ভাব্যতা বিষয়ে। একটা উদাহরণ চট করে মনে পড়ছে এখন। গত শতকের এইটিজের স্বল্পপ্রজ কবি সাজ্জাদ শরিফের একটা কবিতায় এত দুর্ধর্ষ সুর মাখায়েছিলেন সঞ্জীব, দলছুট সঞ্জীব চৌধুরী, কবিতাটা আগে থেকেই প্রিয় ও বহুপঠিত হওয়া সত্ত্বেও স্তম্ভিত হয়ে গেছিলাম আমরা অনেকে এর সুরারোপ শ্রবণপূর্বক বিস্ময়াভিঘাতে, এই অলমোস্ট ননলিরিক্যাল কবিতাতেও-যে সুর সম্ভব এইটা আমাদের মনেও হয়নি কোনোদিন। শরিফের ‘ছুরিচিকিৎসা’ কাব্যবইয়ের নামকবিতাটার কথা ভাবছিলাম। অথবা আমরা স্মরণ করতে পারি জেমসের গানগুলো, সুভাষ মুখোপাধ্যায় এবং শামসুর রাহমানের দুটো কবিতা বিশেষভাবেই, যথাক্রমে ‘যা রে ফুল পুবে যা / আঁধারে ডুবে ডুবে যা’ এবং ‘আমি তারায় তারায় রটিয়ে দেবো’ — এইগুলো তো ওই-অর্থে একদমই লিরিক্যাল নয়, এ-ও তো দুর্ধর্ষ সুর/গান হতে পেরেছে। জ্যাক প্রেভের প্রমুখ ফরাশি কিছু স্যুরিয়ালিস্ত্ কবি কিংবা আফ্রিক্যান নিগ্রো স্পিরিচ্যুয়ালের ফর্ম্যাটে বসানো প্রতুলের গানগুলো মনে পড়বে ফের একবার। প্রতুল তো প্রাসঙ্গিক ক্ষেত্রে সিদ্ধির পরাকাষ্ঠা। প্যাম্ফলেট থেকে একদম কম্যুনিস্ট ম্যানিফ্যাস্টো অথবা মাও-জে-দঙের স্পিচ, রেডবুক থেকে খাবলা-মারা প্যারাগ্র্যাফে সুর বসানো, সফলতায় এবং সাহসে এইগুলা লা-জওয়াব। কবীর সুমন তো মনে পড়বেই। ইনি যে কেবল শহীদ কাদরীর গদ্যস্পন্দ কবিতায় সাক্সেসফ্যুল সুর ও সংগীতের যোজন ঘটায়েছেন তা-ই তো নয়, বিভূতিভূষণের ডিরেক্ট গদ্যে খেলিয়েছেন সুরের সুষমা। আইপিটিএ ফেইজের গণসংগীতে ব্যাপক শক্তিমত্তার সঙ্গে কবিতায় সুর দেয়া হয়েছে, একেকটা ডাঁটো গদ্যের ঘনবুনট পঙক্তিদীপিত স্তবকে মেঠো সুর ও সংগীতাবহের সাবলীল ব্যবহারও সম্ভব হয়েছে। এইগুলা আমাদের অভিজ্ঞতায় অ্যাকোমোডেইটেড অলরেডি। কিংবা আমরা সাম্প্রতিকের আরেকটা এক্সপেরিয়েন্স ইয়াদ রাখব। গৌতম হালদারের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ মঞ্চায়নের আশ্চর্য অভিজ্ঞতা। আস্ত প্রযোজনাটা মাইকেলের মাহাকাব্যিক অক্ষরবৃত্তদৃপ্ত স্বর বজায় রেখেও ধ্রুপদী বিভঙ্গঋদ্ধ ও সুরেলা।

কাজেই সুর যতটা-না থাকে একটা কাগুজে টেক্সটে, বেশি থাকে ব্যক্তির ভেতর্দেশে। এই ভেতর্দেশের সুর যখন অবমুক্তির মওকা খোঁজে, একজন সুরকার এই কাজটাই তো করে, সে তার নিজের সুরোপযোগী লিরিক্স খুঁজে নেয়। এইটা খালিচোখে স্রেফ কবিতাপাঠক হিশেবে আমাদের গোচরীভূত সবসময় না-ও হইতে পারে। সেইটা না-হয় গেল কোনোমতে বোঝা। এইবার কথা যেইটা, গান কি লেখা সম্ভব কি না, আপনি নিয়মিত কবিতা লেখেন — মনে করা যাক — ইন ওয়ান ফাইন মর্নিং আপনি কুঁজো হয়ে গেলেন বসে গান লিখিবারে, ইজ ইট সো! সম্ভব বুঝি, এই কায়দায়, গান লেখা! বড়জোর গীতিকবিতা লেখা যাইতে পারে, কিন্তু গান লেখা!

তা-যে এক্কেবারে না-মুমকিন, তা-ও তো না। না-হলে স্যংরাইটার কথাটা আছে কোন কামে! সেইটাই তো। স্যংরাইটার মোস্টলি সুরের সংস্পর্শে-থাকা লোক, গানের ও সুরের কাঠামো-গ্র্যামার বিষয়ে দখল-রাখা লোক, সুরমূর্খ ব্যক্তিবিশেষ কেউ নন। গীতিকারবৃত্তির মোস্ট এসেনশিয়্যাল পার্ট সুরদখল। মনে হয় আমার। অবশ্য সুর সম্পর্কে জানাশোনা যার যত বেশি, সুর লাগানো যার যত বেশি দখলে, সে এক্ষেত্রে সুবিধা পায় বেশি। যেমন, ধরা যাক, একটা লাইন লিখে একজনের মনে অথবা অন্য কোনো অজ্ঞাত স্থলে নির্দিষ্ট মার্গের একটা সুর উঁকি দিলো, তো সেই-মোতাবেক তিনি বাকি-থাকা লাইনগুলোর শব্দ পেয়ে যেতে থাকবেন এবং ক্রমাগত ক্যাপ্চার করে যাবেন শব্দকণা।  আর এই প্রবাহে অস্থায়ী-অন্তরা-সঞ্চারী ইত্যাদি পরপর বাঁধতে পারবেন তিনি। শব্দের ওজনগত তরিতম বা বাড়-কম স্বয়ংক্রিয়ভাবেই হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটবে তখন। ব্যাপারটা সম্ভবিবে তখনই যখন সুরকার ও গীতিকার এক ও অভিন্ন ব্যক্তি হবেন।

ব্যানারে ব্যবহৃত ছবির শিল্পী  সত্যজিৎ রাজন

… …

COMMENTS

error: