নিলয় দাসের সাথে সম্পর্কের একটা সহজ আরম্ভ || এবাদুর রহমান

নিলয় দাসের সাথে সম্পর্কের একটা সহজ আরম্ভ || এবাদুর রহমান

The simple beginning is something so insignificant in itself, so far as its content goes, that for philosophical thinking it must appear as entirely accidental. — Hegel, Aesthetics

Only that which is simple constitute a beginning. — Hegel, Science of Logic, Book-1

গোস্তকে ভাষায় উদ্ঘাটনে, আমাদের,  যে উৎত্রাসী কৃতী — তাই-ই স্মৃতি, তারেই স্মৃতি বইলা অবিহিত করা হয়, — আমার কথা না — আই উইশ! … আসে, ভালো ভালো ফরাসি বহিতে লেখা আসে এইসব কাঁহা কাঁহা বাণী।

তো, আমি এবাদুর রহমান, আমার প্রিয়তম একজন শিক্ষককে স্মরণ করতেসি, কারণ আমি সশরীর ও তিনি নন, তা নন। তিনি নিলয় দাস। তিনি সম্প্রতি, খুব অকালে, কালান্তরিত হইসেন।

১৯৯০ সালের জানুয়ারিতে তাঁর সাথে পরিচয়। মোহাম্মদপুর, তাজমহল রোড, সি ব্লকের এক বাড়িতে। আমার স্কুলজীবনের এক সখারে গিটার বাদন শিখাইতেন উনি। সেই সময়েই পুরা কাল্ট ফিগার ছিলেন। ওলমোস্ট তীর্থময় সংস্কারে আমার প্রবংশের প্রত্যেক গায়ক-বাদক কবুল করত, “… ওহ ডুউড! জেমস্  আছে তার জায়গা মতো, বাচ্চু আছে তার জায়গায় … ফুয়াদ, সাইদ, মাসুক, জয় এরাও আছে, কিন্তু, নিলয়দাই বাংলাদেশের বেস্টেস্ট গিইটারিস্ট, একমাত্র পূর্ণাঙ্গ গিইটারিস্ট …”

আমার সাথে পরিচয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই নিলয়দার গাওয়া (ও বাজানো) ক্যাসেট ‘কত যে খুঁজেছি তোমায়’ বের হয় — উন্মাদ, সেরিব্রাল বাদন আর রোমান্টিক আর্তির নমনীয় প্রত্যক্ষতা ও ইঙ্গিত বাঙ্ঘিম উচ্চারণের — ছায়াসেতু যেন গানগুলা, কয়টা সপ্তাহ আমরা পুরা ঘোরের মধ্যে ছিলাম, এমনকি, মধ্যবিত্ত, নাগরিক বাঙালিদের গান কি তবে ক্রান্তিকালের উন্মেষক্ষেত্রে পৌঁছালো — এমন ভাবতেও প্ররোচিত হয়েছি।

বিভিন্ন অভিঘাত ও বিভাবের সামীপ্যসূত্রে বাংলা রকনরোলের একটা তুঙ্গ মুহূর্তের সূচনা হচ্ছে সে-সময়। একদিকে সুমন-টুমনদের তৈরি করা প্রগলভ উত্তেজনা আমাদের শ্রবণে এসে পৌঁছাচ্ছে প্রথমবারের মতো এবং আমরা বুঝতে পারছি, বাচ্যার্থের দিকটা উপেক্ষা করেও বাংলা গান — নতুন স্থানাঙ্ক ও সাহসিক দ্রাঘিমার দিকে — বাঁক নিচ্ছে, মূলত আমাদের মাটিতে, অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বামবা  আয়োজিত প্রতিটা মুক্ত বায়ুর জলসায় তখন একলাখ প্লাস ছেলেমেয়ে হিস্যা নিচ্ছে আর স্টেজের গানের সাথে নেচে-গেয়ে ঘোষণা দিচ্ছে যে, এই প্রবহমান সমাজে বিভিন্ন সংগ্রাম ও সংস্কারের ভিতর দিয়ে যে মূল্যচেতনা অর্জিত হয়েছে কথার বাস্তবতা ও মনোভঙ্গি অনুসৃত হয়ে গেছে এই নতুন সংগীতের শরীরে।

লেনদেন-১ (সংক্ষেপিত)


এবাদ : নিলয়দা, আপনার নিজের সম্পর্কে কিছু বলেন।
নিলয় : কি কমু মিঞা … দুরো! … তোমরাই কও না …

এবাদ : কবে থেইকা গিটার বাজান আপনি?
নিলয় : খুব সম্ভব … ’৮১ সালে, ফার্স্টে, বাজানো শুরু করি।

এবাদ : কেমনে আসলেন এই লাইনে?
নিলয় : বলতে পারো, আমার রক্তের মধ্যে মিউজিক … আমি বড় হয়েছি খুব সাংস্কৃতিক পরিবেশে … আমার মা-বোন সবাই সংগীতের সাথে জড়িত … বিশেষ করে বাবা — সুধীন দাস — বাংলাদেশের বিখ্যাত একজন স্বরলিপিকার …

এবাদ : আপনি তো আর ওইসব মিউজিক বাজান না … আপনি তো পুরা হার্ডকোর রে ভাই!
নিলয় : আমি মূলত দুই-একজন সিনিয়রের বাজানো দেখে ভীষণ ইন্সপায়ার্ড হইতাম, নয়নকে দেখেই গিটার হাতে তুলে নেই … কিন্তু, কারো কাছে শেখার সুযোগ হচ্ছিল না … কেউই সিরিয়াসলি শেখাতে চাইতেন না তেমন … কেমন যেন একটা উন্নাসিক মনোবৃত্তি কাজ করত … পুরা অ্যাক্সিডেন্টে এক কোরিয়ান ভদ্রলোকের সাথে আমার পরিচয় হয় … উনি ক্ল্যাসিক্যাল গিটার বাজাইতেন, তো, অনেক সাধ্যসাধনার পর তিনি আমাকে কয়েকটি প্রাথমিক কর্ড দেখায়ে দেন — এভাবেই শুরু … আমি জীবনে গিইটারের উপর কোনো কোর্স করি নাই … যতটুকু এসেছি পুরাটাই নিজের চেষ্টায় … বরাবরই আমি খুবই ক্ল্যাসিক্যাল স্টাফ শুনতাম : বাখ, মোজর্ট, বিটোভেন … বিশ্বের ফাইনেস্ট কাট বাদকদের সিম্ফন শুনে সেসব … গিটারে তোলার চেষ্টা করতাম এবং এখনও করি — এটাই আমার শিখার পদ্ধতি …

এবাদ : আপনি তো অনেক বিখ্যাত শিল্পীর সাথে বাজিয়েছেন। দুই-একজনের নাম বলেন শুনি।
নিলয় : এইটা আমার সৌভাগ্য কি না জানি না তবে, হ্যাঁ, বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠিত শিল্পীর সাথেই আমার বাজানো পড়েছে … আমাদের সমাজ মিউজিশিয়্যানদের কোনো স্বীকৃতি দেয় না … এমনকি নামটা পর্যন্ত উল্লেখ করা হয় না তাদের … তাছাড়া, ওয়েল … যেহেতু আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান, আর্থিক ব্যাপারটাও একটা ফ্যাক্টর এখানে … অর্থের তাগিদে একসময় হোটেলে বাজানো স্টার্ট করি … একসময় আমি ড্রাগে আসক্ত হয়ে পড়ি … ’৮৪-’৮৮ পর্যন্ত লাইফের একটা কালো অধ্যায় … বর্তমানে আমি ড্রাগের কবল থেকে মুক্ত … এখন আমি গিইটার শেখার একটা স্কুল চালাই … আমার ক্যাসেট বের হবে …

এবাদ : আপনার স্কুল সম্পর্কে বলেন।
নিলয় : ’৮৯-তে রেইনবোর কবিরভাইয়ের সাহায্যে এবং তারই অনুপ্রেরণায় আমি একটা গিইটার শিক্ষার স্কুল শুরু করি।

এবাদ : আপনার শিখানির স্টাইল কী?
নিলয় : আমার মতে নতুন শিক্ষার্থীর জন্য সারেগামা হচ্ছে বেস্ট এক্সারসাইজ। তবে ডিফারেন্ট অ্যাঙ্গেলে তা করতে হবে। প্লাকিঙের উপর জোর দিতে হবে। বিশেষ করে ডান হাত চালু করতে হবে … আমার স্টাইল হচ্ছে ক্ল্যাসিক ইনফ্লুয়েন্স লিড … রিচি ব্ল্যাকমোর এই স্টাইলের পথিকৃৎ … রকনরোলকে নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করেছেন তিনি, কিন্তু ওয়াই.জে. মামস্টিন ক্ল্যাসিক গিইটারকে ইলেক্ট্রিক লিডে তুলেছেন … র‍্যান্ডি রোডস্, জিমি হেইনড্রিক্সের নামও এক্ষেত্রে উল্লেখ করতে হবে …


নিলয়দার সাথে প্রায় ১৪/১৫ বছর আগে যে দীর্ঘ একটা আলাপে নিরত হয়েছিলাম তার শুরুর স্মৃতিধার্য চূর্ণাংশটা উপস্থাপিত করলাম। সেদিনকার আমি এখনো বেঁচে আছি, কিন্তু, আমার পায়ের নিচের মাটি বদলে গিয়েছে … চেইঞ্জ হয়ে গিয়েছে ঢাকার সাংস্কৃতিক জীবনের দৃশ্যাবর্ত ও বাতাবরণ; বিশেষত ’৯০/’৯১ সালে আমাদের জাতীয় জীবনে — একটা ক্রমান্বয় সংগ্রাম ও গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যয়-আভায় হঠাৎই আলোকিত হয়ে ওঠে — যে সম্ভাবনার দরজাগুলো খুলে গিয়েছিল, আমরা তার সুবিধা ও সুযোগ কিছুমাত্র গ্রহণ করতে পারিনি, বরং একটি শ্রেণির বশবর্তিতায় লুটে নেয়া হয়েছে আরেকটি শ্রেণির বর্তমান-বর্ণাঢ্যতা — স্বপ্ন-স্মৃতি — যৌবস্পন্দন।  এ মুহূর্তে, বাংলাদেশে যে মূলধারা ও মূল্যচেতনা অধিষ্ঠিত হয়েছে, তার আধিপত্য — খুব পরিকল্পিত ও ডেলিবারেটভাবে — আমাদের সংস্কৃতির সামগ্রিক স্বভাবের মধ্যে যে ভেতর থেকে বিবর্তন হয়ে ওঠা সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদী দাপটের বিরুদ্ধে ইনহেরেন্টলি জাগর, বাঙালির ওলমোস্ট বুনিয়াদী জ্ঞানভাণ্ড, তাকে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে একটা প্রান্তিক অবস্থানে ঠেলে দিচ্ছে; গত ৬০ বছর সময়কালে পূর্ববাঙলার প্রগতিধারার ইতিহাসগর্ভে স্ফীত হয়ে উঠছিল যে বিকশমান ভবিষ্যতের নতুন প্রজ্ঞা, তার জীবনীশক্তি ও সামর্থ্য যে উমবালিক্যাল কর্ড দিয়ে গণমানুষ ও গণমানুষের জাগ্রত ব্রত, ঐতিহ্য ও বাসনার সাথে প্রযুক্ত, ক্ষমতা-অনুমোদিত মূলধারার জ্ঞান — যে জ্ঞান দেশ ও জাতি নামধেয় অর্থ ও বিমূর্ত বোধকে ধর্ম, সম্প্রদায় বা উগ্র জাতীয়তাবাদী পরিচয়ের কোনো-একটা একক চৈতন্যে বুনে তুলতে পারঙ্গম — সেই প্রাণদায়ী গর্ভনালী ছিন্ন করার প্রক্রিয়া প্রায় সম্পন্ন করে এনেছে।

এবং এখানে এসেই একজন হ্যাপি আখান্দ বা নিলয় দাস আমাকে ধন্দে ফেলেন। তাদের প্রবর্তনায় উদ্যত হয়ে আছে প্রতি-অন্যায়ী প্রতিরোধ বা সমাজের বিরুদ্ধে ক্রুদ্ধ অভিমান, কিন্তু তাদের বৈপ্লবিক রাজনৈতিক কোনো অনুশীলনের সচেতন সংস্রব দেখি না … অথচ ইতিহাসের গর্ভহত্যা বা রাষ্ট্রের মানবতা বিকাশের পরিকল্পিত প্রতিবন্ধের বিরুদ্ধে উচ্চকিত উচ্চারণের মাধ্যমে আমাদের চেতনার ঋদ্ধি ও ব্যাপ্তি ঘটাচ্ছেন তারা … তাদের প্রায় প্রতিটা বাদনা ও শিল্পসৃষ্টি তীব্র আখ্যানশরীর সজীব অনুষ্ঠানের অংশ হয়ে প্রতিষ্ঠিত রুচি ও রাষ্ট্রীয় কথকতাকে আক্রমণ করে …

আমার মনে পড়ছে নিলয় দাসের টুপি বা জিন্স পরে গিটার বাজিয়ে গান গাওয়াকে ‘অপসংস্কৃতি’ বলে আক্রমণ করেছিলেন কয়েকজন সংসদ সদস্য ও আওয়ামী বুদ্ধিজীবী সে-সময়। দেশব্যাপী ব্যান্ডসংগীতের দাপটে ‘ইসলাম ইন ডেঞ্জার’ এমন একটা ধুয়োও তোলা হয় সুপরিকল্পিতভাবে। শিল্পকলা একাডেমির একটি চ্যারিটি কন্সার্টে বিনা প্ররোচনায় আইয়ুব বাচ্চু পুলিশ দ্বারা প্রচণ্ড প্রহৃত হন — কিন্তু, বাংলার কোনো রকনরোলার বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক, অগণতান্ত্রিক, গণবিরোধী ও নির্যাতনমূলক রাষ্ট্রযন্ত্রের রূপান্তর চান নাই, বরং এইটাকে টিকিয়ে রেখেই শুধু শোষণ-শাসনের অবসান কামনা করে জিকির করেছেন।

তাদের মননমুদ্রার মূলের সমস্যাটা বা সমাজে তাদের অবস্থান আমি বুঝতে চেষ্টা করেছিলাম; আমার এলোমেলো ডায়েরি-এন্ট্রি :

সংগীতকে আত্মিকতার সার্বক্ষণিক ভাষা হিশাবে লোকেট করছে সংস্কৃতি, কারণ, গানে অনেকটা কবিতার মতোই, লোগোসকে অভিব্যক্তি দেয়া হচ্ছে যা মানবচেতনার সন্নিহিত এবং প্রত্যন্ত প্রদেশগুলোকে স্পর্শ করে। রূপান্তরিত করে আবার, শুদ্ধ কল্পনার এক্সপ্রেশন হয়ে মরমি দ্যোতনায় আত্মাকে অনুধাবনও করছে। আত্মস্থ করছে।

তবে, এইটা হলো উচ্চাঙ্গ সংগীত।

সংগীত এখানে আত্মিক। খুব বেশি হলে আধ্যাত্মিক — কল্পনার সত্যতায়, প্রথা ও প্রকরণের সক্ষমতায় সমাজের কালেক্টিভ প্রতিন্যাসে এই সংগীত আবেগগত বাস্তবতা বা কারুণ্যের সাথে বিমূর্ত জ্ঞানের সংসারের বিচিত্র মিথস্ক্রিয়া জারি রাখে।

কিন্তু, আমরা এখানে বলছি, নিলয়দার প্রসঙ্গ এনে, রকনরোলের কথা যার আস্বাদন ও আনন্দের অভিজ্ঞতা মনে বা চিন্তায় হয় না, সরাসরি শরীরে হয়।

রকনরোল শরীরী অভিজ্ঞতা ও ছন্দ ট্র্যান্সমিট করে।

রকনরোল শরীরকে সাব্লিমেট করে — রকের উৎসার শরীর থেকে ও এই গানের রিসেপশনও প্রকৃত প্রস্তাবে শরীরেই হয়।

তাছাড়া, রকনরোলের সৃজনসত্তার রূপ আগ্রাসী যৌনতা দিয়া নির্ধারিত। রকনরোল জন্ম থেইকাই দিনানুদৈনিক ও অপ্রাকৃত ভোকাবিউলারি ও অপরিশীলিত কণ্ঠের ভাষ্যের উচ্চকিত প্রতিষ্ঠা করে এসেছে — এই প্রতিষ্ঠার মূল শর্তও হয়ে উঠছে, শব্দাবলি নান্দনিক উপস্থাপনে নীরক্ত হয়ে ওঠার আগের মুহূর্তের শরীরী উপস্থিতি ও ওই শব্দ যে সত্তা ও অভিজ্ঞতার ইঙ্গিত দেয় সেই সত্তা ও অভিজ্ঞতা যাপনের প্রেক্ষিত ও অন্বয়কে গ্রেফতারের — তাকিদ ও উপলব্ধি।

এখানে নিলয়দার বলা একটা কথা খুব মনে পড়ছে। নিলয়দা বলতেন, এমেরিকানরা, যুদ্ধের দগদগে সাইকোসিস ও পুঁজিবাদের উদগ্র আগ্রাসন, তাদের প্রত্নমনের মঞ্জুষা থেকে যেসব রাক্ষসকে বের করে আনসে ও সবকিসু এক্সরসাইজ (exorcise) করতে, প্রসেস করতে রকনরোল ব্যবহার করল … আর সে-কারণে অ্যামেরিকানদের রকনরোলকে সমাজরূপান্তর ও ভাবপ্রকাশের একটা টুল হিশাবে তুলে নিতে হয়েছে সেই একই কারণে সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ বা নয়া উপনিবেশবাদের হিংস্রতায় গুটিয়ে যাওয়া যে-কোনো মার্জিন্যাল কালচারেই, আজকে বিশ্বব্যাপী রকনরোল জনপ্রিয়।

লক্ষ কইরেন, পুঁজিব্যবস্থার ভিতর নিষ্পেষিত মানুষ রকনরোলে তাদের এক্সপ্রেশন পাচ্ছে, অর্থাৎ পুঁজি যে আধুনিকতা বা যাপনের প্রেস্ক্রিপশন দিচ্ছে তার বিপরীতে বাস্তব ও শরীরী লড়াইয়ের স্থাপনায় রকনরোলের প্রভাব আছে।

সমাজের, এই ধরনের গান বা এই গানের গায়কদের প্রতি, বিরুদ্ধতা বুঝতে এইটা একটা কথা। আরেকটা বিষয় হচ্ছে রকনরোল ডায়োনিজিয়ান, যৌনতাময় ও শরীরী বলেই জন্মক্ষণ থেকেই সমাজ কর্তৃক ট্র্যান্সগ্রেসিভ এবং রকনরোলাররা প্রোফেন ও সমাজবিরোধী বলে চিহ্নিত।

ভাইসব, লক্ষ কইরেন, বুর্জোয়া ধনতন্ত্র শরীরকে কিন্তু পবিত্র বলছে। কিন্তু, যা-কিছু শরীরী তা অপবিত্র এবং নিষিদ্ধ।

{এখানে আরবি ‘হারাম’ শব্দটা স্মরণে আনা যায় — যা একই সাথে নিষিদ্ধ ও পবিত্র অর্থের ইঙ্গিতজ্ঞাপক}

পবিত্রতা ও পাপ বা সীমালঙ্ঘনের — ট্র্যান্সগ্রেশনের  — ধারণা আদিম কৌম সমাজের ‘অর্ডার অফ ইন্টিমেসি’ বা ‘ঘনিষ্ঠতার ক্রম’ — পুনর্বিন্যাসের সময় থেকে অর্থাৎ বস্তু ও চেতনা, পুরুষ ও প্রকৃতি, ব্যক্তি ও পরমের বিভাজনের মুহূর্ত থেকে বের হয়ে এসেছে।

হায়ারার্কিক ও শ্রেণিবিভাজিত সমাজে এই অসম্ভব সন্ত্রাসী বিভাজনের স্থিতি ও কথনমুদ্রা মূলত শিল্পীর — ক্ষমতা-অনুমোদিত শিল্পীরা নয় … যারা সমাজবহির্ভূত, অপরাধী, উন্মাদ, দ্রষ্টা ও যে-কোনো বিচারে সমাজবিরোধী — ধারণ করেন।

এই শিল্পীরা একই সাথে এই বিভাজনের অসঙ্গতি ও সন্ত্রাসের সাথে সম্পর্কিত, কারণ তারা — অনুসন্ধান ও জ্ঞানের বহুমুখী প্রকাশে — এই বিভাজনের কথা ও পরম মিলনের কিছু ইঙ্গিতময় মুহূর্তের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সমাজকে ‘প্রকৃতিস্থ’ রাখে। আবার একই সাথে, সমাজকে টিকে থাকার জন্য যে গূঢ়, অখণ্ড, রহস্যময় ও আত্মিক-আধ্যাত্মিক সত্যগুলির বাস্তব অভিজ্ঞতার খবর প্রয়োজন তারও ধারক, ঋত্বিক ও সংগঠক এই শিল্পীরাই।

অর্থাৎ শিল্পীদের সেই যাপনে অভ্যস্ত হতে হয় যা সমাজের খণ্ডিত সত্যের অনুসারী না, যা শরীর ও আত্মায় সবচেয়ে আরণ্যক ও ভয়ঙ্কর অন্ধকার অসঙ্গতির সাথে সার্বক্ষণিক সম্পর্ক রাখে।

অর্থাৎ, সমাজই শিল্পীদের, সমাজকে টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনে, সমাজবিরোধী অবস্থানে ঠেলে দিচ্ছে।

বলাই বাহুল্য, এই অবস্থানে সত্তাকে মেন্টেইন করার ক্ষমতা সবার নেই। এই ভারের দায়িত্ব সবার জন্য না।

আমি যতদূর জানি, নিলয় দাস এই ভার অনুভব করতেন; তিনি নন্দনমিনারের অশ্লীল নিঃসঙ্গতায় বিমুখ ছিলেন; তিনি আমাদের মেইনস্ট্রিমে কখনো সেভাবে উৎকীর্তিত হননি ও জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত স্থিত ছিলেন সৎ ও নির্জলা মৃত্যুস্তোত্রে, যখন

চেতাবনি ছিল ঠিক, তুমি-আমি লক্ষই করিনি
কার ছিল কতখানি দায়
আমরা সময় বুঝে ঝোপে ঝোপে সরে গেছি শৃগালের মতো
আত্মপতনের বীজ লক্ষই করিনি…

তাঁকে সেলাম। পাঠক তোমাকে সেলাম।


এই লেখাটা সার্চ করছিলাম আমরা অনেকদিন ধরেই, গানপার  স্টার্ট করার সময় থেকে, কম করে হলেও বছর তিনেক হয়ে গেল। শুধু অতটুকু মনে ছিল যে এককালের পাক্ষিক চিন্তা  পত্রিকায় এবাদুর রহমানের একাধিক লেখা পড়েছি এবং সেসবের মধ্যে নিলয় দাস ইন্তেকালের অব্যবহিত পরে ইন্টার্ভিয়্যুভিত্তিক একটা লেখা পড়েছি বলে আবছা স্মৃতি ইয়াদ আছে। বাসায় ম্যাগাজিনের গাট্টি তো আর একটা-দুইটা না, কাজেই খুঁজতে নেমেই ইজিলি খুঁজে পেলাম অত অনায়াস না বিষয়টা, আর চিন্তা  পত্রিকার মণ্ডমুদ্রিত সংখ্যাও তো কম নয়, কাজেই ঢিমেতালে খোঁজাখুঁজি চলছিল এই আশায় যে একদিন পেয়ে গেলে দেখা যাবে গানপারে তা ছাপা যায় কি না।

ফাইন্যালি খুঁজে পাওয়া গেল কুড়ি খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে। এবং কয়েকটা ব্যাপার তখন খুঁটিয়ে খেয়াল করে দেখি যে এইটা চিন্তায় ছাপা হয়েছিল ২০০৬ নভেম্বরে আর নিলয় দাস ইন্তেকাল করেন ওই বছরের জানুয়ারিতে। তার আগেই অবশ্য নিলয় দাস নিয়া ‘দাস ক্যাপিটাল’ ও ‘গুলমোহর রিপাবলিক’ প্রণেতা (আরও কর্মকাণ্ড ও বইপুস্তকাদি আছে উনার) এবাদের লেখাটা যে উনার ‘এক ব্যাগ শিল্প’ সহ অন্যান্য বইগুলায় নাই তাতে প্রায় নিঃসন্দেহ হয়েই ছিলাম। ‘দাস ক্যাপিটাল’-এ থাকার প্রশ্নই আসে না কারণ ওইটা ছাপায়া বাইর হয় ফেব্রুয়ারি ২০০৬ সনে। এইবার খুঁজে পেয়ে ফের পড়তে যেয়ে দেখি চিন্তাওয়ালারা লেখাটা ছাপায়েছে ঠিকই কিন্তু যত্ন করে একটু প্রুফ সংশোধনের ন্যূনতম কম্মোটাও করেছে তেমন নজির নাই, বরং উল্টোটা। টাইপোর মচ্ছব একেবারে। মুশকিল হচ্ছে এবাদুর রহমানের লেখার প্যাটার্ন সম্পর্কে যারা জানেন তারা নিশ্চয় মানবেন যে এবাদে একাধটু উল্টাপাল্টা আকার-ইকার বা বানান/শব্দক্রীড়া ইত্যাদি রচনার ধকটার জন্যই বহুলাংশে দরকারি। চিন্তায় আমাদের মনে হলো প্রচুর শব্দ স্রেফ প্রুফচেকের অনবধানতার কারণে ধন্দে ফেলে দেয় পড়তে যেয়ে। এইসব ঝামেলা পার করে লেখাটা ফাইন্যালি কম্পোজও করা গেল মূল পত্রিকাপাঠ মিলিয়ে মিলিয়ে, থেমে থেমে, এরপরে লেখকের অনুমতি গ্রহণের পালা।

‘দাস ক্যাপিটাল’ বা তারও আগে এবাদসম্পাদিত ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা’ বা খানকতেক ছোট ছোট পত্রিকায় এবাদের লেখার লগে চিনপরিচয় আমাদের আজকের নয়, ম্যালা দিনের, কিন্তু লেখকের লগে ব্যক্তিক পরিচয় ছিল না। তার অবশ্য দরকারও পড়ে নাই আগে। এইবার সংগত কারণে পরিচয়ের জরুরৎ পড়ে। এবাদুর রহমানের কাছে ইনবক্স করি বিষয়বিত্তান্ত জানিয়ে এবং তিনি লেখাটা পাব্লিশের ব্যাপারে কন্সেন্ট দিয়া আমাদেরে আনন্দিত করেন।

তবু আশঙ্কা থেকে যায় এইটা লেখকের অভিপ্রেত পাঠোদ্ধার কি না, চিন্তায় যেমন উল্টাপাল্টা ছাপাইবিন্যাসে ব্যাপারটা ছিল তা থেকে ব্যেটার জায়গায় এসেছে এখন, তবু লেখকের যে-কোনো সংশোধনী পাবার অব্যবহিত সঙ্গে-সঙ্গেই আমরা তা জুড়ে নেব। রচনাটা যারা পড়বেন, আমাদের মতো তারাও উদ্বোধিত ও আনন্দিত হবেন আমরা জানি। — গানপার

… …

COMMENTS

error: