অনন্ত বিজয় দাশ জন্মদিনস্মারক শব্দশ্রদ্ধার্ঘ ২০২০

অনন্ত বিজয় দাশ জন্মদিনস্মারক শব্দশ্রদ্ধার্ঘ ২০২০

শুভ জন্মদিন, অনন্ত বিজয় দাশ!

অনন্ত বিজয় দাশ একজন লেখক, বিজ্ঞান ও বিবর্তন বিষয়ক সভ্যতার অগ্রগতি নিয়া আজীবন তৎপর এই লেখকের জন্ম ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দের ৬ অক্টোবর; ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের ১২ মে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁকে খুন করা হয়, সেদিন সকালবেলায়, সিলেট শহরের বনকলাপাড়ায় তাঁরই বাসার সংলগ্ন হত্যাকাণ্ডটা ঘটে। কে বা কারা তাঁর হত্যাকারী? রিপ্লাই : নীরবতা। রাষ্ট্র এই ব্যাপারে শেষকথাটা বলতে পারে।

একটা ব্যবস্থা, একটা লাগাতার আপসকামী সিস্টেম, আদ্দিকালের বর্বর ভাবনার মদতদাতা ব্যবস্থাই খুন করেছে অনন্তবিজয়কে। একা অনন্তবিজয় নয়, ২০১৩-পরবর্তী সিরিজ হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পিত অংশ হিশেবে অনন্তবিজয়ের আগে-পরে খুন হয়েছেন আরও অনেকেই। নিহতদের অপরাধ, তারা বাংলাদেশ নিয়া ভাবতেন, তারা বাংলায় লিখতেন, বাংলায় বলতেন, বাংলায় আঁকতেন ভবিষ্যতের ছবি, বিশ্লেষণ করতেন বাংলাদেশকে যার যার যুক্তি ও বাকশক্তি দিয়া। যার যার জায়গায় থেকে একেবারেই স্বাভাবিক কাজকর্মগুলো সৎভাবে করতে যেয়েই তাদেরে খুন হতে হয়।

তারপর তো বহুকিছুই হয়েছে। ডেভেলপমেন্টের জয়গাথা আমরা আলবৎ গাইব, তবে এখানে নয়, অন্যত্র। শুধু অনন্তবিজয় এবং অন্যান্য (হুমায়ুন আজাদ, অভিজিৎ রায় এবং অনেকেই আরও) মতপ্রকাশকারী চিন্তানুশীলকদের হত্যাকাণ্ডগুলা সাইলেন্স দিয়াই জায়েজ করে নেব কি না, ভাবতে হবে এবং ঝেড়ে কাশতে হবে। এবং দ্রুত। ২০১৩ থেকে এই সাতবছরে (এবং স্পষ্ট কথাটা বলতে গেলে যেই জীবনপতন শুরু হয়েছিল অনেক আগে থেকে, ব্যাপারটা আমাদের কাছে ক্লিয়ার হতে থাকে ২০০৬ সালে হুমায়ুন আজাদ নিহত হবার পর) পরিস্থিতি কী হলো, কতটা ফায়দা কার হলো, কোন গ্যালারিতে গেল করতালি ও আতশবাজি — নিশ্চয় তা আর আঁচ করতে হয় না, প্রকাশ্য দিবালোকে সমস্তই দেখা যায়।

কাজেই অনন্ত বিজয় দাশের জন্মদিনে কেককাটা সেলিব্রেশন তো করবার প্রশ্নই আসে না। যেই ব্যবস্থাটা মানুষের চিন্তাভাবনার প্রকাশ সইতে পারে না, যেই বিদঘুটে ব্যবস্থাটা মানুষেরে পেছনে টেনে রাখতে চায়, যেই ব্যবস্থাটা মানুষের মগজ ও মুখ নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, মানুষের মনের ও শরীরের জবরদখল চায়, সৃজনশীলতা থামায়ে দ্যায় যেই ব্যবস্থা, মানুষের হৃদয়বৃত্তি-বিজ্ঞানবৃত্তি নয় কেবলই শিশ্নবৃত্তির বিকাশ উদ্বুদ্ধ করে যেই ব্যবস্থা, — চাপাতিকোপে-দেহ-খণ্ডবিখণ্ড-হয়ে-যাওয়া লেখক অনন্ত বিজয় দাশের জন্মদিনে সেই বিকট আসুরিক ব্যবস্থার বিনাশ ছাড়া আর কিছুই চাইবার থাকতে পারে না।

আর বিচার? যে গেল, সে তো চলেই গেল, কোনো তন্ত্রই ফিরাতে পারবে না তারে এই বিপুলা আলো-জল-বায়ুর ভুবনমেলায়। নিহতের বিচার দরকার হয় না, জীবিতের নিরাপত্তার জন্যই বিচার দরকার, জীবিতেরা আগাবে কি পিছাবে এই প্রশ্নেই বিচার দরকার। বেয়াক্কেল বুজরুকদের মদতকারী ব্যবস্থাটার বিনাশ দরকার। যদি সর্ষের ভিতরেই থাকে সেই ভূত? বুনতে হবে নয়া সরিষার বীজ। উপড়ে ফেলতে হবে পুরান সর্ষেতরু।

কথা বলো, কথা বলো, কথা বলো, প্রিয়তমা! আওয়াজ দাও! খুন্তি-নিড়ানি-কোদাল হাতে নিয়া খাড়াও সরিষার সুবিস্তৃত জমিনের সামনে। কেবল প্রতীকী প্রতিবাদে আর বিচার-চাওয়া আব্দারে হচ্ছে না।  আওয়াজ দাও! কথা বলো! স্পষ্ট!

শব্দই ব্রহ্ম, শব্দেই মীমাংসিত হয় দিনদুনিয়ার যাবতীয়, শব্দে চেনা যায় সিংহ কে এবং কারা ষড়যন্ত্রকারী। চিত্রকলা, গানবাজনা আর কালো-ধলো রঙের ব্যবহারে যেই প্রতিবাদ তা কার্যকর শুধু সভ্য সমাজে, এই প্রিমিটিভ অঞ্চলে সেসবের ইম্প্যাক্ট নগণ্য। সশব্দ হও, সরব হও, সোচ্চার হও! তোমার জনপদটাকে পেইন্টিং, মিউজিক, সিনেমা আর ব্লিসফ্যুল বর্ণমালার জন্য সমুজদার করে তোলো। অবারিত যুক্তিবুদ্ধি আর চিত্তবৃত্তির সাবস্ক্রাইবার বাড়ায়া যাও। যতদিন তা না হচ্ছে, কেবল শব্দ, শুধু শব্দস্পর্ধায়, কেবলই আওয়াজ দিয়া ভাঙাও ঘুম ও গড়িমসি। দ্বিতীয় কোনো সড়ক নাই আর।

অনন্ত বিজয় দাশ জন্মদিনস্মারক শব্দশ্রদ্ধার্ঘ ২০২০ সমাপ্ত হলো।


প্রণয়নে
অলক চৌধুরী, বাপন তালুকদার, বিমান তালুকদার, সত্যজিৎ রাজন, জাহেদ আহমদ ও রতন দেব

ট্রিবিউটপোর্ট্রেইট
সত্যজিৎ রাজন

… …

COMMENTS

error: