সুরমাসায়র পর্ব ৪ || পাপড়ি রহমান

সুরমাসায়র পর্ব ৪ || পাপড়ি রহমান

SHARE:

কুয়াশামোড়ানো ভোরবেলায় আমি চললাম ভর্তি পরীক্ষা দিতে। কোনোরকম প্রস্তুতিমূলক পড়াশোনা ছাড়াই। বার্ষিক পরীক্ষার পরে হেসেখেলে দিন কাটিয়ে নতুন ক্লাসে দিনকয়েক আসাযাওয়া করেছি। একটা-দুইটা ক্লাস হয়েছে কি হয় নাই! এদিকে আগের পড়াশোনাও একদম গুলে খেয়ে বসে আছি। অবশ্য ভর্তি পরীক্ষার কোনোরকম দুশ্চিন্তা আমার মাঝে নাই। দুশ্চিন্তা হচ্ছে না, তার কারণ আমি দেখছি এই নতুন শহরের কুয়াশা একেবারে ধোঁয়ার মতন। শীতকাল এলেই যেমন দূর থেকে দেখতাম, আমাদের পুকুরদুটো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন রয়েছে। পুকুরে জলের চিহ্নমাত্র দেখা যেতো না। শুধু দেখতাম, যেন গভীর কোনো খাদ থেকে ক্রমাগত ধোঁয়া উঠছে! সে-রকমই  কোনো ধুম্রজালের ভেতর দিয়ে আমি আর আব্বা পথ চলছি। একহাত দূরের কিছুও দৃষ্টিগোচর হয় কি হয় না। ধুম্রজালের ভেতর দিয়ে বেশ খানিকটা পথ চলার পরও চারপাশের কুয়াশার আড়াল সরে যায় না।

এভাবেই চলতে চলতে আমি আর আব্বা এসে দাঁড়াই সুরমা নদীর পারে। পিচগলানো পাকা রাস্তা পেরিয়ে মাটির বাদামী শরীরের দেখা পাই আমি। আহা! মাটি! এই মাটি আমি ফেলে এসেছি কত দূরে? দাদাজানের কাছে, দিদির কাছে, আম্মার কাছে আমি আমার প্রিয় মাটির উঠান জমা রেখে এসেছি। যে-উঠানে আমার ডেকি মুরগিটা দাবড়ে বেরায়। সুযোগ পেলেই চলে যায় অন্য শরিকের ধান খেতে। আর মার খেয়ে পা ল্যাংড়া করে ঘরে ফেরে। দিদি তখন ডেকির পা টেনেটুনে তাতে চুন-হলুদের প্রলেপ মাখিয়ে দেয়। ডেকির পালকগুলি কী মসৃণ! উজ্জ্বল সোনালি আর কালো রঙের!

আমি এই প্রথম এত কাছে দাঁড়িয়ে এত বিশাল কোনো নদী দেখি। এই সেই নদী যার নাম সুরমা। সে একটি নদী। এই নদীর কথা আমি বইতে পড়িনি। চাচাতো ভাইয়েরা পড়েছে, আমি শুনেছি। এই সেই সুরমা নদী! শীতের সুরমার জল কমতে কমতে মরাধরা অবস্থায় আছে এখন! জল শুকিয়ে দশা সঙ্গিন, তবুও সে বুক চিতিয়ে শুয়ে আছে। জল অপ্রতুল বলে দুইপারেই খাড়া কাছাড়, যে-কাছাড় নেমে গেছে বহু দূরে। এই কাছাড় বেয়ে বেয়ে চলে গেলে জলের স্পর্শ পাওয়া যাবে। আব্বা আমার হাত ধরে। আমি আর আব্বা ধীরেসুস্থে ঢালু পাড় বেয়ে নামতে থাকি। একেবারে বন্ধুর পথ। পা হড়কালে গড়িয়ে গড়িয়ে জলের কাছে গিয়ে থামতে হবে।

নামতে নামতে দেখি ঘাটে বেশ কয়েকটা নৌকা ভিড়ে আছে, যারা যাত্রী তুলে ওই পারে ভেসে যাচ্ছে। ভেসে যে যাচ্ছে তার কোনো চিহ্ন রেখে যাচ্ছে না তারা। মাঝির বৈঠায় জল ঝিলিক দিয়ে উঠতে না উঠতেই নাও কুয়াশার পর্দার আড়ালে চলে যাচ্ছে!

আমি আর আব্বা নদী আর নৌকার খেলা দেখতে থাকি চুপচাপ। আচ্ছা, যারা কুয়াশার ঘেরের ভেতর হারিয়ে যাচ্ছে তারা ঠিকঠাকমতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে তো? নাকি তারাই অন্য কোনো ছল করে ফিরতি নৌকায় ফিরে আসছে? কে জানে! আমি আর আব্বা নৌকা করে পার হতে থাকি সুরমা নদী। ঢেউয়েরা এখন অচঞ্চল। জলের উপর শীতের কুয়াশার সর জমে রয়েছে। মাঝির বৈঠা পড়া মাত্রই সেই সর ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে। বৈঠা ওঠানামার সাথে সাথে মাঝির হাতের পেশি ফুলে উঠছে। শীতের মৃত নদী পারাপারে মাঝির পেরেশানি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আব্বা খেয়াভাড়া মিটিয়ে দিয়ে আমার হাত ধরে। খাড়া কাছাড় বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে আমি আর আব্বা দুজনেই হাঁপিয়ে উঠি। সামান্য দম নিয়ে ফের রিকশা। মাত্র কয়েক মিনিটের মাঝেই রিকশা এসে দাঁড়ায় অগ্রগামী বালিকা বিদ্যালয়ের গেটে। বিশাল গেটের মাথায় ইশকুলের নাম লেখা।  কিন্তু গেট ভেতর থেকে বন্ধ। কি করা? আব্বা পাশের আরেকটা ছোট গেট দিয়ে ঢুকে পড়ে। আব্বার সঙ্গে সঙ্গে আমিও। বুড়ো দারোয়ান কিছু-একটা জানতে চাইলে আব্বা কী বলে আমি ঠিক ধরতে পারি না। ধরতে পারি না কথাটা হয়তো ঠিক নয়, আমি আদতে শুনতেই পাই নাই।

গেট থেকে কয়েক কদম এগোলেই হেডমিস্ট্রেসের রুম। রুমের সামনে ইটের রাবিশ ফেলে রাখা। একপাশে একটা ছায়াবিস্তারী কৃষ্ণচূড়া। শীতের প্রকোপে রঙ হারিয়ে বসে আছে। রুমের অনতিদূরে শাদারঙা দেয়ালের একটা বৃত্ত। সেই বৃত্তের ভেতর জা্না-অজানা ফুলের গাছ আর পাতাবাহারের শোভা। নানান রঙের ফুল ফুটে আছে। অবশ্য এই ফুলেদের অধিকাংশই আমার চেনা। গাছগুলিরও বেশিরভাগ চিনি আমি।

আব্বা হেডমিস্ট্রেসের রুমে ঢুকে আরও কি কি সব বলে যেন। আর খানিক বাদে দপ্তরি গোছের কেউ একজন এসে আমাকে একটা ছোটমোট ঘরে নিয়ে যায়। ওই ঘরে ছোট ছোট ডেস্ক আর বেঞ্চ দেখে আমি বুঝতে পারি এটা হয়তো কোনো ক্লাসরুম। কিন্তু আবেদা খানম উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের মতো বড়সড় বেঞ্চ নয় এইগুলি। এখানের বেঞ্চগুলি ছোটদের বসার উপযোগী করে বানানো হয়েছে। কিন্তু এই মুহূর্তে বেঞ্চগুলি খালি। সিটে কেউ বসে নাই। আমি একাই বসে থাকি।

একজন শাড়িপরা টিচার আমাকে শাদা কাগজ ও প্রশ্নপত্র দিয়ে যায়। এই ঘরে আসার পূর্বে আব্বা আমার হাতে কলম তুলে দিতে দিতে বলেছিল —
‘বুঝেশুনে উত্তর লিখ।’

এক্ষণে প্রশ্ন পড়ে আমি বেশ বিচলিত। বাংলা, অঙ্ক ঝটাঝট লিখে ফেললেও ইংরেজি নিয়ে ভালোরকম ব্যারাচ্যারায় পড়ে যাই। কারণ আমি তো ইংরেজি পরীক্ষা দিয়েছি মুখে মুখে। অর্থাৎ মৌখিক। জেরুফুপু যা যা প্রশ্ন করেছে আমি সবই টপাটপ উত্তর দিয়েছি। এবং পঞ্চাশে পঞ্চাশ পেয়েছি। এখন এই ছাপা প্রশ্নের কিছু ইংরেজি আমি পারি, কিছু আবার পারি না। কিন্তু আমি তো সব প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারলে কেঁদেকেটে অস্থির হয়ে যাব। আমার এখন করণীয় কী? আর কিছু না ভেবে আমি যা যা পারি লিখতে শুরু করি। কিন্তু লেখা শেষ হওয়ার পূর্বেই সেই টিচার এসে আমার খাতা নিয়ে চলে যায়।

আব্বা হেডমিস্ট্রেসের রুমে বসে আছে। আমাকে দেখে স্মিত হেসে বলে —  পেরেছ সবকিছু?
আমি মাথা নিচু করে থাকি। পরীক্ষার প্রশ্নের সবকিছুর উত্তর লিখতে না-পারা ভয়নক অপরাধ। এটা আমি আমাদের বাড়িতে থাকাকালীনই জেনেছি। আর আব্বাও সর্বদাই বলে — ফ্যুল আন্সার করতে হবে কিন্তু।

ভাইয়েরা সবাই ফ্যুল আন্সার করেই বাড়িতে ফেরে। প্রশ্ন ছেড়ে আসলে কারো পিঠের চামড়া থাকবে না — এ-রকম কথা আমি তো জন্ম থেকেই শুনে আসছি।

আজ আমি ইংরেজির প্রশ্নের উত্তরে কি কি লিখেছি সেসব মনেও নাই। তবে আমি আমার পরীক্ষা নিয়ে মোটেও চিন্তিত নই। আমি তো খুশিতে ডগোমগো হয়ে আছি। খানিক বাদেই আমাদের ফের নৌকাভ্রমণ। পুনরায় নদীপথে যাতায়াত! আমি আর আব্বা খেয়া পারাপার হয়ে বাসায় ফিরব। আর পথে যেতে যেতে রাজ্যির নতুন কিছু দেখব। ভাগ্য ভালো থাকলে আমরা হয়তো একটা জাহাজের দেখাও পেতে পারি! মস্তপানা কোনো জাহাজ — যে কিনা হাঁসের মতো পলকা গতিতে ভেসে ভেসে যায়।                  (চলবে)

… …

COMMENTS

error: