আমার কোলে চড়ার দুপুর আমার কাঁখে চড়ার বিকেল || সত্যজিৎ রাজন

আমার কোলে চড়ার দুপুর আমার কাঁখে চড়ার বিকেল || সত্যজিৎ রাজন

SHARE:

গ্রামের বিকেলগুলো কেমন বিষণ্ণতায় ভরা। অথচ সেই ছোটবেলার বিকেলের আরম্ভ হতো মুগলির টাইটেল-স্যঙের মতো করে — “জঙ্গলে ভোর হলো / আজ নতুন প্রভাত এল / খুশিতে ভরে গেল চারিদিক।”

অনেকদিন পরে এবার গ্রামে আসা হলো। বিকেল এত বিষণ্ণ হয় আগে দেখা হয়নি। ঘুঘুর ডাক সবসময়ই সেই বিষণ্ণতায় বাড়তি করুণতা ঢেলে দেয়। কেমন নিঃসঙ্গভাবে ক্রু ক্রু বলে ডেকে যায়।

এই গ্রামেই আমার শৈশব কেটেছে। জীবনের প্রায় সব স্মৃতিই আমার শৈশবের স্মৃতি। স্মৃতিগুলাও আমার কেমন জানি ছায়া ছায়া শ্যাওলাধরা; — গোবর, ধান আর কাদামাটির গন্ধে মোড়া — ছাতিমফুল আর বাঁশঝাড়ের শুকনা-কাঁচা পাতার গন্ধে ভুরভুর করা। আমার শৈশবস্মৃতিতে নেই কোনো টুথপেস্টের গন্ধ কিংবা রেক্সোনার সুবাস। সবই এই কাদামাটির শ্যাওলাধরা ছায়া ছায়া গন্ধ।

আমার খুব ছোটবেলায় বিকেলগুলো আসত আমার পিসিমণির কাঁখে চড়ে। স্নান সেরে, দুপুরের ভাতঘুম সেরে, চুল আঁচড়ে লাল চপ্পল পায়ে চড়িয়ে প্রতিদিন মণির হাত ধরে বা কাঁখে চড়ে যেতাম গ্রামের একমাত্র পঞ্চায়েতি টিউবওয়েলের কাছে। যেদিন আমি কাঁখে চড়তাম সেদিন কলসের সৌভাগ্য হতো না কাঁখে চড়ার। আমি প্রসন্ন হলেই কেবল কলস কাঁখে চড়তেন।

তালগাছের নিচে কল। মাঝে মাঝে তালপাকা সিজনে তাল পড়ত। তালের অধিকার ছিল যে আগে কুড়িয়ে নিতেন তার। কার গাছ কার জায়গা তখনো গ্রামের মানুষের বোধ এত পাকেনি তালের মতো। তাই গাছের তাল যে কুড়াতেন তারই ছিল। তালতলায় প্রায় প্রতিদিন কোনো-না-কোনো দুর্ঘটনার জন্ম দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফেরাই ছিল আমার একটা বিশেষ কাজ।

একবার একটা লাল পাথর কুড়িয়ে পেয়ে সেটা নাকের ভিতর চালান করে দিয়েই বুঝলাম বেরোনোর আর-কোনো রাস্তা খোলা নাই, অমনি চিৎকার চ্যাঁচামেচি করে পিসির সকল বান্ধবীর সহযোগিতায় পাথর অপসারণ করা হলো। এর আগেই মোটামুটি গ্রাম সচকিত করে তোলা হয়ে গেছে।

আরেকদিন বড় একটা কালো পোকাকে কঞ্চি দিয়ে ঘাটাতে গিয়ে সেটা পায়ে চেপে বসে। নিরীহ পোকা কস্মিনকালে কাউকে কামড়িয়েছে বলে রেকর্ড নাই, কিন্তু ভয়ঙ্করদর্শন আমি তো মাটিতে পড়ে চিৎকার — পোকা ছাড়াবে কি, আমার পা ঝাড়ানো আর লাত্তিতে গ্রামের তরুণী পিসিদের হাতের কাচের চুড়ি ভেঙে চুরমার।

এ-রকম নিত্যকর্মের মধ্য দিয়েই কাঁখেচড়া শৈশব পেরিয়ে গেল। আহা, কোলে চড়ার দিন আমার কাঁখে চড়ার বিকেলগুলো!

প্রচ্ছদে ব্যবহৃত ছবিটির শিল্পী : সত্যজিৎ রাজন

… … 

COMMENTS

error: