নির্বাচনী ইশতেহারে সংগীতশিল্পকেন্দ্রী ইশ্যু অন্তর্ভুক্তিকরণের দাবিতে ম্যাক  

নির্বাচনী ইশতেহারে সংগীতশিল্পকেন্দ্রী ইশ্যু অন্তর্ভুক্তিকরণের দাবিতে ম্যাক  

বাংলাদেশে একাদশ ন্যাশন্যাল নির্বাচন এখন দোরগোড়ায়। নির্বাচনী ইশতেহারে সংগীতশিল্পের সুরক্ষা, বাজার ও বিপণনের বিকাশ এবং সর্বোপরি শিল্পীস্বার্থ সমুন্নত রাখার ব্যাপারে বেশকিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা সামনে এনেছেন মাকসুদুল হক। দেশের প্রখ্যাত এই মিউজিশিয়্যান তাঁর ফেসবুকপাতায় একটা চারদফা প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে। এই প্রস্তাবনির্দেশিত ইশ্যুসমূহ ম্যানিফেস্টোতে অ্যাকোমোডেটেড হলে দেশের প্রায় বেহাত-হয়ে-যাওয়া সাংগীতিক শিল্পবাজার শিল্পী-কলাকুশলী এবং ভোক্তাদের অনুকূলে ফিরবার রাস্তা খুলবে বলিয়া আন্দাজ করা যায়।

মাকসুদুল হক তাঁর প্রস্তাবপত্রটা ড্রাফ্‌ট করেছেন গত-দুইমেয়াদ-দীর্ঘ মসনদাসীন শাসকদল আওয়ামী লীগকে অ্যাড্রেস করে। সেখানে, ফেসবুকে পোস্টেড সেই প্রস্তাবপত্রে, নির্বাচনসংলগ্ন সরকারদল আওয়ামী লীগকে ‘সংগীতশিল্পীবান্ধব রাজনৈতিক দল’ আখ্যা দিয়ে ম্যাক আহ্বান জানিয়েছেন তাদের ইলেকশন-ম্যানিফেস্টোতে ক্লেইমগুলো সুবিন্যাস্তভাবে সন্নিবেশন ও অবস্থান স্পষ্টকরণের জন্য। অবশ্য আওয়ামীজোটের শরিক দলগুলো সংগীতসিনেমা বা সাংস্কৃতিক পদচারণা নিয়া তাদের অবস্থান খোলাসা করবে কি না তা ম্যাকের আহ্বানপত্রে আসে নাই, কিংবা কামাল হোসেন নেতৃত্বাধীন প্রধান বিরোধীদলীয় ঐক্য সংগীতপ্রশ্নে তাদের ইশতেহারে পয়েন্ট আনবে কি না তা-ও বোঝা যাবে শিগগিরই। ডিসেম্বরের তিরিশে ন্যাশন্যাল নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগ পনেরো ডিসেম্বর নাগাদ ইশতেহার জনসমক্ষে নিয়া আসবে বলে বিভিন্ন সংবাদসূত্র থেকে জানা যাচ্ছে। এবং অন্য দলগুলোর ঘরেও ইশতেহার ফর্ম্যুলেশনের তোড়জোড় চলছে বলে সূত্রগুলো জানাচ্ছে।

এমনিতে এই বিষয়ে সন্দেহ নাই যে ম্যানিফেস্টোতে সংগীত, সিনেমা, সাহিত্য, নৃত্য ও চিত্রকলা ইত্যাদি সম্বলিত কালচারবাজারের একটা সামগ্রিক ও সুস্পষ্ট অঙ্গীকারনামা এবং রাস্তামানচিত্র দেশের রাজনৈতিক দলগুলো প্রণয়ন করবে, দেশবাসীর সঙ্গে শেয়ার করবে এবং সে-অনুযায়ী জনসাধারণ বেছে নেবে তার প্রতিনিধিত্বকারীটিকে, এইটা এখন সময়ের দাবি। মাকসুদুল হকের এই বিষয়ে সোচ্চার হওয়াটা তাঁর গত দুই দশকব্যাপী ইন্টেলেকচুয়্যাল প্রোপার্টি এবং রয়্যাল্টি রাইটস্ নিয়া আন্দোলন ও সক্রিয়তার অংশবিশেষ। শুধু ব্যক্তিগতভাবে ম্যাক নয়, ‘বামবা’ থেকে এ-সংক্রান্ত দাবিনামা রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি রাখা আবশ্যক; একইভাবে ‘বিএফডিসি’, নৃত্যশিল্পীদের সংগঠিত পরিষদ, থিয়েটার গ্রুপগুলোর সমবেত সংঘ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট সহ সকল প্রকার পার্ফোর্মিং আর্টস রিলেটেড স্টেইকহোল্ডারদের তরফ থেকে ম্যানিফেস্টোতে দেশের সাংস্কৃতিক ফিউচার ম্যাপ সম্পর্কে একটা হাইলাইটেড অধ্যায় অ্যাড করার ব্যাপারে প্রেশার-আপ করা দরকার। ম্যানিফেস্টোতে একদম ফোকাসড কথাবার্তা থাকলে দেশের কালচারমার্কেটে ব্রেক-থ্রু আসবে যেমন, ঠেকানো যাবে সংস্কৃতিবৈরী দুরাত্মাদের, শিল্পসংস্কৃতি থেকে একচেটিয়া বাণিজ্য করে মুনাফা তুলে শিল্পীঠকানো লুটেরাদের দাপট ও দৌরাত্ম্য দমানো সম্ভব হবে, তেমনি নিশ্চিত করা যাবে দায়িত্ববাহক বিভিন্ন মহলের জবাবদিহি।

নিজের ফেসবুকপাতায় ব্যান্ডমিউজিক ম্যুভমেন্টের অন্যতম লড়াকু ও প্রতিষ্ঠাকালিক ‘বামবা’-প্রেসিডেন্ট দেশের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী, ‘মাকসুদ ও ঢাকা’ ব্যান্ডের লিডভোক্যাল, গীতিকার ও সংস্কৃতিবীক্ষক মাকসুদুল হক যে-স্ট্যাটাসনোটটা আপ্লোড করেছেন সম্প্রতি, শিল্পীর অনুমতি নিয়ে সেইটা আমরা হুবহু নিচে পুনরুদ্ধৃত করব :

সংগীতশিল্পীবান্ধব রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের কাছে আহ্বান জানাই, আপনাদের নির্বাচনী ইশতেহারে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো স্পষ্ট করুন —

১. মেধাসম্পদ আইন ও রয়্যালটির প্রায়োগিক বিষয়ে যথাবিহীত ব্যবস্থা গ্রহণপূর্বক প্রচলিত আইনের অধীনে তা শক্তভাবে প্রণয়ন করবেন,

২. বহুজাতিক কোম্প্যানিদের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ মদদে শিল্পীদের গান ফ্রি ডাউনলোড করার যে লুণ্ঠনের রাজত্ব বিরাজমান তা আইন করে বন্ধ করবেন,

৩. বাংলাদেশ টেলিরেগ্যুলেটরি অথরিটির কতিপয় অসৎ কর্মচারী, যারা সরাসরি বহুজাতিক বেনিয়াদের মদদ দান ও উৎসাহিত করেন, সাংগীতিক চৌর্যবৃত্তির অপকর্মে লিপ্ত থাকার দায়ে তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ দাখিলপূর্বক গ্রেফতার ও আইনি ব্যবস্থা নেবেন,

৪. বাংলাদেশের শিল্পীদের সাংগীতিক কর্মকে ‘জাতীয় অপার্থিব সম্পদ’ হিসেবে মর্যাদা দেবেন এবং এই সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ সহ প্রচার, প্রসার ও ভবিষ্যতে এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সকল বিধির সাথে সমন্বয় সাধনপূর্বক আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এর সুষ্ঠু বিতরণ ও বিপণন সুনিশ্চিত করবেন।

মাকসুদুল হকের এই আহ্বান শুধু আওয়ামী লীগ নয়, দেশের জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রাহী সব-কয়টা পার্টিই আমলে নেবে এবং তাদের ইশতেহারে এতদবিষয়ক স্পষ্ট উচ্চারণগুলো জনগণসমক্ষে রাখবে এমন আশা করবেন সংগীতসমুজদার দেশের সচেতন সকল মহল। রাজনৈতিক দলগুলোকে সংগীত-সিনেমা-সাহিত্য ও সমগ্রত সংস্কৃতি বিষয়ে অস্পষ্ট আবছা বার্তা-বাগ্মিতার বদলে স্ট্রেইটকাট লিখিত অঙ্গীকার-রূপরেখা সামনে আনতে হবে। ম্যাকের এই উচ্চারণ সেই পথেরই একটা ধাপ।

ব্যানারে ব্যবহৃত প্রতিকৃতির শিল্পী  ইমতিয়াজ আলম বেগ

প্রতিবেদন : সুবিনয় ইসলাম

… …

COMMENTS

error: