বান্নিস্মৃতি || অসীম চক্রবর্তী

বান্নিস্মৃতি || অসীম চক্রবর্তী

সাকিন সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ উপজেলাস্থ ঢাকাদক্ষিণে অবস্থিত মধ্যযুগীয় সমাজসংস্কারক শ্রী চৈতন্যদেবের পৈতৃক ভিটা থেকে মাইল তিনেক দূরে। সঙ্গত কারণে আমার শৈশবকৈশোরের সবচেয়ে আনন্দঘন উৎসবের অনুষঙ্গ ছিল শেষ-বসন্তের বান্নির প্রতিটা দিন।  চৈত্র মাসের প্রতি রবিবার জুড়ে শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর দাদাই (ঠাকুরমা)-র পাঁচশো বছরের অধিক পুরাতন বাড়ির প্রাঙ্গনে বিগত কয়েকশত বছর ধরে নামে ভক্তদের ঢল, চলে সংকীর্তন, বসে ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ মেলা। সেই মেলাই হলো বান্নি। ঢাকাদক্ষিণের এই পুরাতন মেলা কি করে বান্নি হয়ে উঠল তা ক্রমশ প্রকাশ্য।

নজরুল ঠাট্টা করে তুলসীবনের বাঘদের নিয়ে এক ছড়ায় বলেছিলেন : “আমার হরি নামে রুচি / কারণ পরিণামে লুচি” … সেই লুচির স্বাদ অগ্রাহ্য করে হরিনাম সংকীর্তনের থেকেও আমাদের শিশুমন বেশি অনুরক্ত ছিল বান্নির মেলার জন্য। হাতের আঙুলের কড়ায় আমরা গুনতাম অপেক্ষার দিনগুলো। থাকত হাজারো জল্পনাকল্পনা। বান্নিতে  খরচ করার জন্য বছরের শুরু থেকেই আরম্ভ হতো  মাটির ব্যাংকে টেকাটুকা জমানোর পালা। আমাদের শৈশবে  বাড়িতে কুটুম এলে যাবার বেলা কিছু টাকাটুকা  মিলত মিঠাই কিনে খাওয়ার জন্য। বার্ষিক পরীক্ষা শেষে মামাবাড়ি গেলে ফেরার সময়ও মিলত পয়সাকড়ি। এসবের পুরোটাই  জমা পড়ত মাটির ব্যাংকে। ইত্যাদি  নানা কারণে  ঢাকাদক্ষিণের বান্নি ছাড়া  আমাদের শৈশবস্মৃতি একেবারেই অসম্পূর্ণ।

শুরুতে একটু গৌরচন্দ্রিকা করে নিচ্ছি, যাতে যারা এখনো শ্রী চৈতন্যদেব সম্পর্কে ততটা অবহিত নন তাদের রিলেট করতে সমস্যা না হয়। চৈতন্য মহাপ্রভু (১৪৮৬ – ১৫৩৪) ছিলেন ষোড়শ শতাব্দীর বিশিষ্ট বাঙালি ধর্ম ও সমাজ সংস্কারক।  ‘চৈতন্য চরিতামৃত’ নামক একটি গ্রন্থে শ্রী চৈতন্যদেবের বাণী এবং জীবনবৃত্তান্ত লিপিবদ্ধ করেছিলেন কৃষ্ণদাস কবিরাজ। সেই গ্রন্থ অনুসারে ১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দের দোল পূর্ণিমা রাতে নদীয়া জেলার নবদ্বীপে জন্মগ্রহণ করেন শ্রী চৈতন্যদেব ওরফে নিমাই। পিতা জগন্নাথ মিশ্রের আদি বাড়ি শ্রীহট্ট জেলার ঢাকাদক্ষিণ ইউনিয়নের দত্তরাইল গ্রামের মিশ্রপাড়ায়। তবে অধ্যয়ন এবং সংস্কৃত শাস্ত্র চর্চার জন্য জগন্নাথ মিশ্র নদীয়া জেলার নবদ্বীপে আস্তানা গাড়েন এবং স্থানীয় কন্যা শচী দেবীকে বিবাহ করেন। শ্রী চৈতন্যদেবের ডাকনাম নিমাই। আমি নিশ্চিত করে বলে দিতে পারি দুই বাংলার বাঙালিদের খুবই কম মানুষ আছেন যারা নিমাই সন্ন্যাসের গল্পগাথা আর শচী মায়ের পুত্রশোকে  চোখ ভেজাননি।   জাতি-ধর্ম-বর্ণের উর্ধ্বে উঠে শ্রীচৈতন্য মানবধর্মের যে ভাবাদর্শ  ছড়িয়ে দিয়েছিলেন ভারতবর্ষের তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে, সেই  ভাবাবেগ আর বাউল  ও বৈষ্ণব মতাদর্শের প্রভাবে বাংলা যেমন পেয়েছে  লালন সাইঁজী থেকে শুরু করে বাউল শাহ আবদুল করিম সহ অজস্র বাউল ও বৈষ্ণব মতাদর্শী গীতিকবিদের,  তেমনি পেয়েছে আধুনিক কবি রবীন্দ্রনাথকেও। তৎকালীন কুসংস্কারগ্রস্ত  হিন্দুধর্মের কট্টর জাতিভেদ দু-পায়ে দলে  তিনি সমাজের নিম্নবর্গীয় মানুষদের বুকে জড়িয়ে ধরে বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণ করেন। শুধুমাত্র জাতিভেদ বা সমাজসংস্কার নয়, বাংলার ভাষা ও সাহিত্যের বাড়বাড়ন্তকাল সেই মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যে শ্রী চৈতন্যদেবের প্রভাব ছিল চোখে পড়ার মতো। বিদ্যাপতি, জ্ঞানদাস, চণ্ডীদাস সহ মধ্যযুগীয় কবিদের লিগ্যাসি ক্যারি করে বৈষ্ণব পদাবলি, চৈতন্য চরিতামৃত, চণ্ডীমঙ্গল, মনসামঙ্গল ও ধর্মমঙ্গল ধারার মঙ্গলকাব্য, রামায়ণ, মহাভারত ও ভাগবত অনুবাদ সাহিত্য, শাক্ত পদাবলি ও লোকসাহিত্যে চৈতন্যদেবের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ উস্কানিমূলক মদদ পরিলক্ষিত হয়। এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা করব অন্য কোথাও, অন্য কোনো একদিন।

বিবাহের পরে  জগন্নাথ মিশ্র এবং শচী দেবী ঢাকাদক্ষিণে এসে কিছুদিন বসবাস করেছিলেন। তখনই শচীদেবীর গর্ভে আসেন শ্রী চৈতন্যদেব। তৎকালীন রীতি অনুযায়ী সন্তান প্রসবের আগেই শচীদেবী চলে যান নবদ্বীপে, উনার মায়ের কাছে। শ্রীহট্ট থেকে নদীয়া বহু ক্রোশ দূর। তৎকালীন সময়ের জন্য যা ছিল একেবারেই বিদেশ বিভুঁই। তাই ছেলে, বৌ এবং অনাগত নাতির সাথে যে আর দেখা হবে না তা জগন্নাথ মিশ্রের মা প্রায় ধরেই নিয়েছিলেন। তবুও আশা ছাড়েননি দুঃখে-কষ্টে জর্জরিত জগন্নাথ মিশ্রের অশীতিপর বৃদ্ধ মা। যাবার আগে বলে দেন যেন তাঁর অনাগত নাতি অর্থাৎ শ্রী চৈতন্যদেব  একবার ঢাকাদক্ষিণ এসে তাঁকে দেখে যান। নিমাইয়ের জন্মের পরে তাঁর ঠাকুমা অর্থাৎ বাপের মা আমৃত্যু সিলেটের ঢাকাদক্ষিণেই বসবাস করতেন। যা বর্তমানে দাদাইর বাড়ি নামে পরিচিত। যেখানে আজো  পাঁচশো বছরের অধিক পুরাতন ভবনের ধ্বংসাবশেষ বর্তমান। লোককথায় জানা যায় একবারই  ঠাকুমার দর্শনের জন্য চৈত্রের এক রবিবারে শ্রী চৈতন্যদেব ও তাঁর বৈষ্ণবসঙ্গ নগর সংকীর্তন করতে করতে  ঢাকাদক্ষিণ এসেছিলেন। কিন্তু সেই রবিবার চৈত্রের কত তারিখ ছিল অথবা চৈত্র মাসের কততম রবিবার ছিল সেই তথ্য কোথাও পাওয়া যায়নি বিধায় স্থানীয় ভক্তরা মহাপ্রভুর আগমনকে উদযাপন করতে চৈত্র মাসের প্রতি রবিবারে আয়োজন করে সংকীর্তন এবং উৎসবের। সেই থেকে প্রতি বছর চৈত্র মাসের প্রতি রবিবারে শ্রী চৈতন্যদেবের অনুসারীদের মেলা বসে জগন্নাথ মিশ্রের বাস্তুভিটার প্রাঙ্গনে। শুরু হয় চৈত্রের প্রতি রবিবারের  মেলা। যা পরে স্থানীয় ভাষায় ধীরে ধীরে বান্নি (রবিবারি >রবিবারনি > রইবারনি>রইবান্নি>বান্নি ) নামেই পরিচিত হয়ে ওঠে। সেইসাথে চৈত্রের তৃতীয় রবিবারে আয়োজন হয় তিনদিনব্যাপী হরিনাম সংকীর্তন এবং উৎসবের। আর যদি সেই সপ্তাহেই পড়ে দোল পূর্ণিমা অর্থাৎ শ্রী চৈতন্যদেবের জন্মতিথি  তবে তো সোনায় সোহাগা। সেই উৎসবে সারা দেশ থেকে আগত কীর্তনিয়া গ্রুপের হরিনাম সংকীর্তন আর মেলা। পূর্ণিমার আগের রাতে রাতভর চলে অধিবাস অর্থাৎ আবাহন এবং শেষ হয় দধির ভাণ্ড মাটিতে ভেঙে পুণ্যার্থীদের ধুলায় গড়াগড়ির মাধ্যমে। আমাদের ছোটবেলায় আমরাও একটা সংকীর্তনের দল তৈরি করেছিলাম উৎসবে গাইব বলে।

অনেকেই আরেক বৈষ্ণব মতাদর্শ প্রচারক এবং শ্রী চৈতন্যদেবের প্রায় সমসাময়িক লাউড়ে আবির্ভুত হওয়া অদ্বৈত প্রভুর স্মৃতিধন্য পনাতীর্থে যাদুকাটা নদীতে বিখ্যাত বারুনী স্নান এবং বান্নির মেলার সাথে শ্রী চৈতন্যদেবের পৈতৃক ভিটায় সংগঠিত হওয়া রবিবারনি/বান্নি গুলিয়ে ফেলেন। পনাতীর্থের বান্নির মেলা হয় চৈত্র মাসের মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথিতে। হয়তো একই মাসে পনাতীর্থ এবং মাধবকুণ্ড সহ বাংলা জুড়ে বারুনী স্নান এবং বারুণীর মেলা হয় বিধায়  অনেকেই ঢাকাদক্ষিণের মেলাকেও বারুণীর মেলা হিসাবে ধরে নেন। যদিও ঢাকাদক্ষিণে শ্রী চৈতন্যদেবের প্রাঙ্গনের মেলা আর বারুণীর মেলার পারপাস একেবারেই ভিন্ন। পনাতীর্থ সহ বাকি বারুনী সম্পর্কিত সব মেলার নাম বান্নি এসেছে বারুনীর অপভ্রংশ থেকে, তবে ঢাকাদক্ষিণে শ্রী চৈতন্যদেবের মেলার নাম বান্নি হয়েছে রবিবারি থেকে বিবর্তন হয়ে অর্থাৎ রবিবারি>রবিবারনি >রইবারনি>রইবান্নি>বান্নি।  সিলেটের হিন্দুদের মধ্যে একটি বিশেষ রিচুয়্যাল আছে যা হলো  গয়া-কাশি-বৃন্দাবন-নবদ্বীপ সহ যাবতীয় তীর্থস্থান ভ্রমণ করে এসে যদি কেউ ঢাকাদক্ষিণে শ্রী চৈতন্যদেবের ধাম আর পনাতীর্থের বারুনীস্নান না করে তবে তাঁর তীর্থভ্রমণ সম্পূর্ণ হয় না।

ছোটবেলা বাবার কাছে গল্প শুনেছি ১৯৭১ সালে দেশজুড়ে যুদ্ধের দামামা। অন্য সব সনাতনধর্মী স্থাপনার সাথে আক্রান্ত হয় ঢাকাদক্ষিণের শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর পৈতৃক ভিটা। স্থানীয় পাকিস্তানি-দোসরদের সহায়তায় পাকিস্তানি হানাদাররা গুড়িয়ে দেয় পুরাতন মন্দিরের একাংশ। ওই সময়ে শ্রী চৈতন্যদেবের উত্তরসূরি শ্রী রাধাবিনোদ মিশ্রের পিতা শ্রী রাধিকা মিশ্র কোনোক্রমে কাঁঠালকাঠের তৈরি শ্রীকৃষ্ণ এবং শ্রীচৈতন্যদেবের প্রাচীন মূর্তি নিয়ে ভারতের করিমগঞ্জে পালিয়ে যান। যেখানে আজো সেই মূর্তি পূজিত হন বলেই শুনেছি। দেশ স্বাধীনের পরে ১৯৭২ সালে স্থানীয় মানুষদের সাথে নিয়ে আমার বাবা শ্রী অমল চন্দ্র চক্রবর্তী এবং শ্রী চৈতন্যদেবের উত্তরসূরি শ্রী রাধাবিনোদ মিশ্র উদ্যোগ নিলেন মহাপ্রভুর বিগ্রহ পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য। সেই গল্প বলতে গেলে বাবার চোখে দেখা যায় যৌবনের উচ্ছাস। আমার বাবা শ্রী অমল চন্দ্র চক্রবর্তী তখন সিলেটে মদন-মোহন কলেজে এবং রাধাবিনোদ মিশ্র মুরারিচাঁদ কলেজে পড়াশোনা করতেন। ফোনে যখন কথা হচ্ছিল বাবার সাথে এই বিষয়ে বেশকিছু জিজ্ঞাসার জবাব জানতে, তিনি বললেন, “তখন আমার এবং মিলন মিশ্রের (রাধাবিনোদ মিশ্রের ডাকনাম) বয়স বাইশ কি তেইশ। টগবগে তরুণ। আমরা স্থানীয় কিছু মানুষদের সাথে নিয়ে দুজনে উদ্যোগ নিলাম মহাপ্রভুর বিগ্রহ পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য। পাকিস্তানি আর্মিরা চলে গেছে কিন্তু বিশাল মন্দির এবং দাদাই বাড়ির পুরোটাই চলে গেছে স্বার্থান্বেষী মানুষদের দখলে।  সিলেটের তৎকালীন ডিসি ফয়জুল্লাহ সাহেব সেই অবৈধ দখল উচ্ছেদ করতে সর্বাত্মক সহায়তা করেন। একরাতের মধ্যে স্পেশাল ফোর্স পাঠিয়ে ঊনিশটি দখলদার পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়। মহাপ্রভুর পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য আপ্রাণ  সাহায্য করেন মদন-মোহন কলেজের অধ্যাপক  প্রয়াত কে.কে. পাল, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা প্রয়াত নিকুঞ্জবিহারী গোস্বামী এবং  প্রয়াত সমাজসেবক শ্রী উমেশ চন্দ্র। করিমগঞ্জের ডিসির সাথে সিলেটের ডিসি ফয়েজুল্লাহ নানান যোগাযোগ করলেও  প্রাচীন সেই মূর্তি ভারত সরকারের কাছ থেকে ফেরৎ আনা যায়নি এবং শ্রী রাধিকা মিশ্রও স্থায়ীভাবে আর ঢাকাদক্ষিণ ফিরে আসেননি। অগত্যা উমেশ চন্দ্র মহাশয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় মনিপুরী কারিগর দ্বারা শ্রীকৃষ্ণ এবং শ্রীচৈতন্যদেবের দুইটি মূর্তি বানিয়ে আনা হয়। স্বাধীন  পিতৃভুমিতে নবরূপে প্রতিষ্ঠিত হলেন  শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু। পরবর্তীকালে ১৯৯১ সালে আবারো কতিপয়  স্থানীয় ধর্মান্ধ সংখ্যাগুরু  দ্বারা আক্রান্ত হয় মানবতাবাদী বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্নদ্রষ্টা শ্রীচৈতন্যদেবের পিত্রালয়। আবারো মন্দিরের একাংশ গুড়িয়ে দেওয়া হয়। কয়েক বছর বান্নিতেও স্তিমিত-নিস্তেজ ভাব চলে আসে।  অবশেষে সব প্রতিকূলতাকে কাটিয়ে আবারো পূর্ন উদ্যমে শুরু হয় বান্নি এবং উৎসব।

আগেই বলেছি অধমের পৈতৃকভিটা থেকে শ্রী চৈতন্যদেবের পৈতৃকভিটার দূরত্ব মাত্র তিন মাইল। আমাদের শৈশবে সেই তিন মাইলের অর্ধেক রাস্তা ছিল কাঁচা আর বাকিটা আধাপাকা। সঙ্গত কারণেই সেই অর্ধেক রাস্তায় হণ্টন ছাড়া আর কোনো বাহনই ছিল না। মাঝেমধ্যে দুই-একটি মনুষ্যচালিত রিকশা নজরে পড়লেও তা ছিল বিরল এবং ঝুঁকিপূর্ণ। তাই প্রতি বছর মেলার সময়ে সেই দেড়মাইল  রাস্তায়  পা-ই ছিল ভরসা।  আমার মা খুব খুতখুঁতে স্বভাবের মানুষ। তিনি চাইতেন না আমরা ভিড়ের মধ্যে হেঁটে বান্নিতে যাই। তাই বান্নির পথে তাঁর বাঁধা ছিল প্রায় নিয়মিত।  তবে আমার জেঠিমা ছিলেন বান্নিতে যাওয়ার উদ্যোক্তা। জেঠিমার উস্কানি আর বাবার প্রচ্ছন্ন মদদে  আমাদের বান্নিযাত্রা ছিল নিয়মিত। আমার মনে আছে আমার শৈশবে জেঠিমাকে মা ডাকতাম। সেই জেঠিমা আমাকে কাঁধে নিয়ে প্রায় প্রতি বছর সেই দুই কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দিয়ে বান্নিতে নিয়ে যেতেন। রাস্তায় বেরোনোর পরেই দেখা যেত ধর্ম-বর্ণের উর্ধ্বে উঠে সারি সারি মানুষ চলেছে বান্নির মেলায়।  আমরাও শামিল হতাম সেই সারির একজন হয়ে। সময়ের পরিক্রমায় বছর-তিনেক হলো জেঠিমা আর হাঁটতে পারেন না। হুইলচেয়ারই ভরসা। সহসাই দেখতে পাই শৈশবের মহীরুহগুলো কেমন জানি গোধূলির আলোর মতো ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসছে। ভাবতেই মনে পড়ে পণ্ডিত জ্ঞানপ্রকাশের কম্পোজিশনে বাণী সরকারের গাওয়া  গান :

কূল ছেড়ে এসে মাঝদরিয়ায়
পেছনের পানে চাই।
ফেলে-আসা দিনে কি মায়া যে জানে
মন বলে ফিরে যাই …

মন চাইলেই কি ফিরে যাওয়া যায় সেই নির্ভাবনাময় বান্নির দিনগুলোতে ?

আগেই বলেছি শ্রী চৈতন্যদেবের বংশের একমাত্র উত্তরসূরি ঢাকাদক্ষিণ ডিগ্রি কলেজের বাংলার অধ্যাপক শ্রী রাধাবিনোদ মিশ্র এবং আমার বাবা পরস্পরের বন্ধু।  একসাথে বহু সংগ্রামের মাধ্যমে তাঁরা যুদ্ধপরবর্তী অচল সময়ে শ্রীচৈতন্যকে পুনঃস্থাপন করেন। সঙ্গত কারণে উৎসবের সপ্তাহে বাবা সকালে ঘুম থেকে উঠে স্নান সেরেই চলে যেতেন শ্রী চৈতন্যদেবের মন্দিরে। ভিড়বাট্টা পেরিয়ে মহাপ্রভুর মন্দিরে পৌঁছলেই দেখতে পেতাম শ্রী চৈতন্যদেবের বংশের একমাত্র সেবাইত রাধাবিনোদ মিশ্র আর আমার বাবা দুজনেই মন্দিরের উঁচু বেদিতে বসে উৎসবের তদারকি করছেন। খর্বকায় আমি মন্দিরের উঁচু বেদিতে রাখা শ্রীচৈতন্যদেবের দর্শন না পেলেও বাড়ি ফিরতাম মেলার অজস্র খেলনা ও খাদ্যসামগ্রী নিয়ে। পরবর্তী সময়ে উচ্চমাধ্যমিক স্তরে শ্রী রাধাবিনোদ মিশ্রের কাছে বাংলা ভাষা ও ব্যাকরণ বিষয়ে শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ পেয়ে ধন্য হয়েছিলাম। তাঁর বাংলা ভাষা, ব্যাকরণ, সাহিত্য ও সংস্কৃত বিষয়ে জ্ঞানের ভাণ্ডার এবং অগাধ রসবোধ সত্যিই ঈর্ষণীয়।

আমাদের শৈশবের বান্নি একেক সারিতে একেক ধরনের সামগ্রী নিয়ে বসতো পসারীরা। যেমন যেখানে কাগজের চরকাওয়ালারা  বসতো সে-জায়গাটা রঙিন হয়ে উঠত আমাদের শৈশবের মতো। হরেক রঙের কাগজের এসব চরকাকে আমরা বলতাম ফরফরি। রঙিন ফরফরি বাতাসে ঘুরছে একেবারে রঙিন ফ্যানের মতো। এর পাশেই গুড্ডির বিতান। রংবেরঙের ঘুড়িকে আমরা বলতাম গুড্ডি । সেই গুড্ডির নামের কী বাহার! বাকশো গুড্ডি, সাপ গুড্ডি, চান্দোয়া, পেটকাটি সহ আরও কত নাম!  ঠিক যেন শেষ-বসন্তের রং ঠিকরে পড়ছে প্রতিটি গুড্ডিওয়ালার ছাপড়া স্টলে।  এর পরে এল পোস্টারের স্টল। সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের পোস্টার থেকে শুরু করে মহাভারত-রামায়ণের কাহিনি-নির্ভর পোস্টার, বিভিন্ন হিন্দু দেবদেবীর পোস্টার, বাণী চিরন্তনীর পোস্টার সহ হাজারো রঙিন পোস্টার আর নায়ক-নায়িকার ভিউকার্ডে  ছেয়ে  থাকত একটি কর্নার। তখনো গ্লসি পেপারের চাকচিক্যময় পোস্টারের চল আসে নাই ঢাকাদক্ষিণে চৈতন্যদেবের বান্নিতে।  হালকা কাগজের এক একটি পোস্টারের দাম ছিল দুই টাকা। প্রতিবার মেলায় দুই-একজন নায়ক-নায়িকার পোস্টার আর একখানা সরস্বতীর পোস্টার কেনা ছিল মাস্ট। তবে কোন পাপে কোন শাস্তি দেবেন নরকের অধিপতি যমরাজ তার সচিত্র বিবরণ সম্বলিত পোস্টার দেখলেই ভয়ে শিউরে উঠত শিশুমন।

আরেকটা কর্নারে থাকত বাঁশি আর অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র। বাঁশিবিক্রেতার অপূর্ব বাঁশি বাজানো শুনে আকুল হয়ে প্রতিবারই একটা করে বাঁশি কিনতাম কিন্তু বাজানোটা শেখা আর হয়ে ওঠেনি। সেইসাথে একতারের বেহালা ছিল মেলার প্রধান আকর্ষণ। বাঁশ, চামড়ার ছানি দেওয়া মাটির ঘটি আর প্লাস্টিকের রিবন দিয়ে তৈরি  বেহালার মতো একটি বাদ্যযন্ত্র উঠত বান্নির মেলায়। বাঁশিবিক্রেতার মতো একতারের বেহালাবিক্রেতার বেহালার বেহাগ সুর আকুল করত নিমেষেই।  তাই আমরাও বেহালা কিনতাম এবং বাড়ি পৌঁছোবার আগেই সেই বেহালার দশা বেহাল হতো। বাঁশি-বেহালার সাথে যে জিনিশটা ছিল ‘মাস্ট বাই’-এর তালিকায় তা হলো একটা তিননাম্বারি বল। সেই বল নিয়ে পাড়ার মাঠে খেলতে গিয়ে পাড়ার বাকি খেলোয়াড়দের কাছ থেকে হাল্কার উপরে গর্জিয়াস সমীহ পেয়ে মন্দ লাগত না।

কথায় বলে বেল পাকলে কাকের কি? তবে  বান্নির পাকা বেল না খেলে কাকা জীবনটা অসম্পূর্ণই থেকে যায়। মেলাপ্রাঙ্গনের পুকুরপাড়ে বসতো বেলের দোকান।  নানা সাইজের পাকা বেল থরে থরে সাজানো। সেইসাথে থাকত দশ-বারো জাতের খৈয়ের পসরা। মিষ্টি খৈ, ভেটের খৈ, চিনির খৈ, গুড়ের খৈ  … খৈ ছাড়া বান্নির পরদিন সকালের নাস্তা অকল্পনীয়। এ তো গেল খেলনা আর খাবারদাবারের গল্প। বাকি রইল কাঠের তৈরি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি। নাগেশ্বরের ছিয়া, বটের গাইল, লাঙল, জোয়াল, হামানদিস্তা, ডালঘুটনি আর লোহালক্কড়ের তৈরি দা, শর্তা, ছুরি, কাঁচি, আই দা বা বটনি দা (পা-ওয়ালা দা) সহ সাংসারিক তৈজসপত্র। সেইসাথে দাদাইবাড়ির টিলার আশেপাশে প্রশাসনের চোখে হালকা ধুলো দিয়ে চলত খুবই ব্যাসিক লেভেলের জুয়ার আসর।

একবার উৎসবের  শেষের দিনে আমাদের সবাইকে তাক লাগিয়ে বাবা বাড়ি ফিরলেন ভ্যানে করে কাঠের একসেট সোফা, একটি আলমিরা আর টি-টেবিল নিয়ে। বান্নির শেষদিনের সন্ধ্যা, তাই সস্তা দামেই দিয়ে দিয়েছিল বিক্রেতা। সেটাই ছিলো আমাদের বাড়ির প্রথম কেনা সোফা। শ্রীচৈতন্যদেবের বাড়ির কাছে বাড়ি থাকার সুবাদে বান্নির উৎসবের সময়ে আমাদের বাড়িতে ভিড় বাড়ত আত্মীয়স্বজনের। সেই সাথে থাকত না মায়ের পড়াশোনার চাপ। সুতরাং চৈতন্যদেবের মন্দিরের বান্নির উৎসবের আঁচ লাগত আমাদের বাড়িতেও।

আমাদের ছেলেবেলায় ছিল না টেক্নোলোজির খেল। ছিল না ভার্চুয়াল জীবনের মেকি লোকদেখানো প্রদর্শনী। আমাদের ছিল অবারিত মাঠ, চৈত্র মাসের প্রতি রোববার জুড়ে মেলা। সস্তা দামের রঙিন ফরফরি, নানা রঙের পোস্টার আর ফুটবল নিয়ে আনন্দে বিভোর শৈশব। মজার বিষয় হলো ফরফরি যে দাঁড়িয়ে থাকলেও ঘোরে সেটা জানতাম না। তাই অধিক জোরে ঘোরানোর জন্য হাতে নিয়ে মনের আনন্দে দৌড়ে বেড়াতাম চৈত্রশেষের বিকেলগুলোতে। দেশ ছাড়ার আজ প্রায় এক যুগ। তাই বহু বছর হয় বান্নিতে যাওয়ার সুযোগ হয় না। আত্মিক টান বলে একটা জিনিশ আছে তা অগ্রাহ্য করার কোনো উপায় নেই। তাই জাগতিক দূরত্ব আর আবহাওয়ার তারতম্য থাকা সত্ত্বেও শেষবসন্তে পশ্চিমা চাকচিক্যময় শহরের কাচের জানালা থেকে ঠিকরে-পড়া আলোর ছটায় খুঁজে ফিরি শৈশবের বান্নিস্মৃতি। দেশে গেলে একবারের জন্য ঘুরে আসি স্মৃতিময় শ্রী চৈতন্যদেবের ঠাকুমার প্রাঙ্গন। দেখা করে আসি আমার শিক্ষক শ্রী রাধাবিনোদ মিশ্রের সাথে। জীবন আসলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্মৃতির সমষ্টি।  আমি সবসময় জীবনের সুখস্মৃতিগুলোকেই জীবনের সমষ্টি বলে গণ্য করি। সেই সুখস্মৃতির অন্যতম  শৈশবের বান্নিময় দিনগুলো।

দিন বদলের হাওয়ায় বাংলা জুড়ে ধীরে ধীরে গ্রামীণ মেলার যৌবন পড়তির দিকে। চারপাশটা এখন বড্ড কর্পোরেট বাণিজ্যময়। সঙ্গত কারণে দেশের শহর জুড়ে মাসের পর মাসব্যাপী চলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা। এসব বাণিজ্য মেলার চাকচিক্যের তুলনায় গ্রামীণ মেলাগুলো বড্ড সেকেলে এবং বিবর্ণ। সেইসাথে আছে দালাল  আর প্রশাসনের দৌরাত্ম্য। যদিও দীর্ঘ বিলেতবাসে দেখেছি এইখানে স্থানীয় অথরিটি কিভাবে বুক দিয়ে আগলে রাখে প্রাচীন স্থাপনা আর ভিলেজ ফেয়ার গুলোকে। কিন্তু আমাদের দেশে চলে তার ঠিক বিপরীত ঘটনা। তবুও শত প্রতিকূলতার মধ্যে ঢাকাদক্ষিণের বান্নি এখনো টিকে আছে। তবে চৈনিক চোখধাঁধানো সস্তা দ্রব্যের জেল্লার সাথে টেক্কা দিয়ে না-পেরে-ওঠা আমাদের গ্রামীণ মৃৎশিল্পী, কামার, কুমার, তাঁতি, কাঠমিস্ত্রি সহ গ্রামবাংলার ক্রিয়েটিভ লোকেরা ভিড় করছেন অন্য প্রফেশনে। মেলা হারাচ্ছে গ্রামীণ ঐতিহ্যময় সামগ্রীর যোগান। আজকের বাস্তবতায় বাণিজ্য মেলা আভিজাত্যের প্রতীক হলেও বান্নি সহ যাবতীয় গ্রামীণ মেলা রয়ে যায় ব্রাত্য। সেইসাথে রেজাল্টনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা নামক চরম এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা আমরা সংক্রমিত করছি কোমলমতি শিশুদের মধ্যেও। সেইসাথে অত্যাধুনিকতার আগ্রাসন। শৈশবের উচ্ছাস আর উদ্যমপূর্ণ মুহূর্ত দেবার বদলে শিশুদের মগজ ভারী করছি ‘এ প্লাস’ নামক দুর্যোধন দিয়ে। ব্যাকপ্যাকে বইয়ের বোঝার ভারে আজকের শিশুরা সম্ভবত জানবেও না চৈত্রশেষের বিকেলে মেলাফেরত শিশুর রঙিন ফরফরি হাতে খোলা মাঠে অক্লান্ত দৌড়ানোর অনাবিল আনন্দ আর কাচের গুঁড়ো দিয়ে মাঞ্জামারা সুতা প্যাঁচানো নাটাই হাতে ভরদুপুরে দখিনা বাতাসে বান্নির গুড্ডি উড়িয়ে বন্ধুর গুড্ডিকে বোকাট্টা বানানোর উত্তেজনা।

চৈতন্য মহাপ্রভুর পৈতৃক ভিটায় বান্নি : স্থিরচিত্রে মেলার একাংশ
মার্চ ২০১৯ চৈত্র
১৪২৫, ঢাকাদক্ষিণ সিলেট
স্লাইডে ব্যবহৃত আলোকচিত্রমালা
: জাহেদ আহমদ
(লেখার ভিতরে ব্যবহৃত ছবিগুলো অসীম চক্রবর্তীর সৌজন্যে পাওয়া)

… …

অসীম চক্রবর্তী

COMMENTS

error: