যেভাবে একটা গানের জন্ম

যেভাবে একটা গানের জন্ম

খুব জনপ্রিয় হয়েছিল গানটা, নাইন্টিন নাইন্টিনাইনে এখনও দুচোখে বন্যা অ্যালবামে এই গানটা জায়গা পায়, আজও জনপ্রিয় সমানভাবে। এবং ক্রমশ উজ্জ্বলতর হয়েছে এর উদ্ভাসন সর্বস্তরে ব্যান্ড-ননব্যান্ড শ্রোতা সাধারণ-সমুজদার নির্বিশেষে। জেমসের পরিচয় বিশেষ শ্রোতাগোষ্ঠীর বাইরে নির্বিশেষ জনতার কাছে বিস্তৃত হয় যে-কয়টা গানের মাধ্যমে এইটা সেই গানগুলোর শীর্ষে। ‘মা’ শিরোনামে এই গানটা বাংলা আবহমান গানশ্রোতার কাছে পরিচিত ও প্রিয়। অনবদ্য পঙক্তি, টিউন ও কম্পোজিশনের এই গান জেমসের রেন্ডিশনে এত জনপ্রিয় হয়েছিল যে এর ঠিক পরের বছর এইটার জন্মকথা ছাপা হয় একটা পাক্ষিক পত্রিকায়। এই নিবন্ধে সেই নিতান্ত হ্রস্ব ফিচারটিই প্রিজার্ভ করা যাচ্ছে, সেইসঙ্গে এক-দুই আশপাশকথা।

লাস্ট সেঞ্চুরির নাইন্টিনাইনে জেমসের অভাবিত শৌর্যোজ্জ্বল গলায় এবং গায়নে এখনও দুচোখে বন্যা অ্যালবামে ‘মা’ গানটা বাংলাদেশের সর্বশ্রেণির শ্রোতার কান ও মন হরণ করেছিল। বছরটাই ছিল জেমসের জন্য অত্যন্ত পয়া। তার ঠিক আগের বছর, নাইন্টিএইটে, বাজারে এসেছিল নগরবাউল ব্যান্ডব্যানারে লেইস ফিতা লেইস অ্যালবামটা। বাজারের বাও বোঝা ভার, দুর্ধর্ষ সংগীত ও লিরিকের সমবায়ে লেইসফিতা অ্যালবামটা তাৎক্ষণিক সাফল্য পায় নাই। কিন্তু ক্রমে এই অ্যালবামটার গানগুলো জেমসের ক্যারিয়ারে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে, সেইটা নাইন্টিনাইনেরও পরের ব্যাপার। লেইসফিতা বারানোর পরের বছরই ‘ঠিক আছে বন্ধু’ সোলো মুক্তি পেলে জেমসের ক্রেইজ আবারও তুঙ্গে ওঠে। এবং এই বছরই, নাইন্টিনাইনে, এখনও দুচোখে বন্যা  অ্যালবামে ‘মা’ গানটা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

এখনও দুচোখে বন্যা  বাংলাদেশে যে-সময় মিক্সড অ্যালবামের একটা ধারা চালু হয়েছিল সেই সময়কার সফল মিক্সডগুলোর একটা। অ্যালবামের কম্পোজার ও প্রোডিউস্যর প্রিন্স মাহমুদ। ‘মা’ গানটার গীতিকারও উনি নিজে। সেই সময় প্রিন্সের হাত দিয়ে একের পরে একটা অ্যালবাম বেরোচ্ছিল, মিক্সড-অ্যালবাম বলা হতো সেই বিভিন্ন-শিল্পীর-সমবায়ে-বেরোনো সংকলনগুলোকে। এই অ্যালবামে জেমস্ প্রথমবারের মতো প্রিন্সের ডিরেকশনে কাজ করেন বলে এইটা আলাদাভাবে এমনিতেই মেনশনযোগ্য। পরে জেমস্ অন্যান্য প্রিন্সমিক্সডগুলোতেও কণ্ঠ দিয়েছেন বলা বাহুল্য।


‘… বন্যা’ অ্যালবামে জেমসের ‘মা’ গানটার জন্মকথা আমরা জানতে পাই গানটা রিলিজের ঠিক পরের বছরেই। প্রিন্স মাহমুদের জবানিতে সেই রচনাটা ছাপা হয়েছিল ২০০০ খ্রিস্টাব্দের আনন্দভুবন  ঈদসংখ্যায়। দ্রষ্টব্য আনন্দভুবন বর্ষ ৪ সংখ্যা ১৬, ০১ জানুয়ারি ২০০০। অধুনা সার্কুলেশন ঢাকা শহরেই সীমিত শোবিজ-নিউজ-ভিউজপ্রচারক এই পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন কায়সুল হক;  পাক্ষিক এই পত্রিকাটার বিশেষত্ব ছিল এর ভিতরে ষোলোপাতার একটা পার্ট থাকত সারেগারে শিরোনামে, যেখানে একদম আনকোরা হালের দেশদুনিয়ার গানবাজনার খবরান্তর পাওয়া যাইত। এই পত্রিকাটা আমাদের দেশের বিনোদনসাংবাদিকতায় একটা মাইলফলক, আজও পর্যন্ত এইটা আনপ্যারালাল, সারেগারে সম্পাদনা করতেন অকালপ্রয়াত গোলাম ফারুক। তো, ‘মা’ গানের জন্মকথা ছাপা হয় যে-ফিচারের আওতায়, ‘জেনেসিস ২০০০’ সেই ফিচারের নাম এবং যেটি প্রিপেয়ার করেছিলেন যৌথভাবে এম. এস. রানা ও রাসেল আজাদ।

প্রতিবেদনের শুরুতে বলা হচ্ছে, “জেমস। মিউজিক নিয়ে ফিলিংস্-এর সাথে পাড়ি দিয়েছেন অনেকটা পথ। উপহার দিয়েছেন অসংখ্য জনপ্রিয় গান। তারপরও যে-গানটি জেমসের জন্য এক অনবদ্য সৃষ্টি সে-গানটির জন্ম খুব বেশিদিনের নয়। বছরও গড়ায়নি ‘মা’ গানটি সৃষ্টি হয়েছে।” এরপরে এই গানের স্রষ্টা প্রিন্স মাহমুদের জবানিতে আমরা পাচ্ছি গানটার আঁতুড়কথা। মাহমুদ জানাচ্ছেন —

আমি তখন ‘এখনো দুচোখে বন্যা-‘র কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে এনেছি। এমন সময় মাথায় বুদ্ধি এল একেবারেই ভিন্ন কিছু তৈরি করব। মাকে স্মরণে রেখে ঠিক করলাম মা নিয়েই একটা গান লিখব। আমি আমার আত্মা থেকে সবটুকু ভালোবাসা উজাড় করে লিখে ফেললাম ‘মা ‘ গানটি। তখনো জেমসের কোনো গান রেকর্ড করিনি। তাই ঠিক করলাম জেমসভাইকে দিয়েই ‘মা’ গানটি গাওয়াবো। ‘মা ‘ গানটির সুরও যথারীতি ব্যতিক্রমী করার জন্য উঠেপড়ে লাগলাম। তৈরি হলো সুর। ‘মা ‘ গানের সুরটা তৈরি হবার পর থেকে আমি অনেকটা আশাবাদী হয়ে উঠেছিলাম। এরপর জেমসভাই গানটা শোনার পর খুব প্রশংসা করলেন। আর গানটা ‘সাউন্ড গার্ডেন-‘এ রেকর্ডিঙের আগে যখন আমি গাচ্ছিলাম তখন সাউন্ডগার্ডেনের সাউন্ড-ইঞ্জিনিয়ার মবিন সরাসরি বলেই দিলেন — প্রিন্স, সত্যিই তুমি একটা অদ্ভুত গান সৃষ্টি করেছ! এক-কথায় এটা তোমার অনবদ্য সৃষ্টি। … মবিনের কথাটা আমার খুব ভালো লেগেছিল। তবে তারচেয়েও বেশি ভালো লেগেছিল যখন জেমসভাই গানটি করেন। কারণ জেমসভাই তার সবটুকু অনুভূতি ঢেলে দিয়ে মা  গানটা করেছেন। আমি ঠিক যেমনটা চেয়েছি, ‘মা ‘ গানটা তেমনই হয়েছে। হয়তো আমি ও জেমসভাই দু-জনেই বাবা-মাকে হারিয়ে তাদের শূন্যতা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি। আর তারই ফসল হিশেবে আমাদের মাঝ থেকে বেরিয়ে এসেছে মায়ের সঠিক একটা অর্থ, যা পৃথিবীর সমস্ত মা-জাতিকে উৎসর্গ করেছি।

ইন-শর্ট আবহমান বাংলায় মায়ের আগমন যেভাবে হয়েছিল, উপরের কোটেশনে সেইটা পাওয়া গেল। গোটা গানের লিরিকটা আমরা আরেকবার লিখে দেখি এইখানে —

দশমাস দশদিন ধরে গর্ভে ধারণ
কষ্টের তীব্রতায় করেছে আমায় লালন
হঠাৎ কোথায় না-বলে হারিয়ে গেল
জন্মান্তরের বাঁধন কোথা হারালো

সবাই বলে ওই আকাশে লুকিয়ে আছে
খুঁজে দেখো পাবে দূর নক্ষত্র মাঝে
রাতের তারা আমায় কি তুই বলতে পারিস
কোথায় আছে কেমন আছে মা
ওরে তারা রাতের তারা মাকে জানিয়ে দিস
অনেক কেঁদেছি আর কাঁদতে পারি না।।

মায়ের কোলে শুয়ে হারানো সে-সুখ
অন্য মুখে খুঁজে ফিরি সেই প্রিয় মুখ
অনেক ঋণের জালে মাগো বেঁধেছিলে তাই
বিষাদের অভয়ারণ্যে ভয় তবু পাই

সবাই বলে ওই আকাশে লুকিয়ে আছে
খুঁজে দেখো পাবে দূর নক্ষত্র মাঝে
রাতের তারা আমায় কি তুই বলতে পারিস
কোথায় আছে কেমন আছে মা
ওরে তারা রাতের তারা মাকে জানিয়ে দিস
অনেক কেঁদেছি আর কাঁদতে পারি না।।
কথা, সুর ও সংগীতায়োজন : প্রিন্স মাহমুদ ।। কণ্ঠশিল্পী : জেমস্ ।। ব্যান্ড : নগরবাউল (ফিলিংস্)

মায়ের সাফল্য ধরে এরপরে প্রিন্স ‘বাবা’ গানটা কম্পোজ করেন এবং সেইখানেও জেমস্ অনবদ্যভাবে রেন্ডার করেন। ‘মা’ এবং ‘বাবা’ উভয় গানই ব্যাপক জনপ্রিয় হয় এবং আজও এই গানজোড়া মানুষের আদর কুড়ায় সর্বত্র। প্রিন্স-জেমস্ জুটির এই সৃষ্টিজোড়া বাংলায় গানশ্রোতার হৃদয়ে বেঁচে রইবে যুগযুগান্ত।

প্রতিবেদন : সুবিনয় ইসলাম

… …

COMMENTS

error: