বনজুঁই ঘুমিও না ১ || নিবেদিতা আইচ

বনজুঁই ঘুমিও না ১ || নিবেদিতা আইচ

SHARE:

কী আশ্চর্য অবরুদ্ধ কাল নেমে এসেছে জীবনে! একেকটা দিনের দৈর্ঘ্য বাড়তে বাড়তে যেন আকাশ ছুঁয়েছে। আর বিষাদ হয়েছে অতল। প্রতি মুহূর্তে ভাবি এই দিনটি ফুরালে আরেকটা সকাল দেখতে পাবো তো? যদি দেখতে না পাই তবে নিশ্চিতভাবে বিস্মৃত হব পৃথিবীর বুক থেকে। তাই হয়তো এভাবে স্মৃতির বুদবুদে নিত্য ভেসে বেড়াতে চাই। বুনোফুলের মতো শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিগুলো গেঁথে রাখি একে একে, ওদের জাগিয়ে রাখি। তাই এই প্রয়াস।


ব ন জুঁ ই  ঘু মি ও  না  ।। প র্ব  ১
আমরা তখন আলোরমেলায় থাকি। আলোরমেলা অফিসার্স কলোনি। আমাদের ভবনটির দেড়তলায় সিঁড়ির বুকে বাগানবিলাস আর অলকানন্দার দারুণ ঝাড় ছিল। কিন্তু সেই ভবনের নাম ছিল ‘শাপলা’। ব্যাপারটা সে-বয়সে আমি মেনে নিতে পারতাম না। নাম হিসেবে বাগানবিলাস বা অলকানন্দা বেশি সুন্দর বলে মনে হতো।

আলোরমেলা থেকে সরযুবালা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় হাঁটাপথের দূরত্ব। আমি তখন সেই স্কুলে নবম শ্রেণীর ছাত্রী। সমাজকল্যাণের মাঠ পেরিয়ে স্কুলে যেতাম। মাঝেমাঝে অফিসের জিপে আমাদের নামিয়ে দিয়ে তারপর অফিসে যেত বাবা। যাবার পথে আদর্শ শিশু বিদ্যালয়ে থামতে হতো। মেঝো বোন পড়ত ঐ স্কুলে। ছোট্ট কিন্তু ভীষণ সুন্দর মাঠ ছিল ওদের। দেয়ালে রঙিন ফুল, লতাপাতা, আলপনা। আমার খুব ভালো লাগত দেখতে।

আমাদের ‘শাপলা’ ভবনটার সামনে ছিল ছোট্ট একটা লন। আবার খুব ছোটও নয়। এই লনে আমরা ব্যাডমিন্টন খেলতাম শীতের মৌসুমে। তার একপাশে ছিল সব্জিক্ষেত আর ফুলের বাগান। অজস্র ডালিয়া, কসমস, ঝুমকোজবা, হাসনাহেনা, ভুঁইচাঁপারা জেগে উঠত যার যার মৌসুমে। সব্জিক্ষেতে ফলতো ফুলকপি, ব্রকলি, টমেটো, বেগুন, ঢেঁড়স আরো কত কী! মা নিজের-হাতে-চাষ-করা সব্জি ঝুড়ি ভরে তুলে আনত ঘরে।

লনের আরেকপাশে ছিল লেডিস ক্লাবের অফিস। পেয়ারা গাছ, ঘাসের জঙ্গল। সেই জঙ্গলে বাস করত এক গুঁইসাপ। তার নাম আমরা দিয়েছিলাম ম্যারিয়ান।

বাসার মুখোমুখি ছিল সমাজকল্যাণ অফিসের মাঠ। মাঠের শেষ মাথায় রাস্তার ধার ঘেঁষে একটা পরিত্যক্ত বাড়ি ছিল। স্কুলে যাবার সময় কি বিকালে কলোনির ভেতর চক্কর কাটবার সময় বাড়িটার ভাঙা জানালাগুলো দিয়ে উঁকি দিতাম আমরা। মেঝো বোনটা তখন ক্লাস থ্রি বা ফোরে পড়ে। এই বাড়িতে ভূত আছে বললে দিব্যি বিশ্বাস করত সে। আর আমি মনে মনে হাসতাম খুব। তবে গা ছমছম ভাব আমারও হতো। সন্ধ্যায় পড়তে বসে লোডশেডিং হয়ে গেলে দু-জন হরিহর আত্মার মতো বসে থাকতাম হারিকেন বা চার্জলাইট না জ্বলা অব্দি। আমি অবশ্য তার মধ্যেও ওকে খ্যাপাতাম। দাঁতমুখ খিঁচিয়ে বলতাম — আমি কিন্তু তোর দিদি নই, আমি ভূত।

রোজার সময় খুব মজা হতো আমাদের। আশেপাশের কোয়ার্টারগুলো থেকে ট্রেভর্তি ইফতার আসত। প্রায় প্রতিদিন। বাবা অফিস থেকে ফেরার পথেও কখনো কিনে আনতেন বেগুনি, পেঁয়াজু, ছোলা-মুড়ি। বাসায়ও ছোলা রান্না হতো কখনো কখনো। আমি আর মেঝো মিলে আজানের অপেক্ষায় থাকতাম। আজান দেয়া মাত্রই একটু জল মুখে দিয়ে ছোলা আর পেঁয়াজু খেতে শুরু করতাম। আর হেসে গড়িয়ে পড়তাম একে অন্যের গায়ে। ঐ বয়সের সারল্যটা হারিয়ে গেছে কবেই! আজকাল এমন নির্দোষ আনন্দ পাওয়ার যেন সুযোগও নেই।

আলোরমেলায় বছরখানেক কাটাবার পর বাবার বদলি হলো ঢাকায়। এবার আমাদের ঠিকানা হলো লালবাগে। ছাতা মসজিদের ঘুপচিগলির সেই ভাড়াবাসাটির একতলায়। সেখানে প্রায় দুটো বছর থেকেছি আমরা। ওখানে গিয়ে হুট করেই আমাদের আকাশটা ভীষণ ছোট হয়ে গেল। জানালা খুললে পেকু মিয়ার সাবান ফ্যাক্টরির ধোঁয়া আর উৎকট ঘ্রাণ নাকেমুখে এসে হামলে পড়ত। জানালা বন্ধ করলে ভরদুপুরেই ঘরে রাত নামত।

আমার পড়ার ঘরের সাথে আক্ষরিক অর্থেই একচিলতে বারান্দা ছিল একটা। সেই বারান্দার ছাদ ছিল না। তাই একচিলতে হলেও বারান্দাটি সুন্দর ছিল। মনে আছে একদিনের কথা। তখন আমার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা চলছে। অনেক রাত অব্দি পাশের বিল্ডিংয়ে আসিফ আকবর প্রায় প্রতিদিন সুরে সুরে প্রিয়াকে খোঁজেন, অভিশাপ দেন। রাতে তাই খুব-একটা পড়া হতো না আমার। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে পড়তে বসে যেতাম। সেদিনও ভোরবেলা খুব মন দিয়ে পড়ছিলাম। হঠাৎ দেখি এক অজ্ঞাতকুলশীল লোক পাশের বিল্ডিংয়ের দেয়াল থেকে ঝুপ করে লাফ দিয়েছে আমাদের ছাদখোলা বারান্দায়। আমি চেঁচিয়ে উঠতেই ঘরের সবাই জেগে উঠল। আর বেচারা ভীষণ ভ্যাবাচেকা খেয়ে পালিয়ে গেল তক্ষুনিই।

মনে আছে লালবাগে রোজার সময় অন্যরকম অভিজ্ঞতা হয়েছে যা আগে মফস্বলে আমরা দেখিনি। কারণ আমরা তখন থাকতাম আবাসিক এলাকায় যা বাজার থেকে বেশ দূরে ছিল। কিন্তু লালবাগের ব্যাপারটা অন্যরকম। চারপাশে বাজার, অসংখ্য দোকান। গিজগিজ করছে লোকজন। এখানে রোজার সময় হরেক রকম ইফতার আইটেম নিয়ে ফুটপাতে খোলা আকাশের নিচে, দোকানের সামনে শামিয়ানা পেতে পসরা সাজিয়ে বসতো দোকানিরা। প্রচুর ভিড় হতো রাস্তায়। ছত্রিশ পদের ইফতারি থেকে যার যা পছন্দ কিনে নাও। দু-চারদিন প্রতিবেশীদের বাসা থেকেও ট্রেভর্তি ইফতার আসত। না এলে মা তৈরি করে দিত আমাদের। কিন্তু আগের সেই আমেজটা যেন আর পেতাম না। বোধহয় আমার কৈশোর ফুরিয়ে গিয়েছিল বলে ওরকম লাগত। মফস্বলের আন্তরিকতা ধাতব শহর পর্যন্ত এসে পৌঁছায় না সেটাও বুঝতাম। আরো পরে বুঝেছি সময়টাও তো বদলে গিয়েছে সময়ের সাথে।


প্রচ্ছদচিত্র : অসীম দাস

… …

নিবেদিতা আইচ

COMMENTS

error: