ব্রাজিল || রজার ইবার্ট

ব্রাজিল || রজার ইবার্ট

জর্জ অরোয়েলের উপন্যাস ‘১৯৮৪’ যেমন অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের একটা অল্টার্নেটিভ ভিশন, ‘ব্রাজিল’ সিনেমাটাও মনে হয় যেন অরোয়েলেরই উপন্যাসের একটা ভ্যারিয়েশন। চলচ্চিত্রটার ঘটনাবলি সংঘটিত হয়েছে এমন একটা জায়গায় এবং এমন একটা সময়ে যে দেখে মনে হবে এইটা আমাদেরই তো, সময়টা আর জায়গাটা আমাদেরই নিজেদের, কতকটা আবছা হলেও ছবিটা আমাদেরই নিজেদের বলে মনে হয়। আমাদেরই, ঠিক আছে, কিন্তু হলেও সেইটার গ্র্যাফিক্স সেইটার হার্ডওয়্যার সেইটার পোলিটিক্স ভিন্ন। ওখানকার সমাজটা চালায় একটা মনোলিথিক অর্গ্যানাইজেশন, ওই সমাজের সভ্যরা বা নাগরিকেরা প্যারানোয়্যা আর নিয়ন্ত্রণ-অবদমনের ভিতরে দিনাতিপাত করে। সেখানে ভিন্নমতপ্রকাশকারীদের শায়েস্তা করতে নেমে আসে ছাদ ফুঁড়ে, যেনবা আসমান থেকে, বেমক্কা গা-জোয়ারি চিন্তা-রোখনেওয়ালা লেঠেল বাহিনি বা থটপ্যুলিস্। ওই সমাজের জীবনযাত্রা ভারি নির্মম, কঠোর দমনপীড়নের, অতিশয় নিম্নমানের লিভিং স্ট্যান্ডার্ড।

‘ব্রাজিল’ ম্যুভির হিরো নম্র অপ্রতিবাদী একটা ছোটখাটো মানুষ, অপ্রতিবাদী হলেও সে বেপরোয়া, দিনভর কাজ করে একটা কম্পিউটার টার্মিনালে। এই হিরোর চরিত্রে অভিনয় করেছেন জোনাথান প্রাইস (Jonathan Pryce)। সিনেমায় হিরো চরিত্রের নাম রাখা হয়েছে স্যাম লৌরি। স্যাম সাধুসন্ত নয়, নায়কসুলভ ন্যাকা ভালোমানুষও নয়, মাঝেমধ্যে সে চিট করে, ফাঁকি-ধোঁকা দেয়, ঠকায়; সিনেমায় দেখি যে স্যামের বস্ যখন অন্যমনস্ক বা অন্যত্র ব্যস্ত তখন স্যাম তার পাশের টেবিলের সহকর্মীটিকে নিয়ে কম্পিউটার বন্ধ করে পুরানা ভাঙাচোরা টেলিভিশনের অনুষ্ঠান দেখতে লেগে যায়। স্মৃতিঝিলিমিলি টিভিপ্রোগ্র্যাম উপভোগ করে। স্যাম জানে তার জীবনে কোনো রঙ নেই, নিষ্প্রভ জীবন তার, খিড়কি-দরোজাগুলোও অতি ক্ষীণকায়, সে জানে এই জীবন থেকে বেরোবার আশা নাই, এর ভিতরে থেকে এখান থেকে তার পাবারও কিচ্ছুটিই নাই। কীভাবে বাঁচবে সে, এই নিরাশার দমবন্ধ সমাজে সে নিঃশ্বাস নেবে কেমন করে? একমাত্র রাস্তা স্যামের ফ্যান্টাসি। বিদঘুটে এই দৈনন্দিনতা থেকে এই একটা রাস্তায় বাঁচতে পারে সে, ফ্যান্টাসির রাস্তায়, হোক সেইটা দিবাস্বপ্ন; খোয়াবের ভিতরেই সে এই বিকট দমনপীড়নবাস্তবতা থেকে উড়ে যেতে পারে আকাশের ওপারে আকাশে, উড়ালের খোয়াব দেখে সে, এক রূপকুমারী মমতানারীকে দেখতে পায় সে স্বপ্নের গভীর ভিতরে।

brazilস্যামের রোজকার জীবনে আদৌ সম্ভাবনার কোনো ফোঁটাছিঁটা চিহ্নও নাই। জীবনধারণের মৌলিক ম্যাকানিজমটাও মনে হচ্ছে ভেস্তে যেতেছে। একদম গোড়ার দিকটায় দেখতে পাই জিনিশপত্র সারাইয়ের জন্যে মেকানিক এসেছে। মেকানিকদের মধ্যেও আবার রয়েছে বৈধ-অবৈধ বা অনুমোদিত-অনুমোদনহীন। যে-মেকানিকটা আসে, অভিনয় করেছেন এই চরিত্রে রবার্ট ডি নিরো (Robert De Niro), সে ইলিগ্যাল ফ্রিল্যান্স রিপেয়ার্ম্যান। মনোলিথিক শাসক সংগঠকেরা যা-কিছু রিপেয়ারের অযোগ্য মনে করে, ডি নিরো তা-ই ফিক্স করে দিয়ে মুসিবতে-পড়া মানুষগুলোকে একটু স্বস্তি দিয়ে নিজে সমাজ/রাষ্ট্রদ্রোহী হয়। ডি নিরোকে দেখা যায় একটা লম্বা তারের সহায়তায় নিজের মুক্তির পথ বা পালানোর/পগারপারের পথ পেয়ে যেতে। স্যামের জীবনে এস্কেইপ নাই।

ঠিক এইরকম চলতে চলতে একদিন স্যাম একটা আজব জটিলতায় প্যাঁচ খেয়ে যায়, যে-জটিলতার সঙ্গে তার স্বপ্নমানবী ইনভোল্ভড। এর সঙ্গে জড়িত স্টেটের চিফ এক্সিকিউটিভ পর্যন্তও, জড়িত মতানৈক্য-বরদাশ্ত-না-করা মাস্তানগুণ্ডাবাহিনী। কিন্তু, এই-যে ব্যাপারগুলো বলা হচ্ছে, খুবই চিনাপরিচিত মনে হচ্ছে না? হ্যাঁ, ‘ব্রাজিল’ সিনেমার আউটলাইন অনেকটাই মিলে যায় ‘১৯৮৪’-র সঙ্গে; অ্যাপ্রোচটা আলবৎ ভিন্ন।

জর্জ অরোয়েলের হেলানো ভঙ্গিমার অদ্ভুত গদ্যটাকে এরই মধ্যে একটা ছায়াছবিতে ক্যাপ্চার করা হয়ে গেছে, সেই সিনেমাটাও অরোয়েলেরই লিয়িন/হেলানো গদ্যের সঙ্গে পাল্লা-দেয়া প্রায় সমানে সমান হয়েছে, এইখানে ‘ব্রাজিল’ ম্যুভিটা যেন অনেকটা নাইন্টিন-সিক্সটিসের সাইকেডেলিক হাজিরা, অ্যানার্কিক সেই ভিশনটা কাজ করেছে এর পিছনে যে তুমি যদি কিছু গড়তে চাও বা বিকাশ চাও কোনোকিছুর তবে সেই জিনিশটাকে গুঁড়িয়ে ভেঙে দাও।

brazilদুই বিশ্বের মধ্যে একটা ফারাক আছে আরও, অরোয়েলের শৈলীবিশ্ব আর গিলিয়্যামের শৈলীবিশ্বের মধ্যে একটা ফারাক, দ্বিতীয়োক্ত রচয়িতার কাজে যেন অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের কোনো বালাই নাই। দ্বিতীয় রচনাটা সামনে এনেছেন টেরি গিলিয়্যাম (Terry Gilliam), যিনি সিনেমাটার ডিরেক্টর এবং কো-রাইটার। যদিও ‘ব্রাজিল’ নির্মাণকালে একটা আর্থিক নিশ্চয়তা আগাগোড়াই ছিল, আমরা জানি, পয়সার লগ্নি ছিল যথেষ্ট ভালোই; কিন্তু ইউনিভার্স্যাল পিকচার্স বহু গড়িমসি করছিল ম্যুভিটা বানাইবার সময়, রিলিজই দিতে চাইছিল না তারা। কারণ কি? সিনেমায় বিস্তারিতভাবে ব্যাপক স্পেশ্যাল ইফেক্টের ব্যবহার হয়েছে, সেট ডিজাইন সেন্সেশন্যাল, ধ্বংসযজ্ঞের অ্যাপোক্যালিপ্টিক দৃশ্যকল্পনা আর সাধারণ যুক্তিশৃঙ্খলের ঘাটতি ইত্যাদি নিয়া ‘ব্রাজিল’ এক ধুন্দুমার সিনেমাকাজ। লগ্নিকারকের পক্ষে এইটার ফিউচার নিয়া ভাবনাভাবনিরই কোনো প্রবেশপয়েন্ট নাই। গিলিয়্যাম মনে হয় নিজের তাবৎ ফ্যান্টাসি লিখে ফেলেছেন একটা টেবিলে মাথা ঝুঁকিয়ে ঘাড় গুঁজে কোনোদিকে না তাকিয়ে, লেখার সময় এর ম্যুভিনির্মাণকল্পে কেমনধারা জটিলতা আসতে পারে বা এর প্রোডাকশন-ডিফিকাল্টিগুলো সম্ভাব্য কি কি হতে পারে, লেখার সময় গিলিয়্যাম এইসব থোড়াই পরোয়া করেছেন। রচনাটা লেখা হয়ে যাবার পরে এসেছে ফিল্মিঙের প্রশ্ন। এইবার কি হবে? টেরি গিলিয়্যাম সোজা রাস্তা নিয়েছেন, অকুতোভয়, থোড়াই কেয়ার করেছেন যৌক্তিকতার।

ম্যুভিটা আগাগোড়া অনুসরণ করা যাওয়া ভারি শক্ত। দুইবার দেখেছি আমি, কিন্তু সত্যি বলতে কি এখনও নিশ্চিত না ক্যারেক্টারগুলো কে কী করছে, কেনই-বা ক্যারেক্টারগুলো করছে এইসব ইত্যাদি।

কিন্তু মনে হয় যে এইটা আর-পাঁচটা সিনেমার মতো সরলসিধা পাঠ করে ফেলা হোক তা চান নাই গিলিয়্যাম। একটা বোধ্য-অবোধ্য দোলাচলে রেখে দিক ভিয়্যুয়ারদেরে, এইটাই সিনেমার অভিপ্রেত, এইটাই সিনেমার প্যারানোয়েড ভিশনের অংশ। অনেক ইন্ডিভিজুয়্যাল মোমেন্ট আছে সিনেমায় যেগুলো শার্প ইমেইজ তৈরি করে (সিলিং ড্রিল করার দৃশ্য, ডি নিরো কুস্তি করছে প্যাঁচানো তারের জঞ্জালের সঙ্গে, একটা দেয়ালের ভিতর দিয়ে টিউব গলিয়ে ঢোকানো হচ্ছে ইত্যাদি), কিন্তু নিশ্চিতভাবেই দৃশ্যগুলোকে সম্পাদনার হাত দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হয় নাই বা চাওয়া হয় নাই নিয়ন্ত্রিত করতে।

এই সিনেমার সেরা দৃশ্য আমার বিচারে সেইটাই, সিম্পল শাদামাটা দৃশ্য বলতে গেলে, যেইখানে স্যাম অতিকায় আপিশভবনের আদ্ধেকটা পারায়ে গেছে দৌড়ে এবং একসময় নিজেকে আবিষ্কার করছে সে আসলে নিজের ডেস্কে বসে দেয়ালের ওইধারের কলিগের সঙ্গে বচসারত। ঝট করে চ্যাপ্লিনের একটা ফিল্ম মনে এসে যায় এই দৃশ্যে, সেই-যে, ‘মডার্ন টাইমস্’ (Modern Times), এবং মনে পড়ে আরও যে, চ্যাপ্লিনের ফিল্মে ইকোনোমি এবং সিমপ্লিসিটি জিনিশদুইটা ছিল গুণ, গিলিয়্যামে এইগুলো দোষ বা এনিমি হিশেবে দেখা হয়েছে।

Title: Brazil ।। Genre: Dystopian Sci-Fi Film ।। Directed by Terry Gilliam ।। Written by Terry Gilliam, Charles McKeown, and Tom Stoppard ।। Starring:  Jonathan PryceRobert De NiroKim GreistMichael PalinKatherine HelmondBob Hoskins and Ian Holm  Language: English ।। Running Time: 142 minutes ।। Released in 1985

rogerebert.com থেকে বাংলায়  মিল্টন মৃধা

… …

COMMENTS

error: