বড়দিনের বালক

বড়দিনের বালক

পৃথিবী সিডরচিৎকারে তড়পাচ্ছিল তাঁর অগস্ত্যযাত্রার সেই নভেম্বররাত্রিটিতে।

কে এই অগস্ত্য? – কড়া নেড়ে যাওয়া ভুল দরোজায়, কান্নার রঙে আর জ্যোছনার ছায়ায়, শিল্পসন্ত সঞ্জীব চৌধুরী।

শিল্পসন্ত? মানে কী? শিল্পের সন্ত? শিল্পের সেইন্ট? শিল্প বানাইতে বানাইতে সেইন্ট, নাকি সেইন্ট হবার কারণেই শিল্প বানাইতে নেমেছেন? সন্ত জিনিশটাই-বা কী বা শিল্পী কি সন্ত বা সেইন্ট হয়? শিল্পকলা আদৌ দর্বেশগিরির জায়গা?

আরও কথা প্যাঁচানো যায়, কিন্তু আর না। বার্থডেতে টেডিয়াস আর্গ্যুমেন্টের অবতারণা করবার মতো তরুণ টকশোয়ার বা বাঙ্গু প্রভাষক আমি না। হ্যাপি বার্থডে ডিয়ার সঞ্জীব চৌধুরী; ম্যানি ম্যানি হ্যাপি রিটার্নস্ অফ দ্য ডে। এরচেয়ে দামি কথা আর কী আছে?

এইসব কথা মানুষ আদর করতে যেয়ে বলে – এই ‘শিল্পসন্ত’, ‘শিল্পের শহিদ’, ‘কবিতার সন্ত’, ‘কবিতার শহিদ’, ‘উপন্যাসের নৃপতি’, ‘সিনেমার রাজা’, বাউলসম্রাট ব্লা ব্লা। আনন্দ পায় বলেই শিল্পী গান করে, শ্রোতা গান শোনে। সেইটা শিল্প হলো নাকি বিরক্তিকর বদ কিছু হলো তা বাদ-কা বিবেচনা। গান যে গায়/লেখে সে নয়, শিল্পছাপ্পাটা দাগায় বা আরোপ করে ক্রিটিক/শ্রোতা। আদুরে এইসব ‘বাউলসম্রাট’, ‘খেউড়কিং’ ইত্যাদি দিয়া গানবাজনা বা শিল্পের ফায়দা হয় থোড়াই।

শীতের এই হিমবাহী ক্রিসম্যাসদুপুরে চেষ্টা করছিলাম সঞ্জীবের গানের কিছু পঙক্তি ইয়াদ করতে যেইগুলা আমি মিনমিনায়া গাইতাম আমার উড্ডয়নের দিনগুলায়। কিন্তু গোটাগুটি লিরিকটা আজ আর মনে করতে পারছিলাম না, আর গ্যুগ্লাইতেও মন চাইছিল না। কাজেই যে-কয়টা আর যেট্টুক ইয়াদ আছে সেই তট্টুকই কিবোর্ডে খটখটায়া গেলাম দুপুরভর। রেজাল্ট এই প্যারার তলায় পরপর যাক রাখা, আপাতত ছয়টুকরা :

১।
তাই তো অবুঝ মেঘের কোলাহলে
ফাঁদ পেতেছি চাঁদ ধরব বলে
ফের যদি তুমি দিগন্তে করো দেখা
দেখবে বন্ধু ষড়যন্ত্র আঁকা
***
তাই তো জোয়ার আনতে পাঁজর খুলে
ফাঁদ পেতেছি চাঁদ ধরব বলে
[ব্যান্ড দলছুট। অ্যালবাম জোছনাবিহার। বাপ্পা-সঞ্জীব ডুয়েট কণ্ঠ]

২।
ক্রীতদাসের হাসি শুনি নিজের ভেতর
ভাসছে ছুরি ঘুরছে ছড়ি মাথার ওপর
এই জমানার ক্রীতদাসকে মুক্তি দিও —
প্রভু! আখের রসে আরেকটুকু মিষ্টি দিও

ওই ছেলেটি এমন কেন ঝিমিয়ে কাটায়
আকাশটা কি আগুনপুরী মৃত্যুভাটায়
ওই ছেলেটির মৃত্যুকূপে জীবন দিও —
প্রভু! আখের রসে আরেকটুকু মিষ্টি দিও

ওই শিশুটি দারুণ শীতে কাঁপছে কেমন
রাস্তা জুড়ে ভিড়ের মাঝে জীবন যেমন
ওই শিশুটির ভবিষ্যতে দৃষ্টি দিও —
প্রভু! আখের রসে আরেকটুকু মিষ্টি দিও —
প্রভু, আখের রসে আরেকটুকু মিষ্টি দিও!
[সঞ্জীবের জীবদ্দশায় রিলিজড অন্তিম অ্যালবাম ‘জোছনাবিহার’-এ এইটা আমরা পাই। রিলিজের ঠিক একমাসের মাথায় দেহ রাখেন সঞ্জীব]

৩।
নাম
শুধু নাম
জ্বলে অবিরাম
এইখানে
আমিও ছিলাম

বলেছ বারণ
বলেছ বিদায়
…তবু হাত
ডাকে আয়
[গান : ‘কার ছবি নেই’; অ্যালবাম : আকাশচুরি; লিরিক, টিউন অ্যান্ড সাঙ বাই সঞ্জীব চৌধুরী]

৪।
তীরহারা এই দুঃসময়ে স্বপ্ন ডাক দেয়
হাতছানিতে যাই হারিয়ে আঁধার অচেনায়।।
আমার গানের সাথে তোমার গান মেলাও।।
আমার সুরের সাথে তোমার সুর মেলাও।।
[গান : ‘আমি ফিরে পেতে চাই’; অ্যালবাম : আকাশচুরি; শিল্পী : সঞ্জীব চৌধুরী]

৫।
পাখির কণ্ঠে বেসুরো গান ভালো লাগে না
নরনারীর একমুখী টান ভালো লাগে না
ওই ফুলের বুকেই ধুতুরার ঘ্রাণ ভালো লাগে না
ছুরির ভয়ে চমকানো প্রাণ ভালো লাগে না

তোমায় নিয়ে কাড়াকাড়ি ভালো লাগে না
তোমায় নিয়ে বাড়াবাড়ি ভালো লাগে না
আর তোমার-আমার ছাড়াছাড়ি ভালো লাগে না
তোমায় নিয়ে কাড়াকাড়ি ভালো লাগে না

কান্নাকাটি-হল্লাহাটি ভালো লাগে না
সবুজ দ্বীপে মরণঘাঁটি ভালো লাগে না
দুঃস্বপ্ন-ছাওয়া মাটি ভালো লাগে না
অন্ধকারে বসতবাটি ভালো লাগে না

ওই কান্নাভেজা আকাশ আমার ভালো লাগে না
থমকে-থাকা বাতাস আমার ভালো লাগে না
দড়ির তালে নাচতে থাকা ভালো লাগে না
এই মরে মরে বেঁচে থাকা ভালো লাগে না
[অ্যালবামের নাম ইয়াদ নাই, সম্ভবত শেষের আগেরটা]

৬।
আমি তোমার জন্য কাব্য কুড়াই তোমার জন্য গান
লিখি তোমার-আমার বানভাসানি ভীষণ অভিমান
আমি বুকের মধ্যে জমা রাখি হারানো সন্তান
তুমি না-জানো সন্ধান
খোঁজো সাগরপাড়ের হাওয়া
আমার সন্তান সে তো তোমার কাছে পাওয়া
[ফার্স্ট অ্যালবাম ম্যে-বি; লিরিক সঞ্জীবের নিজের ডেফিনিটলি]


আচ্ছা। তাইলে, এই-ই। মানে, এমন অনেক পঙক্তিই ইয়াদ আছে আজও। সুরসমেত। শুধু যদি লিখিত পঙক্তি হতো এইগুলা, কাব্যকলা, তাইলে একটাও মনে থাকত এইধারা লাইনঘাট? একাধটা থাকত হয়তো, অতটা থাকত না। আর কম সময়ের মামলা না, মামলা ম্যালা সময়ের। আজকের এই দিনে এবং দুনিয়ায় মনে-রাখারাখি ভীষণ ঝক্কিরও।

সঞ্জীবের/দলছুটের পয়লা অ্যালবাম ১৯৯৭ ইসায়িতে বেরিয়েছিল। অর্থাৎ ২৩ বছর আগের গানের কলিগুলা আমরা মনে রেখে দিতে পারতেসি, গুনগুনাইতেসি বিষাদে-ফ্যাসাদে-আনন্দে-বেদনে, এইটা হাল্কা ব্যাপার না।

না, হাল্কা ব্যাপার মোটেও না। বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছরে এইটা আদবের সঙ্গে ধর্তব্য। ধরতেই হবে। এইটা মাঝারী বা কুটির শিল্প নয়, এইটা ভারী শিল্প, এক্কেরে সলিড। উপরে যে-স্তবকগুলা আমরা মনে করতে পারতেসি, এর বাইরে রইল সঞ্জীবের পপুলার-হওয়া গানগুলা। তা, ‘শাদা ময়লা রঙ্গিলা পালে আউলা বাতাস খেলে’ গানটা গায় না এমন বাংলাদেশজ প্রাণী আছে? কিংবা তাঁর ‘বায়স্কোপ’?

সঞ্জীবের সুর-করা গানগুলা সবই তো আর সঞ্জীবের লেখা না। আর তার গাওয়াও তো খুব বেশি নয়। এর মধ্যে বেশিরভাগই অন্যের লেখা গানে সুর দিয়া তিনি নিজে গেয়েছেন বা বাপ্পা মজুমদাররে দিয়া গাওয়াইসেন। দলছুটের চারটা অ্যালবামে সঞ্জীবের লেখায় বাপ্পার গাওয়া গানগুলাও অনেক সময় আমরা সঞ্জীবের গান বলে ফেলি। কিন্তু এইগুলা বড় কোনো গোস্তাকি মনে হয় না আমার কাছে। গানবাজনায় এইটাই চিরচর্চিত। কণ্ঠশিল্পীর নামেই গানটা পরিচিত হয়। এতে এমন দোষঘাট হয় না।

তা, একটা গানের গীতিকারের নাম, সুরকারের নাম, মিউজিক অ্যারেইঞ্জার আর কম্পোজারের নাম, বাদ্যযন্ত্রী প্রত্যেকের নাম মনে রাখতে পারলে আমরা তারে দিগগজ পণ্ডিত/গিয়ানী/জ্ঞানী হিশেবে আদাবসালাম জানাব অবশ্যই, কিন্তু নিজে অত পণ্ডিত হবার হিম্মৎ আমার/আমরার নাই। গ্যুগল করলেই বিশ্বপ্রুডেন্ট হওয়া যায়। গানটাই শুনে যাই আমরা, পাণ্ডিত্যের গল্পগাছা পরে শুনলেও হবে।

জেসাস ক্রাইস্ট যেদিন জন্মেছিলেন, সঞ্জীব চৌধুরী ঠিক সেইদিনই পৃথিবীতে পা রাখেন। মানে, পদার্পণ করেন। আর নভেম্বর ১৯ তারিখে, ২০০৭ ক্রাইস্টাব্দে, একচক্ষা দানো সিডরের তাণ্ডবসন্ধ্যায় তাঁর অকাল ও আকস্মিক মৃত্যু। বোধহয় আমরা আরও অনেক অনেক দিন সঞ্জীবকে মনে রাখব। সঞ্জীবকে মনে রাখতে রাষ্ট্রিক/ব্যক্তিক কোনো অনুষ্ঠান আয়োজনের বা অর্থকড়ি সঞ্চালনের দরকার পড়বে না। মানুষ যতদিন গুনগুনাবে, মানুষ যতদিন প্রণয়ে এবং মরমিয়ানায় গুঞ্জরিয়া যাবে, নিজেদের গরজেই তারা মনে রাখবে সঞ্জীবকে।

লেখা / জাহেদ আহমদ ২০২০

… …

COMMENTS

error: