আবার যুদ্ধে যেতে হবে || মাকসুদুল হক

আবার যুদ্ধে যেতে হবে || মাকসুদুল হক

SHARE:

এই লেখাটা গানপারে প্রকাশকালে একটা খাটোমতো ভূমিকা রাখা দরকার যাতে লেখাটার পটভূমি-প্রসঙ্গসূত্র ধরতে পারেন সম্ভাব্য পাঠকেরা গোড়াতেই।  বিশেষ একটা সময়ে ম্যাক এটি লিখেছিলেন এবং আপ্লোড করে রেখেছিলেন তার ফেসবুকনোটসের মোহাফেজখানায়। বাংলাদেশ শুধু নয়, বিশ্বজুড়ে চলছিল তখন জঙ্গিদের খুনখারাবি। কিন্তু খুনখারাবি-জঙ্গিবাজি এখন যে একেবারে বন্ধ হয়ে গিয়েছে তা পাগলেও বলবে না। খানিক স্তিমিত হয়েছে এ-মুহূর্তে এই কিছুদিন আগের তাণ্ডবের তুলনায়। কিংবা আগের চেয়ে তা আরও জটিল আকার ধারণ করতেসে হয়তো। কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম নয়, প্রায় সব প্রথাগত ধর্মকাঠামোগুলোর ভিতরস্থ জঙ্গি অংশগুলোর অপতৎপরতা বাড়তেসে পায়ে পায়ে। ম্যাকের এই লেখায় বাংলাদেশপ্রেক্ষিতের ধর্মোন্মত্ত খুনিগুলারে কেন্দ্রে রেখে দেশের সাধারণ স্বভাবধার্মিক নাস্তিক-আস্তিক সমানাধিকারের নাগরিক সকলের জানমালের হেফাজতে যার যার জায়গায় থেকে কর্তব্য-করণীয় সম্পর্কে একটা উদ্দীপক গলায় কথা বলা হয়েছে। দেশের বুদ্ধিবিভ্রান্তিজীবীরা যখন সর্বত্র কড়া ভাষায় আবোলতাবোল যুক্তিভক্তি আর চাপানউতর চালাইতেসিলেন, মাকসুদুল হক তথা ম্যাক তখন এই লেখায় হাজির হন সোজাসাপ্টা ভাষায় আত্মরক্ষার একটা আশ্চর্য প্রোপোজিশন নিয়া। আত্মরক্ষার এইটাই ইন্ডেজিনাস নলেজ আমাদের। এরচেয়ে মোক্ষম হতেই পারে না কিছু। তবে এই কৌশল এস্তেমাল করার আগে একটা বার্তা আমাদের কাছে ক্লিয়ার হয়া যায় যে দেশের বলেন বা রাষ্ট্রের সমস্ত তান্ত্রিক কাঠামোগুলা ব্যাহত ধস্ত হয়ে গেছে। এইটা বাংলাদেশেই শুধু নয়, এইটা হচ্ছে, দেশে দেশে দুনিয়াজুড়ে এইটা হচ্ছে, ভেস্তে যাচ্ছে মানুষের শান্তিস্বপ্নসাধ। মাকসুদ অবশ্য এই লেখায়, এবং তার অন্য সমস্ত লেখাজোখায় গানে মিউজিকে যাপনে, আশাবাদী ও সাহসে ভর দিয়া চলা লড়াকু মানুষের প্রতিনিধি। তিনি মনে করেন, বলতেসেন এই লেখাতেও, কিছুই শেষ হয়া যায় নাই। রিস্টার্ট দরকার শুধু। তো, রচনাটা ছাপা হয়েছিল ২০১৬ মে মাসে ম্যাকের ফেবুপেজে দুই কিস্তিতে। এইখানে আমরা দুই কিস্তি একত্র করে ছাপাইতেসি। শিরোনাম ওইভাবেই রাখা, ‘আবার যুদ্ধে যেতে হবে’, আলাদা দুই উপশিরোনাম ছিল উভয় এপিসোডের : ‘বাংলার প্রাচীনতম অস্ত্র রুখতে পারে চাপাতিবাজদের’, এবং ‘আমরা কোনো পরাজিত প্রজন্মের প্রতিনিধি নই’। নিবন্ধের মূল শিরোনাম এসেছে ম্যাকেরই বিখ্যাত একটা গানপঙক্তি থেকে : ‘পৃথিবীতে বেড়াতে আসিনি / এসেছি অনেক কাজ নিয়ে / শঙ্কাহীন মনের অধিকার দিয়েছেন সৃষ্টিকর্তা নিজে / ক্ষমতাভোগী আর ক্ষমতালোভীদের যুক্তিতে লড়তে হবে  — / লক্ষ লক্ষ লোক শহিদ হয়নি এই ঠগবাজি মেনে নিতে / তোরা সারাবাংলায় খবর দিয়ে দে / তোরা দেয়ালে দেয়ালে চিকা মেরে দে / মোদের আবারও যুদ্ধে যেতে হবে’। এ-ই হলো, অতি সংক্ষিপ্ত, ঘটনা। আর, যা না বললেও হয়, লেখকের প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও সম্মতি সংগ্রহ করা হয়েছে লেখাটা গানপারে প্রকাশপ্রাক্কালে। — গানপার



বাংলার প্রাচীনতম অস্ত্র রুখতে পারে চাপাতিবাজদের
নিরাপত্তার বিষয়ে সবচাইতে বড় ভুল যেটা আমরা করি তা হলো এ নিয়ে পাব্লিকলি বা প্রকাশ্যে আলাপ করা| প্রতিটি জঙ্গি/সন্ত্রাসী ঘটনার পর আমাদের একটা স্বাভাবিক প্রবণতা হলো — আমরা সবাই ‘নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ’ হয়ে যাই — ও যা ইচ্ছা তা-ই টেলিভিশন সহ সমাজিক মিডিয়া ছাড়াও অন্যান্য সব জায়গায় বকবক করতেই থাকি| পুরানো বাংলা প্রবাদ ‘চোর চলে গেলে বুদ্ধি বাড়ে’ মানসিকতার কারণেই আমাদের স্বভাব বদভ্যাসে কেবল পরিণত হয়নি — আমাদের এখন ‘জাতিগত মুদ্রাদোষ’ হয়ে গেছে| তবে এত কথার প্রয়োজন কেন? এই কথা বলে আমরা নিজেরা নিজেদেরকেই ঝুঁকির মুখে কি ফেলছি না? খুব সহজ ও ডিরেক্ট কথা — চোর/ডাকাত/সন্ত্রাসী/জঙ্গি ইত্যাদি যদি জেনে যায় আপনার বাসা, আপনার গৃহ, আপনার কর্মস্থল, আপনার পরিবার, আপনার আঙিনা আপনি কীভাবে সুরক্ষা করছেন — তাহলে তো আপনি নিজেই তাকে সকল অপকর্ম করার পাল্টা কৌশলের ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন … তাই নয় কি?

এখানে আমি পুলিশ বা বাংলাদেশের কোনো নিরাপত্তা সংস্থার সাফাই গেতে এই লেখা লিখছি না — তবে এই লিস্টটি দেখুন প্লিজ :

২০১৫ ইন্টারপোলের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে গড়ে একলক্ষ নাগরিকের জন্য মোতায়েন আছে মাত্র ৯৬জন পুলিশ| সমগ্র পৃথিবীতে, কোনো দেশে, এত কম পুলিশ দিয়ে সম্ভবত নাগরিকদের নিরাপত্তা দেয়া হয় না| অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থা যথা RAB ইত্যাদি যদি ধরা হয় — আমার মনে হয় না ratio একলক্ষ নাগরিকের জন্য ১৬০ এর উর্ধ্বে|

মোদ্দা কথা, আমরা সম্পূর্ণ নিরাপত্তাহীন অবস্থায় বাস করছি ও ঝুঁকির মুখে আছি আর এ-মতো অবস্থায় আমাদের নিজেদের নিরাপত্তা নিজেদের নিশ্চিত করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই| এটাই বাস্তবতা এবং এটাই মেনে নেয়া আমাদের মঙ্গল| কীভাবে নিজেদের সুরক্ষিত করবেন তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে আপনি কী মানসিক পরিস্থিতিতে আছেন| আপনি যদি ভীত থাকেন, আপনি ভয়ে থাকেন, আপনি ভয় পান — জঙ্গিরা ঠিক তা-ই চাই — এটাই তাদের মোক্ষম অস্ত্র|

বিপদ যখন আসবে — পুলিশ তো দূরের কথা, কখনোই আশা করবেন না কেউ আপনার পাশে এসে দাঁড়াবে বা আপনাকে সাহায্য করবে| তাই যেই মুহূর্তে আক্রমণ শুরু হবে আপনাকেই এর মোকাবেলা করতে হবে, পাল্টা জবাব দিতে হবে — আর যা-কিছু আছে তা নিয়েই ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে| আপনার পাল্টা আঘাত যেন কোনো অংশে জঙ্গিদের থেকে কম নিষ্ঠুর না হয়| মনে রাখবেন কোনো দেশ, কোনো রাষ্ট্র, কোনো নিরাপত্তা রক্ষী বাহিনী আমাদেরকে ‘মৃত্যুমুক্ত নিরাপত্তা’ দেবে না| তা দিতে পারে না, দেয়া সম্ভবও না| মরতেই যদি হয় — কুকুরের মতো মরবেন না — সবসময় প্রস্তুত থাকবেন যেন একটাকে জানে মেরে আপনার নিজের মৃত্যু আসে|

আমরা অনেক প্রতিবাদ করেছি, বহু মানববন্ধন করেছি, বহু ‘অহিংস আন্দোলন’ করেছি — বহু নতুন মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার করেছি| কোনো লাভ হয়নি| মানবিক যুদ্ধ  বলে কোনো যুদ্ধ নেই — যুদ্ধ অমানবিক এবং একটি অপরিচিত গোষ্ঠী আমাদের উপরে যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে| এখন প্রতিরোধের সময়| বাংলাদেশের মানুষের লড়াকু চেতনা এখনো মরে যায়নি| এর পরে প্রতিশোধের সময় — তার জন্য মানসিক প্রস্তুতি এখন থেকেই নিন|

জয় বাংলা!

আমরা কোনো পরাজিত প্রজন্মের প্রতিনিধি নই
প্রতিবাদ তো অনেক করলাম, প্রতিরোধ শুরু হয়েছে — ‘প্রতিশোধের’ জন্য মানসিক প্রস্তুতি কি সবার আছে? চাপাতিবাজদের একই কৌশল, একই নিষ্ঠুরতা শিখুন এবং নিজের আত্মাকে শক্ত করুন| আমরা ‘যুদ্ধ’ চাই না, আমরা ‘তোমার শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলে’ হতে পারি — তবে এর পরের লাইন ‘তবু শত্রু এলে অস্ত্র হাতে ধরতে জানি’ — এ-কথাগুলো কখনোই ভুলবেন না| ওদের সনাক্ত করে ওদের সুরক্ষিত আস্তানা চিহ্নিত করে একইভাবে, একই বর্বরতা দিয়েই ঘায়েল করতে হবে|

ভয় পাচ্ছেন? ভয় কে না পায়? ‘ভয়হীন মানুষ’ প্রথিবীতে একজনও কি আছে? সবারই ভয় আছে — তবে মৃত্যুর ভয়, প্রাণের ভয়? আমরা যদি মুসলমান হয়ে থাকি এবং ইসলাম যদি আমাদের ধর্ম হয়ে থাকে — মনে রাখবেন মুসলমান মৃত্যুকে ভয় পায় না| ৭ই মার্চ ১৯৭১-এ বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে এই কথাটি পাকিস্তানিদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন|

মরণ/মৃত্যুর ভয় আল্লাহ কখনো মনুষকে দেয় না — দেয় ইবলিস ও শয়তান| ভয়ে যদি আক্রান্ত হন সেটা আপনার ব্যক্তিগত বিষয়| তা ফেসবুক সহ অন্যান্য মিডিয়াতে সংক্রমণ করার অর্থ হলো আপনারা চাপাতিবাজদের পক্ষেই কাজ করছেন| এ-সকল কর্ম থেকে বিরত থাকুন| আপনাদের স্ট্যাটাসগুলো আপনাদের ভয় প্রকাশের মাধ্যম না হয়ে যেন হয় সাহসিকতা প্রকাশের মাধ্যম| সবকিছুই ‘শেষ’ এখনো হয়ে যায়নি| বিস্তর লড়াই এখনো বাকি আছে| আমাদের লড়তে হবে এমনই এক শক্তির সাথে যার একমাত্র অস্ত্র ‘ভয়ভীতি’| আমরা ভয় পেতে রাজি নই, ভয় দিতেও রাজি নই — আমরা কেবল লড়াই চাই| We want a fair fight and we want to take the fight to the enemy.

আমরা এক বীর জাতি আর আমাদের আজকের প্রজন্ম কোনো পরাজিত প্রজন্মের প্রতিনিধি নয় — কখনো হতে পারে না| যুদ্ধক্ষেত্রে পলায়নের কোনো সুযোগ নেই| যখন ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা ওরা করেছে — এবং নিরীহ মানুষ কতল হচ্ছে, জাবাহ হচ্ছে, খুন হচ্ছে — এখন আর ‘নিরপেক্ষ’ থাকার কোনো অবকাশ নেই| এই অবস্থায় ভয় পেয়ে যদি গা বাঁচিয়ে ‘নিরপেক্ষ’ থাকার ভনিতা করেন, তাহলে মনে রাখবেন আপনি ক্ষমার অযোগ্য পাপ/গুনাহ করছেন| এর জবাব আপনাদেরকে কড়ায় গণ্ডায় রোজহাশরে দিতে হবে| ‘যুদ্ধ’ কি, যুদ্ধ কত প্রকার ও কি কি, চাপাতিবাজদের আমরা যেন বুঝিয়ে দিতে পারি|

আত্মরক্ষার বহু ভিডিও ইউটিউবে পাওয়া যায়| যেটা আপনার কাজে লাগতে পারে সেটা দেখুন ও শিখে রাখুন কৌশল| আমি একটি দিয়ে রাখলাম এই লিঙ্কে —

https://www.youtube.com/watch?v=YEIeDXxMPNE

জয় বাংলা!

চিত্রকর্ম / সত্যজিৎ রাজন

… …

COMMENTS

error: