গল্প মরাবাঘের অথবা আনোয়ারের

গল্প মরাবাঘের অথবা আনোয়ারের

SHARE:

ন্যাশন্যাল কিংবা গ্লোব্যাল ক্রাইসিস নয়, একেবারেই একটা পার্সোন্যাল ক্রাইসিসের গল্প এইটা। আপনারা রায় দিবেন এইটারে কালচারাল ক্রাইসিস বলা যাবে কি যাবে না। ক্রাইসিস অবশ্য অনেকদিনের, বলে রাখা যাক, ২০০২ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত বছরশুমারি ঠিক অনেকদিন গণ্য হতে পারে কি না তা আলাদাভাবেই বিবেচ্য। তবে একটা ব্যাপার খেয়াল করে দেখেছি যে কেবল ফ্যুলটাইম পোলিটিশিয়্যান ছাড়া আর-সকলেরই ক্রাইসিস আসলে পার্সোন্যাল। মানে একেবারেই ইন্ডিভিজ্যুয়্যাল, সঙ্কট বলি বা সমস্যা বা প্রোব্লেম, নিতান্তই না-হলেও অনেকটা ব্যক্তিগত।

পোলিটিশিয়্যাননরা যাবতীয় সমস্যা ‘জাতীয় সমস্যা’ আকারে হাজির করে, অ্যামেরিকানরা আরও সরেস তথা তাদের দাঙ্গামন্ত্রক থেকে যুদ্ধানুমতি আদায়কল্পে এবং অনিবার্য যুদ্ধতহবিল মোটাতাজাকরণে একটা আলাভোলা ক্যাবলাকান্ত মুখ্যুসুখ্যু দেশের একান্ত ঘরোয়া ব্যাপারবিরোধগুলোকেও যুক্তরাষ্ট্রজন্মারা ‘বৈশ্বিক হুমকি’ হিশেবে পেশকরণে সিদ্ধমস্তিষ্ক। ননপ্রোফেশন্যাল পাব্লিক যারা, যথা ফেসবুক রিপাব্লিকের নাগরিক, তাদের কাছে আদ্দিসআবাবায় সুন্নতে-খৎনাকারীদের অগ্রকর্তন যথেষ্ট মেডিক্যাল সায়েন্স মান্য করে হচ্ছে না টাইপের ব্যাপারাদিও শুদ্ধার্থে সেই ভীষণ দুশ্চিন্তিত ব্যক্তিটিরই বাঁচনমরণ ব্যক্তিক সমস্যা। বলা বাহুল্য, ছবিটা বাংলার, এবং ছিটমহলগুলোর খবরান্তর বিশেষ জানা নাই বিধায় এইটা বাকি বাংলাদেশের চিত্রসংক্ষেপ। গ্লোব্যাল ফেনোমেনা নিয়া সফেন সমুদ্র বানাবার হিম্মৎ নাই, নিড আছে কি না তা-ও বুঝতে হবে, কিন্তু দুঃখ বিনে সুখ লাভ হয় কি মহীতে এবং গ্লোব্যাল বিনে লোক্যালের মোক্ষলাভ অসম্ভব না-হলেও অলমোস্ট তা-ই। কিন্তু এই গল্পে মর্দে-ইয়াঙ্কি নিয়া পাঞ্চ ও ফিস্ট দরকার নাই, কিঞ্চিৎ হলেও হতে পারে মর্দে-ইন্ডিয়্যান নিয়া। তা আল্লা চাহে তো হবে নে। এবেলা আগাই। গল্পটা বাঘের, মাইন্ড ইট, মরাবাঘের। গল্পটা আনোয়ারের।

শামশেরের সঙ্গে বন্ধুত্বটাই ছিল একটা বাঘের সঙ্গে বন্ধুত্বের মতো। এতটাই উদ্দামতা, সজীবতা, দুঃসাহসিকতা ছিল শামশেরের — এতটাই আক্রমণাত্মক, বিষণ্ণ আর ক্ষুব্ধ — এতটাই আন্তরিক ছিল শামশের — এতটাই আন্তরিক যে, প্রকৃত শামশেরকে খুঁজে পাওয়াই ছিল মুশকিল। খুঁজে অবশ্য ঠিকই পাওয়া যায় শামশেরকে, তার কবিতায়। শুধুমাত্র তিনটে কবিতার বইতেই, বাংলা সাহিত্যে, শামশের প্রতিষ্ঠিত করেছে নিজেকে। … সত্তরের সেই মহাসময়ে তার জীবন ছিল যেমন বেপরোয়া, তার কবিতাও তেমনই। আমাদের ভাষায় এমন সশস্ত্র এক আধুনিক কবি, সত্যিই, খুঁজে পাওয়া ভার। 

তার সম্পর্কে একটা খাটো ভূমিকাপ্রতিম লেখায় এই কথাগুলো বলে রেখেছেন ভাস্কর চক্রবর্তী। ইনিও কবি, মৃত, অনেকেরই প্রিয় কবি ভাস্কর চক্রবর্তী তার দীর্ঘদিনের বন্ধু অকালে প্রয়াত হলে একসময় এসে সেই অকালপ্রয়াত বন্ধুটির আজীবনের লেখাপত্তর নিয়ে যখন সমগ্রবই বের হয় তখনই লিখেছিলেন ওই বাক্য-কয়টা আরও গুটিকয় বাক্যের সঙ্গে। লেখাটা সাঁটা আছে সেই ২০০১-সালে-বেরোনো বইয়ের গোড়ার দিককার সাত-আটটা পাতার মধ্যে একটা পাতায়। ‘শামসের আনোয়ারের শ্রেষ্ঠ কবিতা’, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা ২০০২।

অনেকদিন ধরেই ছিল, আছে এখনও, ধন্দটা; — শামসের, না শামশের? বইটা হাতে নেবার কিছুদিন পর থেকেই চিন্তাটা জায়গা করে নেয় পাকাপাকি। বইটার ব্যাপারে একটু বলে রাখি। ভাস্কর চক্রবর্তী যাকে পরিচয় দিতে যেয়ে বাঘ  বলেছেন, ‘শামশেরের সঙ্গে বন্ধুত্বটাই ছিল একটা বাঘের সঙ্গে বন্ধুত্বের মতো’, তার সম্পর্কে অ্যানেকডোট্যাল শুনেছি অনেক। শুনেছি মানে পড়েছি। কৃত্তিবাসীরা তো যতটা-না সাহিত্য করেছেন তারচেয়ে বেহতর পরিমাণে নিজেদের লিভিং নিয়ে ভ্যান্তারা গালগপ্পো করে বেড়িয়েছেন। গত পঞ্চাশ বছরের ইন্ডিয়্যান বাংলা সাহিত্য, অনেক ভেবেচিন্তে দেখেছি, অনেকাংশেই কিংবা ভালো হবে যদি বলি যে বৃহদাংশেই কৃত্তিবাসীদের নিয়া গালগল্পের মোচ্ছব। গত পঁচিশ-তিরিশ বছরের ইন্ডিয়্যান বাংলা লিটলম্যাগাদি ইন-ম্যানি-সেন্সেস্ খালাসিটোলা আর সোনাগাছি নিয়া ফ্যাসিনেশনে সয়লাব। অবসেসড একেবারে। অ্যানিওয়ে। এইসব সূত্র থেকেই শামশের আনোয়ার সম্পর্কিত যত অ্যানেকডোট্যাল জানা হয়েছে। একদম রয়্যাল কায়দায় চলেফিরে বেড়াতেন। সম্পন্ন পরিবারের সন্তান। সয়সম্পত্তি ছিল পড়ন্ত হলেও অঢেল। খর্চা করতেন দেদার। সম্ভবত কবিবন্ধুদের কারণবারিকাণ্ডারি ছিলেন। দরাজদিলা ছিলেন, এই ইনফো অনেকেরই ইন্টার্ভিয়্যু সুবাদে এসেছে উঠে। এবং ছিলেন বন্ধুবৎসল, তথা কবিবৎসল, সবসময়। ক্রেজ ছিল কবিমহলে তার একেবারে কচমা বয়স থেকে, বোধ করি, এইসব কারণেই। কিন্তু কবিতাটা, ভাগ্যিস, ভালো লিখে গেছেন। নইলে এই নিবন্ধ পয়দানো হতো না নিশ্চয়। সেইটাই। কিন্তু মরেও গেলেন দুম করে, তাজা তরুণ বয়সেই, সে-ও তো দুই/তিন যুগ হয়ে গেল। তো, কৃত্তিবাস  শুরুর প্রথম দুই-তিনবছরে একটা অ্যাওয়ার্ড লঞ্চ করা হয়েছিল বলে জেনেছি আমরা আমাদের জন্মের পরে। এইটা প্রায় তিন/চার বছর সম্ভবত কন্টিনিউ করে পরে অ্যাওয়ার্ড ছাড়াই হুদা পত্রিকা বার হয়েছে আরও বহু বছর। বহুদিন মরে পড়েছিল। সুনীল শেরিফ হবার পরে এইটা আবার ল্যাজারাসের ন্যায় বের হয় বেশ কয়েক সংখ্যা। মাল যদিও পড়তির দিকেই তখন। সম্প্রতি ওখানকার প্রতিভাস প্রকাশনী এইটা বাইর করতেসে। অ্যানিওয়ে। সেই আদি কৃত্তিবাসের প্রথম পুরস্কার পাবার ব্যাপারটাতে তরুণ কবিদের মধ্যে তরুণ শামশেরের ক্রেজ কতখানি ছিল তা খানিক মেহসুস হয় নিশ্চয়।

যে-ব্যাপারটায় খটকা, তা তো বলেছিই বোধ’য়, শামশের না শামসের, — কিংবা দুইটা বানান কেমন করে হয় এক-ও-অভিন্ন মনুষ্যনামের! দে   কর্তৃক প্রকাশিত ও বাজারজাতকৃত বইটার সূচনাপ্রচ্ছদ ও অন্তিমপ্রচ্ছদে ছাপা আছে ‘শামসের আনোয়ারের শ্রেষ্ঠ কবিতা’, মানে শামসের,  চালডালনুনের ওজনজ্ঞাপক সের,  আচ্ছা, ঠিকাছে; একবার ভেতরে যেয়ে খেয়াল করে দেখুন, পুস্তানির পরে যে-একটা পাতা থাকে সাধারণত বইনাম-লেখকনামের জন্য বরাদ্দ শুধু, সেইখানে দেখবেন ‘শামশের আনোয়ারের শ্রেষ্ঠ কবিতা’, মানে শামশের,  বাঘসমার্থক বিদেশী শব্দ শের,  বা কবিতা/কাব্য অর্থে যেই বিদেশী শব্দটা, আচ্ছা, ঠিকাছে, বুঝিয়া পাইলাম। এরও পরের পাতাটায়, যেখানে বইনাম-কবিনামের সঙ্গে প্রকাশনাগারের নাম যায়, সেখানেও রয়্যাল টাইগার। উল্টোপৃষ্ঠে প্রিন্টার্সলাইন বা ক্রেডিটলাইন ছাপা আংরেজিতে, সেখানকার স্পেলিং প্রতিবর্ণীকরণ নিয়মানুসারে হয় ‘সামসের’, তা আংরেজি না-হয় ফেলেই দিলাম। লেট্’স্ প্রসিড। পরের পাতায় প্রকাশক জনৈক সুধাংশুশেখর দে মশাইয়ের নিবেদনবাক্য, তথায় শামশের বটে; এর পরের ভাস্করবাক্য তো পূর্বেই নিবেদিয়াছি। বিদঘুটে এই শৃঙ্খলা ভারতরাষ্ট্রীয় বঙ্গসংস্কৃতির বহুকালের আচরিত নিষ্ঠার পরাকাষ্ঠা। তা, খানিক পরে এই ব্যাপারটা হাল্কা চালে একবার ফেরায়ে এনে ফের খাতাখানি মুড়ে নেয়া যাবে নে। এখন অন্য প্রসঙ্গ, অন্য প্যারা, চলুন!

কোন নামে ডাকি গো তোমারে, কোন নামে ডাকিব কবিরে, শামসের না শামশের? কবি নিরুত্তর। কবির বন্ধু ভাস্করের ডাকা নামটাকে যদি ধর্তব্যে নেন, তো বাঘ ডাকতে ইতস্তত করবেন না নিশ্চয়, শের, শামশের, বাঘের সঙ্গে বন্ধুত্বের আমেজ পাবেন তাতে। এখন, কথা হলো, নাম তো নামই। নামে কী-বা আসে যায়? শেইক্সপিয়্যর কপ্চাবেন না বাবুমশয়, বিষয়াশয় বুঝিয়াশুনিয়া ব্রেইনিকোটস্ থেকে টুক্লিবেন। গোলাপের নাম নিয়া আলাপ মারাচ্ছি না। মানুষের নাম নিয়া ক্রাইসিস। উপরন্তু বহু বহু বছরের ঘনীভূত সঙ্কট। মনুষ্যনামের ক্ষেত্রে নামধারীর অভিপ্রেত উপায়/পন্থা অবলম্বন অবশ্যকর্তব্য। কবি যদি নিজনাম শামসের হিশেবে প্রচারিয়া থাকেন, তো ওজনজ্ঞাপকই সই। এখানে সেকেন্ড অপিনিয়নের চান্স নাই। হাছন রাজা বেচারাকে হাসন রাজা আর আহমদ ছফাকে আহমদ সফা বানাইবার আধুনিকতা নিয়া সাইবেরিয়ায় গিয়া তত্ত্বচর্চা চালায়ে যান। আল্লা ভরসা। আমাদের কথা হলো, কবির অভিপ্রেত নাম কোনটা —শামসের, না শামশের? আমরা ভিনদেশের মানুষ, তদুপরি মাদার ইন্ডিয়ার চক্ষুশূল, আমরা কবিতা পড়ি কিন্তু কবির সনে ওঠাবসা করি নাই। অটোগ্রাফহান্টার হলেও গবেষণা খানিকটা খালের কিনার দিয়া নিয়া গিয়া মাঝগাঙ এড়াইয়া সাগরে ফেলা যাইত। তো, ভাস্করের ইঙ্গিতটা স্পষ্টত বাঘের দিকে হেলানো। অথবা বাঘ ভাস্করসমর্থিত। তবু মন মানে না। ভাস্কর নেহায়েত ভালো মানুষ, সত্যিকারের কবি, স্টান্ট নিতে দেখা যায় নাই তারে কোনোদিন কবিতা ছাপতে/লিখতে যেয়ে। অ্যানিওয়ে। বন্ধুকে বাঘের মর্যাদায় দেখতে বা দেখাইতে কার না ভালো লাগে বলুন? বলা বাহুল্য, মরা বন্ধু, তথা মরা বাঘ। হতে পারে এমনও যে, সিংহের আসনটা সুকৌশলে নিজের জন্য রিজার্ভ রাখতে যেয়ে হেন কৌশল এস্তেমাল করেছেন ভাস্কর! হতে পারে না? আমাদের দেশে হয় তো, খুব হতে দেখি, বিশেষত কবিতামার্কেটে। বন্ধু-বন্ধু বাঘসিংহ, অবশিষ্ট সব মেকুর অথবা মুর্গি। ঠিকাছে। ঠিকাছে না? সারমেয়দের কথাটা পাড়বেন না? তা, ভাস্করও তো নাই যে গিয়া জিগাই। কিন্তু সমস্যার সুরাহা তো করা চাই বেহেনজি! শামসের না শামশের? কবি নিরুত্তর। কবি কি সত্যিই নিরুত্তর? মরাবাঘের উত্তর অবশ্যই একটা-না-একটা থাকে, কেবল কান থাকা চাই এবং চাই কান পেতে শুনবার সদিচ্ছে ও ফুরসত, অরণ্যে তথা কবির বিচরণভূম কবিতাবইতে। একটা কবিতা আগে দেখা যাক, মরাবাঘের পুকার, কবিতা আনোয়ারের :

আমি আমার পাশে দন্ত্য ‘স’ ও মূর্ধন্য ‘ষ’-কে রাখতে চাই না। আমি দন্ত্য ‘স’কে ঘৃণা করি। যদিও ওর প্রতিভা আছে, আমি চাই ও নষ্ট হোক, পিছলে হারিয়ে যাক, হাঁপানির টান উঠুক ওর — তারপর ও মুছে যাক বর্ণমালা থেকে। 

মূর্ধন্য ‘ষ’কে আমি আরো ঘৃণা করি। কেননা ও আমার ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলে। সব সময় কাছাকাছি থাকে আমার। আমি জানি ওরও দীপ্তি আছে। সুন্দর ইশারা আছে … কিন্তু আমি ওকে দৌড়ে হারাতে চাই। ঘুম বা জাগরণ থেকে আমি চাই ওর স্বপ্নগুলো উবে যাক, ও দেউলিয়া হয়ে যাক। টাকা ধার করার জন্য মিথ্যা বলুক। ঘোরাফেরা করুক ছদ্মবেশে। জলাতঙ্ক হোক ওর। এভাবে বর্ণমালা থেকে ও বিদায় নিক। 

ওরা ছিল আমারই মতো সংখ্যালঘিষ্ঠ। কিন্তু এখন ওরা ধ্বংস হয়ে যাবার পর ঢ্যাঙা ও বেঢপ শুধুই একটা তালব্য ‘শ’ হয়ে বেঁচে আছি। সামনে কাঁটাতার … ওপাশ থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকেদের ঢিল এসে গায়ে পড়ছে। ওরা আমার শরীরে থুতু ছিটিয়ে দিচ্ছে। এই কি আমার নিয়তি! মূর্ধন্য ‘ষ’ ও দন্ত্য ‘স’ ছাড়া আমার কোনো নিরাপত্তা নেই। ভীত, অসহায় একটা ঢ্যাঙা তালব্য ‘শ’ হয়ে মারমুখী জনতার সামনে আমি দাঁড়িয়ে আছি। কাঁটাতার ঘিরে রেখেছে আমাকে। পাঠক, আমাকে বলে দিন — এই কি অপরিহার্য ছিল তাহলে! বর্ণমালা থেকে এই হঠকারী তালব্য ‘শ’ কি চিরতরে বিদায় নেবে সংখ্যাগরিষ্ঠের থুতু, গাল ও ঢিলের অত্যাচারে! 

এইখান থেকে খানিকটা আন্দাজ করে নেয়া যায় না ‘শামসের/শামশের’ অথবা শামসের বনাম শামশের দ্বন্দ্ব সম্পর্কে? অ্যাট্-লিস্ট কবির অভিপ্রায় সম্পর্কে একটা আন্দাজ তো করে নেয়াই যায় চাইলে। স্বীয় নামের অভিপ্রেত বানান নিয়া শামসের/শামশের আনোয়ারকে এতটাই কি পীড়া পোহাতে হয়েছে? দি অ্যান্সার মাই ফ্রেন্ড ইজ্ ব্লোয়িন্ ইন দ্য উইন্ড, ইজন্’ট্ ইট? আজও চমৎকার, মেহেরজান, দেশ   ও অন্যান্য রংবাহারী বেশের ইন্ডিয়্যান বাংলা কাগজে এবং মগজে এই সিচ্যুয়েশন অপরিবর্তিতভাবেই বিরাজে। অ্যানিওয়ে। আপনে বলবেন, প্রিন্টিং-এরর হতেও তো পারে, কিংবা আলাল-দুলাল দ্বন্দ্ব সমাস টাইপের দোলাচল/ডিলেম্যা। আপনে এখনও বঙ্গসংস্কৃতির বাইরে বসত করেন বলতে হবে তাইলে। বঙ্গসংস্কৃতির হাজার বছরের সুসংস্কৃত দুষ্কৃতির অংশ এইটা। ক্রাইসিস কি মাগনা কয়েছি হে! এই মামলা আমি নিজেই নিরিখ করে দেখে আসছি সেই ঊনিশ শ তেপ্পান্ন সাল থেকে। আমাদের ব্যুরো অফ স্ট্যাটিস্টিক্স অবশ্য সালসংখ্যা নিয়া আপত্তি তুলবে। সে-যাগগে। এছাড়া আরেকটা কথা হচ্ছে গিয়ে এ-ই যে, দে   প্রকল্পিত ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ সিরিজের বই লিগ্যাসির মতো বনেদ তৈয়ার করে ফেলেছে বহুকাল হয়; সেই প্রকাশনীর একটা বইয়ের এপিঠ-ওপিঠ মলাটে এবং অন্যত্র মুদ্রণত্রুটি থাকতে পারে, তা-বলে লেখকনাম নিয়ে বেখেয়াল মনে হয় দে   ঘুমিয়েও হতে পারবে না। গাঙ্গুলি-ব্যানার্জি-মুখুজ্জে-চাটুজ্জে এবং অন্যান্য অসংখ্য চসারিয়্যান ইংরেজির ন্যায় দাঁতভাঙা বাংলায় সুশ্রাব্য সদবংশজাত মনুষ্যনামাবলি লিখতে যেয়ে হাজার বছরের বাংলা দে   বা দেশ   বা সানন্দা   কারোরই কোনো প্রমাদ পরিলক্ষিত হলো না লাইফে, কেবল আনোয়ার আর আফসার আমেদ আর ইত্যাকার কিছু মিয়াদের নামেই কিবোর্ডের কি   আর মুদ্রণযন্ত্রের ম্যাডামজি বিদ্রোহ/বিট্রে করে বসেন? পদ্মার এদিককার কিবোর্ড বা ছাপাই-বাঁধাই মেশিনগুলো তো দেখি সিন্স দি ভেরি ফার্স্ট লাইট অদ্যাবধি একটা চাটুজ্জে-বাড়ুজ্জে-ভটচাজ্-চক্কোত্তি লিখতে যেয়ে একটাবারের জন্যও পরমাদ ঘটায় নাই! বিষয়টা রহস্যাবৃত।

মোটেও না। আদৌ না। হারাম রহস্যাবৃত না। ব্যাপারটা ভালোই মীমাংসিত। অনেক অনেক কাল পূর্বে, মৈত্রী সার্ভিস চালু হবার সময়ের আগায়-পাছায়, এ নিয়ে একটা আলাপ উঠেছিল ইলিশের পোনাটাও পাতে না-পাওয়া ‘হ্যাঁ-হ্যাঁ বলা সঙ্’ বদ্বীপের সাহিত্যবেপারীদের তরফ থেকে। একটু অনুযোগের আদলে, আব্দারের সুরে, হলেও উঠেছিল কথাটা। মাদার ইন্ডিয়া অ্যান্সার করেছিলেন একটা আমতা-আমতা। নানান মুখোশে নানা ব্যক্তিত্বের রূপ ধরে সেই উত্তর এসেছিল। অভিন্ন উত্তর যদিও। অনুগ্রহ করে এই সায়াটিকার শূলবেদনা নিয়া বার্ধক্যজর্জর সিনিয়র সিটিজেনটাকে পুরানা পেপারপত্রিকা ঘাঁটবার হুকুম দিয়েন না যেন! তবে কথাগুলো ভুলি নাই জনাব, হৃদয়ে গেঁথে রেখেছি। কি ছিল মহাভারতামৃতম্? বলা হয়েছিল, মাটির কিরা আমি মিছে কইছি নে, মোহামেডান নামগুলো তো আসলে বাংলা শব্দ নয়, বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে এর ক্ষীণ যোগসূত্রও নাই বিধায় এই ভুলগুলো ঘটে যায় বারবার; ভাববেন না, কালচারাল এক্সচেঞ্জ শুরু হয়েছে, একদিনে তো হবে না, তবে একদিন এই সমস্যাটা আমরা কাটিয়ে উঠব। …

জনাব, আপনি কি চান যে এই মরাবাঘের গল্পটা এরপরও চালাই আমি? কে হায় হৃদয় খুঁড়ে কফশ্লেষ্মা বার করতে ভালোবাসে বলুন? তাছাড়া আমরা বাপ-মা নিয়া নিদারুণ শরমিন্দা বিপ্লবী কবিসাইত্যিকের দল, আমরা নামবিপ্লবী, কল্পতরু ভারতমাতরমের সংকেত বুঝতে পেরেই কি না কে বলবে আমরা নাম রাখতে লেগেছি ‘কোলাহল করিম’, ‘নিঃশব্দ নঈম’, ‘আতুর আমির’ … রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-কি কসম, মিছে কইছি নে একদম! আদম পত্রিকায় বা বাদাম পত্রিকায় বা গন্দম পত্রিকায় পদ্য ছাপতে হবে তো! ঐহিক ও দৈহিক ও অন্যান্য উদারা মুদারা তারা ঘাটের ভুঁড়িয়াল ঘড়াগুলো সখা কেমনে অ্যাভোয়েডিব? উনারা নাম নিয়া যেন পেরেশান না হন, ‘তাইজন্যে’ এহেন ব্যবস্থা। যাগগে। আ ম’লো যা! মিনসে দেকচি পারেও! নামতেই চাইচে না যে! খালি শ্বাস ফালায় আর ঘর্ঘর আওয়াজ করে, কামের নামে ভেরেন্ডি। কিন্তু তথ্যটা দিয়া রাখি যে, সেই সময়টায় আলাপ উঠেছিল এদিককার শামসু-শহীদ প্রমুখ স্টলোয়ার্টদিগের নাম যেন সদয় বিবেচনাপূর্বক সহি লিখিবার আজ্ঞা হয় হুজুরের, অন্তত বলাৎকার না-করেন যেন সংস্কৃতির অজুহাতে বেচারা বাপের পাপে মোহামেডান কবিসাইত্যিকদিগেরে। সেই আর্জির উত্তরে এসেছিল প্রোক্ত আমতা-আমতা সাংস্কৃতিক থলের বিলাই বেরিয়ে। এখন তো পরিস্থিতি আরও জগৎশেঠী আকার ধারণ করছে বলে সন্দেহ হতেছে। একহপ্তা যায় না দেখি দাদা ডেকে তেরো কবির কবিতাপাঠ এখানে, তো কিয়দ্দুরে ম্যারাপ বেঁধে সেমিনার, মান্যবর অতিথির নয়ন যথেষ্ট ভোমরা বানায়ে নেবার মতো কামিয়াব হলে তো কবির জিন্দেগি বনগিয়া, চাই-কি তিনশব্দে একটা সার্টিফিকেটও জুটে যেতে পারে। মরা যদি অন্তর্জলিযাত্রায়, তাইলে আদম অ্যাওয়ার্ডটাই-বা খারাপ কিসে? বেলাবেলি জুটিয়ে নে মা, বাদে যে পস্তাবি লো পোড়ারমুখী! কী সুখ পাও সখা — আওয়াজ জনান্তিকে — ঘাটের মরা গৌতমতোষণে? অ্যানিওয়ে। এইসব অশ্লীল/‘শালীনতাবিবর্জিত’ বলিয়া সাব্যস্ত হবে স্বামীদের কাছে, সেহেতু ‘অপ্রেমিকে শুনবে না গান দিলাম এ ফরমান’। দোহারের বন্দনাগান শেষে এসে।

একটা সতর্কীকরণ। উৎকলিত কবিতাটা এখানে যে-সার্ফেসে রেখে পাঠ করা হয়েছে, এইটাই এর অভিপ্রেত পাঠ নয় নিশ্চয়। যে-কোনো ভালো কবিতাই তো তা-ই। একতলীয় নয়, কবিতা, বহুতলীয়। কেবল শামশেরের অস্বস্তি ছিল তার নামবানানজনিত যথেচ্ছাচার নিয়ে, বেদনাও ছিল বোধ’য়, এইটা খানিক ধরা গেলেই হলো। পরিস্থিতির বিবরণ নিয়া ফ্যাসাদ করা যাবে হয়তো অনেক আরও। কবিতার নাম ‘শ’। উল্লিখিত বইটির ৭৮ সংখ্যায় সূচিত পৃষ্ঠায় এইটে অ্যাভেইলেবল। বইটার দ্বিতীয় কোনো সংস্করণ বা মুদ্রণ হয়েছে বলে খবর জানি না। বাঘের গল্প ফুরায়। হায়! আপাতত।

লেখা : জাহেদ আহমদ (২০১৫)

… …

COMMENTS

Posari IT Solution
error: