সুধারঞ্জনের পত্রিকাভাণ্ডার

সুধারঞ্জনের পত্রিকাভাণ্ডার

অনেক-অনেকদিন বাদে গেছিলাম পত্রিকাবিক্রেতা সুধারঞ্জন বাবুর দোকানে। এর মধ্যিখানে ব্যবধান বারো-তেরো বছরের, বা একটু কম হবে, মোটমাট বলা যায় চাকরিবাকরি ঠেলতে শুরু করার আগে রোজ রোজ গাদাগুচ্ছের পত্রিকা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অথবা আয়েশ করে টুলে বসে পড়ার একটাই ছিল ভরসাস্থল : সুধার দোকান। ওরা তিনভাই মিলে দোকান চালাতেন পালাক্রমে, বাসটার্মিনাল চত্বরের সামনে সড়কসংলগ্ন দোকান, দৈনিক পত্রিকা আর সাপ্তাহিক-মাসিক ম্যাগাজিনগুলা থাকত। সব পত্রিকা খরিদ করার রেস্ত তখন ছিল না সেই টিউশনিবিধ্বস্ত দিনগুলায়, দরকারও ছিল না, কিন্তু সব পত্রিকা একনজর দেখার খুব নেশা ছিল তখন। বিশেষভাবেই ছিল সিনেম্যাগাজিন পড়ার ঝোঁক। ওইসব গসিপ পয়সা খর্চে কেনার ইচ্ছে হয়নি কোনোদিন, হলে এদ্দিনে ফতুর হয়ে যেতাম, জরুর পড়ার ইচ্ছে ঠিকই হতো। তখন জ্যান্ত ও মজাদার ইংরেজি রপ্ত করার এই এক সহজ রাস্তা ছিল ইন্ডিয়ান সিনেম্যাগগুলো উল্টেপাল্টে দেখা নিয়মিত। প্রতি পাক্ষিকে এই কাজটা রুটিনমাফিক করে গেছি তিনভাই নিধিরঞ্জন-সুধারঞ্জন-সমীররঞ্জন প্রমুখদের প্রশ্রয়ে। স্টারডাস্টসিনেব্লিৎস   প্রভৃতি পত্রিকার গসিপগুলো খুঁটিয়ে পড়তাম টুলে বসে, বেশিরভাগ সময় একপায়ে দাঁড়িয়ে। এছাড়া শোভা দে-র কলাম পড়তাম খুব নিয়মিত মনে আছে। কেনা হতো শুধু ঢাকা ক্যুরিয়ার,  ইংরেজি সাময়িকপত্রিকার ভিড় থেকে, কেবল খুশবন্ত সিং পড়ার লোভে। সেসব ছিল বটে একেকখানা দিন! কতশত ঘটনা-দুর্ঘটনায় রঙিন!

ওরা তিনভাই পালাক্রমে দোকান চালাতেন। সকালে ছোটভাই সমীররঞ্জনকে দোকানে বসিয়ে নিধি ও সুধা দুজন মিলে দুই সাইকেলে প্যাডেল মেরে লাইনের পত্রিকা পৌঁছাতে বেরোতেন। লাইন শেষ করে দোকানে ফিরতে ফিরতে দুপুর হয়ে যেত। ফের পত্রিকাবান্ডিল বগলে চেপে দুইভাই টার্মিনালের গাড়ির প্যাসেঞ্জারদের জানালায় পত্রিকা হকারি করতেন যখন, বড়ভাই নিধিরঞ্জনের হাতে তখন দোকান সামলানোর ভার। সকালের সময়টুকু লাইনফেরি, আর দুপুর থেকে সারাদিন সন্ধ্যা অব্দি বাসে বাসে হকারি, রাত্তিরে আবার ট্রেনে ফেরি। এর মধ্যে লাইনফেরি ব্যাপারটা খানিক ব্যাখ্যার দাবি রাখে। সেইটা হলো, বাড়ি বাড়ি পত্রিকা পৌঁছানো। যে-সমস্ত বাসাবাড়ি ও দোকানপাটে মাসচুক্তিতে পত্রিকা রাখা হয়, সেইসব নিয়মিত গ্রাহকদের কাছ থেকে একটা নির্ধারিত হারে সার্ভিসচার্জ আদায়্পূর্বক দৈনিক পত্রিকা ডোর-টু-ডোর ডেলিভারি, হকারদের ভাষায় এর নাম লাইনফেরি। তিনভাই মিলে দোকান ও পত্রিকা পয়দলে-সাইকেলে বিক্রি করে বিয়ে-থা করে থিতু হয়েছিলেন প্রথম দুজন, সমীররঞ্জন চলে যায় মালয়েশিয়ায়। বেশ কপাল ফিরে যায় তাদের, কিন্তু আদি ব্যবসা তারা ছাড়েননি এখনো।

প্রতিদিন যেতাম একসময়, টিউশনি ও বাসায় বসে ব্যাচ-পড়ানো ব্যবসার ফাঁকে, যেতাম রোদ মাথায়, কখনো-কদাচ ছাতা হাঁকিয়ে। এরই মধ্যে গেল চলে আঙুলের ফোকর গলে এগারো বছর! সুরমা নদীর জল অনাব্য অসুখে এখন মরোমরো। মূলত বড় সদাইপাতি কিনতাম বছরে দুইবার : শারদীয় পূজাসংখ্যাগুলো ও ঈদসংখ্যা একগাদা। তা-ও কিনতে পারতাম না যদি নিধি-সুধা-সমীরদের সহযোগ না-পেতাম। মোটমাট চারশ-পাঁচশ টাকার সওদা পরবর্তী বছরের পূজা ও ঈদ আসার আগ পর্যন্ত কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ ছিল আমার জন্য। মাসে মাসে বিশটাকা-তিরিশটাকা করে বকেয়া জমা রাখতাম ওদের খাতায় নিজহাতে লিখে। গত দুইদশকে অনেক অভ্যেসই বদলে গেছে জীবনের। এর মধ্যে একটা অভ্যেস ছিল গোগ্রাসে পত্রিকা গেলা। জাতীয়-বিজাতীয় বিশেষ দিনগুলোতে পত্রিকা কিনতাম প্রায় সবগুলো। এবং, আশ্চর্য, পড়েও ফেলতাম মূল কাগজের সঙ্গে দেয়া সম্পূরক সাময়িকীর প্রায় সমস্তই! এখন দেখি, সারাদিনে এক-অক্ষরও পড়া হয় না এমন দিনই সাধারণ। খেয়াল করে দেখেছি যে, পুরো সপ্তাহে চাকরিসূত্রে পঠিত/পড়তে-বাধ্য প্রতিবেদনপত্র অথবা নানাকিসিমের তথ্যপুস্তকগুলোর বাইরে সাকুল্যে সাত-দশপাতা পড়া হয় আমার। হিসাবখানা আস্ত হপ্তার। বলা দরকার, ওই সাত থেকে দশ পাতার ভেতরেই অন্তর্ভুক্ত পত্রিকার আধপড়া-আধাদেখা সংবাদ-কলাম-সাময়িকীগুলোও।

সুধা ছিল সমবয়সী আমার, ওর বড়ভাই আমার চেয়ে ঢের বড় ছিলেন বয়সে তখনই, আর সমীর ছিল অনেক অনেক ছোট। সমীররঞ্জন-সুধারঞ্জন-নিধিরঞ্জনেরা তাদের আদি ব্যবসা ছাড়েন নাই, আমি কি পেরেছি ধরে রাখতে পড়ার ব্যবসা আমার? বাহ্! কতকিছুই-না পড়ি রোজ ফেসবুকে-ব্লগে! এহ বাহ্য!

লেখা / জাহেদ আহমদ ২০১৩

… …

COMMENTS

error: