অবন্ধু কোরো না আমায়, ও বন্ধু আমার

অবন্ধু কোরো না আমায়, ও বন্ধু আমার

এইটা একটা সাধারণ ট্রেন্ড আজকালকার, দেখবেন যে, ঘোষণা দিয়া সাড়ম্বরে অবন্ধুকরণ। একদিক থেকে ভেবে দেখলে এইটা খারাপ নয়, এইভাবে চারপাশে শোর মাচিয়ে কেউ-একজনকে অবন্ধুকরণের বজ্রনির্ঘোষ সংবাদ পরিবেশন। সচরাচর আমরা সাংস্কৃতিক-নৃতাত্ত্বিক ঐতিহ্যানুযায়ী পিঠে ছুরি মেরে অভ্যস্ত। বুকের দিকটায় আমরা পাক্কা প্রেমিক, পাছায় হিংসুক। কাজেই ডিক্লেয়ার করে এইভাবে সাজ-সাজ রবে অবন্ধুকরণ এথিক্যালি হয়তোবা সাউন্ড। তবু, তবুও, সখা হে! একটু অমানবিক হওয়াও কখনো কখনো মানবিক কারণে জরুরি হতে পারে। প্রয়োজনে ছুরিই মেরো না-হয় তুমি, অয়ি, তবু অবন্ধু কোরো না আল্লার দোহাই। তারও আগে অনুরোধ থাকবে, দুনিয়ার সবাইকে একসঙ্গে মেহমানদারির দাওয়াত দিও না হে! একসঙ্গে একই-সময়ে একাধিকে উপগত হওয়া নাথিং ডেলাইটফুল। আমার মন মানে না, দিনরজনী, আমি যেন কিসের আশায় আশায় থাকি। ইচ্ছে করে না ছেড়ে যেতে একেবারে। ইত্যাদি। এইসব ভাবালুতা। আলবৎ। তবু, তবুও, হায়! কিন্তু অবন্ধুকরণ ব্যাপারটা আমার জন্য তো আনন্দের হতে পারে না। কারণ দুনিয়ার সাত-আটশ কোটি লোকের ভেতর আমার আত্মীয়পরিজন তো ধরেন শ-খানেক, এর মধ্যে আমি ঔন করি এমন লোকের সংখ্যা তো অনেক কম, তাই বলে বাকি সবাইকে তো আমি অবাঞ্ছিত ঘোষণা দিতে পারি না। ব্যাপারটা বিদঘুটে বিরক্তিকর লাগে আমার কাছে —  এইটা হামেশা দেখতে পাই ফেসবুকে — এহেন অবন্ধুকরণ প্রোক্লেমেশন। কিছু মনে নেবেন না আপনারা যারা হামেশা বাধ্য হন হয়তো অবন্ধুকরণ প্রকল্প বাস্তবায়নে, কেননা বাঁচতে তো হবে, এবং বাঁচবেই যদি বাবা তো নিজের মনের মতন ইচ্ছাস্বাধীন সুখে শান্তিতে বাঁচো। আপনি তো তা-ও খুব পোলাইটলি মাইল্ড সিন্ট্যাক্সে ডিসক্লেইমার দিয়েছেন, মনে করেন, সদাশয় আপনি, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখবেন হুমকিহুঙ্কার। ওরে বাপ রে! হাওয়ার হুমকি, হাওয়ার হুঙ্কার, আর খোদ মুর্গাটাও যে হাওয়াবাতাসের, ভার্চ্যুয়াল — সে কী আর বলতে! এইধারা হুমকিদেনেওয়ালাদেরে দেখিয়া রামগড়ুরের ছানার মুখেও বিরল হাসি পায়। অ্যানিওয়ে। ব্যাপারটার মধ্যে ফার্স এবং ফেরোশ্যাস দুইটি দিকই রয়েছে। এখন, খুবই প্র্যাক্টিক্যাল কারণও থাকতে পারে আমাকে আপনি বা আপনারা দ্বারা-দিয়া-কর্তৃক অবন্ধুকরণমূলক ছুরিকাঘাতের পেছনে। সেইটা ধরেন মতানৈক্য, মতবৈরিতা, বা মতশত্রুতাই মনে করেন। কিন্তু এইসবও কি আসলে অবন্ধু করবার জন্য শক্ত গ্রাউন্ড হতে পারে? বেফায়দা কেন এসব, যাওয়া যাইত না কিছুদিন ইগ্নোর করে? বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই টোটকা — আই মিন কিছুদিন ইগ্নোরকরণ — ফলদায়ক হয় দেখবেন। কিছুদিন পাত্তা না-দিয়া দেখবেন হোৎকা প্যাঁচুক কবিরাজও কুর্নিশ করিয়া যাইবে আপনারে। এখন, ধরেন আপনাকে আমি ধুমিয়ে গালিগালাজ শুরু করে দিলাম, আপনার জিনা হারাম হয়ে গেল ফেউয়ের মতন পিছুলাগা আমার আচরণে — এইসবও তো অবন্ধু করার মতো অত গুরুতর দণ্ডযোগ্য না-ও হতে পারে, একটু যদি সেই ইসলামের খলিফাদের একজন হজরত আলির তরবারিযুদ্ধে ভূলুণ্ঠিত প্রতিপক্ষের থুতু উৎক্ষেপণের ঘটনাটা ইয়াদ করেন তাইলে তো বিরুদ্ধমতাবলম্বী বিরক্তিকর শত্রুপ্রতিম লোকটাকে আপনি অবন্ধু করার আগে দ্বিতীয়বার ভাববেন, কারণ ব্যাপারটা তখন মতের দ্বন্দ্ব ছাড়িয়ে ব্যক্তির দ্বন্দ্ব হয়ে যায় এবং অবন্ধু করে আসলে আপনিই হেরে যান। আরেকটা হলো গিয়ে যে, আপনার বন্ধুসংখ্যা ফেবুপ্রদত্ত সুবিধাসীমা ছাপিয়ে থৈ থৈ, সেক্ষেত্রে হয়তো কিছু ছাটাই-বাছাই করা লাগতে পারে, তা-সত্ত্বেও ঘোষণা না দিয়া যাকে অবন্ধু করছেন তারে ইফ পসিবল ইনবক্সে একটা বাণী দিয়া ব্যাপারটা বুঝাইয়াও বলা যায়, এইসব কিচ্ছুটি না-করেও চুপচাপ অবন্ধুকরণ অনেক মানবিক ও শ্রেয়। যেমন আরেকটা ব্যাপার ভাবেন, আপনার ছেলের বিয়েতে নেমন্তন্ন করলেন না আপনি আমারে, যেহেতু আমি আপনার অত ক্লোজ সার্কিটের কেউ না, তা-ও অনুষ্ঠানোত্তর কোথাও দেখা হয়ে গেলে আপনি একটু রিগ্রেট করবেন এইটুকু বানোয়াট ভালোবাসা তো মানুষ হিশেবে আপনার কাছ থেকে আমি পাইতেই পারি। কিন্তু যদি নিমন্ত্রিতদের লিস্টি পাব্লিশ করে ফেলেন, করতে পারেন যেহেতু আপনার ছেলেরই বিয়ে এবং আমার মেয়ের সঙ্গে তো নয় আর, তখন সেখানে আমার নাম না-দেখে যত দূরবর্তীই হই আমি একটু হলেও মনটা তো কেঁদে ওঠেই। আর কে বলতে পারে যে, যাকে আপনি অবন্ধু ভাবছেন, সে হয়তো এই-মুহূর্তে আপনারই কল্যাণকামনা করছে, হয়তো সে আপনাকে নিয়ে সুখস্মৃতি চারণ করছে কারো সঙ্গে, আর আপনার বন্ধুটিই হয়তো আপনার বারোটা বাজাইছে। ব্যাপারগুলো আমি এইরকমই ভাবি। আমি সবসময় ভাবি যে, আমিই দুনিয়ার সেরা আকাম্মা লোকটা, আপনার কোনো উপকারেই আসছি না, আখাম্বা মাকাল গাছ একটা, কাজেই পয়লা করাতের কোপটা আমার কাণ্ডেই পড়িবেক আমি শিওর, সেহেতু নিবৃত্ত করিতে হেন অনুনয়পত্র। ও বন্ধু আমার, আনফ্রেন্ড কোরো না আমায়, ফর গডস্ সেইক, হোল্ড য়্যুর হ্যান্ডস অ্যান্ড লেট’স্ ওয়েইট ন্ সি! সমবেত হাসাহাসি। দিও না দিও না মোরে ফ্রেন্ডশিপদিবসে অবন্ধুকরণের ফাঁসি …

লেখা : জাহেদ আহমদ 

… …

COMMENTS

error: