আমার সেকুলার ইদমর্নিং : একটি স্মৃতিকথা || শিবু কুমার শীল

আমার সেকুলার ইদমর্নিং : একটি স্মৃতিকথা || শিবু কুমার শীল

SHARE:

আমার জীবনে ইদ কয়েক প্রকার। যখন ন্যাংটা ছিলাম, মানে ছোট বা গুড়া, তখন এক রকম। যখন বড় হইতে থাকলাম বই পড়তে থাকলাম, মালাকাইটের ঝাঁপি বা ভূতের বই বা লা মিজারেবল, তখন আরেক রকম; ওই সময়টা অঙ্কুরোদগমের সময়। তখন ইদও কেমন জানি। পাড়ার মেয়েটাকে ভজানোর জন্য চুলের বিশেষ কাট, কোন ধরনের প্যান্টের কাটিং চলতেছে বা কোন টেইলার্সে প্যান্ট বানাবো এসব।

ইদে তখন বাংলা সিনেমা ঘরে এবং বাইরে। মার্শাল আর্ট আইকন রুবেল তখন পর্দা কাঁপায়, সামাজিক ছবির কান্নাকাটির ভিড়ে টিন-এজ ভালোবাসার ছবি কেয়ামত… এসে পোলাপানদের চোখ ফুটায়া দিলো। এসবও একেকটা ইদ। পূর্ণদৈর্ঘ্য ইদ। এসব ইদে পকেটে টাকা আসতেছে কই কই থেইকা জানি। বস্তুত গরিবই ছিলাম এখনকার মতো, তবে সেই সময়ের ইদগুলা কিউট ছিল।

ন্যাংটাকালে তো ইদের মর্নিং-এ নামাজও পড়ছি বন্ধুদের সাথে কাতারে দাঁড়ায়া। ওইসব বিস্মৃত সেকুলার দিন কবে কই যে হারাইল! “উইদাউট কলেজ নো নলেজ”-এর যুগে ইদের সঙ্গে আসত রক-অ্যালবাম। সুস্মিতার সবুজ ওড়না উড়ে আসত গাঙচিলের মতো। পাড়ায় পাড়ায় ডেকসেট। হিন্দির দাপট তখনও কম। তুমি নাই তুমি নাই তুমি নাই মাধবী… তখনও রক কাঁপাইতেছে। ঘুড্ডির গায়ে লাভিউ জানেমান লেইখা আরেক ছাদে চালান। এসব হচ্ছে কোনো-না-কোনো ইদে, সালামিতে।

মুনস্টার সিনেমাহ্যল তখনও মুখোমুখি। শাঁখারিবাজার তাতিবাজার ফ্যুল-ফ্যামিলি ম্যাটিনি শো। ওই ডিম ডিম ডিম, ফান্টায়ায়ায়ায়া, অরমায়েরেবাপ সেভেনাপ…। লায়ন, সাবিস্তান, চিত্রা, আজাদ, মানসী, রূপমহল, গীত সংগীতে প্রেক্ষাগৃহ পূর্ণ। আহো ভাতিজা আহো জারাসি সেমাই খায়া যাও। সেই ইদ ফুরায়া গেল ভাই…!

ইদের রকম বদলায়া গেল যখন আমি গম্ভীর হইতে শিখলাম তখন। বাংলাদেশে সবাই প্যাকেজ নাটক বানায় তখনও। ইদ আসত প্যাকেজ নাটকের পরাবাস্তব গল্পের মতো। কাওরান বাজার, বেইলি রোডে ইদনাটক ব্যবসায়ীদের আনাগোনা তখন রমরমা। তরুণ-যুবক সবাই ইদে নাটক বানায়, সেই নাটক কারা কারা যেন দেখে কারা কারা আবার সমালোচক পুরস্কার পায়।

একটা প্যাকেজের মতোই ছিল ইদ। ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের দলীয় বিনোদন শেষে লোকে কেউ পোলাউ, কেউ ভাত খায়া ঘুমায়া যেত ইদের দিন। তবে বুদ্ধিজীবী নাটকগুলোর সামনে কেউ কেউ ঝিমাইত বটে। ফেসবুকে তখনও সবার ফেস দেখা যায় না।

টিভিনাটক একদিন হয়া গেল টিভিফিকশন। ‘সেক্স পিয়ার’ ভক্তরা এতে গোস্বা করল কারণ তারা স্ক্রিনপ্লেরে নাটক বলতে শুরু করল আর নিজেদের একেকটা গিরিশ্চন্দ্র ঘোষ।

আজ দূরাগত সব প্যাকেজ ড্রামা, টেলিফিল্ম, প্রায়ফিল্ম, হবে-হবেফিল্ম। আজ বিষণ্ণ দর্শক মোবাইলে স্ট্রিমিং করে। হাগতে বইসা সিনেমা দেখে। টেলিভিশন স্টুডিওগুলা গৃহপালিত অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পবিত্র ইদ পালন করছে।

আমি টিভিসেটের সামনে বইসা ভাবি, “আমাদের গেছে যে ইদ, তা কি একেবারেই গেছে?”

… …

COMMENTS

error: