আমার ঈদ || মিঠু তালুকদার

আমার ঈদ || মিঠু তালুকদার

SHARE:

আমার ঈদস্মৃতি বিশাল কলেবরের। আমি বরাবর ছুটে-চলা মানুষ। ফলে আমার বন্ধুবৃত্তের বহর অনেক বড়, অনেক লম্বা, অনেক চওড়া। তাই ঈদের দিনের যেমন, পূজার সিজনেরও তেমনি, অনেকানেক ঘটনাবহুল স্মৃতি। নিশ্চয় স্মৃতি সতত সুখের, উৎসবস্মৃতি নিষ্কণ্টক সুখেরই চিরকাল, ঈদের স্মৃতিসুখ তো বলা বাহুল্যই। চিকন কয়েকটা বাক্যে, লাফায়ে লাফায়ে, একটা আউটলাইন ড্রাফটের চেষ্টা করি। ঈদস্মৃতির আউটলাইন।

তখন আমরা থাকতাম শহরেরই শিবগঞ্জে। খরাদিপাড়ায়। এক-পর্যায়ে বাসা শিফট করে বাসিন্দা হই বালুচরে। গোপালটিলায়। এইখানেই সপরিবার সেটল-ডাউন করি আমরা। কাজেই ঈদস্মৃতি বলতে গেলেই শিবগঞ্জ আর গোপালটিলার গাছপালাপাখি, নিসর্গ, ফুটবলমাঠ, ব্যাডমিন্টনকোর্ট প্রভৃতি। দিনভর দ্বিচক্রযানে চেপে চক্কর। টৈ টৈ সিলেট শহর চষা। আর আমার অমল-ধবল বন্ধুদল। মহল্লার স্টাইল-আইকন সিনিয়র ভাইয়েরা।

আমার একটা ডাকনাম আছে, এখনকার অ্যাসোসিয়েশন সেই নামটার খবরই জানে না। পালাপার্বণে পুরানা পাড়ার ইয়ারবন্ধুরা ডাকনামে হেঁকে ওঠে কালেভদ্রে। মিঠুন। কদাচিৎ দেখাসাক্ষাৎ হয় তাদের সঙ্গে এখন। হুল্লোড়ে সেই দিনরাইতগুলা হারায়ে গেল পলকেই যেন। বর্তমানে এমনকি ঈদে-পূজায়ও হরিহরাত্মা পাড়াবন্ধুদের লগে দেখা হয় না। ভাবতেই অবাক লাগে। এই রিয়্যালিটিটা মেনে নিলেও অবাস্তবই লাগে এখন।

দুই থেকে তিনটা ছায়াছবি দেখতাম ঈদের দিনের দুপুর থেকে রাইতের ভিতরে। প্রেক্ষাগৃহে যেয়ে। একদিনে একটানা তিনটা ছায়াছবি। পূর্ণদৈর্ঘ্য। রঙিন। বক্সের টিকেট কেটে। ব্ল্যাকারের লগে হাতাহাতি-মারামারিও করেছি। ঈদের দিনের হৈহল্লা আনফর্গেটেবল। শো ভাঙতে-না-ভাঙতেই পড়িমরি ছুট লাগাইতাম আরেক হ্যলের দিকে। এবং দঙ্গলে দেখতাম ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত শাবনুর-মৌসুমী। নাচে গানে ভরপুর। ফাইটিং। সামাজিক অ্যাকশন।

পূজায় সিনেমাহ্যলে যেয়ে বই দেখার ফুরসতই ছিল না। পূজায় আলাদা মাস্তি ছিল। তবে সেই ইউটিউব-নেটফ্লিক্সহীন আদিম যুগে প্রেক্ষাগৃহে যেয়ে বই দেখতাম এবং ঈদের দিনে একলগে তিন-তিনটা উপর্যুপরি। জিনিশটা আজ ভাবতেই তব্দা লাগে যে একদিনে তিন-তিনটা ছায়াছবি! ঈদের সুখস্মৃতি। সিনেমার মতোই। দীর্ঘ। পঁচিশ-ছাব্বিশ রিলের। এখন তো মাসেও দুইটা দেখা হয় কি না ভাবতে হবে।

সেইসময় তো ফোনও ছিল না। না ল্যান্ড, না সেল। তবু সংযোগ ছিল গভীর। ঘন। গহন। কোনোমতে একজনের বাসায় গিয়া হাজির হতে পারলেই কেমন করে জানি না বাকিরা কানেক্ট হয়ে যেত। অডিয়ো ক্যাসেটের রমরমা। গানা বাজাও। ফ্যুল ভলিউমে। এমপ্লিফায়ার অ্যাড করে। পাড়ার লোকের পিলে চমকিয়ে। মুরুব্বিদের মারমুখা বানিয়ে। ঈদের দিন বলে বকাবকি তো বন্ধ ছিল না পাড়াবুড়াদের। বকা মনে থাকে না। বাদ্যবাজনা থাকে।

একটু একটু বড় হচ্ছি। ঈদ সেলিব্রেইটিং ড্রিঙ্কস্ হবে না? তা বাদ যাবে কেন! রজনী কিছু ঘন হলে শ্যেনচক্ষু অভিভাবকস্থানীয়দেরে এড়িয়ে একটুখানি ড্রিঙ্কস্। উদ্ভিদসেবা আরও পরের দিকে। সেইসময় ঈদের বাদের দুই-তিনদিনভরা রাস্তাঘাট থাকত নিরাই। যানঝঞ্ঝাটমুক্ত। ফলে বাইসাইকেল চালাইবার আদর্শ সময়। চালাইতামও মনের হাউস মিটিয়ে। বিচিত্র কসরতের অ্যাক্রোব্যাটিক বাইকিং-এক্সপেরিমেন্টগুলা চালিয়েছি ঈদের মওকায়।

ঈদের আনন্দের ধরন ছিল আলাদা। তারপরও বলব যে আমার কাছে ঈদের চেয়েও ঘনিষ্ঠ ও গভীর আনন্দের ছিল শবেবরাত। হয়তো-বা কালীপূজা বা দিওয়ালির লগে একটা সাযুজ্য ছিল, শবেবরাত তাই আমার কাছে ছিল আলাদা আকর্ষণীয়। দশ-পনেরোদিন একটানা আনন্দ। পাড়ায় বাজি-পটকা ইত্যাদি মুহুর্মুহু। চোরাগোপ্তা আনন্দ। বর্তমানে সেই শবেবরাত উধাও। সম্পূর্ণ উধাও। শবেবরাতের স্মৃতি পরে কখনো রোমন্থন করা যাবে একদিন।

নয়া কাপড়জামা কিনতে যেমন পূজায় তেমনি ঈদেও সমান নিষ্ঠা ছিল। মূলত বস্ত্রাদি কিনতাম কাজী ম্যানশন থেকে। সেইসময় কাজী ম্যানশন তরুণদের মধ্যে ক্রেইজ তৈয়ার করেছিল। শস্তায় মিলত তুলনামূলক, রিজনেবল দামের চেয়েও কমে। এই কারণে ফ্যাশনদুরস্ত তরুণদের বছরে একাধিকবার শখের কাপড়চোপড় খরিদের সুযোগ এনে দিয়েছিল কম-প্রাইসের পরিধেয় বস্ত্র খরিদের জন্য প্রসিদ্ধ এই শপিংম্যল।

সময় কীভাবে এত দূরে চলে যায়! এত বদলায়! আগে ঈদের দিনে বন্ধুদের বাসায় প্রেজেন্স না দিলে মা-খালারা রাগ করতেন। কপট রাগ নয়, মা-খালাদের আদি ও অকৃত্রিম মাতৃগোস্বা। ঈদের দিন গেল অথচ মিঠু এল না! নামাজটা কোনোমতে শেষ হতেই ঈদের কার্যক্রম শুরু। ঈদগার মাঠের কাছেই পাড়া। পাড়ার গলিমুখে দাঁড়িয়ে থাকতাম। টুপি-আচকানপরা কারোর একজনের বাসায় ঢুকেই গুরুজনদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় সেরে মাস্তি স্টার্ট।

কমন ছিল যে একটা সময় পর্যন্ত ঈদের দিনে একগোছা বাইসাইকেলে উড়ে আমরা যাইতাম দলদলি বাগানের একদমই ভিতরে। প্যাডেলে এগারো-বারো মিনিট কিক দিলেই দলদলি চা-বাগান। সবুজ। বনঘেরা। আঁকাবাঁকা। সাইকেলের শোভাযাত্রা। তারপর ইতিহাস। বলব, অবশ্যই। স্মৃতি-ইতিহাস, অবসরে। অবসর কই? অবকাশ? সবাই ভুগছে ব্যস্ততায়। এইবার তো একটা শালাও ফোন করে নাই। ঈদ মুবারাক জানায় নাই। চুলায় যাক। যাই, আমিও।

… …

মিঠু তালুকদার

ভৌত-অবকাঠামো উন্নয়ন ও নির্মাণ ব্যবসায়ী
মিঠু তালুকদার

COMMENTS

error: