ঈশ্বরের মতো ভবঘুরে

ঈশ্বরের মতো ভবঘুরে

এই পঙক্তিটা বাংলায় গানবাহিত হয়ে এসে পশেছিল কানে। অ্যান্ড ইট ওয়্যজ্ নাইন্টিন-নাইন্টিসিক্স, ওই বছরেই রিলিজ হয়েছিল ‘স্ক্রুড্রাইভার্স’ অ্যালবামটা, — যেখানে জেমসের রেন্ডিশনে এইটা ছাড়াও/সহ মোটমাট পাঁচটা গানের স্থান সংকুলান হয়েছিল। তখনও ‘নগরবাউল’ হয় নাই, ‘ফিলিংস’ ছিল জেমসের গানদল। স্ক্রুড্রাইভারে একপিঠে ‘এলআরবি’ পাঁচটা এবং আরপিঠে ‘ফিলিংস’ পাঁচটা — সাকুল্যে দশটা গানই ছিল। তুমুল জনপ্রিয় হয়েছিল ‘স্ক্রুড্রাইভার্স’। অব্যবহিত আগে যেমন হয়েছিল ‘ক্যাপ্সুল ৫০০ মিগ্রা’ অ্যালবামটাও। ওইখানেও এলআরবি-ফিলিংসই ছিল।

তখন অডিয়োবাজারে ব্যান্ডগুলো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে; ব্যান্ড ছাড়াও ননব্যান্ড হরেক কিসিমের অ্যালবাম অলমোস্ট হররোজ বেরোচ্ছে, ব্যবসাও করছে। এক-ধরনের অ্যান্থোলোজি-অ্যালবাম বার করার কালচার চালু হয়েছিল, অসম্ভব জনপ্রিয়ও হচ্ছিল সেগুলো, যেখানে বারোপ্রকারের ব্যান্ড-সোলো শিল্পীদের সম্মিলনে ভ্যারাইটি অফ অডিয়েন্স ধরার চেষ্টাটা লক্ষ করা যাচ্ছিল। ‘স্ক্রুড্রাইভার্স’ অবশ্য মিক্সড নয়, ডুয়ো অ্যালবাম, এলআরবি-ফিলিংস দুইটা ব্যান্ডের দশটা কাজ নিয়ে এর ইমিডিয়েট আগে ‘ক্যাপ্সুল ৫০০ মিগ্রা’ সাক্সেস্ পাওয়ায় সেকন্ড ভেঞ্চার হিশেবে বেরোয় এই স্ক্রুড্রাইভার্স। পরে এর কন্টিন্যুয়েশনে কেবল ডুয়ো নয়, ট্রায়ো এবং মিক্সডের পাশাপাশি বিচিত্র কম্বিনেশন-পার্ম্যুটেশনে অ্যালবাম প্রোডিউস করার একটা বাজারফ্রেন্ডলি নিরীক্ষা আমরা করতে দেখেছি ফিতার ক্যাসেটযুগের শিল্পী-কলাকুশলী-বিনিয়োগকারীদেরে। অ্যানিওয়ে। এইখানে একটামাত্র পঙক্তি নিয়া আলাপ উঠায়েছি। ইম্পার্সোন্যাল আলাপ নয়, বাহুল্য হলেও কথাটা বারবার বলতে হয় নিবন্ধাদিতে; — এই ল্যান্ডে লেখালেখি মানেই হচ্ছে আপনারে একটা ‘জাতীয় কণ্ঠস্বর’ হইয়া তারপরে আলাপে আসতে হবে, এবং না-হলে হেনস্তার শিকার হতে হয় যা অকথ্য বিরক্তির ব্যাপার। বারবার বলেও রক্ষা পাওয়া যায় না। বারবার ডিসক্লেইমার তবু দিয়েই যেতে হয় নিবন্ধের পর নিবন্ধান্তরে।

একটা লাইনের আলাপ। পঙক্তি একটাই, কিন্তু তা ব্যঞ্জনায় বিবিধ মধু ও মুসিবত নিয়া হাজির হতে পারে এমন নজির আমরা হামেশাই লভি গানে ও কবিতায়। এইখানে সেই কিসিমের আরেকটা আলাপ। তার আগে গানটার নামঠিকানা ভালো করে বলে নিই। ঠিকানা তো বলেই নিয়েছি আগে, এইটা নাইন্টিসিক্সে ‘স্ক্রুড্রাইভার্স’ অ্যান্থোলোজিতে অ্যাভেইল করেছি পয়লা, এখন তো খোলা হাওয়ায় সেলফোনের বাটন টিপে যে-কোনো বই বলুন বা গান গলাধঃকরণ করা যায়। গানটা আমরা ‘যে-পথে পথিক নেই’ শীর্ষক পঙক্তি দিয়াই চিনি। লিরিকের পয়লা লাইনদ্বয় “যে-পথে পথিক নেই / বসে আছি সেই পথে” গা-ছমছমানো অরণ্যঘন গলায় সহসা হাজির হয়। জেমসের গান। আমরা সাধারণ শ্রোতা গানের কণ্ঠশিল্পীর নামে একেকটা গান মনে রাখি; এইটাই কমন প্র্যাক্টিস, এতে দোষের কিছু দেখি না। তারপরেও যদি সুযোগ থাকে এবং তথ্যটা জানা থাকে তাইলে একটা গানের গীতিকার-সুরকার-অ্যারেঞ্জার কারোর নামই মিসড-আউট রাখা যাবে না। আসাদ দেহলভী লিখেছেন আলোচ্য পঙক্তির কবিতা/গানটা — জেমসের অনেক জনপ্রিয় ও শক্তিশালী লিরিকের জন্ম হয়েছে দেহলভীর হাতে — আর গানটার দুর্ধর্ষ সুর করেছেন জেমস্ নিজে। একবার গোটা গানের গীতিভাগ পড়ে নিয়ে তারপর মূল আলাপে ঢুকে তড়িঘড়ি নিবন্ধ খতম দেবো :

যে-পথে পথিক নেই
বসে আছি সেই পথে
একা আমি একলা রাতে
শত শতাব্দী ধরে
চুপচাপ নিশ্চুপ চারিধার
বসে আছি এই আমি
একগ্লাস জোছনা আর একগ্লাস অন্ধকার হাতে।।

অর্ধেক পূর্ণিমা রাতে
মেঘের আড়ালে
আকাশের লুকোচুরি খেলা
নির্ঘুম রাত শেষে
চাঁদের ফাঁসি হয় সূর্যের আশীর্বাদে
ক্লান্ত প্রভাতে সূর্যের আশীর্বাদে।।

রাতজাগা অজস্র তারা
বানায় আলোর সেতু
নীরব রাতে নীরবতা ভাঙে
উড়ন্ত ধূমকেতু
ছায়াপথ ধরে আমি হেঁটে যাই
অসীম আমি
ঈশ্বরের মতো ভবঘুরে স্বপ্নগুলো
রাতের অরণ্যে ভোজসভায় উৎসবে মাতে
একা আমি একলা রাতে শত শতাব্দী ধরে
চুপচাপ নিশ্চুপ চারিধার বসে আছি এই আমি
একগ্লাস জোছনা আর একগ্লাস অন্ধকার হাতে।।

ছায়াপথ ধরে আমি হেঁটে যাই
অসীম আমি ঈশ্বরের মতো
ভবঘুরে স্বপ্নগুলো
রাতের অরণ্যে ভোজসভায় উৎসবে মাতে
একা আমি একলা রাতে
চুপচাপ নিশ্চুপ চারিধার
বসে আছি এই আমি
একগ্লাস জোছনা আর একগ্লাস অন্ধকার হাতে।।
সুর : জেমস্ ।। গীত : আসাদ দেহলভী ।। কণ্ঠ : জেমস্ ।। সংকলন : স্ক্রুড্রাইভার্স ।। রিলিজকাল : ১৯৯৬

যে-কথাটা আপাতত বলবার তা এ-ই যে, ব্যান্ডধারার বাংলা গানে যে-কয়টা আদ্যোপান্ত শক্তিমন্ত লিরিক রয়েছে — একেবারে কমও নয় ব্যান্ডের ধারায় পাওয়ার্ফ্যুল লিরিকের সংখ্যা — ‘যে-পথে পথিক নেই’ শীর্ষসারিতে যে জায়গা পাবে এতে সন্দেহ থোড়াই। লিরিকের যে-পঙক্তিবিন্যাস/পঙক্তিসজ্জা আমরা উপরে রেখেছি, এইটা গীতিকারের অভিপ্রেত পঙক্তিসংস্থান না-ও হতে পারে। সেক্ষেত্রে একটা সমস্যা এ-ই যে, নেট ইত্যাদি উন্মুক্ত সোর্সগুলোতে যেভাবে একেকটা গানের লিখিত রূপ আমরা পাই বাংলায় তা বানানবিচ্যুতি-বিন্যাসব্যবস্থা ইত্যাদি সমস্ত বিচারেই মনে হয় না গীতিকারের অভিপ্রেত উপায়ে প্রেজেন্টেড। মুদ্রিত বই বা অ্যান্থোলোজিও তো নাই। ফলে এইখানে যেভাবে বিন্যাস্ত হয়েছে, এই নিবন্ধে, সেইটা গান শুনে শুনে এই নিবন্ধকারের কল্পিত পঙক্তিবিন্যাস/সজ্জা তা বলা বাহুল্যই। কিন্তু মূল কথাটা আমরা এখনও বলি নাই, বলতে উদ্যত হয়েছি মাত্র। পরের প্যারায় চেষ্টা করছি ছিন্নকথা অ্যাভোয়েড করে যেতে।

এই নিবন্ধের শিরোনামে উৎকলিত পঙক্তিটা, তার আশপাশের পঙক্তিগুলো/পঙক্তিচূর্ণ, আমরা যখন শুনি তখন যে-মজাটা তৈয়ার হয় সেইটা আলাপের কেন্দ্র করতে চেয়েছি। নিছক ব্যক্তিক অভিজ্ঞতা হতে পারে এইটা, আর-কেউ হয়তো অন্য কদমে হাঁটেন/ভাবেন। পঙক্তিটা শোনার সময় ইল্যুশন তৈরি হয় একাধিক অর্থতলের, যেমন একবার মনে হয় এইখানে গানটা বলতে চায় ‘আমি ঈশ্বরের মতো’, পরে মনে হয় ‘অসীম আমি ঈশ্বরের মতো’, আবার মনে হয়, না, আসলে গানটা এই জায়গায় বলতে চাইছে ‘অসীম আমি’ আর আমার স্বপ্নগুলো ‘ভবঘুরে’ এক্স্যাক্টলি ঈশ্বরের মতো, পরে ফের মনে হয় ঈশ্বরের সঙ্গেই নিজেকে তুলনা করতে অ্যাডজেক্টিফাই করা হচ্ছে আমিটাকে ‘অসীম’ হিশেবে, এবং আসলেই তো। মানুষই তো, রসগোল্লা বলেন বা ঈশ্বর তা মানুষ বৈ কে আর! মানুষ কত বড়? উত্তর হয়, মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়। ঈশ্বরের মাপজোখ ওইমতো। রইল শুধু ভবঘুরে। দেশ হতে দেশান্তরে যে ঘুরে বেড়ায়। সৃজনশীল মানুষ মাত্রেই মাইগ্র্যান্ট, অভিবাসী, শিফট করে এক চিন্তাদেশ থেকে আরেক চিন্তাদেশে ক্ষণে ক্ষণে, — এইরকম একটা কথা সালমান রুশদি বলেছিলেন গ্যুন্টার গ্র্যাসের প্রবন্ধগ্রন্থ ‘অন রাইটিং অ্যান্ড পোলিটিক্স ১৯৬৭-১৯৮৩’-এর মুখবন্ধ লিখতে যেয়ে। এইটা ট্রু। তবু ধন্দ যায় না। গানের লিরিক শ্রবণকালে এইরকম শ্রবণের মধুভ্রম হয় বিভিন্ন গানে, এতে গানের আর্থস্তর অনেকান্ত হয়। আর আলোচ্য গানটা জেমস্ গেয়েছেন, বিশেষ ওই জায়গায় রিফ্রেইন রিপিট করছেন এমনভাবে যেন মধুমুসিবতের ভ্রম আরও প্রগাঢ় হয়।

আমি ঈশ্বরের মতো অসীম হই কিংবা আমার স্বপ্নগুলো ভবঘুরে ঈশ্বরের মতো, দ্যোতনা যা-ই হোক, কথা তো একটাই। মনসুর হাল্লাজের মৃত্যু নাই। মানুষ যতদিন ভাষায় ব্যক্ত করবে নিজেরে, ততদিন এই বিস্ময়ব্যঞ্জনাগুলো ভাষায় উঁকি দিয়া যাবে। একেকটা ভালো কবিতা, ভালো গীতাখ্য, ভালো গদ্যকাজ বা ছায়াছবিধৃত মন্তাজের বরাতে এই বোধোদয়গুলো সন্তর্পণে এসে আমাদেরে শান্ত ও স্মিত করে রাখে।

লেখা : জাহেদ আহমদ

… …

COMMENTS

error: