কবরের পাশে একশ বছরের পুরনো তানপুরা || সরোজ মোস্তফা

কবরের পাশে একশ বছরের পুরনো তানপুরা || সরোজ মোস্তফা

SHARE:

আজ আর মনে নেই কারা কারা বারী সিদ্দিকীর কফিনটা কাঁধে নিয়েছিলেন; কাঁধে রেখে হাঁটতে হাঁটেতে কারা কারা শিল্পীকে কবরে নামিয়ে দিয়েছিলেন। মনে আছে, ২০১৭ সালে নভেম্বরের বিকালটা নেত্রকোণা কলেজমাঠ আশ্চর্য কান্নায় নত ছিল। আব্দুল আলিমের আচ্ছন্ন স্বরে সবাই যেন গাইছিলেন ‘দুয়ারে আইসাছে পালকি / নাইওরি গাও তোলো রে / বলো মুখে আল্লা-রসুল সবাই বলো’। কবি  সাইফুল্লা এমরানের ঘোষণায় — মাঠের সবুজে মিশে ছিল গোলাপ ও রজনীগন্ধা; শ্রদ্ধা নিবেদন।

নরম বিকালে আজ ধানক্ষেত থেকে উঠে আসে হেমন্তের ঘ্রাণ; লেবুর বাগান আর আমগাছের ছায়ায় শীতমগ্ন ২৪ নভেম্বর। মগড়াতীরের এই কারলি গ্রামে পুকুরের তীরে বারী সিদ্দিকী ঘুমিয়ে আছেন। নিজের হাতে বানিয়েছেন ‘বাউল বাড়ি’। তিনি জানতেন, এমন বিকালে শিয়রের পাশেই থাকবে বিরই ধানের ঘ্রাণ। তিনি জানতেন, দূরদুরান্ত থেকে ভক্তেরা আসবে। বড় বাড়ি লাগবে। বড় বড় ডেকচি লাগবে। লাগবে বড় বড় লাকড়ির চুলা। বাউলেরা থাকবে। আসর বসাবে। গাইবে দরদী গান। আমার কাছে খুব আশ্চর্য লাগে, যে তিনি বলতেন, বাউলেরা সুর বোঝে না!; বাউলেরা বেসুরো গান ধরেন। সেই তিনি বানিয়েছেন ‘বাউল বাড়ি’। এ যেন অহংকার কিংবা অভিমানে মত্ত নয়; এ যেন নিজেকে চেনার পাঠশালা। জোর না খাটিয়েই মাটির গানের পরিচয়| এ যেন প্রজন্মের প্রতি দায়, স্নেহ ও একাগ্রতা। এ যেন বাউল গানের উত্তরাধিকারীদের একটা বাঁশি কিংবা মাটির দোতারা উপহার দেয়া।

তিনি কি কোনো স্কুলিং করতে চাইছিলেন কিংবা নিজের ভিটায় চাইছিলেন বাউল বুদ্ধির উন্মেষ? আমার মনে হয়, সমাজের ভেতরে শিল্পীও অনেক পরোক্ষে একটা আত্মদর্শন প্রচার করেন। এটা শিল্পীর মনোগ্রাম। ‘বাউল বাড়ি’ কি এমন কিছু! যা শোনা মাত্র লোকেরা বারী সিদ্দিকীর নামের পাশে তাকাবে? এই নামের ভেতরেই তিনি দীর্ঘায়ু; এই নাম কি সেই পরম্পরা যার কোনো ধ্বংস নেই? সাধুর কাজ জাঁক দেয়া থাকে রক্তে ও জনপদে। সাধুকে জোর খাটিয়ে তাড়িয়ে দেয়া যায় না। নেত্রকোণা যেহেতু বাউলের চারণভূমি; সেখানেই তিনি সুরসাধনার একটা আশ্রম সাজাতে চান। বাউলদের আনাগোনায় জেগে থাকল ‘বাউল বাড়ি’। এ যেন নিজের নামের আবির্ভাব। সংকটের বাইরে এসে সাধনার এই উঠানে দাঁড়ালে নবীন বাউলেরা জানতে পারবেন কোথায় থামতে হবে, কোথায় নামতে হবে, কীভাবে গাইতে হবে শাশ্বত দিনের গান। নিজের চেহারা যে দেখতে পারে, সে-ই হচ্ছে বাউল।

গুরুর সান্নিধ্যে এসে মানুষ শান্তি পায়। নিজের ইচ্ছাবৃক্ষে পানি ঢালতে মানুষ গুরুকে খোঁজে। জগতের অক্ষম ও নিরুপায় পথে হাঁটতে হাঁটতে মানুষ মুর্শিদের আশ্রমে জিরোতে আসে। মুর্শিদের কথা ও সুরে বেদনা নামের পাথর গলতে থাকে। চোখ থেকে নামে তপ্ত হাহাকার। সোজা হয়ে মানুষ আবারো দাঁড়ায়। সে জানে আকাশের নিচে নিজের ইচ্ছার চেয়ে মূল্যবান কিছু নেই।

আমি জানি, বারী সিদ্দিকী কাউকে শিষ্য বানাননি। কিন্তু একলব্যের মতো শিষ্য হয়েছেন অনেকেই। আজ তাই কিশোরগঞ্জ, জামালপুর, নরসিংদী থেকে ভক্তেরা এসেছেন। সাধুর কবরে, ওস্তাদের কবরে ফুল ছিটিয়েছেন। যে যেভাবে পারে সেভাবেই শান্তি বিছিয়ে রাখুক। কবরে  ফুল বিছিয়ে ভক্তেরা মোনাজাত ধরে। আজ মনে হলো, কান্নাই প্রকৃত মোনাজাত। প্রকৃত মোনাজাত প্রভুত্ব কমায়। প্রকৃত মোনাজাত      কাফনের কাপড়ের মতো হালকা করে মন। পরিপূর্ণ নিবেদনে সাধুর অন্তর হালকা হতে থাকে; সবকিছুকে ভাসিয়ে নিজেও ভেসে চলে।

মোনাজাত শেষে গায়েনেরা গান শুরু করল। যে-কোনো গানে দরদ থাকলে আর শুনবার মতো মন থাকলে মানুষ গোল হয়ে বসে। মানুষ আসছে, মানুষ যাচ্ছে। আগামীকাল গান হবে। একদল মানুষ প্যান্ডেল বানাচ্ছে। একদল মানুষ পাটি বিছিয়ে উঠনেই গাইছে গান। চেহারায় কান্না নিয়ে বারী সিদ্দিকীর স্ত্রী ফরিদা ইয়াসমিন পুকুরপাড়ে হাঁটছেন। কিছুক্ষণ আগেই টিভির লোকেরা এই দিনে উনার অনুভূতি জানতে চেয়েছেন। কী সহজে বলে গেলেন তিনি ‘অনুভূতি আর কি! কবে যে উনার পাশে চিরবিশ্রামে যাব।  উনাকে ছাড়া থাকতে আমার খুব কষ্ট হয়। উনার হাতটা, মুখটা ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছা করে। আত্মা শান্ত করা বাঁশি শুনতে ইচ্ছা করে’। উনার কবর এখনো পাকা হয়নি কেন? — সাংবাদিকেরা এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ‘কবর পাকা হবে ভাই। মানুষটার জন্য নতুন মাটি দিয়া ঘর বানাইছি। নতুন মাটির ঘর যেন না ভাঙে সেজন্য সময় নিছি। খুব তাড়াতাড়ি কবর পাকা করলে মাটি সরে যেতে পারত।

সাংবাদিকের প্রশ্নে জিজ্ঞাসা থাকে। দরদ ও মায়া থাকে না মোটেও। কিছুটা ক্লান্ত হয়েই মহিলা সবুজের কাছাকাছি চলে এসেছেন। বাগানের ভেতরে একেকটা লেবুপাতার স্পর্শে মন কেমন যেন সতেজ হয়ে ওঠে। মানুষের সাথে হাঁটতে হাঁটতে জেগে ওঠে নম্রতা। নম্রতার মাঝেই সম্পর্কের উৎপত্তি। মুহূর্তের সেই সহজ অধিকারে জিজ্ঞাসা করি, ‘আপনার সাথে ওস্তাদ বারী সিদ্দিকীর পরিচয় কীভাবে?’

সহজ প্রশ্নকে আরো সহজ করে উত্তর দিতে থাকেন ফরিদা ইয়াসমিন। ‘উনার সাথে আমার পরিচয় ১৯৮১ সালে। আমি তখন সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী। উনি আমার শিক্ষক ছিলেন। আমার বড়ভাইয়েরও শিক্ষক তিনি। খুব ভালো ছাত্র ছিলেন। আমরা অনেকে মিলে একসাথে বিজ্ঞান, গণিত, ইংরেজি পড়তাম। আমরা উনার খুব ভক্ত ছিলাম। শ্রদ্ধা করতাম। টান ও আকর্ষণ ছিল। কিন্তু যাকে বলে প্রেম, ডেটিং — এসব ছিল না। স্কুলে আমি নাচ করতাম। গানও করতাম। উনি বাঁশি বাজাতেন। কিন্তু কেউ কাউকে প্রস্তাব কিংবা প্রেমপত্র লিখিনি। আসলে মনের ভেতরে ফল্গুধারার মতো বহমান ছিল আমাদের প্রেম ও আকর্ষণ। কিন্তু একদিন এই প্রবল আকর্ষণ পাহাড়ি নদীর স্রোতের মতো বেরিয়ে আসে। এসএসসি পরীক্ষার পর আমি আমার নানার বাড়ি সুনামগঞ্জের ধর্মপাশায় বেড়াতে যাই। আমার নানা ছিলেন আওয়ামীলীগের বিখ্যাত নেতা আব্দুল হেকিম চৌধুরী। সেই নানার বাড়িতে তিনি এসে হাজির। আমাকে নাকি দেখতে এসেছেন। আমি তো অবাক! একদিন থেকেও ছিলেন। উনার মতো মানুষকে পেয়ে আমরা খুব যত্ন করলাম। পরদিন ধর্মপাশা থেকে মোহনগঞ্জে আসলাম। উনি চলে যাবেন। আমরা উনাকে ট্রেনে উঠিয়ে দিতে এসেছি। দেখি, উনার চোখ দিয়ে পানি নামছে। উনার চোখ দেখে আমিও কাঁদছি। ট্রেন ছেড়ে দিবে কিন্তু আমাদের কান্না থামে না। সেই দিনই বুঝেছি ভালোবাসার শক্তি। সেই দিনই বুঝেছি, আমাদের একসাথে থাকতে হবে।’

হাঁটতে হাঁটতে আমরা পেঁপেগাছের বড় পাতার নিচে এসে দাঁড়াই। ফরিদা ইয়াসমিনের উচ্চারণগুলো তখন খুব মায়ামাখানো। কথা ঠোঁটে এসে বসে থাকলে না বলে থাকা যায় না। আমি বলি, ‘উনার মতো গুণী মানুষের সাথে সংসার করতে কষ্ট হয়েছে কি-না? শিল্পীরা তো সংবেদনশীল হয়; সংসারে বারী সিদ্দিকী কেমুন ছিলেন?’

কলমি ফুলের মতো নিচু স্বরে তিনি বলতে থাকেন, ‘তিনি খুব সহজ মানুষ ছিলেন। ছিলেন স্পষ্ট ও অকপট। সংসারে কোনো বিষয়েই অমিল ছিল না। আমাদের ৩৩ বছরের সংসার। আমাদের ম্যারেজ ডে হতো দুদিন। তিনি বলতেন, ম্যারেজ ডেতে আমারা উৎসব করব। গানবাজনা হবে। উৎসব কি একদিনে শেষ করা যায়? আমাকে নিয়ে বাজার করতেন। মাছ-মাংস-কাঁচাবাজার দুজন মিলেই আমরা করতাম। আমার রান্না পছন্দ করতেন। শুনেছি, শিল্পীরা অগোছালো হয় কিন্তু ইনি সংসারে কখনোই অগোছালো ছিলেন না।’

ফরিদা ইয়াসমিনের কথার ভেতরে কেমন যেন দৃঢ়তা। আবেশমাখানো, নিজস্ব অধিকার থেকে উঠে আসা শান্তির স্বর। উনার দিকে তাকিয়ে আবারো জিজ্ঞেস করি, ‘আপনার গান কিংবা নাচ কি তিনি পছন্দ করতেন? আপনার শিল্পসত্তা বিকাশে উনার ভূমিকা কেমুন ছিল?’

‘১৯৮৬ সালে আমার প্রথম ছেলের জন্ম হয়। এর পরে আমি আর নাচ করিনি। আমিই চাইনি। তখন তিনি বললেন, ‘তুমি তানপুরা বাজাও। আমি শিখাব। উনিই আমাকে তানপুরা শিখিয়েছেন। সংসারের কাজকর্মের পরও উনার কাছে তিন-চার ঘণ্টা তালিম নিতাম। উনার আগ্রহ, অনুপ্রেরণা, তালিমে আমি তানপুরা বাজানো শিখেছি। উনি বাঁশি বাজাতেন। উনার পাশে বসে আমি বাজাতাম তানপুরা। সেই মুহূর্তগুলো কী শান্তির ছিল — বলে শেষ করা যাবে না। উনার সাথে আমি সমস্ত ইউরোপ ঘুরেছি। ক্লাসিক্যাল অনুষ্ঠানে বাজিয়েছি। বিভিন্ন ফ্যাস্টিভ্যালে বাজিয়েছি। উনার পাশে বসে, উনার বাঁশি শুনে বাজানোর কী শান্তি সে কি বলে শেষ করা যাবে! উনি আমার গুরু। উনি আমার জীবন। উনার সাথে আমার সম্পর্কের কথা শুনে পণ্ডিত ওস্তাদ ভিজি কর্নাড উপহার হিসেবে আমাকে ১০০ বছরের পুরনো একটা তানপুরা দিয়েছিলেন। এই উপহার তিনি পুনে থেকে আমার জন্য নিয়ে এসেছিলেন। এইটা আমার জীবনের সেরা একটা উপহার।’

পরম সত্য নিহিত যে-কথায় সেই কথা শুনে মন ক্রমশ উজ্জ্বল হতে থাকে। মানুষের মনকে কখনোই ধরা যায় না; কিন্তু কথায় কথায় সে-মন যখন পবিত্র হয়ে নামে তখনই পাশের মানুষটিকে ভালো লাগে খুব। সেই ভালোলাগায় আমি জিজ্ঞেস করি, ‘সাংসারিক টানাপোড়েন বারীভাইয়ের শিল্পসাধনাকে বাধাগ্রস্থ কিরেছে কি-না?

‘উনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই আমরা বিবাহ করেছি। বিত্তের অভাব আমাদের ছিল। কিন্তু অসুখী ছিলাম না। না আমি; না উনি। আসলে বাড়ির ভেতরে উনি তো রেওয়াজ ও সাধনার ভেতরেই থাকতেন। আমাকেও সেই সাধনার কাছাকাছি রাখতেন। নিত্যদিন ক্লাসিক্যাল মিউজিক নিয়ে থাকতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়েই তিনি ওস্তাদ আমিনুর রহমানের সান্নিধ্যে আসেন এবং উনার অধীনে প্রশিক্ষণ নিতে থাকেন। আমিনুর রহমান সাহেবই উনাকে পুনে পাঠিয়েছিলেন। প্রায় বছরখানেক ছিলেন। এর চেয়ে বেশি সময় থাকার ক্ষমতা ছিল না। নতুন সংসার। বেশি সময় যদি থাকতে পারতেন! গুরুর আশ্রম ও সাধনা ছাড়া সুর কণ্ঠে বসে না।’

বাউলবাড়ির উঠান তখন আচ্ছন্ন হয়ে আছে সান্ধ্য ধূপে। নরসিংদী থেকে আসা শিল্পীরা ক্রমাগত গাইছেন। গান গাইলে মন ঠাণ্ডা হয়। সাধু কিংবা ওস্তাদের কবরের পাশে উঠানে বসে গাইলে মনে হয় সত্যি সত্যি ঠাণ্ডা হয়। বাউলবাড়িতে ফরিদা ইয়াসমিনকে আমার একশ বছরের পুরনো একটা তানপুরা মনে হয়। হেমন্তের পৃথিবীতে সান্ধ্য ধূপের ঘ্রাণে বাউলবাড়ি থেকে ছড়িয়ে যাচ্ছে সুরের পবিত্রতা। বাউলবাড়িতে ফরিদা ইয়াসমিন একশ বছরের পুরনো তানপুরা।

… …

COMMENTS

error: