ছায়াপথ || আশিকুজ্জামান টুলু

ছায়াপথ || আশিকুজ্জামান টুলু

SHARE:

এখন রাত ৫টা, রাত না বলে ভোর বলাই ভালো। কোনো কোনো রাত কেন যেন আটকে যায় মনের কোনো এক কোনায়, ঘুম হয়ে যায় বিবাগী। চোখ খোলা অবস্থায় দেখা যায় ভোরের আগমন। কোনো কোনো দিন মনটাও থাকে একটু ভেজা ভেজা, হিউমিডিটি বেশি থাকে সেদিন মনের বায়ুমণ্ডলে। ঠিক আজকের মতো। জানালায় ভারী পর্দা ঝুলছে, কিছুই দেখা যাচ্ছে না। বাইরের আকাশটাও না। ছোট্ট একটা টেবিলল্যাম্প জ্বলছে ঘরে, একটা ভিডিও বাউন্স করতে দিয়ে তাকিয়ে আছি মনিটরের দিকে। কখন যেন মনিটরের আলোটাও নিভে গিয়েছে, খেয়াল করতে পারিনি। মাঝে মাঝে চোখের সামনে অবস্থিত কোনোকিছুকেই দেখা যায় না কিন্তু অনেক দুরের অনেককিছুকেই একেবারে চোখের সামনে দেখা যায়, মনের সামনে অনুধাবন করা যায়।

***
কি লিখব জানি না । ক’দিন ধরে ভাবছি আপনাকে নিয়ে একটা লেখা লেখার বিষয়ে কিন্তু সময় করে উঠতে পারছি না অথবা মনের ভিতরে অশান্ত ঢেউ বারংবার হৃদয়ের কূল ভাসিয়ে দিয়ে যাচ্ছে, তাই হয়তো শরীর চাইলেও মন চাইছে না বসে লেখা শুরু করতে।

***
আপনার সাথে আমার প্রতিদিন দেখা হতো না, মাঝে মাঝে দেখা হতো। আপনি ব্যস্ত থাকতেন আপনার জীবন নিয়ে আর আমি আমার। কালেভদ্রে দেখা হলে সহাস্যে বরণ করে নিতেন আমাকে, আমি হাত বাড়িয়ে করমর্দন করতাম আপনার সাথে। আপনার হাত খুবই মোলায়েম ছিল অর্থাৎ ছেলেদের হাতের চাইতেও কিছুটা মোলায়েম বেশি। আপনি আমাকে টুলুভাই বলে সম্বোধন করতেন এবং আমিও আপনকে ভাই ডাকতাম। কোথায় যেন একটা চমৎকার বোঝাপড়া আপনার সাথে অনেক আগে থেকেই হয়ে গিয়েছিল।

***
আপনার এবং আমার জীবনের কোনো-একটা যাত্রা একসাথে শুরু করেছিলাম বিধায় হয়তো আপনার সাথে আমার পথচলায় একটা বিনি সুতার বাঁধন ছিল। আপনার সেই শুরুটা যেমন কষ্টের ছিল, আমারটাও ছিল কষ্টের। আপনি আপনার আগের ব্যান্ড ছেড়ে নতুন ব্যান্ড তৈরি করলেন, আমিও ঠিক একই তরীর যাত্রীর মতো আমার পুরনো ব্যান্ড ছেড়ে নতুন ব্যান্ডের যাত্রা নিয়ে শুরু করলাম। আপনাকে ও আমাকে প্রমোট করার জন্য এগিয়ে এল বাদল। আসলে বাদল ছিল খুব ভালো একটা ছেলে যার টেস্ট ছিল অসাধারণ। ঐ সময়ে আপনার ও আমার ব্যান্ডের ক্যাসেট এক ঈদে বেরিয়ে গেল। দর্শকশ্রোতা পছন্দ করলেন গানগুলি।

***
কয়েক বছর চলে গেল। এর মধ্যে আমি একটা মিক্স ক্যাসেটের কাজ শুরু করলাম এবং আপনাকে গাইতে আহ্বান জানালাম। আপনি সহাস্যে রাজি হয়ে গেলেন গাইতে, একবারও জিজ্ঞাসা করলেন না আর কে কে থাকবে অ্যালবামে যেটা অন্য ব্যান্ডমেম্বাররা জিজ্ঞাসা করতেন। গানটা লিখল আমাদের আসিফ ইকবাল এবং আমি সুর করলাম। ইউটিউবলিঙ্ক খুঁজে যে-কেউ শুনতে পারেন গানটা, “সারারাত তুমি হেঁটেছ আমার নিঝুম স্বপ্নপথে / ফেরারী স্মৃতিরা গিয়েছে চলে আমায় একাকী ফেলে” — ‘স্টার্স ২’ মিক্সডঅ্যালবামে এই গানটা রিলিজ করা হয়।

***
আমি সবসময় গায়কদের পেমেন্টের বিষয়টা আগেভাগে আলাপ করে নিতাম। আপনাকেও ঠিক সেভাবেই জানতে চাইলাম আপনার সম্মানী। আশ্চর্যের বিষয় হলো আপনি আমাকে কোনো অঙ্কের কথা বললেন না বরং বললেন :
— দিয়ে দিয়েন যা ইচ্ছা।
আশ্চর্য হলাম এই ভেবে যে সবাই আগেই অঙ্কের কথা জানিয়ে দেয় কিন্তু আপনি কোনো অঙ্কের কথা বললেন না এবং আমাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করে বললেন :
— “দিয়ে দিয়েন যা ইচ্ছা”!

***
আমি গানটার ডামি পাঠিয়ে দিলাম আপনার কাছে। রেকর্ডিঙের দিন একেবারে ঠিক সময়ে পৌঁছে গেলেন স্টুডিওতে। আমরা অফিসরুমে বসে কিছুক্ষণ আড্ডা মারলাম এবং তারপর স্টুডিওর ভিতরে ঢুকলাম। আমি আপনাকে আগেই গানের ট্র্যাকটা পাঠিয়ে দিয়েছিলাম যাতে আপনি প্রস্তুত হয়ে আসতে পারেন। আপনি প্রথমেই গিটারটা বাজাতে চাইলেন, আমি মবিনকে বললাম গিটারটা নিয়ে নিতে। মবিন সবকিছু রেডি করে গিটারের টেক নেয়া শুরু করল। আপনি একমনে গিটার বাজিয়ে গেলেন। প্রথমে কর্ড সহ রিদমটা বাজালেন এবং তারপর বাজালেন লিড। আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকলাম, আপনাকে আমার কোনো ডিরেকশন দিতে হলো না, আপনি যা বাজালেন তা-ই আমি ফাইনাল হিসাবে নিয়ে নিলাম মবিনকে দিয়ে। এরপর আপনি ভোকাল দেয়ার জন্য ঢুকে গেলেন বুথে। ঠিক তিনটা টেকে গান কমপ্লিট করে দিলেন, সেখানেও কিছু বলতে হলো না, শুধু আপনি আমাকে জানালেন দুয়েকটা ওয়ার্ড চেঞ্জ করে গাইবেন। আমি সম্মতি জানালাম এবং আপনিও খুব তাড়াতাড়ি গানটা গেয়ে ফেললেন, আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম গাওয়াটা এবং গিটার বাজানো শুনে। গান শেষ করে আবার অফিসরুমে আসলাম, আমি একটা খামে আপনার সম্মানীটা আপনার সামনে তুলে ধরলাম, আপনি খুব সন্তর্পণে সম্মানীটা নিয়ে পকেটে ঢুকালেন। আমি আপনাকে টাকাটা গুনে নিতে বললাম, আপনি বললেন :
— লাগবে না কাউন্ট করতে।
সেখানেও আপনার আমার প্রতি বিশ্বাস দেখে আবারও মুগ্ধ হলাম। সাথে সাথে একটা কথা মনে আসলো —  “আমাদের মাঝে কিছু গায়ক আছে, কিছু মিউজিশিয়্যান আছে এবং কিছু আছে শিল্পী”। আপনি হলেন সেই শিল্পী যাদের গানের প্রতি ভালোবাসাটাই প্রধান, অন্যকিছু ঠিক তততা টানে না।

***
আমি আপনার প্রাপ্য সম্মানীই দিয়েছিলাম যা আমি আরেকজন প্রথম সারির গায়ককে দিয়েছিলাম। আপনি পরে আমাকে ফোন করে থ্যাঙ্কস দিয়েছিলেন। আপনাকে কথাগুলি কোনোদিন বলা হয় নাই। সবসময় ভাবতাম কোনো একসময় বলব যে আমি কত মুগ্ধ ছিলাম আপনার ডিলিংস দেখে, গান শুনে এবং বাজানো দেখে। আপনি যে হঠাৎ করে কাউকে কিছু না জানিয়ে কোনো-এক ছায়াপথে রওনা দিয়ে দিবেন তা আমি কেন বাংলাদেশের কেউ ভাবে নাই।

***
সবসময় আমরা ভাবি “পরে একদিন জানিয়ে দিব”। এই পরে আর কোনোদিন আসে না জীবনে। যা জানানোর আজই জানিয়ে দিন, কাল হয় আমি বা আপনিও ছায়াপথ প্রদক্ষিণে রওনা দিয়ে দিতে পারি।

***
ভালো থাকবেন ডিয়ার বাচ্চুভাই (Ayub Bacchu), আপনার জন্য বাংলাদেশের সবাই প্রাণ ভরে দোয়া করে প্রতিদিন। আপনাকে যদি জানাতে পারতাম যে “সব প্রস্থানই মন থেকে হারিয়ে যাওয়া নয়, কিছু প্রস্থান মনের ভিতর চিরস্থায়ী বসতি গড়া”, তাহলে খুব ভালো হতো।


আশিকুজ্জামান টুলু। সিঙ্গার, স্যংরাইটার, কম্পোজার, রেকর্ডপ্রোডিউসার।

গত শতকের আশি-নব্বইয়ের দশকে ব্যান্ডসংগীতের তুমুল সৃজনমুখর দিনগুলায় যে-কয়জন কমপ্লিট মিউজিশিয়্যান বাংলাদেশ পেয়েছে, আশিকুজ্জামান টুলু অঙ্গুলিমেয় সেই কয়েকজনের একজন। এবং অগ্রগণ্য। যেমন আইয়ুব বাচ্চু (Ayub Bacchu)। উভয়েই শীর্ষগণ্য। তাদের সৃষ্ট সংগীতের গুণে, মানে এবং পরিমাণেও অগ্রগণ্য তারা। আশিকুজ্জামান টুলু হঠাৎ করেই অন্তরালে চলে যান তার মিউজিশিয়্যানক্যারিয়ারের তুঙ্গ অবস্থায় থাকাকালেই। জীবনবাস্তবতা, বাংলাদেশে, এমনই। জীবিকা আর জৈবনিক অন্যান্য জটিলতায় দেশের শ্রেষ্ঠতর সৃজনকুশলীরাও অকালে ছিটকে পড়েন দিগ্বিদিক। বর্তমানে ক্যানাডাবাসী টুলু সংগীতে একটু-একটু করে ফিরছেন বলেই আন্দাজ করা যায় তার ফেসবুকপেজ ফলো করলে। মেইনস্ট্রিম বাংলাদেশি মিউজিকে যদিও গরহাজির টুলু। যদিও বাংলাদেশে মেইনস্ট্রিম মিউজিক বিজনেস বলতে কিছু আছে কি না, আরেকটু স্পষ্ট গলায় আওয়াজটা তোলা যায় যে এখানে এখন মিউজিক জিনিশটাই মিসিং কি না, আরেক তর্ক এইটা।

আইয়ুব বাচ্চু প্রয়াণের একবছর পূর্ণ হবার দিনে এই লেখাটা আশিকুজ্জামান টুলু লিখেছিলেন তার ফেবুপাতায়। ট্রিবিউট জানিয়েছিলেন প্রয়াত সতীর্থকে। এবং আমরা জানতে পারছি মিউজিশিয়্যান বাচ্চু চরিত্রটির এক অনন্য অন্তরঙ্গ বৈশিষ্ট্য। ফলে লেখাটা গানপারে আর্কাইভড রাখবার জন্য টুলুর অনুমতি প্রার্থনা করে গেল অক্টোবর মাঝভাগ থেকে এই মধ্যডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষায় থেকেছি। রিসেন্টলি মিলেছে অনুমতি। এই লেখাটায় ক্যাপ্চার করা আছে বাংলাদেশের মিউজিকের দুই মেধাবীর মুখ। দুইজনের প্রতিই রইল গানপারের স্যালুট, টুপিখোলা। —   গানপার


… …

আশিকুজ্জামান টুলু

সিঙ্গার, স্যংরাইটার, কম্পোজার, রেকর্ডপ্রোডিউসার। বাংলাদেশি মিউজিশিয়্যান, বর্তমানে ক্যানাডায় সেটল্ড।
আশিকুজ্জামান টুলু

Latest posts by আশিকুজ্জামান টুলু (see all)

COMMENTS

error: