কবির সহোদরা

কবির সহোদরা

SHARE:

উইলিয়ম ওয়র্ডসওয়র্থের সহোদরা ডরোথিকে নামে চিনি সেই ছাত্রাবস্থা থেকে। ডরোথি ওয়র্ডসওয়র্থ। উইলিয়ম ওয়র্ডসওয়র্থের কবিতা ক্লাসপাঠ্য হিশেবে পড়ার সময় দুর্বলস্বাস্থ্য নিত্যিবছর-রোগে-ভোগা অসুখা ভাইয়ের সার্বক্ষণিক দেখাশোনার দায়িত্বরত ও চিরনির্ভর বন্ধু-সহচর ডরোথির নাম গুরুত্ব দিয়া উল্লেখ করা হয়েছিল পাঠবোধিনী বইয়ের ভূমিকা-মতন অংশে। ব্যাপার হলো, তখন তো নমঃনমঃ করে কোনোমতন কবিতাটায় একবার নজর বুলিয়েই দৌড়াতাম কবিজীবনী খুঁজতে। এবং তখন ছিল আমাদের সেই বয়স, যখন সম্ভব-অসম্ভব সব জায়গায় কেবল কাহিনি খুঁজে বেড়াতাম। এবং না-পেলে এমনকি কাহিনি একখানা বানায়ে নিতাম। তখন স্রষ্টা ছিলাম নিজেই আমরা কত কত কাহিনির! ছিলাম নটমন্দিরের কুশ ও লব একলা আমরা একেকজন। তখন ডাবল-পার্ট ছাড়া সিনেমা আমরা পাত্তাই দিতাম না। আমাদেরই জন্য তখন বলিউড-ঢালিউড জুড়ে কেবল দ্বৈত-চরিত্রের কাহিনিনির্ভর সিনেমা বানাতে বাধ্য হচ্ছিলেন ম্যুভিডিরেক্টররা। আর ট্রিপল-পার্ট সিনেমা খান-কতক হয়েছিল, তদ্দিনে আমাদের কাহিনিলিপ্সা খানিক ভাটার দিকে এসে গেছিল, পরে এই জিনিশটা আর কন্টিন্যু করে নাই।

কিন্তু, হোয়াটেভার, বলতে বসেছিলাম কবির সহোদরা নিয়ে এক-দুইটা কথা যা আমরা জানি। বিশেষ কিছুই তো জানাশোনা নাই, বিপুলা এই বিশ্বের, তিন-চারটে ফেইডেড চিঠির ব্রাউনিশ পাতার হায়ারোগ্লিফিক্যাল অক্ষর ছাড়া। তা, সেই সময়ে, সেই আমাদের কাহিনিক্ষ্যাপা বয়সে একটা অদ্ভুত গল্প পাই একজন কবি ও কবি-সহোদরার। কবিতার দিকে মন কোনোদিনই ছিল না, আজও নাই, কবিতা দেখলেই ভালুকজ্বরে বেহুঁশ হয়ে যেতাম তখন যেমন এখনও তথৈবচ। যোগ করার যা, তা হলো, আজকাল কাহিনিতেও মজে না মন। কাহিনিগন্ধ নাকে আসার সঙ্গে সঙ্গে হাই ওঠে ঘন ঘন, ঝিমুনি ও তন্দ্রাভাব তীব্রতর হয়, মনে কেবল হতে থাকে — ছেড়ে দাও হে কাহানি  উলাল্লা-উলাল্লা হে বিদ্যা বালান কেঁদে আমি কিছুদিন বাঁচি! কিন্তু ওয়র্ডসওয়র্থ ও তাঁর সহোদরার কাহিনি খুব অন্যরকম সুন্দর মনে হয়েছিল তখন। অদ্ভুতও। তখন তো কবিদের কবিতার চেয়ে প্যারাফ্রেজ আর ইন্টার্প্রিটেশন পড়ে কাজ চালিয়ে চলেছি, সিনেমা যত-না দেখছি তারচে বেশি সিনেব্লিৎস  পড়ছি, নায়ক ও নায়িকাদের রিউমারাস ফেয়ারি-টেইল অত্যন্ত মূল্যবান তখন আমাদের কাছে। এই বাবদে স্টক এত উপচে-পড়া পূর্ণ যে একজিন্দেগিতে কয়ে শেষ করা যাবে না।

আর কিটসের শিশিরের শব্দের মতো প্রণয়, শেলির ঝড়ো যৌবনমদমত্ত প্রেম, বায়রনের ডন-জুয়ানগিরি, অ্যান্ড্রু মার্বেল আর জন্ ডানের পত্নী ও প্রণয়িনী ইত্যাদি ঘটনায় জীবন আমাদের ঘনঘটাময়। সেইসময় এই ভাইবোনের সঙ্গে দেখা। তার আগে বলে রাখি যে শার্ল বোদলেয়্যর বা রাইনার মারিয়া রিল্কে বা মায়াকোভস্কি কিংবা পুশকিনের প্রণয়জীবনের সঙ্গে আমরা যুক্ত হব আরও কিছুকাল পরে, এই অধ্যায় ছিল না সিলেবাসে, এবং কবিতার পানেও চোখ রেখেছিলাম কিছুকাল যেমন বড় দীর্ঘকাল চোখ রেখেছিলাম বেদনার পানে। সেইসব অবান্তর গল্প, পরীক্ষাখাতায় লিখলে হেডস্যার মাইর দিবনে।

অ্যানিওয়ে, করছিলাম ভাইবোনের গল্প, ফেরাই দৃষ্টি মূল কথায়। বিয়ে-থা করেছিলেন ওয়র্ডসওয়র্থ, জনক হয়েছিলেন সন্তানের, বধুটিও ছিল পাশে শিশুটিও ছিল, তবু বোনের কাছেই ছিলেন তিনি ছেলেবেলারই ন্যায় ন্যাওটা, বোনই ছিলেন চিরনির্ভর তার। সবসময় ভাইকে আগলে রেখেছেন। বস্তুত, মনে হয়েছে আমার, শৈশবযাপন করে গেলেন ভগ্নস্বাস্থ্য নরম স্বরের কবিটি জীবনভর। এইরকম একজন কবির খবর জানি বাংলায়, এবং অসম্ভব নরম গলার সংহতবাক কবি তিনি, নির্মল হালদার। নির্মল অকৃতদার, ইন্ডিয়ান, বোনেদের সংসারে আদরে আদরে কাটালেন জীবন। আজও লিখছেন তিনি, লিখে চলেছেন, রচনায় সেই বোনেদের কথা বড় মমতায় নিয়া আসেন এবং পাঠক হিশেবে আমরাও আর্দ্র হয়ে উঠি পড়তে পড়তে সেই নির্মলকবিতাগুলো।

ডরোথি ছিলেন সর্বার্থেই ওয়র্ডসওয়র্থের কবিতার সহকারী। জীবনীকারদের কেউই এই দিকটি ইগ্নোর করেননি, ফলাও করে না-বললেও উল্লেখ করেছেন। ডরোথি দিনলিপি লিখতেন রেগ্যুলার। ভাই যত জায়গায় অবকাশ কাটাতে  যেতেন, ডরোথি থাকতেন সঙ্গে। একটা ডায়রি, ডরোথির, আমার মতো অল্পজ্ঞাত আনপড়েরও পড়া হয়েছে। নর্টন অ্যান্থোলোজিতে পেয়েছিলাম সেই বিউটিফ্যুল রচনার নির্বাচিত অংশ, খণ্ডাংশ হলেও যথেষ্ট বড় ও বিস্তারিত। রচনার নাম The Grasmere Journal, ডায়রির এন্ট্রিগুলো সব ওয়র্ডসওয়র্থের দিনযাপনের নিত্য খুঁটিনাটি, ঝিলিক দিয়ে উঠেছে এরই মাঝে ফাঁকেফোকরে ডরোথির প্রকৃতিবীক্ষণ ও সৌন্দর্যবোধগভীরতা।

‘গ্রসমিয়্যর জর্নাল’ হলো ওয়র্ডসওয়র্থ ও ডরোথি ভাইবোনের লেইক ডিস্ট্রিক্ট অঞ্চলে দীর্ঘ অবকাশকালীন প্রতিদিনের অপরাহ্নহণ্টন, কবির স্বাস্থ্যপুনরুদ্ধার-অন্তর্বর্তী বিভিন্ন জটিলতা ও আততি, নিত্য বনভ্রমণের সময় দেখা ঘাসফুল-লতাগুল্মের জলছবি, কবিবন্ধুদের আগমন ও খবরাখবর যেখানে অনেকেই আমাদের পরিচিত যথা কোলরিজ বা ওয়াল্টার স্কট প্রমুখ, সর্বোপরি ভাইয়ের জন্য বোনের অপত্য স্নেহ ও গভীর-গভীরতর মমতা। আর পড়তে যেয়ে কোথাও কোথাও ভাইয়ের কিছু স্বার্থপরতার ব্যাপারের ইঙ্গিতও চোখে পড়েছে, যদ্দুর মনে পড়ে তেরোবছর আগকার পাঠাভিজ্ঞতা থেকে, এবং কবির বন্ধুদের চেহারাগুলো অন্য অন্তরঙ্গতায় এক-দুইবাক্যে এঁকেছেন ডরোথি যা ওই কবিদের জীবনীতে পাওয়া যাবে না।

যা-হোক, খুব সুখদ আর আটপৌরে ইংরেজি, মনে হবে আপনার পড়তে পড়তে, এবং একই সঙ্গে এত নরম ছায়াময়! নিজে টুকটাক লিখতেন কবিতা, অ্যামেচারিস্ট, প্রচুর লিখতেন চিঠি ও ডায়রিভুক্তি। কিন্তু চাইলে যে লিখতে পারতেন কবিতা-গল্প-প্রবন্ধ-উপন্যাস ফর্ম্যাটে ফেলে তথাকথিত সাহিত্যাশ্রিত রচনাপত্র, মনে হয়েছে আমার, যে-কোনো দুর্মুখ পাঠকেরও তা-ই মনে হবে বলে আমার অনুমান। ডরোথির এই জর্নালে এই আলোকের ইশারা চাপাভাবে হলেও লভ্য। ভাইয়ের লেখার মঙ্গলার্থে তিনি নিজের ক্ষীণ লেখকবাসনা চাপা দিয়ে রেখেছেন চিরদিন। এমন ঘটনা অবশ্য নতুন নয়, পৃথিবীতে লেখকশিল্পীদের স্বজন অনেক নারী আমাদের জানামতে এইরকম করেছেন তাদের আপনজন লেখকের মুখ চেয়ে। যে-ব্যাপারটা আমাকে এত অবাক করেছে, সেইটা হলো, ওয়র্ডসওয়র্থ একবারও বোনকে লেখকবাসনার দিকে আকারে-ইঙ্গিতেও পুশ করেছেন বলে কোথাও নজির মেলে না।

বিয়ে-থা করেননি ডরোথি। যা-হোক। ভাই যখন বিয়ে করছেন, ম্যারি হ্যাচিন্সনকে, বোনের তখন একত্রিশ; এবং মনে করছেন তিনি বিয়ে করার পক্ষে ঢের পরিত্যক্ত ও অবাঞ্চিত বয়স হয়ে গিয়েছে; থেকে গেলেন ফলে ভাই ও ভ্রাতৃবধুর সঙ্গে, তাদেরই সংসারে, চিরদিনই। বিরাশি-তিরাশি বছর বেঁচেছিলেন। বলেছি আগেই, কবি নির্ভর করতেন বোনের ওপর, বোন সহকারিতা দিয়ে গেছেন ভাইকে, ভাইয়ের লেখকসত্তাকে, সেইটা যে কেমন নির্ভরতা আর কেমন সহকারিতা, তার নজির টের পেতে আগ্রহী যে-কেউ উঁকি দিয়ে দেখতে পারেন ডরোথির জর্নালগুলোতে। একটামাত্র পড়েছি আমি, নির্বাচিত খণ্ডাংশ, তাতেই ভীষণ চমকে গেছি। একটা উদাহরণ রেখে যাই এখানে। ‘ড্যাফোডিল’ আর ‘টিন্টার্ন অ্যাবি’ কবির বহুলভাবে পঠিত দুই কবিতা। এই কবিতাগুলোতে যে-বর্ণনা, কাব্যকৌশলের যে-ভঙ্গি, কিছু তুলনা আর উপমার মুখচোখ অবিকল মিলে যায় এই গ্রসমিয়্যর জর্নালের কিছু ভুক্তির বৈকালিক ভ্রমণের থেকে তুলে-আনা কিছু বর্ণনার সঙ্গে। এবং কবি লিখেছেন কবিতাদ্বয়, এইটা ফ্যাক্ট, ডায়রির দুই থেকে পাঁচ বছর পর!

হতেই পারে, এবং এইরকম প্রচুর হয়েছে কবির রচনাজীবনে, এইটা তাঁর বায়োগ্র্যাফাররা জানাচ্ছেন, বোনের দিনলিপির নির্ভরতা তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন। ব্যাপারটা অনেকটা ওইরকম যে, বেচারি ডরোথি যেন কবির সাঁটলিপিকার! কবি যখনই যেখানে গিয়েছেন, বোনকে সঙ্গে নিয়েছেন, টুকিটাকি দৃশ্য-অনুকথাগুলো নোট রাখার জন্য বোনকে অনুরোধ করেছেন। তবু একটাবারের জন্যও বোনের লেখকসত্তার দিকে ফিরিয়া তাকান নাই বিশ্বনামজাদা আমাদের কবিটি। ইট’স্ ওকে, অল ইজ ওয়েল, গ্যুড ফাইন ওয়ান্ডার্ফ্যুল! সাব্বাশ! এইধারা সাব্বাশি আমার-আপনার ও আমাদের অনেকেরই পাওনা কি না, ভাববেন একটাবার। আর ছোটমুখে বড়কথা বলে ফেললাম বলে গোস্তাকি মাফ করবেন।

ডরোথি ওয়র্ডসওয়র্থের ‘গ্রসমিয়্যর জর্নাল’ পুরাটাই পিডিএফ পাওয়া যায়। একটু খুঁজলে পাওয়া যায় না এমন কিছুই তো দুনিয়ায় নাই আজ আর। শুধু খুঁজে দেখবার নিয়তে একটি ক্লিকের অপেক্ষা।

জাহেদ আহমদ (২০১৩)

… …

COMMENTS

error: