ইম্যাজিনিং আর্জেন্টিনা, ইম্যাজিনিং বাংলাদেশ

ইম্যাজিনিং আর্জেন্টিনা, ইম্যাজিনিং বাংলাদেশ

SHARE:

গুম শব্দটার সঙ্গে কি আমরা কানপরিচিত আছি? আমরা, মানে বাংলাদেশিয়ারা, ব্যাপারটা কি ভিশ্যুয়ালাইজ করতে পারব গুমের ভিক্টিম একটা পরিবারে কেমন সদমা যায়? ডিস্যাপিয়ারিঙের কন্সিক্যুয়েন্সেস সম্পর্কে আমরা আন্দাজ করতে পারব? গুম তো হয় একজন, দুঃস্বপ্নে মূক হয়ে যায় একটা আস্ত মহল্লা থেকে একটা আস্ত জনপদ, প্রতিবন্ধী হয় সেই শিকারের পুরো পরিবার, মানসিকভাবে বিকলাঙ্গই হয়ে পড়ে গোটা জাতি গোটা কান্ট্রি। ফিয়ার স্প্রেড করে দ্রুত, ভয়ের একটা কালচার ডেভেল্যপ করে এবং এই কালচারের কান্ধে সওয়ার হয়ে শাসনযন্ত্র স্মুদ তবিয়তে রয়। শাসকের তক্লিফ লাঘবে এই-রকম গুম ও অন্যান্য দৈত্যদানো প্রভূত কন্ট্রিবিউট করিয়া থাকে। এইসব তো আমাদের জানবার কথা না, আমরা ভালো ও চমৎকার আছি দীর্ঘ দশক ধরিয়া, আরামে দাঁড়ায়া আছি দুইপা ফাঁক করে।

যে-কথা বলছিলাম, গুমের কারবার তো বাংলাদেশে নাই, ঠিক আছে মানছি যে গুম গণপ্রজারা আস্বাদ করে নাই, জিন্দেগিতেও গুম আমরা চাখা তো দূর-কা-বাৎ নয়নে হেরি নাই, নিরাপত্তায় আছে বেবাকে বেডরুমে, ডেমোক্রেসি বিরাজিছে বেহদ ঘাসে ঘাসে ঘরে ও সদরে। আমাদের ধান আছে, ধন আছে, বেশ দারুণ পুষ্পও আছে এই দ্বিজেন্দ্রবসুন্ধরায়। আফসোস শুধু এইটাই যে আমাদের সিনেমাটা নাই। ভীষণ সুজলা-সুফলা বাংলাদেশটা ছায়াছবিতে ক্যাপ্চার করবে এমন নির্মাতা আমরা পাচ্ছি-পাচ্ছি করেও পাচ্ছি না। অ্যাডমেইকারের দেশে সেই সিনেমানির্মাতা কবে হবে যে খালি টিভিট্যকশোতে ভ্যা ভ্যা না করে একটা ভালো ম্যুভিথিয়েটার বানাবে যেখানে এই সিচ্যুয়েশন সোনার সেলুলয়েডে এঁটে তুলবে? যে-দেশে গুম নাই, ঘুমনিদ্রা নাই যে-দেশে, বিপুলা শান্তিসুখের এই বাংলাটা ছায়াছবিতে তুলে আনবে বাপের সেই দুর্দান্ত ব্যাটাটা কই?

ডিস্যাপিয়ারিং বা গুম ব্যাপারটা আমরা পাই বিদেশের সিনেমায়। দেশে একে তো গুম নাই, রাষ্ট্রীয় খুন নাই, বিচারবহির্ভূত প্রশাসনিক ষণ্ডামি নাই, সিনেমায় এইসব আশা করব না কাজেই। সিনেমাই তো নাই দেশে, এত কথা কেন তবে? এত ট্যকশো ফটরফটর কেন? গণমাধ্যম নামধেয় সংবাদপত্রে টেলিভিশনচ্যানেলে এত অবাধ স্বাধীনতা কেন? যদি সিনেমা না থাকে দেশের, যদি শিল্পসাহিত্য হয় স্ট্যাটাস দেয়া খালি মিনিটে মিনিটে ফেসবুকে, একটা জাতির সৃজনশীলতা মানেই যদি হয় দেদার কাব্যি করা আর ঈদসাংখ্যিক উপন্যাস প্রসব, তবে কেমন করে ইম্যাজিন করবে লোকে দেশের ফিউচার? আমাদের যা-কিছু সবই দেখা হয়ে গেছে পাস্টে, এখন হতেছে যা-কিছু সমস্তই কেউ অতীতে দেখেছিল স্বপ্ন বা দর্শন আকারে, এখন চলছে সেইসবের বাস্তবায়ন। দুনিয়ায় এই একটা পাস্ট টেন্সের ন্যাশনস্টেইট আমাদের।

ফ্যুটবলবিশ্বকাপের মাসে একটা ছায়াছবি দেখতে দেখতে এইসব কথাবার্তা মাথায় আসছিল আর যাচ্ছিল। ছবিটার নাম ‘ইম্যাজিনিং আর্জেন্টিনা’। মিড-সেভেন্টিসের দিকে দেশটায় একটা রাষ্ট্রীয় গুমখুনের দক্ষযজ্ঞ চলেছিল, ওই জিনিশটাই সিনেমায় পোর্ট্রে করা হয়েছে। এমনিতে মেইকিঙের দিক থেকে এইটা ভালো ভোট পাবে না হার্ডকোর ম্যুভিভিয়্যুয়ারের, বরঞ্চ ভজকট পাকিয়ে ফেলা হয়েছে এমন জায়গাই হিসাবকিতাবে বেরিয়ে আসবে বেশি। কিন্তু গুমের ভয়াল টেনশনটা ট্র্যান্সমিট করতে পেরেছেন নির্মাতা, যার ফলে দেখতে পারা গেছে শেষ-পর্যন্ত।

Imagining Argentinaবইয়ের কাহিনিটা খারাপ ছিল না। আসলেই সিনেমাটা আর্জেন্টাইন একটা নভেলের অ্যাডাপ্টেশন। বক্তব্য অনেকটা এই-রকম যে, একটা দানব একনায়কতন্ত্র সবকিছুই ধ্বংস করে ফেলতে পারে কেবল মানুষের কল্পনাটা ধ্বংস করতে পারে না। কাহিনিটা যেভাবে টানা হয় সিনেমায়, সেই ভাবটা গাঁজাখুরি বিভ্রমে ভরা। নায়ক একজন থিয়েটারশিল্পী, যিনি শিশুদের জন্য মঞ্চে নাটক ডিরেকশন দেন এবং স্ক্রিপ্ট লেখেন। কল্পনা আছে তার, সৃজনশীল মানুষ তিনি। গিটার বাজাইয়া সুরও অ্যারেইঞ্জ করেন দেখা গেল। বউ আছে, যে কি-না সাংবাদিক। মেয়ে একটা আছে কিশোরী বয়সের। বউয়ের রাজনীতিচতন্য অনেক সক্রিয়, নাট্যকার স্বামী নির্বিরোধে একটু সৃজনশীলই রইতে চান বোঝা যায় সিনেমার শুরুতে। কিন্তু বউয়ের কারণে বেহুদা বাংলাদেশী সৃজনশীলের সুখটা নায়ক ভোগ করতে পারে না বেশিদিন। অচিরে মেয়ের স্কুলে এবং অন্যান্য সর্বত্র গুমের চোরাগোপ্তা ঘটনায় নায়িকা আর্টিকেল লিখে ফেলে একটা পেপারে এবং যা হবার তা-ই হয়। গুম হয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বামী পিটিশন করেন উদ্ধারের, কিন্তু সবাই বিষয়টা দেখছি-দেখব করে। এইভাবে একদম সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানও দেখানো হয়। নির্বিকার। বিচার বিভাগ, শাসন বিভাগ, সকলেই নির্বিকার। রাস্তায় চুপচাপ প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়া মানুষ হাঁটে তাদের নিখোঁজ স্বজনের ফিরিয়া পাবার আর্তি নিয়ে। কে কারে ফেরায়।

এরই এক পর্যায়ে নাট্যকার নায়ক নিজের ভিতরে একটা আজগুবি বা দৈব শক্তি টের পান। যে-কোনো গুমের শিকার পরিবারের সদস্যকে ছুঁয়ে নায়ক বলে দিতে পারে সেই ভিক্টিম বেচারা বাঁচিয়া আছে না মরে গেছে, কোথায় আছে কেমন আছে ইত্যাদি। ঠিক যেন আমাদের দেশের পিরদের ব্যাপার। পিরদের যেমন হয়, আমাদের নায়কেরও পসার হয়। পিরেরা হাদিয়া নেন, আর্জেন্টিনার পির হাদিয়া নেন না। তিনি তার স্ত্রীকে খোঁজেন এবং মানুষের একটু সহায়তা করা যায় কি না তালে থাকেন। উনার স্ত্রী নিয়মিত বলাৎকারের শিকার হচ্ছেন রাষ্ট্রীয় সুশীল নিপীড়নের ক্যাম্পে, এক-পর্যায়ে কিশোরী আত্মজাকেও ধরে নিয়া যাওয়া হয় সেখানে এবং তখন আমাদের ‘টু উয়োমেন’ ম্যুভিটার স্মৃতি ইয়াদ হয়। এই দৃশ্যগুলো ম্যুভিতে দেখানো হয় খুবই শ্লীল অথচ অতিশয়দৃশ্যহীন অভিনয় দিয়ে; এমা থম্পসন অভিনয় করেছেন স্প্যানিশ অ্যাক্সেন্টে ইংলিশ-বলা নায়িকার চরিত্রে, আন্তোনিয়ো ব্যান্দেরাস নায়ক। এমার অভিনয় বিউটিফ্যুলি টাচি, ব্যান্দেরাস মানানসই অভিনয় করলেও অত স্মরণীয় অভিনয় করতে পেরেছেন বলা যাচ্ছে না।

Imagining Argentinaযা-হোক, ফাইন্যালি সিনেমায় কি হলো বলতে গেলে এর সম্ভাব্য দর্শক সিনেমাদেখার রহস্যটা হারাবেন। বলি যে, এই সিনেমা, বা এই ধরনের রাষ্ট্রীয় অত্যাচার-অনাচার নির্ভর করিয়া বানানো মোশন-পিকচারগুলো, বাংলাদেশের সিনেমায় দিন ফিরাইতে চাওয়া অ্যাডবণিক দেখলে ঢালিউডের কি ফায়দা হবে না-হবে জানি না, কোমলমতি সিনেমাপ্যাশনেইট কমন দর্শকেরা দেখলে একটা মার্জিন প্রোফিট মিলতেও পারে ইন রিমোট ফিউচার। ভিশন টোয়েন্টিফোর্টির ইমপ্লিমেন্টেশন সাঙ্গ হলে পরে ম্যে বি সিনেমাবাংলায় এক-দুইটা বাংলাদেশ বানানো হবে, যে-সিনেমাকাহিনিগুলো দেখতে দেখতে ডেমোক্রেসিবিপন্ন বদ্বীপের আমরা চারণ করব পুরানা রাত্রিদিনের শ্বাসরুদ্ধ গুমখুননিপীড়ন-অস্বীকার-করা রাষ্ট্রীয় জবানে ‘এক/দুই বিচ্ছিন্ন ঘটনা’-র বাংলাদেশস্মৃতি, কিছুটা বাংলাদেশ ভিশ্যুয়ালাইজ করতে পারব ভবিষ্যতের।

ম্যুভিটা দেখতে দেখতে একটা ব্যাপার মনে হচ্ছিল, উপন্যাসে যে-টেক্নিক শিল্পকৌশলের বিবেচনায় টেরিফিক, ফিল্মে সেই টেক্নিকটাই ভীষণ বদখত। যে-নাট্যকারকে কেন্দ্রীয় ক্যারেক্টারে রেখে এই সিনেমার কাহিনি আবর্তিত হয়েছে, সেই নাট্যকারের ভবিষ্যদ্রষ্টা বা প্রায় জ্যোতিষী কিসিমের অ্যাকশন-রিফ্লেকশন দেখে ম্যুভিটারে বিতিকিচ্ছি মনে হলেও উপন্যাসে এই ফিউচারদ্রষ্টার বর্ণনাটা আলবৎ নন্দনীয় হয়েছে এইটা আন্দাজ করতে পারি। কিন্তু উপন্যাসটা তো পড়ি নাই, পড়ব কি, চোখেও দেখি নাই।

‘ইম্যাজিনিং আর্জেন্টিনা’ (Imagining Argentina) বানিয়েছেন যিনি, নাম তার ক্রিস্টোফার হ্যাম্পটন। ম্যুভিডিরেকশন দিয়েছেন এবং ম্যুভিচিত্রনাট্য রচেছেন হ্যাম্পটন নিজে। যে-উপন্যাস অবলম্বনে ম্যুভিস্ক্রিপ্টটা, সেই উপন্যাস লিখেছেন ল্যরেন্স থর্নটন।

কেমন আছে আপনার প্রিয় আপনার প্রেমিকা বাংলাদেশ, কাউরে জিগাইবেন না, সিনেমায় এক্সপেক্ট করবেন না মরে গেলেও, শুধু অস্বস্তিটা মাঝেমধ্যে শেয়ার করবেন কেউ-পুঁছে-না এমন কোনো গণমাধ্যমে অসংহত তুচ্ছকায় নিবন্ধে। সুখে থাকতে ভূতে কিলায়, তা যা-ই বলুক লোকে, “মানুষ বড় ভয় পেয়েছে / মানুষ বড় নিঃসহায়” গানটা মাঝেমধ্যে একলা গাঙের ঘাটে গাইবেন, যেন না-শোনে গুমত্রস্ত দোয়েল কিংবা কাকপক্ষীটিও। ‘ইম্যাজিনিং আর্জেন্টিনা’ দেখতে দেখতে ইম্যাজিনিং বাংলাদেশ, সন্তর্পণে, সকল দেশের রানী তিনি, দেশে-দেশে পুরস্কৃত, এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকি মিয়া তুমি?

Movie Title: Imagining Argentina ।। Directed & written by Christopher Hampton, based on the novel by Lawrence Thornton ।। Starring by Antonio Banderas, Emma Thompson, Ruben Blades, Maria Canals, Leticia Dolera, Kuno Becker, John Wood,  Claire Bloom ।। Released in 2003 ।। Run-time 107 mins.

রিভিয়্যুড বাই  মিল্টন মৃধা

… …

মিল্টন মৃধা

অবদায়ক, গানপার 

Latest posts by মিল্টন মৃধা (see all)

পরের পোষ্ট
আগের পোষ্ট

COMMENTS

error: