আকাশী, প্রিয়, জীবনে শেষবার || জাহেদ আহমদ

আকাশী, প্রিয়, জীবনে শেষবার || জাহেদ আহমদ

গতকাল ঠিক দুপুরে, প্রিয় আকাশী, সেই কবেকার কোনো গতকালনির্দেশিত দুপুরের অনাদি-অনন্ত উঠোনে, দুঃসাধ্য-অগম্য যোগাযোগের সেই যুগে, সেই চিঠিচালাচালির যোগাযোগহীন অন্ধকারাচ্ছন্ন মনতোলপাড় শতাব্দে, সেই ইমেইল-ফেসবুক-ট্যুইটারহীন অসহ নৈসঙ্গের দীর্ণ দশকে, সেই মিউজিক্যাল খুন ও পসিনার দিনে, একটা গানচিঠি দিয়েছিলে, প্রেরণ করেছিলে সেই বিপুলা সাংগীতিক উড়োনৌকোটিরে, সেই তরণী-বাওয়া ভুলি নাই প্রিয় ভুলি নাই, তোমার প্রিয় কবি —

Under the wide and starry sky
Dig the grave and let me lie.
Glad did I live and gladly die,
And I laid me down with a will.

গিয়েছে পেছনে এক আস্ত সহস্রক, শতক গিয়েছে, গেছে চলে দশকের পর দশক, বুঝি ফিরে এল অন্তিম স্তবকটা আবৃত্তির ক্ষণ এইবেলা? আজকের হেন ধুন্দুমার মরমী মিউজিকের মজমায়, হেন কোকস্টুডিয়োপনায়, এই মিষ্টি মিষ্টি বিনোদনসুরচর্যায়, সেই দোলা কই, নিখিল-উথালপাথাল সেই উদ্দামতা, আর সেই নিশিঘোর অরণ্যস্বনন ও সমুদ্রস্থৈর্য, কই? মিষ্টি মিষ্টি মিস্টিক মিউজিক, জলের গানের মিষ্টি মিষ্টি দুষ্টুমি-নাটামি, চিরকুটের এই চিরিপচিরিপ চড়ুইপনায়, এই স্ট্রিং আর নুরিদের সুন্দর-সুন্দর ফোকফিউশনপনায়, এল বুঝি বিদায়বিদীর্ণ টোম্বস্টোন স্থাপিবার দিন?

This be the verse you ’grave for me;
“Here he lies where he longed to be,
Home is the sailor, home from sea,
And the hunter home from the hill.”

রেক্যুয়েম  শীর্ষক কবিতাটার রচক রবার্ট ল্যুই স্টিভেন্সন। পয়লাবার এই কবিতাটা বাংলা গানবাহিত হয়ে কানে এসেছিল। মরমেও পশেছিল। সম্প্রতি মিউজিক নিয়া কামনাবাসনারত উদ্দাম যুবা, ভাবো! কোকস্টুডিয়োর সঙ্গে পাল্লা দিয়া খালি মিষ্টি মিষ্টি মিঠাইমণ্ডা বানাইবা, খালি এলইডি স্ক্রিনের ন্যায় ঝকমকা পারিবারিক সুর ফুৎকারিবা, নাকি বিভীষিকাবাহক সংগীতের স্রষ্টা হবা, ভাবো! ডু সামথিং, ড্যুডস্! দিতেই যদি হয়, আউলাইয়া দে। অথবা থাক। গেট অ্যা ডিপ ডেকাডেন্ট স্লিপ। অন্ধকারের গভীর সারাৎসার বুঝিয়া নাও। যে-আঁধার আলোর অধিক, বুদ্ধদেবদ্বিজে ভক্তির আবহমান যে-একটা ন্যাকা ভদ্দরনোকঝোঁকা বাংলা কবিতা, আলোকায়নের বড়াইদীপ্ত বঙ্গীয় বুদ্ধিজীবিতা, পারলে সেই তিতপুরানা বাসি বৃথা আধুনিকতার খ্যাতা পোড়াও।

রক যদি হয় যেন তোমারই রক হয়। গ্র্যাঞ্জ যদি হয় যেন তোমারই গ্র্যাঞ্জ হয়। মেটাল হলে যেন তোমার মেটালটা হয়েছে বলিয়াই চিনতে পারি আমি। সাইকেডেলিয়ায় যেন তোমার চোয়ালধসানো অবয়বটাকে দেখতে পাই স্ট্রিটপোস্টের নৈশ আলোয় অবসন্ন একাকী শিব। হুদাই বিশুদ্ধ রকের পিছে হেঁদিয়ে মরছ। সংগীতের শুদ্ধতা, কাঁঠালের আমসত্ব আর কচুপাতার বার্গার ইত্যাদি জিনিশের কনজ্যুমার বাংলাদেশের চারদশকদীর্ঘ লড়াইঋদ্ধ ব্যান্ডমিউজিক ম্যুভমেন্টের পরে এখনও রয়েছে দেখে বেদনায় বিস্ময়ে বোবা হয়ে গেছে দ্যাখো ভুবনবিন্ধ্যাচল। হুঁশ-ম্যে আও, সুরঞ্জন, ওই দ্যাখো গ্রহান্তরের গ্যাসস্টেশনে বসে ভাঙাগিটারে গীত বাঁধছে এক এক্সট্রা-টেরেস্ট্রিয়্যাল অতিজীবিত! ভরায়ে তুলিছে সে একাগ্র অন্যমনে বেদনাবোধলুপ্ত অতিপৃথিবীর রাতদুপুরগুলো।

দুপুরবেলাগুলোয়, সেই আমাদের আকুলপরান একাকী দিনের দুপুরবেলাগুলোয়, — ডিনামাইট দিয়ে ধূলিবৎ উড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করত যেই দুঃসহ শরীরী দুপুরবেলাগুলোকে, — সেই দুপুরবেলাগুলোর মতোই ছমছমে গলায় একদিন একটা গান বেজে উঠেছিল, কোকস্টুডিয়োমধুর বর্তমান ছন্দোবিধুর তাল-লয়মেদুর দুনিয়া ভাবতেও পারবে না সেই দুপুরের দানবিকতা, বেজে উঠেছিল উন্মাতাল আমাদেরই কুত্তাপাগল থমথমানো গোটা অস্তিত্ব, এইভাবে, এই নিম্নলিখিত উপায়ে —

প্রিয় আকাশী, / গতকাল ঠিক দুপুরে তোমার চিঠি পেয়েছি / ঠিকানা লেখোনি, ঠিকানা পেলে কোথায় তা লেখোনি / ঠিকানা পেলে কোথায় লেখোনি

শিবলী আর জেমস — লতিফুল ইসলাম শিবলী আর ফারুক মাহফুজ আনাম জেমস — দুই কবি মিলে এই জিনিশ এনেছিল ধরণীতে। তোমার জন্য, প্রিয়তমা, চিরতরে। এরপরে এসেছিল দমকে-দমকে একেক অভাবিত অতিকায়তা —

সুদীর্ঘ প্রবাসের অর্ধেকটা কাটিয়েছি বোহেমিয়ানদের মতো ঘুরে ঘুরে /  মাদ্রিদ থেকে হ্যামবুর্গ; নিউক্যাসল্ নেপোলি থেকে প্রাগ বুখারেস্ট মেসিডোনিয়া;

তারপর? তারপর? শোনো গো দখিনা হাওয়া, তারপরেতে ছিল এই বিতিকিচ্ছিরিধারা —

ফ্রাঙ্কফুর্টের বইমেলায় নতুন বইয়ের গন্ধে / মনে পড়েছে তোমায় / ফ্লোরেন্সে সিস্টাইন চ্যাপেলে / মিকেলাঞ্জেলোর মহান সৃষ্টি পিয়েতার সামনে দাঁড়িয়ে / তোমাকে মনে পড়েছে / অ্যাথেন্সের  কফিশপে (প্রিয় আকাশী) জমজমাট কবিতাপাঠের আসরে, / ভিয়েনার তারাজ্বলা  রাত্রির আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে পড়েছে / তোমার প্রিয় কবি — Under the  wide and starry sky / Dig the grave and let me lie / Glad did I live and  gladly die / And I laid me down with a will…

তারপরের স্ট্যাঞ্জায় যেয়ে, হে ম্যেরে হামসফর, একযারা ইন্তিজার করে দ্যাখো, পরপর কী আসছে ধেয়ে বাংলা গানভুবনে উপর্যুপরি এই লোকটার গলার রগ ভর করে —

প্যারিসের কন্স্যার্টে যতবার মোৎসার্ট কিংবা বিতোভেন শুনেছি / ততবারই কেন যেন চিরদুখী পাগল ভ্যানগগকে মনে পড়েছে / তোমার প্রিয় গায়ক জিম মরিসনের শেষ দিনগুলো কেটেছে এই প্যারিসে…

এবং, তরুণ তুর্কি, হে আমার শিবরাত্রির সলতে, হে আঁধারমানিক আমার, হে বাংলাকাব্যের কমান্দান্তে, এইবার শোনো তোমার পূর্বজের প্রেম। ছোট্ট করে এই কথাগুলো, টুক করে এই কথাগুলো, শুনায়ে যাই আরেকবার, জীবন যখন শুকায়ে যায় নিন্দা আর স্তুতির ধূমল তর্কাতর্কে, শেষবারের মতো প্রতিবার এই জীবনে এসে এই নিম্নলিখিত শুভেচ্ছারাশি রেখে যাব তোমার শিয়রে, হে অন্যের-বালিশের-পাশে-ঘুমন্ত সিন্ডারেলা আমার! নিম্নলিখিত কথাগুলো, মেহেরজান, পুনরায়, তোমার লাগিয়া —

বাইজেন্টাইন সম্রাজ্ঞীর মতো তোমাকে ঘিরে থাক পৃথিবীর সমস্ত সুখ / তুমি অনিন্দ্য সুন্দরী হয়ে ওঠো, সুন্দর / তুমি ভালো থেকো / ভালো থেকো / আকাশী, প্রিয় আকাশী / তুমি ভালো থেকো, প্রিয় আকাশী…

বিদায় দ্যাও মোরে, দ্যাশান্তরে যাই, নিদেন প্যারাগ্রাফান্তরে … এই নিবন্ধের বাইরে বেরিয়ে যেয়ে একবার, একটামাত্রবার, মৃত্যুর আগে এই শেষবার কিংবা জীবনে এই প্রথম যেনবা, গাই : “প্রিয় …

… …

COMMENTS

error: