জয়ধরখালী ৬ || শেখ লুৎফর

জয়ধরখালী ৬ || শেখ লুৎফর

জয়ধরখালী গ্রামটা রূপসী নারীর শাড়ির আঁচলের মতো একচিলতে সবুজ। ছোট্ট এই গ্রামে কোনো পাগল নাই। তবু উত্তর দিক থেকে উড়ুন্টি বাতাসের বেগে হঠাৎ হঠাৎ একটা পাগল এসে উদয় হয়। লকলকে বাঁশের মতো লম্বা কিচকিচা কালো পাগলের শরীরটাতে একটা সুতার দসিও থাকে না। তার কোমরের নিচ থেকে সবটা পাৎলা হাগুতে সয়লাব। গুয়ের গন্ধ শুঁকে শুঁকে পাগলের পেছনে একঝাঁক মাছি ভনভন করে উড়ে আসছে। টাট্টুর মতো বিশাল লিঙ্গটা দৌড়ের তালে তালে লচৎফচৎ করে তার দুই উরুতে বারি মারছে। সে এই-বাড়ির পুকুরপাড় দিয়ে সেই-বাড়ির সামনের খলা দিয়ে ছুটছে। মাঝে মাঝে দৌড়ের মধ্যেই ছেড়-ছেড় করে হাগছে। তার বেশ পিছনে একদঙ্গল শিশুকিশোর। পাগলের গুয়ের গন্ধে আস্তা দেশ উজাড়। তাই সকলের হাত নাকে। দৌড়াতে দৌড়াতে পাগল তার লিকলিকে লম্বা হাত দুটো বুকের কাছ থেকে দুইদিকে ছিটানি মারতে মারতে চিৎকার দিয়ে বলছে, লাডুক কদররসুল, লাডুক কদররসুল…।

লাডুক কদররসুল এর মর্ম কী — কেউ জানে না। কিন্তু কদররসুল শব্দটা তাদেরকে ভড়কে দেয়। রসুল! রসুলউল্লাহ! মানে নবিকরিম হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম! তারচে আরো বেশি ভীতিকর ঘটনা হলো, এই শব্দটা শোনার সাথে সাথে গোয়ালঘরে কিংবা খলায় বাঁধা গরুগুলো চমকে গিয়ে জাবনার চাড়ি থেকে মুখ তোলে। চোখে উদভ্রান্ত দৃষ্টি। ভয়ে শরীরের লোমগুলো একপলকে দাঁড়িয়ে গেছে। তারা সতর্ক কান দুটো আকাশের দিকে খাড়া করে লেজটা পিঠে তুলেই দড়িতে জানপ্রাণে টান মারে। তারপর ভে…ভে করে ভয়ার্ত চিৎকার দিয়ে এক-লহমায় গরুগুলো হাওয়া হয়ে যায়। গ্রামের মানুষগুলো যে-যেখানে ছিল সেখানেই পাথরের মুর্তির মতো অবাক বিস্ময়ে দাঁড়িয়ে থাকে। হাঁস-মুর্গি-কবুতর সহ দুনিয়ার সকল প্রাণিরা যার যার প্রাণ হাতে পালিয়েছে। কালবোশেখির পরে যেমন হয় তেমনি উত্তরদিকের পাড়াগুলোতে ডাকাডাকি চলছে; চলছে গরু খোঁজাখুঁজির কাউমাউ।

উজানপাড়া থেকে বড়বাড়ি হয়ে দক্ষিণপাড়া। দক্ষিণপাড়ায় হুলুস্থুল ফেলে পাগল ডানদিকে বাঁক নিয়ে পালপাড়ায় ঢোকে। পালদের গরু কম। তবু যে-কয়টা আছে তুফানের মুখে খড়কুটার মতো দিকবিদিক ছুটতে গিয়ে তারা উঠানের সব হাঁড়িপাতিল চুরমার করে ফেলে। পালপাড়ার শেষ বাড়ির উঠানে এসে পাগল থমকে দাঁড়ায়। এই বাড়িটা বজেনদের। বজেনের বাবা নাই। বিধুবা বুড়ি মা হৈ চৈ লঙ্কাকাণ্ডে ঘর থেকে বেরিয়েই পাগলের সামনে পড়ে যায়। এই আসমান-উঁচা উলঙ্গ পুরুষ। মাছির ভনভনানি আর গুয়ের গন্ধে দুনিয়া উদাস। বুড়ির কী মনে হয় খোদা জানে। সে আস্তে আস্তে গিয়ে পাগলের একটা হাত ধরে, আইয়ো বাবা। তুমি অতদিন কৈ আছলা?

পাগলের উদভ্রান্ত চোখমুখ নরম হয়ে আসে। বজেনের মা একটা পিঁড়ি এনে সামনে রাখতেই পাগল টপ করে বসে পড়ে।

বুড়ি রান্নাঘর থেকে ঝকঝকা করে মাজা কাসার লোটা ভরা পানি নিয়ে আসে। পাগল লোটার দিকে হাত বাড়ায়। বজেনের মা পানিভরা লোটাটা দুইহাতে প্রণামের ভঙ্গিতে পাগলের হাতে তুলে দেয়। পাগল পরান ভরে পানি খায়। উঠানের চারদিকে শত শত মানুষের আচান্নক চোখ তার দিকে তাকিয়ে আছে। কী মন্ত্রে? কোন যাদুবলে এই-রকম একটা ভয়ঙ্কর পাগল বজেনের মায়ের কাছে শিশু হয়ে গেল?

বজেনের মা দ্বিগুণ উৎসাহ ও সাহসে পাগলের পিঠে-মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে। আদরে শিশুর মতো পাগলের চোখ ঘুমে ঢুলতে থাকে। বজেনের মা একটা গামছা পানিতে ভিজিয়ে ঘষে ঘষে পাগলের কোমর থেকে নিচের সবটা শরীর পরিষ্কার করে দেয়। আরামে-আদরে পাগল পিঁড়িটা সিথান দিয়ে উঠানের মাটিতেই ঘুমিয়ে পড়ে। এই ফাঁকে বজেনের মা উঠে ঘরে যায়। গরিবের ঘরে কী আর থাকতে পারে? তবু ছিক্কায় ঝুলানো ঘটি-বাটি তালাশ করে ভাগ্যগুণে একটা মুড়ির মোয়া আর তিনটা তিলের তক্তি পেয়ে যায়। হৃদয়-নিংড়ানো মমতার এই সামান্য জিনিসই বাটিতে করে নিয়ে এসে, ঘুমন্ত পাগলের সিথানের কাছে বজেনের মা বসে থাকে। পাগলের নিঃশ্বাস ধীর ও ভারী। পরম শান্তিতে তার নাক ডাকছে।

মিনিট পাঁচেকের একটা গভীর ঘুম শেষে পাগল ধড়ফড়িয়ে জেগে ওঠে। গরিব বজেনের মা বাটিটা পাগলের সামনে এগিয়ে ধরে। একহাতে মোয়াটা আরেকহাতে তক্তি-তিনটা নিয়ে পাগল বাড়ির চারপাশে চোখ বুলায় : শত শত মুখ। দুই ঘরের গলিতে, জামগাছের আড়ালে, পাতিল রাখার চালার পিছনে, পশ্চিমের বেড়ার ফাঁকে ফাঁকে জোড়া জোড়া অপলক চোখ। পাগলের শান্তির দুনিয়াটা ঝলসে ওঠে। বিরক্তির চোখে ফিরে আসে উদভ্রান্ত দৃষ্টি। নরম শরীরটার পেশীগুলো টানটান হয়ে খিঁচে ওঠে। কেউ ছিনিয়ে নেওয়ার ভয়ে বালকের মতো বুকের কাছে মুঠি দিয়ে ধরা তক্তি আর মোয়া সহ লিকলিকে হাত দুটো, তলোয়ারের মতো বেগে দু-পাশের বাতাস কেটে দু-দিকে বেরিয়ে যায়, লাডুক কদররসুল…লাডুক কদররসুল…!

বিকালের দিকের একটা সময় ধরে পাগল কিন্তু আসতেই থাকে। একই পথ ধরে রোজ রোজ তার আসা এবং শেষ গন্তব্য বজেনের মার উঠান। বজেনের মা দুপুরের পরেই উঠানের কাঁঠালতলায় একটা জলচৌকি বিছিয়ে রাখে। পাগল এসে চৌকিতে বসলে বজেনের মা তাকে সাবান-সোডা দিয়ে ঘষে ঘষে স্নান করায়। শিশুর মতো সারা শরীরে যত্ন করে তেল মাখে। তারপর গরম গরম ডালভাত খেতে দেয়। গ্রামের মানুষজন এখন কথায় কথায় বলাবলি করে, বজেনরা বড়লোক অইয়া যাইব।

মুসলমানরা বলছে, এই আউলিয়ার দোয়ায় বজেনরা লক্ষপতি হয়ে যাবে। হিন্দুরা বলছে, এই নাগা সন্ন্যাসীর আশীর্বাদে বজেনদের বাড়ি সোনার পুরী হয়ে যাবে।

মাসখানেক আর পাগলের দেখা নাই। দুনিয়াদারির চাপে বলতে গেলে গ্রামবাসী ‘লাডুক কদররসুল’ কথাটা প্রায় ভুলে গেছে। নিশ্চিত ভুলেও যেত যদি-না মাঝে মাঝে দুষ্ট বালকেরা ‘লাডুক কদররসুল’ বলে খামাখা চেঁচিয়ে না উঠত। তারপর একদিন খুব সকালে জয়ধরখালীর শান্ত বাতাস বজেনের মায়ের বুকফাটা চিৎকারে চৌচির হয়ে যায়, আমার বাবা নাই গো! আমার লাডুক নাই…

এই চিৎকারে চারদিক থেকে পড়িমড়ি করে মানুষ ছুটে এসে দেখে, লাডুক পাগলা বজেনের মায়ের উঠানে উপুত হয়ে পড়ে মরে আছে! তার কোমরের নিচ থেকে সবটা রক্তে-হাগুতে সয়লাব।

মানুষ দেখে বজেনের মায়ের চিৎকার আরো ভয়াবহ হয়, বাবা আমারে শেষ দ্যাহা দ্যাখবার আইছিন গ। আমি পোড়াকপালী মরণঘুমে আছলাম গো…।

আশপাশের দশগ্রাম থেকে কাতারে কাতারে মানুষ ছুটে আসে। তাদের হাউঘাউ গপ্প, অতিপ্রাকৃত কল্পনার লাগামছাড়া বয়ান চলতে থাকে দুপুর পর্যন্ত। তারপর ভিড়ের মাঝে আলাপ ওঠে শেষকৃত্যের। বজেনের মা জনতার সামনে দুইহাতে সাদা থানের আঁচল পেতে তার দাবি জানায়, আমি আমার নাগা সন্ন্যাসী বাবারে আমগর শ্মশানে দাহ করাম।

ভিড়ের মাঝ থেকে উত্তরপাড়ার মুরুব্বি রুসমত আলী শেখ চিৎকার দিয়ে প্রতিবাদ জানায়, এই আল্লার ওলিরে আমরা সুন্নিমতে দাফন-কাফন করাম।

বজেনের মা পাগলের সিথানে বসে আহাজারি করছিল। রুসমতের কথায় এবার সে পাগলের মাথা দুইহাতে আঁকড়ে ধরে, — না না!

ভিড়ের মাঝ থেকে ছফির মুনশি চেঁচিয়ে ওঠে, — আগে দ্যাইখ্যা ল জাত কি…

এরই মাঝে জয়ধরখালীর জনতা পষ্ট দুই ভাগ হয়ে গেছে। পাগলের পশ্চিমদিকে হিন্দুরা, পুবে মুসলমানরা। এখন আর কোনো হাঁকডাক নাই, সকলের মুখ কালো থমথমে। এই নীরবতায় ছফির মুনশি আবার ঘোষণা করে, — জাত কি দ্যাইখ্যা ল।

পশ্চিমের ভিড় থেকে আওয়াজ আসে, হ। লও দ্যাইখ্যা লই।

ছফির মুনশিরা পাঁচজন রুসমত আলীর নেতৃত্বে এগিয়ে আসে। বজেনের মায়ের পক্ষ থেকে হিন্দুরাও পাঁচজন আসে। উপুত-হয়ে-পড়ে-থাকা লাডুকপাগলার দীর্ঘ দেহটা ধরাধরি করে উল্টে রাখা হয়। সকলের চোখ পাগলের লিঙ্গের মাথায়। পাৎলা চামড়ার আবরণের ভেতর থেকে লাটিমের মতো মুণ্ডুটা উঁকি দিয়ে আছে। বজেনের মা প্রাপ্তি ও বিজয়ের উল্লাসে চিৎকার দিয়ে ঘোষণা করে, এই-যে দ্যাহঅ বাবার ছুঁছি কাটা (খৎনা) হইছে না।

হিন্দুদের ভিড়ে কলরব ওঠে, — সন্নাসী, নাগা সন্নাসী।

পুবদিকের ভিড়ে মুসলমানমানরা সব ঠাঠাপড়া মুর্দার মতো স্থির চোখে, পাগলের খৎনাহীন লিঙ্গের দিকে তাকিয়ে থাকে। ছফির মুনশি ভিড়ের মাঝ থেকে লাফিয়ে ওঠে, — অঙ্গে কি যায় আসে? যেখানে জবান সাক্ষী আছে …

মুসলমানদের ভিড় থেকে চিৎকার ওঠে, — লাডুক কদররসুল… এই রসুল কার?

শত শত ঈমানদারের গলায় গর্জন ওঠে, — মুসলমানের রসুল; আমগর মুসলমানের।

পশ্চিমের ভিড় থেকে রামুসাহা কিত্তনের সুরে গেয়ে ওঠে, — ‘অঙ্গ ছাড়া দেহ কি হয়? / দেহ না থাকিলে জবান কি রয়?’

এইভাবে অনেক ঘাফিঘুফি আলাপের পর দুইদিকের ভিড় থেকে আবার সেই পাঁচজন-পাঁচজন দশজন পাগলের কাছে এগিয়ে আসে। বিলাপরত বজেনের মাকে মাঝে রেখে বহু শলাপরামর্শের পর স্থির হয়, লাডুক পাগলাকে কবর দেওয়া হবে হিন্দুপাড়া আর মুসলমানপাড়ার মাঝখানের সেই পতিত জমিটাতে। যাতে রোজ রোজ সন্ধ্যায় কবরের পৈথানে হিন্দুদের দেওয়া চেরাগের আলো আর সিথান দিকে মুসলমানদের ধরানো আগরবাতির সুগন্ধ লাডুক পাগলার আশীর্বাদ হয়ে সারাগ্রামে ছড়িয়ে পড়ে।

… …

শেখ লুৎফর

COMMENTS

error: