জয়ধরখালী ১৩ || শেখ লুৎফর

জয়ধরখালী ১৩ || শেখ লুৎফর

জয়ধরখালী উজানপাড়ায় হাতু ফকিরের একটা মাজার আছে। বসতবাড়িগুলো থেকে একটু দূরে, অসংখ্য গাছপালাঘেরা ছোট্ট মাজারটা সারাবছর তার মারফতি ভাবগাম্ভীর্য নিয়ে, দুনিয়াবি ঝক্কিঝামেলা থেকে একটু দূরে, একলা পড়ে থাকে। যারা আলস্যপ্রিয় এবং ফাঁকিবাজ, শরিয়তের কঠিন শাসন ও ক্লান্তিকর আনুষ্ঠানিকতা থেকে গা বাঁচাতে চায় এবং হাতের পাঁচ হিসাবে পরকালের পথটাও রাফসাফ রাখার তাগিদ বোধ করে, তাদের কেউ কেউ সন্ধ্যা হলে লিকলিকা পায়ে নিরালা মাজারটায় চলে আসে। সাদা দবদবা চুলদাড়ি আর ফকফকা ফর্সা চেহারার বয়োবৃদ্ধ পিরসাব একটা মোমবাতি ধরিয়ে, চোখ বুঁজে ডুবে থাকেন তার নিজের ভুবনে : ধর্ম তো শান্তি, মারফতের বাতি দিয়ে পাপতাপ-অন্ধকারভরা এই দুনিয়ার সকল সৃষ্টির মাঝে স্রষ্টাকে তালাশ করা, নিজের করে ভালোবাসা।

ভক্ত-আশেকানরা এসে মোমবাতির ক্ষীণ আলোয় নিঃশব্দে কালো কালো কিম্ভূত ছায়া ফেলে পিরসাবকে ঘিরে বসে। মারফতের কানুন ও কেরামতি বিষয়ে টুকটাক আলাপ হয়। একতারা আর কাঠের চটা বাজিয়ে প্রতি বিষুধবারে গান হয়। সব শেষে বাবার দিদার লাভের মনস্কামে জিকিরও হয়। জিকিরের আল্লাহু-আল্লাহু উচ্চরবে গভীর অন্ধকারে ডুবে-থাকা গ্রামটা যেন ঘুমের মাঝেও আড়মোড়া ভাঙে; সাহাপাড়া কিংবা পালপাড়া থেকে ভেসে আসে কীর্তণের ক্ষীণসুর। তখন সত্যিই মনে হয়, মানুষ তার অনুসন্ধিৎসু মনের স্বাধীন চেতনা ও চিন্তাফিকির দিয়ে, জয়ধরখালীর সরু সরু আঁকবাঁকা রাস্তাগুলোর মতো জগতে কত মত আর পথই-না আবিষ্কার করেছে! আবার কখনো মনে হয়, হাজার হাজার বছরের সাধনায় আবিষ্কৃত সেই মত ও পথ দিয়ে তারা আজ কতটুকুই-বা এগিয়ে গেল?

আজ ফাল্গুন মাসের এক তারিখ। হাতু ফকিরের মাজারে বার্ষিক ওরস হবে। সেই সুবাদে মাজারের নির্জন চত্বরটা বিকাল থেকেই মাইকের আওয়াজে, আউলবাউল-পির-ফকিরের জটা চুল-দাড়ি আর সালুকাপড়ের বাহারে রঙিন হয়ে উঠেছে। মাজারঘরের সামনের পাকা চাতালটায় আতপ চালের মস্ত একটা স্তূপ। একটু দূরে কাঁঠালতলায় জবাইয়ের জন্য একটা গরু বাঁধা। বিনবিন করে ছড়িয়ে-পড়া আতপ চালের সুবাসের সাথে গরুটার হাম্বা হাম্বা ডাক আর মারফতি গায়কদের একতারার প্রস্তুতিমূলক টুনটুনানির আমোদে জয়ধরখালী গ্রামটাকে আজ অস্থির-অস্থির লাগছে।

আজ থেকে মাসখানেক আগে নূরুরা কয়েকজন ময়মনসিং গেছিল সিনামা দেখতে। এটাই নূরুর জীবনে প্রথম কোনো শহরে আসা। ট্রেন থেকে নেমে, স্টেশানটা পেরিয়ে তারা এসে বাইরে দাঁড়ায়। তাদের সাথে আরো অনেকেই ট্রেন থেকে নেমে এসেছে। স্টেশনঘরের দেওয়ালজুড়ে সিনামার বড় বড় পোস্টার। সবাই রাঙিন পোস্টারগুলো দেখছে। নূরুও মনে মনে বানান করে ছবিটার নাম পড়ে, ‘নীল আকাশের নিচে’। অভিনয়ে রাজ্জাক-কবরী। নূরুরা এই ছবিটাই দেখতে এসেছে।

একটা স্টলে বসে তারা ডালপুরি আর চা খেয়েছিল। গ্রামদেশে তো চায়ের বালাই নাই। তাই নূরুর জীবনে চা খাওয়াটাও সেই প্রথম। চৌদ্দ-পনেরো বছরের নূরুর মনে জিনিসটা খুব দাগ কাটে। তাই হোটেলবয় কীভাবে চায়ের কাপে লিকার দেয়, চিনি দেয় এবং সবশেষে ছোট্ট একটা চামচ দিয়ে নাড়িয়ে নাড়িয়ে চা বানায় তার বারোআনা বিদ্যাই সেদিন সে মুখস্থ করে ফেলেছিল।

আজ সকালে ঘুম ভাঙার পর থেকেই নূরুর মনে চায়ের বিষয়টা ক্ষণে ক্ষণে টুক্কুরু দিয়ে উঠছে। আজ হাতু ফকিরের মাজারে ওরস হবে। দূরদুরান্ত থেকে দলে দলে আসবে হরেক কিসিমের পির-ফকির আর তাদেরকে ঘিরে জমে উঠবে অগুন্তি মানুষের মেলা। পির-ফকিরেরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে যার যার ভক্ত-আশেকান নিয়ে আসন পাতবে। তারপর একতারা বাজিয়ে মরমি গান হবে। গানের সাথে লম্বা লম্বা বাবরি দুলিয়ে হাক্কুরহুক্কুর জিকির হবে। জিকিরের জুশে ফানাফিল্লা হয়ে আশপাশের পাঁচ গ্রাম থেকে আসা জোয়ান জোয়ান মর্দরাও বাবরি দুলিয়ে তালে তাল মিলাবে।

রাত বারোটা-একটার সময় মাজারের উত্তরদিক থেকে ভেসে আসবে প্রায়-হয়ে-ওঠা খিচুড়ির সুবাস। সেই সুগন্ধে পির-ফকির আর আমজনতার আঁত-নাড়ি ক্ষিধায় কড়মড় করে চেঁচিয়ে উঠবে। আর এই সুযোগটাই নিতে চায় নূরু। সে টাকাপয়সা বোঝে না। লেখাপড়ায় কোনো আনন্দ নাই দেখে পড়াশোনাও করেনি। যতসব উদ্ভট উদ্ভট কাণ্ডকারখানার জন্য পাড়ার কিশোরদের কাছে সে মস্ত এক নায়ক। বাঁশ দিয়ে সে রণপা বানিয়েছে। যখন কোনোকিছু করার থাকে না তখন রণপা দুইটা দিয়ে বাতাসে ভেসে ভেসে  সে সারা পাড়াময় ঘুরে বেড়ায়। পেছনে একদঙ্গল পোলাপান আমোদে কাউমাউ করতে করতে ছুটছে।

ময়মনসিং থেকে চা খেয়ে আসার পর থেকেই সে, চা নিয়ে আচান্নক একটা কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলার হাউসে মাঝেমাঝে আনমনা হয়ে যেত। নূরু বিছানা থেকে লাফ দিয়ে নেমে পড়ে। সামনে বিস্তর কাজ। কোদাল আর মাটি-কাটার একটা ঝুড়ি নিয়ে সে বাড়ির পিছনের কলাবাগে চলে যায়। সেখান থেকে অনেকক্ষণ কোপাকুপির পর পুরনো আর আধাপচা কলাগাছের একটা মোথা তুলে ফেলে। তারপর মোথাটা কেটেছেঁটে, পানি দিয়ে ধুয়ে পরিস্কার করে, সবার অলক্ষে ঘরে এনে দরজায় খিল দিয়ে বসে। তারপর কলার মোথাটা দা দিয়ে কুচিকুচি করে কেটে, ধান সিদ্ধ করার মস্ত একটা ডেকচিতে ভরে, চুলায় অনেকক্ষণ জ্বাল দেয়। বিরাট বড় একডেকচি পানি আর কলার পচা মোথা জ্বাল খেয়ে খেয়ে, বিকালের দিকে গাবের কষের মতো সেরদুয়েক ঘন লাল রস হয়ে যায়। এইটাই নূরুর চায়ের লিকার।

বসন্তকাল চলে আসছে। কয়দিন পরেই দক্ষিণ দিক থেকে বইবে বাতাস। তখন সে মস্তবড় চিলাঘুড্ডি বানাবে। সেইজন্য গত বিষুধবারে কাঁওরাইদ বাজার থেকে ঘুড়ি বানানোর কাগজটাগজ কিনে এনেছিল। ওরসের দিন বিকালে সেই কাগজগুলো জিগাগাছের কষ দিয়ে জোড়া লাগিয়ে বিরাট বড় একটা কাগজ বানায়। তারপর সেই কাগজটা নিয়ে নূরু এসে বড়বাড়ির সাহাবদ্দির কাছে দাঁড়ায়, — ভাইয়ো আমার এই কাগজটাত একটা জিনিস ল্যাইখ্যা দ্যাও।

বিকম পরীক্ষার লেখাপড়ায় সাহাবদ্দি টেবিলে ডুবেছিল। বেকব্রাশ করা চুল আর চিকন গোঁফের সাহাবদ্দি নায়ক রাজ্জাক-রাজ্জাক চেহারা নিয়ে নূরুর কথায় মাথা তোলে, — কী জিনিস?

নূরু মনে মনে ময়মনসিংহের সেই চাখানার সাইনবোর্ডটা আরেকবার পড়ে নেয়,‘সারদা টি স্টল’। এবার নূরু টেবিলের উপর কাগজটা বিছিয়ে সাহাবদ্দিকে বলে, — বড় বড় কৈরা ল্যাখবা, ‘নূরু টি স্টল’।

সাহাবদ্দি নূরুকে খুব ভালো করেই চিনে। তাই একটা মুচকি হাসি দিয়ে বলে, — আর কী কী লিখতে হবে?

সাহাবদ্দির এই কথায় নূরুর ছোটখাটো শরীরটায় আমোদ উছলে ওঠে, — কাগজের নিচে চিক্কুন চিক্কুন কৈরা ল্যাখবা, সাং-পোস্টাফিস : জয়ধরখালী, থানা : গফরগাঁও, জিলা : ময়মনসিং, পূর্বপাকিস্তান।

মাজারের দক্ষিণের খালি অংশটাই নূরুর বাপের ধান মাড়ানোর খলা। পাড়ার যত দুষ্ট বালকেরা আছে তারা সকলেই নূরুর মহাভক্ত। সন্ধ্যার আগে আগে নূরু তার সাগরেদদের নিয়ে ‘নূরু টি স্টল’ রেডি করে ফেলে। তারপর ইস্কুল থেকে তিনটা বেঞ্চ এনে স্টলের তিনদিকে পেতে দেয়। বাঁশের চাটির বেড়ার গায়ে সেঁটে দেয় ‘নূরু টি স্টল’ লেখা কাগজটা। পাশেই চুলার উপর সেই বড় ডেকচিটা। দুইসের ঘন লিকারে তিনসের আঁখের গুড় ছেড়ে দিয়ে নূরু এক-কলস পানি ঢেলে দেয়। তারপর একমুঠি দারুচিনি আর একখাবলা তেজপাতা ডেকচিতে ফেলে নূরু বিসমিল্লা বলে চুলাতে আগুন ধরায়। এর আগেই তার শিষ্যরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে নাকভাঙা, কানফাটা, ডেঁটিভাঙা পনেরো-বিশটা কাপ জোগাড় করে ফেলেছিল। সেই কাপগুলো ‘নূরু টি স্টল’ লেখা কাগজটার নিচে একটা টেবিলের উপর এখন শোভা পাচ্ছে।

রাত নয়টা-দশটার পর ঢোল-হারমোনির উচ্চ সুরের সাথে গায়কদের বেহালার সুরে ওরস তার আপন বৈশিষ্ট্যে জমে ওঠে। এদিকে নূরু টি স্টলেও জমে উঠছে চায়ের বিকিসিকি। যত গরিবই হউক, সকলেই দুই-চারআনা পকেটে নিয়ে এসেছে। তাই এই সুযোগে চায়ের মতো বড়লোকি জিনিসটা একবার চেখে দেখার লোভে আলাপসালাপ করতে করতে অনেকেই এদিকে চলে আসে। একেক দফায় নূরু পাঁচটা-সাতটা কাপে চা ঢেলে দেয়। আর তার চেলারা টপাটপ হাতে কাপ নিয়ে বেঞ্চগুলোর দিকে ছুটে যায়। ধূমায়িত চায়ের কাপ থেকে দারুচিনি আর তেজপাতার ঘ্রাণের সাথে আঁখের গুড়ের স্বাদ মিলে আচাভুয়া একটা সুবাস উঠছে! চিকার মতো দুইঠোঁট লম্বা করে, সুরুত-সুরুত করে গরম চা টানতে টানতে ফিসফিস করে একজন আরেকজনের কাছে বলছে, চাডা খুব মজা অইছে!

যে এই কথাটা বলল, সে জীবনে চা খাওয়া তো দূরে থাক চোখেই দেখেনি। উঠে যাবার সময় তারা নূরুর দিকে তাকিয়ে জিগায়, কত অইছে?
দক্ষিণপাড়ার কুদ্দু নূরুর এক নম্বর চেলা। সে টনটনা গলায় বলে, — একআনা।
চারকোণাওয়ালা একটা পাঁচপয়সার সাথে একটা কানাপয়সা মিলিয়ে লোকটা কুদ্দুর হাতে একআনা দেয়। কুদ্দু পয়সাটা নূরুর সামনের টিনের কৌটায় আলগোছে রাখে। এবং এইভাবেই তারা ওরসের খিচুড়ি পরিবেশনের আগ-পর্যন্ত ডেকচির সবটা চা বেচে ফেলে।

সারারাত চা বেচে পরের দিন সকালে ঘুমাতে গিয়ে নূরুর খালি উজবিজ (অশান্তি) লাগে। তার মনে খালি এক চিন্তা, অতগুলান ট্যাহা দ্যায়া কী করাম?
এই এক চিন্তায় নূরুর একটুও ঘুম হলো না। ঘুমের অশান্তির সাথে মনের অশান্তিটা বেশি খচখচ করে। ঘরে তার মা নাই। তাই বাড়িটা ছন্নছাড়া। এইসব ভাবনায় মাঝেমাঝে মনটা অসার লাগে। বুকের ভিতর কান্নার মতো কী-একটা গুমরায়।

বিকালে নূরু আবার তার সাগরেদদের নিয়ে পুবের মাঠের বড় বাতরটায় বসে। সামনে পেঁয়াজ-মরিচ-রসুন-তামাকের সারি সারি সবুজ ক্ষেত। তারপর গাঙপাড়ের ঘন সবুজ জংলা। নূরু সেইদিকে তাকিয়ে তার শিষ্যদেরকে জিগায়, — কত ট্যাহা লাভ অইছে জানস?
কিশোরদের চঞ্চল চোখগুলো চকচক করে ওঠে, — কত?
উনতিরিশট্যাহা ছয়আনা তিনপৈসা।

বিশ টাকা হলে দস্তুরমতো একটা খাসি পাওয়া যায়। তাই উনত্রিশ টাকার কথা শুনে বালকেরা ভড়কে যায়। দলের মধ্যে সাহাপাড়ার অসীম একটু বড়। সে বলে, — লও টুফাবাতি (চড়ুইভাতি) খাই।
এই কথায় নূরু খুশি হয় না। বৈঠকে নীরবতা লম্বা হয়। বালকেরা সকলেই নূরুর দিকে তাকিয়ে আছে। পিঠ চুলকে, হাসি হাসি মুখটা দুই হাতে ঘষে নূরু বলে, — এক কাম করলে অয়-না?

নূরুর কথায় উপস্থিত শিষ্যরা সকলেই নীরব থাকে। নূরু আবার পিঠ চুলকাতে চুলকাতে বলে, সাহাপাড়ার বুড়ি বৈষ্টমী দিদি রোজ রোজ আমগরে কত গান হুনায়। তার ঘরটা ট্যাহার অভাবে এইবার ঠিক করতা পারছে না। ল দিদিরে গ্যায়া ট্যাহাডা দ্যায়াই।
নূরুর এই প্রস্তাবে বালকেরা সকলেই আনন্দে লাফিয়ে ওঠে। তারাও বুড়ি বৈষ্টমীর গানের ভক্ত।

সবুজে সবুজে সয়লাব জয়ধরখালী গ্রামটা পশ্চিমে ঢলেপড়া সূর্যের লাল আভায় মায়ের মুখের মতো ঝলমল করছে। সেইদিকে তাকিয়ে অনিদ্রায় নূরুর লাল চোখ দুটো আবার ছলছল করে ওঠে।

… …

শেখ লুৎফর

COMMENTS

error: