জয়ধরখালী ১৪ || শেখ লুৎফর

জয়ধরখালী ১৪ || শেখ লুৎফর

ফাগুন মাসটা যাবে না বলে গড়িমসি করতে করতে হলহল করে দক্ষিণা বাতাস বইতে শুরু করে। দুপুর হলে চাষ-দেওয়া ধূ ধূ মাঠে ঘূর্ণি ওঠে। ধূলাবালি, শুকনা পাতা আর গরম বাতাসের বিশাল বিশাল ঘূর্ণিগুলো শনশন করে গ্রামের দিকে এগিয়ে আসে। গাছে গাছে কোকিলের সীমা-সংখ্যা নাই। আম-জাম-কাঁঠাল গাছ আর মস্ত মস্ত বাঁশঝাড়ের কোন অতল থেকে যে হাজারেবিজারে প্রেমকাতর প্রাণীগুলো ‘বউ কথা কও’ ডাকতে ডাকতে মানুষের কান ঝালাপালা করে ফেলছে! ঝোপঝাড়, লতাগুল্ম আর চিকন চিকন দু’পায়ে-পথের পাশে ভাটগাছগুলো সহ সবাই গা-ঝাড়া দিয়ে শরীরের সব পাতা ফেলে, ডালপালা ভর্তি ফুল নিয়ে ডগমগ যুবতী হয়ে উঠেছে। মাঝে মাঝে দমকা হাওয়া জঙ্গলের দিক থেকে কুমারী মেয়ের শরীরের মতো অচেনা ফুলের সুবাস নিয়ে ছুটে আসে। না ফুলে, না কোকিলের ডাকে, গ্রামের মানুষের কোনো ধিক নাই। তারা মাঠের জমিগুলো হাল-মই দিয়ে, মাটির বড় বড় ঢেলাগুলো মুগুরে পিটিয়ে, একদম রেডিমেডি করে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে; এখন একছাঁট বৃষ্টি হলে আমন ধান আর পাটের বীজ বুনবে।

নূরুর কিন্তু অত ঝামেলা নাই। কাঁঠালের বিচির মতো তেলতেলা আর টনটনা গতরের ছোটখাটো নূরুর মাথাভর্তি কোঁকড়া চুলের বাহার। চনচনা খাড়া নাকটার নিচে চিকন একজোড়া গোঁফের রেখায় সবসময় লেগেই আছে একটা মিষ্টি হাসি। নূরুর বাপের রান্নাঘরে আর ধান ভানার ঢেঁকিতে বসে সারাবছর যারা বিড়ি খায় আর রসিয়ে রসিয়ে গপ্প মারে, আজ তারা সকলেই পাঁচহাত লম্বা একটা চিলাঘুড়িকে ঘিরে নুরুদের উঠানে মহাব্যস্ত। কেউ কেউ নাওয়ের গুনের মতো শক্ত আর মোটা সূতা টানাটানি করে জিনিসটার সক্ষমতা যাচাই করছে। কেউ কেউ তালপাতা কেটে, বাঁশের খাবাশির (বাঁশের চিকন ফালি) মাথায় ফিতার মতো বেঁধে ধেনু তৈরি করছে। যারা অলস আর সন্দেহপ্রবণ এবং একটা ছলছুঁতা পেলেই কথাটা টেনে টেনে লম্বা করতে ভালোবাসে, তাদের কেউ কেউ নূরুর দিকে জিজ্ঞাসা ছুঁড়ে দেয়, এই সূতা পাঁচহাত চিলাঘুড্ডির টান মানব?

হাড়গিলা লোকটার পাশে যে বসেছিল, সে জন্মের আইলস্যা। তার কথা বলতেও বড় ক্লান্তি। সে তার হাঁটুর দাদটা চুলকাতে চুলকাতে ফুচুৎ করে একটা থুতু ফেলে, বসন্তের দাগে ভরা কপালটা কুঁচকে রায় দেয়, মনে কয় মানত না।

লোকটা পরনের একমাত্র লুঙ্গিটাকে কোমরের সাথে গোঁজতে গোঁজতে প্রায় উলঙ্গ হয়ে গেছে, সেইদিকে বিন্দুমাত্র খেয়াল নাই। তার এই বড় বড় অণ্ডকোষদুইটা মাটি-ছুঁইছুঁই! দক্ষিণপাড়ার কুদ্দু একটা ফাজিলের শেষ ফাজিল পোলা। ছোট ছোট বিচ্ছু পোলাপানের ভিড় থেকে সে একটা ছোট্ট ঢেলা ঝুলে-থাকা অণ্ডকোষের দিকে ছুঁড়ে মেরে পলকে হাওয়া হয়ে যায়। আর এই ঘটনায় উপস্থিত সকলের মাঝে হাসির রোল ওঠে।

বিকালের দিকে খরায়-পোড়া ধূ ধূ মাঠের শনশন ঘূর্ণিবায়ু থেমে গিয়ে দক্ষিণ থেকে অলল করে বইতে শুরু করে একধারা বাতাস। নূরুর সাথে দুই-তিনজনে ধরাধরি করে ঘুড়িটা পতিত মাঠে নিয়ে আসে। বড়দের পিছনে কবকব করতে করতে একদঙ্গল পোলাপানও আসে। ঘুড়িটা ঘিরে তাদের গবেষণার অন্ত নাই। চিলের মতো ছুঁচালো ঘুড়িটার সামনের ঠোঁটে চারটা আর পিছনের লেজে তিনটা ধেনু বাঁধা হয়েছে। ধেনুগুলোতে একটু বাতাস লাগতেই গায়কী সুরে ভোঁ ভোঁ করে ডেকে উঠতে চায়।

বাতাসের মুখে দুইজনে দু’পাশ থেকে ঘুড়িটা উঁচিয়ে ধরে আকাশের দিকে ঠেলে দিতেই ভোঁ করে একটা ছোট্ট চক্কর দিয়ে মারমার উড়তে শুরু করে। ঘণ্টাখানেকের মাঝে নূরুর ঘুড়ি দশসের সূতা খেয়ে, চৌথাই আসমানে গিয়ে, চিলের মতো দুই পাখনা মেলে থির হয়ে বসে।

সন্ধ্যার দিকে মস্ত বড় চাঁদের আলোয় পুবের আকাশ লাল হয়ে ওঠে। তখন বিড়ি টানতে টানতে বড়রাও এসে নূরুর পাশে বসে। নূরু ঘুড্ডি নামিয়ে নিতে চাইলে উপস্থিত ছোট-বড় সকলেই প্রতিবাদ করে। কালো কালো লোমে ভর্তি বুকটা গশগশ করে চুলকাতে চুলকাতে উত্তরপাড়ার হাবি বলে, দ্যাখ কী চান্ উঠছে, দক্ষিণ থেকে কী বাতাস আইতাছে!

নূরুর ঘুড্ডির সাতটা ধেনুর সপ্তসুরে সারাদুনিয়া বুঝি নেশায় বুঁদ হয়ে ঢুলছে। গরুবাছুর বেঁধে হাত-পা ধুয়ে গ্রামের রাখাল ছেলেরাও এসে নূরুর সাথে জোটে। বাতরের তালগাছে ঘুড্ডির গুনটা বেঁধে নূরু একটা বিড়ি ধরায়। এইমাত্র-ওঠা চাঁদের লাল রোশনির সাথে ধেনুর গুনগুন গুঞ্জনে তার বুকের ভেতরটা মোমের মতো গলে বেরিয়ে পড়তে চাইছে।

পাড়ার রাখাল আর ছেলেছোকরারা নূরুকে ঘিরে আলাপ জমিয়েছে। কেউ কেউ করছে বিটলামি আর দৌড়াদৌড়ি। চাঁদটা একটু গড়ান দিয়ে উপরের দিকে উঠতেই শিরা মিয়া আসে। এই উঁচু আর ফনফনা পাতলা গতরের শিরা মিয়াকে তার দমকা হাওয়ার মতো চলন-বলন আর বিশাল গোঁফটার জন্য গ্রামের সকলে আদর করে সিরাঙ্গী ডাকে। সন্ধ্যার দিকে সে জানি কোথায় ছিল কে জানে। ধেনুর পাগলা সুরে বড় বড় পা ফেলে বিড়ালের লেজের মতো ঝুলে-পড়া গোঁফটা তা দিতে দিতে এসে আসরে উদয় হয়। তার সাথে জুটে গিয়াসউদ্দী, কাদের সহ আরো দশ-বারোজন জোয়ান মর্দ। তারা সকলেই কমবেশি দুই-তিনটা করে সন্তানাদির বাপ। কিন্তু এই ফটফটা সাদা জোছনা আর ধেনুর সুরে তারাও পোলাপানদের মতো পতিত মাঠে গোল্লাছুট খেলা শুরু করে দেয়।

সারাটা গ্রাম জোছনার শান্ত ধারায় ধুয়ে যাচ্ছে। সারাদিনের পর এই রাতেও বিরহী কোকিলগুলো গাছে গাছে অক্লান্ত রোদনে ব্যস্ত। চিমসা গরমের পর দক্ষিণা বাতাসের ঠাণ্ডা পরশে গতর-মন জুড়িয়ে যায়। তাই গ্রামের বুড়াবুড়িরা উঠানে বসে আলাপসালাপ করছে। কেউ কেউ উঠানে পাটি পেতে গড়াগড়ি দিচ্ছে। তাদের পাশে শুয়ে-বসে জোছনা আর ধেনুর সুরে শিশুরা কলকল করে কথা বলছে।

সাহাপাড়ার বিধান সাহা কাপড়ের ব্যবসায়ী। হিসাবনিকাশে সে কড়া ধাতের মানুষ। বারান্দায় খেঁজুরপাতার পাটি বিছিয়ে হারিকেনের আলোতে হিসাবের খাতা নিয়ে বসেছিল। নানান প্রকার জটিল হিসাবে ঠাঁসা তার হৃদয়টায় আজ সন্ধ্যা থেকেই জোছনার সাথে নূরুর ঘুড্ডির ধেনুর সুর চুঁয়ে চুঁয়ে জমছিল। তাই জোর করে হিসাবের খাতায় মনটা নিতে না-পেরে বিরক্ত হয়ে ঘরের মানুষটাকে ডেকে বলে, এই হারিকেনডা লইয়া যাও।

হারিকেনের লাল আলোটা মিলিয়ে যেতেই বারান্দাটা জোছনায় ঝলমলিয়ে ওঠে। ধেনুর সুর শুনতে শুনতে বিধান সাহার বুকটা কী-এক আচান্নক অভাবে ক্ষণে ক্ষণে মোচড়ায়।

গগনশাহ শেখের ছোটছেলে হামিদ বসন্তরোগে পড়েছিল সেই পোষ মাসে। ছোট্ট বালকের সারাটা শরীর দগদগা ঘায়ে লাল হয়ে গেছিল। পোষ-মাঘ এই দুইমাস সে কলাপাতায় শুয়ে কাটিয়েছে। দিনে একবার শুধু খেয়েছে মাশকলাইয়ের ডাল দিয়ে একমুঠি ভাত। পৃথিবীর আর-সব খাবার তার জন্য ছিল হারাম। অসম্ভব প্রাণশক্তির জোরে সে এ-যাত্রা টিকে গেছে। ফাগুন মাস আসতেই ঘা শুকিয়ে চাক্কা চাক্কা ছাল উঠতে থাকে। এখন সে গরম গরম ডাল-ভাত দুইবেলা খেতে পারে। নিজে নিজে বিছানায় উঠে বসতেও পারে। নূরুর ঘড্ডির ধেনুর শব্দে আজ সন্ধ্যা থেকেই সে একলা একলা বিছানায় বসে ছিল। তার অসুস্থ, ছোট্ট বুকের ভিতরটা বারবার কেঁপে উঠছে। বাইরের উঠানে বসে বাড়ির সবাই আলাপে মত্ত। শুকিয়ে-তক্তা-হয়ে-যাওয়া শরীরটা টেনে টেনে হামিদ বিছানা থেকে একলাই নেমে পড়ে। তারপর চৌকির বাজু, দরজার কপাট ধরে ধরে, টলমল পায়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। দক্ষিণের লিলুয়া বাতাসে বয়ে-আসা ধেনুর সুর আর জোছনার অবিরল ধারা যেন অসুস্থ বালকের নিঃসঙ্গ বিছানার অন্ধকার পৃথিবীটা এক-লহমায় মুছে দেয়। তখন বারবার তার মন বলে, এইবারের মতো সে বেঁচে গেছে। তার সারাশরীরে তো হাড়গোড় ছাড়া কিচ্ছু নাই। তাই ধেনুর সুরে হাড়ের কোটরের ভিতর বালকের চোখ দুইটা আনন্দ-অশ্রুতে চকচক করে।

… …

শেখ লুৎফর

COMMENTS

error: