জয়ধরখালী ১৭ || শেখ লুৎফর

জয়ধরখালী ১৭ || শেখ লুৎফর

জিলহজ মাসের চাঁদটা উঠার পর থেকে জয়ধরখালীর লেকুচাচার হাত থেকে যেন হুঁক্কা আর নামতেই চায় না। একটু ভালো করে তাকালেই আপনারা লেকুচাচাকে চিনবেন। ছোটখাটো চেহারার মানুষটা যেমন চুপচাপ তেমনি বিষণ্ণ। ছেলেরা বড় হওয়ার পর থেকে হাটবাজারেও যায় না। দিনের বেশিরভাগ সময় কাটে ক্ষেত-গিরস্তির কামে কিংবা বারান্দার কোনার দিকে বসে হুঁক্কা টেনে টেনে। তাই থুতনির সাদা দাড়িগুলা তামাকের ধোঁয়ায় হয়ে গেছে লালটি রঙের।

আর কয়দিন পরেই কুরবানির ঈদ। এইবার লেকুচাচার কুরবানির কোনো জো নাই। কোনো কোনো বছর নিজের গোয়ালের বুড়া বলদ কিংবা গাইটা কুরবানি দিয়ে সে উদ্ধার পায়। এইবারে সেই ব্যবস্থাও নাই। হালের দুইটা বলদ আর দুধের গাইটা বাদে গোয়ালের বাকি সবগুলা গরু নাবালেগ শিশু।

খাবারের সময় পাকঘরে লেকুচাচার বুড়ি তেরো-চৌদ্দটা সানকি বাড়ে। পাঁচটা পুতের বউ আর তাদের আণ্ডাবাচ্চা সহ সংসারটা তার জাহাজমার্কা। হাতে দশটা টাকাও নাই। ঘরে বারো-চৌদ্দ মণ পাট আছে। খোরাকি বাদে বিশ-বাইশ মণ ধানও আছে। এই বাবদ কিচ্ছাও অনেক লম্বা। আত্মীয়-এগানার খাতিরযত্ন, পরিবারের মানুষগুলার কাপড়লাতা, সাবান-সোডা, তেল-নুন-কেরোসিনের কথা তাকে তো মনে রাখতেই হয়। এসব তো আর তার জমিনে ফলে না। বুড়া মানুষটা হাঁসফাঁস করে। পাটক্ষেতের নিড়ানি ফেলে, সত্তর বছরের ছানিপড়া চোখ মেলে খোদার দুনিয়াটা দেখে; সব ঘোলা ঘোলা!

আছরের নামাজের টাইম হলে চাচা পাটক্ষেত থেকে উঠে আসে। আশপাশে পানি নাই। মাইলকে-মাইল শুকনা পাটক্ষেতের উপর দিয়ে বাতাস থৈ থৈ করে ঢেউ দিয়ে যাচ্ছে। তাই জমিনের ধুলামাটি দিয়েই সে তায়ামুম করে নেয়। তারপর ক্ষেতের মোটা বাতরে গামছা বিছিয়ে চার রাকাত ফরজ নামাজ আদায় করে। সালাম ফিরিয়ে আরেকবার দুনিয়াটা দেখে, ঢলে-পড়া সুরুজের লাল আভায় মাঠের পর সবুজ মাঠ খোদার আরশের মতো কী সুন্দর আর পবিত্র লাগছে! আল্লা কত যতন করে দুনিয়াটা সৃষ্টি করেছে। লেকুচাচার কুঁচকানো চামড়ার ছোট্ট বুকটা শান্তিতে ভরে ওঠে।

দুই হাত তুলে মুনাজাতের শুরুতেই চাচা আজ ডুকরে ওঠে, — নাতি-নাতনী, পুত-বউ লইয়া আল্লা তুমি আমারে চৈদ্দটা মুখ দিছো। পোলাপানগুলান একটু গোস্তু খাইবার আশায় সারাটা বছর কুরবানির ঈদের দিকে চাইয়া থ্যাহে। ঈদের পরেও আট-দশদিন তারা হাড় চুষতে চুষতে উঠান জুইড়্যা খেলায়। তাগর কী আমোদ! কী ফুর্তি! আল্লা গো …,অহন যুদিন কুরবানি না দিতারি…

পিঠে হেলে-পড়া সুরুজের রোদ-উত্তাপ নিয়ে পাঁচটা ছেলে পাটক্ষেতে নিড়ানি দিচ্ছে। চাচা তাদের থেকে বেশ তফাতে বাতরে বসে খোদার দরবারে দুই হাত তুলে জারেজারে কাঁদে। তার দুইহাতের দশআঙুল বেয়ে চোখের পানি টপটপ করে পড়ছে। এই কয়দিনে তার থুতনির দাড়িগুলা তামাকের ধোঁয়ায় আরো বেশি লাল, রুক্ষ।

পরের দিন দুপুরে খেতে বসে লেকুচাচা ভাঙা-ভরী গলায় ঘোষণা করে, এইবার কুরবানি নাই।

তার বড় ছেলেটা উড়াল জাল নিয়ে বিলে গেছিল। টেংরা-পুঁটির সাথে মস্ত একটা শোল মাছও পেয়েছে। শোলের ঝাল চচ্চড়ি দিয়ে ছোটরা খুব আমোদ করে খাচ্ছে। দাদার এই আচান্নক ঘোষণায় তাদের হাসিটাসি সব বন্ধ হয়ে যায়। মুহূর্তে পাকঘরে নেমে আসে হাশরের নীরবতা। কোমরসমান ছোট ছোট নাতিগুলা টাসকা চোখে দাদার দিকে তাকিয়ে থাকে। জোয়ান জোয়ান পাঁচটা ছেলের একটাও পাত থেকে মাথা তুলে না।

চুলাপাড় থেকে বড়বউ আস্তে করে উঠে যায়। ছোটবড় মিলে তার পাঁচটা সন্তান। একটু পরে সে ফিরে এসে শ্বশুরের পাতের সামনে ষোলোটাকা চারআনা রেখে দিয়ে বলে, আণ্ডা-মুরগি-কৈতরের ছাও বেইচ্চ্যা সারাবছরে এই কয়ডা ট্যাহা জমছিন; বাছাপ (বাবা), আফনের কাছে থাহুক।

লেকুচাচার বড় নাতিটা খুব ইস্কারি। উজানপাড়া প্রাইমারিতে ক্লাস ফাইবে পড়ে। সারাদিন দুনিয়ার সব খুঁটিনাটি নিয়ে দাদার পিছে পিছে হাঁটে। সন্ধ্যা হলেই বই নিয়ে বসে। লেখাপড়ায় নাকি খুব ভালো। মায়ের দেখাদেখি সে-ও পাতের ভাত ফেলে একলাফে বেরিয়ে যায়। একটু পরেই ফিরে এসে দাদার পাতের কাছে চারআনার দুইটা সিকি রেখে বলে, আমি ঘুড্ডি বানায়া রহিমের কাছে বেচছিলাম দাদা।

এইবার একে একে অন্য বউদেরকেও উঠতে হয়। তারাও হাঁস-মুরগি-কবুতর লালনপালন করে।

এইভাবে খাওয়া শেষ হওয়ার আগেই লেকুচাচার পাতের সামনে কুরবানির গরু বাবদ উনষাট টাকা চৌদ্দ আনা মজুদ হয়। সবশেষে পাঁচ টাকার একটা আস্ত নোট নিয়ে এসে লেকু চাচার হাতে তুলে দেয় তার বুড়ি, — আমগর কতা বাদ; কুরবানি না দিলে আমার নাতিরা ফকিরের লাহান মাইনশ্যের বাড়ির পোলাপানের আতের (হাতের) দিকে চাইয়া থাকবঅ।

সবাই জানে, এক-সোয়াশ টাকার নিচে মোটামুটি কোনো গরু হবে না। তাই চাচার শুকনা মুখের দিকে তাকিয়ে বুড়ি একটা পরামর্শও দেয়, ঘরে দশ-বারো সের হউড়া (সরিষা) আছে, বেচলে আরো চৈদ্দ-পনেরো ট্যাহা অইব।

ঈদের দুইদিন আগে সত্তর টাকা দিয়ে লেকু চাচা একটা হাড়জিরজিরে গাই কিনে নিয়ে আসে। এশার নামাজের সময় উঠানে গরুর পায়ের শব্দে বাড়ির তিনদিকের ছোট ছোট ঘরগুলা থেকে সবাই ছুটে আসে। বাচ্চাদের কাউমাউ আমুদে লেকুচাচার উঠানে ঈদের খুশি উপচে পড়ে। পশ্চিমের বড়ঘর থেকে কুপি হাতে বুড়িও বেড়িয়ে আসে। বুড়ি হাতের বাতিটা উঁচিয়ে ধরে। বড়বউ কুলায় করে ধান-দুব্বা নিয়ে আসে। ছোটবউ বদনা ভরা পানি নিয়ে এসে ‘বিসমিল্লা’ বলে গরুর সামনা দুই পায়ে ঢেলে দেয়। এইভাবে বাড়ির ছোট-বড় সকলেই গাইটা নিজের বলে বরণ করে নেয়। প্রাথমিক আনুষ্ঠানিকতা ও উত্তেজনার পর কুপিবাতির লাল আভায় উপস্থিত সকলের নজর পড়ে গাইটার উপর; হাড়জিরজিরে জীবটা ক্লান্তিতে ধুঁকছে! দেখলেই মনে হয় যে-কোনো সময় ধ্পাস করে মাটিতে পড়ে যাবে।

পরের দিন ফজরের নামাজের পর গোয়ালে গিয়ে লেকুচাচা দেখে গাইটা মরে পড়ে আছে! মুখের চারপাশে ফেনা, কালো চকচকে চোখ দুইটা ঠিকরে বেরিয়ে এসেছে। মোটা মোটা হাড্ডির মস্ত কঙ্কালটার চারপাশে বাঁধা অন্য গরুগুলা আগা-পা মাটিতে ঠুকছে আর ফোঁসফোঁস করে দম ছাড়ছে।

মরা গাইটাকে দড়ি দিয়ে বেঁধেছেদে, মোটা মোটা বাঁশের সাথে জোড়ান দিয়ে, বাপ-বেটা ছয়জনে কাঁধে করে নিয়ে মাঠের দিকে রওনা হয়। বাড়ি ছাড়িয়ে নিচের জমিনে নামতেই লেকুচাচা পিছন ফিরে একবার তাকায়; গাছের একটা পাতাও নড়ছে না। মানুষভরা বাড়িটায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। আম-জাম-কলা গাছের ফাঁকে ফাঁকে চৌদ্দ-পনেরোটা হতবাক মুখ। আঁচলের খুঁট দিয়ে বুড়ি চোখ মুছছে। ঠিক মানুষ মরলে যেমন হয়; শুধু লজ্জা-শরমে তারা হাউমাউ করে বিলাপ জুড়তে পারছে না!

গাইটা নিয়ে মাঠের মাঝে ফেলা হয়। ছেলেরা বাঁশ-দড়ি নিয়ে বাড়ির দিকে ফিরে যাচ্ছে। কারো মুখে কোনো কথা নাই। কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছে না। সবাই মাথা নুয়ে নুয়ে হাঁটছে। দুই ক্ষেত পেরিয়ে মোটা একটা বাতর দেখে লেকুচাচা তার পাত্থর পাত্থর গতরটা নিয়ে বসে পড়ে। পুবদিকের বাঁশঝাড় ছাড়িয়ে সূর্য একটু উপরে উঠতেই খোদার দুনিয়া রহমতের আলোতে ঝলমল করছে। লেকুচাচা পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখে, তার জোয়ান জোয়ান পাঁচটা ছেলে মাটিতে বড় বড় ছায়া ফেলে ভূতের মতো বাড়ির দিকে হাঁটছে। সবার শেষে ছোট ছেলেটা। সে দেখতে মাগীমুখো। এবং বছরখানেক আগে বিয়ে করে আনা নতুন বউয়ের বিশেষ ভক্ত। ফাঁক পেলেই কলার ছড়াটা, কাঁঠালটা বিক্রি করে বউয়ের জন্য লুকিয়ে লুকিয়ে স্নো-পাউডার কেনে। লেকুচাচা এক আচান্নক গলায় ডাক দিয়ে তার ছোট ছেলেকে বলে, — আমারে এক ছিলিম তামুক দ্যায়া যাইস।

কল্কির তামাক মনমতো জ্বলে উঠবার আগেই অ্যারোপ্লেনের ভঙ্গিতে ঝাঁকে ঝাঁকে শকুন নামতে শুরু করে। কুকুরও এসেছে তিন-চারটা। দ্যাখতে দ্যাখতে শকুনে আর কুকুরে লড়াই শুরু হয়। মাঠের কাঠাবিশেক জমিন, কাঠের একজোড়া খড়ম, একটা হুঁক্কা, একজোড়া লুঙ্গি-গামছা আর একসানকি ভাত — এই নিয়েই লেকুচাচার সত্তুর বছরের জীবনে কোনো আক্ষেপ-অভিযোগ নাই। তবু আজ কেন জানি তার বারবার মনে হয় দুনিয়া ভরা শকুন! খালি শকুন!

হাড়গিলা গতরের তবারক মাঠ থেকে ফিরছিল; চিকার মতন লম্বাটে মুখে চিহিনিহি হাসিটা তার লেগেই থাকে। লেকুচাচার তামাকের গন্ধ তাকে টেনে টেনে শোকে-বিধ্বস্ত মানুষটার কাছে নিয়ে আসে, চাচা বইয়া রইছ ক্যা? মরছে ত মরছেই, আয়ো বাড়িত যাইগ্যা।

ছিলিমটায় জোরে একটা দম দিয়ে চাচা পড়শি ভাতিজার হাতে হুঁক্কাটা তুলে দিতে দিতে ঠাণ্ডা গলায় বলে, সত্তর ট্যাহায় গাই কিইন্ন্যা কত জাতের হহুন (শকুন) দ্যাখলাম!

হুঁক্কা হাতে অসার গতরটা বাড়ির দিকে টানতে টানতে লেকুচাচা আরেকবার খোদার রহমতে ভরা দুনিয়াটা দেখে : তার ছানিপড়া চোখে সব ঘোলা ঘোলা; তামাম জাহান ঘিরে থাকা আসমানটাও সিলভারের পুরাতন পাতিলের মতো ঝাপসা আর ছোট। খুব ছোট!

… …

শেখ লুৎফর

COMMENTS

error: