জয়ধরখালী ২০ || শেখ লুৎফর

জয়ধরখালী ২০ || শেখ লুৎফর

আশপাশের কয়েক গ্রামে কলেরা লেগেছে; জয়ধরখালীতেও কেউ কেউ কলেরায় পড়েছে। তাই সন্ধ্যা হতেই পাড়ার চ্যাংড়ারা খড়কুটার আগুন জ্বালিয়ে জোর গলায় চিৎকার দেয়, —

আলীর হাতের জুলফিকার মা ফাতেমার তির,
যেইদিক থেকে আইছ রে বালা সেইদিকেতে ফির।

তবু সাদিরের বউটা মাঝরাতে কলেরায় পড়ে। ঘণ্টাখানেকের মাঝে দাস্ত-বমিতে বিছানাটা সয়লাব হয়ে যায়। দেখতে দেখতে তার ফর্সা শরীরটা হয়ে ওঠে পোড়া কাঠ। চোখ কোটরে ধেবে গেছে, গোলগাল মুখটা শুকিয়ে বেরিয়ে এসেছে চোয়ালের হাড্ডি। দুই-তিনঘণ্টার মধ্যেই বউয়ের শক্ত-সমর্থ দেহটা অসার হয়ে বিছানায় মিশে যায়। কথা বলা তো দূরে থাক এখন আর চোখের পাতি খুলে রাখারও শক্তি নাই। এবং এইভাবে রাত পোহাবার আগেই সে একটা টানা মেরে চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেল।

যে গেল, সে গেল। কিন্তু সাদিরের সংসারটা জোয়াল-ভাঙা কলুর ঘানির মতো আছড়ে পড়ল দুনিয়াদারির কঠিন মাটিতে। তিন-চারটা এতিম বাচ্চা উঠানের ধুলায় সারাদিন গড়াগড়ি খায়, পেটে দানাপানি নাই, গোসল নাই, কারণে-অকারণে ভেউ ভেউ করে কেঁদে ওঠে। জয়ধরখালীর মানুষ বলে, ‘দেখা দুঃখ গায়ে সয় না।’ তাই সাদিরের দুঃখে বাড়ির চাচি-জেঠিরা কথায় কথায় হায়-হায় করে ডুকরে ওঠে।

দোহারা গড়নের সাদির দুই বলদের পিছনে আরেকটা বলদ। তার এত দয়ামায়া নাই, বোঝ-পরামর্শ নাই। তার গরু-বাছুর আছে, হাল-মই আছে, পুবের বাইদের বড় ক্ষেতটায় রোপা-আমনের চারা লাগানোর কথা ছিল, কামলারা এসে খবর শুনে মুখ কালো করে ফিরে গেল। ভাত রাঁধতে গিয়ে সাদির হাত পোড়াল, ফাঁকা বাড়ি পেয়ে পিছনের জংলা থেকে একটা শিয়াল এসে ছোট ছোট ছাওগুলার মাঝ থেকে খপ করে মুরগিটা ধরে নিয়ে গেল, দশ-বারোটা বাচ্চা এখন সারা উঠান জুড়ে চিঁ চিঁ করে মাকে খোঁজে।

দুপুরের রোদে দুনিয়াটা খাঁ খাঁ করছে। সাদিরের ছোট মেয়েটা বারান্দার মাটিতে পড়ে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছে। বড় ছেলেটা পেটের ক্ষুধায় ভাত ভাত করে বাপের পিছে এসে দাঁড়িয়ে কাঁদতে থাকে। ভাতের ফেন গালবার সময় ঢাকনা সরে গিয়ে ভাতের হাড়িটাই উল্টে পড়ে। সাদির পা-দুইটা বাঁচাতে গিয়ে লাফ দিয়ে ছেলে সহ গড়িয়ে পড়ে পেছনে। রাগে-দুঃখে সে লাথি মেরে ভাতের হাড়িটা উড়িয়ে উঠানে ফেলে, ছেলেকে একটা চড় মেরে পাকঘর থেকে বেরিয়ে আসে।

তারপর বারান্দার কোনায় বসে হুক্কা টানতে টানতে তার দুইচোখ ভিজে আসে।

সবারই কাঁধে সংসার নামক ঘানির জোয়াল আছে। তবু একটু ফুরসত পেলেই বাড়ির চাচি-জেঠিরা এসে সাদিরের এতিম ছেলেমেয়েগুলোর শরীরের ধুলা ঝেড়ে, নাকের হিৎ (সর্দি) মুছে কোলে তুলে নেয়। কেউ কেউ আদর করে ডেকে নিয়ে বাচ্চাগুলোকে ভাত দেয়। কেউ কেউ সাদিরের জন্যও ভাত নিয়ে আসে; বাছাব (বাবা) এইবা বইয়া (বসে) থাকলে অইত না। এগরে (বাচ্চাগুলোকে) বাঁচাইতে অইলে আরেকটা সংসার করতে অইব।

চাচির এই কথায় সাদিরের চোখ-দুইটা ছলছল করে। সে মাথা নিচু করে বসে থাকে। বউটা ছিল তার ঘরের লক্ষী। মাঠে সে ভূতের মতো খাটত আর বউটা খাটত বাড়িতে। কলুপাড়া থেকে একপোয়া সরিষার তেল এনে দিলে তাই দিয়ে সে দশদিন চালিয়ে নিত। ঘরে কিচ্ছু না থাকলেও শাক-শুঁটকি-ভর্তা যা-ই সাদিরের পাতে দিত সব অমৃতসমান। এখন বাড়ির যেদিকেই চোখ যায় খাঁ খাঁ করে। এইজন্যই মানুষ বলে, —

বউ মরে অভাইগ্গ্যার,
ঘোড়া মরে কপাইল্ল্যার।

গাঙের ঘাটে, দিঘির ঘাটে, মাঠের জমিনে কাজের সময় পাড়ার বুড়োরা প্রথমে সাদিরের জন্য একটু পস্তায়। তারপর কেউ কেউ প্রস্তাব দেয়, সাদিররে আরেকটা বিয়া করাইতে অইব।

দুপুরে গোসলের সময় ছবির বাপ গাঙের পানিতে ভুরুত ভুরুত করে পরপর তিনটা ডুব দিয়ে ওঠে। ঘাটে বসে কেন্দু শেখ নিশিন্দা ডাল দিয়ে দাঁতন করছিল; সে ফুছুত করে থুতু ফেলে বলে, ‘আইজ বৈকালে লউচা সাদিরের বাড়িত যাই। হের মা-বাপ নাই, এইসব আমরা না দেখলে ক্যাডা দ্যাখব।’

ছবির বাপ গামছা দিয়ে ভেজা শরীর মুছতে মুছতে বলে, ‘আগে পাত্রী তালাশ কর, হ্যারে আরেকটা বিয়া না করাইলে এতিম পোলাপানগুলান মইরা যাইব।’

সুরুজ ডুবে-ডুবে সময় তিন বুড়ো এসে সাদিরের বাড়ির দেউড়িতে ডাক দেয়, ‘আব্দুল সাদির…অ আব্দুল সাদির! বাড়িত আছো?’

বাড়ির ভিতর থেকে সাদিরের বিষণ্ণ ও দুর্বল গলা ভেসে আসে, — হ চাচা; আইয়ো।

সাদির বারান্দায় পিঁড়ি পেতে দেয়, হুক্কা-তামাক দেয়। মোটা মোটা হাড়ের থুম্বা থুম্বা শক্ত-সমর্থ শরীর, গাব্দা-গাব্দা হাত-পা, থুতনির সাদা দাড়িগুলা তামাকের ধোঁয়ায় কটকটা লালচে; বুড়োরা লালচে রঙের দাড়ি নাচিয়ে নাচিয়ে তামাক টানে, কথা বলে, ‘পোলাপান দুফুরে খাইছে?’

কেন্দু শেখের কথায় সাদির মরা মরা গলায় জবাব দেয়, — হ চাচা; দক্ষিণের ঘরের চাচি ভাত-ছালুন পাঠাইছিন; পোলাপান পেটভইরা খায়া ঘুমাইতাছে।

বুড়োরা হুক্কা টানে, জমিনের আলাপ করে, চাষাবাদের আলাপ করে, কাতি মাসে আর বৃষ্টিই হলো না তাই রোপা আমনের ধান নিয়ে শঙ্কার কথাও আলোচনায় আসে।

ভাশুরেরা সব সাদিরের খালি বাড়িতে এসেছে দেখে পশ্চিমের ঘরের চাচি একটা পাকা পেঁপে ফালি ফালি করে কেটে, বাটাভরা পান-সুপারি আর চিনা-মাটির প্লেটে করে পেঁপে পাঠিয়ে দেয়। পান মুখে দিয়ে বুড়োরা আবার হুক্কাতে মন দেয়। এদের মাঝে এহুদালী সরকার বয়স-বুদ্ধি-বিবেচনায় সবচে বুড়ো আর পাকা। সে হুক্কাতে শেষ টান দিয়ে কেন্দু শেখের হাতে তুলে দিতে দিতে সাদিরকে শুনিয়ে বলে, ‘আইজ মাগরিবের পরে তিরিপুইরা (ত্রিপুরা অর্থাৎ কুমিল্লা) হুজুররে জিগাইয়া দ্যাহি চল্লিশদিনের আগে বিয়া বিষয়ে হাদিস-কোরান কি কয়?’

বুড়োরা সব উঠে যায়। এই কয়দিনেই সাদির জেনে গেছে বউ-মরার চল্লিশ দিনের মধ্যে বিয়া সম্ভব না। সারাদিন পশুর খাটুনির পর তার পেটভরা ভাত চাই, নিপিত্তি বিছানা চাই, মনের দুইটা কথা বলার জন্য, মন-গতরের পেরেশানি ভোলার জন্য নরম গতরের আরেকটা মানুষ চাই। এইভাবে চললে চল্লিশদিনের আগেই তার সবকটা ছেলেমেয়ের সাথে সেও মরে যাবে! এইসব ভাবতে ভাবতে সাদিরের গতরটা কলেপড়া ইঁদুরের মতন খালি ছটফট করে আর ভাবে, — চল্লিশ দিন! চল্লিশ দিন না চল্লিশ বছর?

সাদির কাঠের সিন্দুক খুলে, জিন্নাহর ছবিওয়ালা পাঁচটাকার একটা নোট নিয়ে লুঙ্গির কোঁচড়ে গোঁজে। মাঝের ঘরের চাচির দেওয়া মাছ-ভাত পেটভরে খেয়ে ছেলেমেয়েরা এই অবেলাতেও ঘুমাচ্ছে। ঘুমাক। সাদির দরজার কপাটে শিকল তুলে মসজিদের দিকে ছোটে। তিরিপুইরা হুজুর আর আগের হুজুর নাই। কথা বলার সময় তার ক্ষুধার্ত আঁত-নাড়ি থেকে এখন আর শকুনের চিমসে গন্ধ আসে না। ভুঁড়িটা সামনের দিকে বেশ আগুয়ান। কাপড়চোপড়, শরীর-স্বাস্থ্যে, পান-জর্দা-আতরের গন্ধে আর চেহারার নুরানি রোশনাইয়ে দারুণ পরহেজগার পরহেজগার লাগে।

মসজিদের আঙিনায় হুজুর পায়চারি করছিল, সাদির সালাম দিয়ে সামনে দাঁড়ায়, — আমার পোলাপানের মার লাগি একটু দোয়া করইনযে হুজুর।

এই কথা বলে সে কোঁচড়ের নোটটা হুজুরের সামনে মেলে ধরে। চিলের মতো ছোঁ মেরে নোটটা নিয়ে হুজুর পকেটে রেখে দিয়ে বলে, ‘এশার নমাজের সময় মজ্জিদে থাইয়েন, আঁই দোয়া করিওম।’

সাদির হুজুরের আরো কাছে এসে ফিসফিস করে বলে, — মাগরিবের পরে এহুচাচা আফনেরে জিগাইব, চল্লিশদিনের আগে বিয়া বিষয়ে হাদিস-কোরান কি কয়?

এইবার হুজুর মুচকি হাসে। সাদিরের মতো কৃপণ মানুষ কেন নগদ নগদ পাঁচটাকা দেয় এই বিষয়টাও তার কাছে পরিষ্কার হয়, তাই সে মুখের হাসিটা আরেকটু চওড়া করে বলে, ‘সরকার সাবরে আঁই কই দিমু, মাছলায় ওজর থাকলে তিনদিনের পরেই পুরুষের বিয়া জায়েজ আছে।’

কয়েকদিনের মধ্যেই বাড়ির মরুব্বিরা পাত্রী-খোঁজা, বিয়ে ঠিক করা এবং সাদিরের আগের বউয়ের শাড়ি-গয়না নিয়ে, টুপ করে কলমাটা পড়িয়ে, বাড়িতে নতুন বউ নিয়ে আসে। রতিশক্তি বিষয়ে পাড়ার তরুণ কামলা ও কৃষকদের মাঝে সাদিরের খ্যাতি আসমান-উঁচা। এইসব বিষয়ে আলাপ উঠলে কেউ কেউ ফেক ফেক করে হাসতে হাসতে বলে, ‘সাদির ভাইয়ো একবার মেশিন স্টাড দিলে সহজে বন্ধ করে না।’

আজ নতুন বউয়ের সাথে সাদিরের বাসর ঘর। তাই গরুরাখাল থেকে শুরু করে অবিবাহিত কামলা আর কৃষকদের মাঝে একটা চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। সাদিরের বউ মরেছে দশ-বারো দিন আগে। এই দশ-বারোদিনের মজুদ মর্দামিশক্তি নিয়ে সাদির আজ নতুন বউয়ের সাথে বাসর রাত যাপন করবে। বউয়ের সাথে কী কথা হয়, কীরকম সান্টিং হয় এইসব তাদের পাঙসা জীবনে হঠাৎ তুফানের মতো অস্থিরতা নিয়ে এসেছে। তাই আজ তারা সন্ধ্যার মুখেই গোয়ালে গরু-বাছুর বেঁধে, হাত-পা ধুয়ে,  মাথার রুক্ষ-লাল চুলে তেল দিয়ে চিরুনিও চালিয়েছে ইচ্ছামতো। তারপর ভাতটাত খেয়ে সবগুলা রাখাল পুকুরপাড়ে বসে আদিরসাত্তক আড্ডা জমায়।

সাদির সব বিত্তান্ত জানে। আজ এবং আগামী কয়েক রাত তার ঘরের পিছনে এসে অনেকেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মশার কামড় খাবে, চৌকির কেঁতকুত শব্দের তালে তালে এক আবিল আনন্দে শিহরিত হবে। এদের কান থেকে প্রথম কয়দিনের রাতগুলাকে সে কোনোভাবেই লুকাতে পারবে না।  সে-ও তো একটা সময় এই করে এসেছে।

জয়ধরখালীর মানুষের মনে যত রকম গোপন বিকার আছে তার মাঝে এইটাও একটা। তাই চৌকির কোনায় বসে বিড়ি টানতে টানতে সাদির মনে মনে একটা প্রস্তুতি নিতে থাকে। আগের বউটার জন্য মনের কোনায় একটা কষ্ট ফাৎ ফাৎ করছে আবার নতুন বউয়ের চলন-বলনটাও আড়ে আড়ে ঠাহর করে। তার এই বউটাও খুব চালাক। পালকি থেকে নেমে, ঘরে এসেই বাচ্চাগুলাকে কোলের কাছে নিয়ে বসেছে, তারপর গোসল করিয়ে পেট ভরে ভাত খাইয়েছে। আর এখন ওদেরকে ঘুমপাড়ানোর জন্য ঘরের উত্তরের পাশের চৌকিটাতে সাথে নিয়ে শুয়েছে। ছেলেমেয়েরা ঘুমালেই সে গিয়ে নতুন বউকে তার বিছানায় নিয়ে আসবে। তাকে পান-সুপারি দিয়ে যাবার সময় বউটার চোখ দেখেই সাদির এইসব বুঝেছে। বেশ উঁচা-লম্বা আর দোহারা গড়নের বউটা সামনে-পিছে যথেষ্ট হৃষ্টপুষ্ট। সাদিরের বউয়ের এইটা দ্বিতীয় বিয়ে। প্রথম বিয়ের তিন মাসের মাথায় নাকি স্বামীটা মরেছিল সাপের দংশনে। বউয়ের বয়সও কমপক্ষে কুড়ি-বাইশ। তার সামর্থের সাথে বউয়ের শারীরিক যোগ্যতার আপাত-বিবেচনায় সন্তুষ্ট সাদির খুশি মনে বিড়িতে লম্বা টান দেয়। একমুখ ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে মুচকি হাসে আর বিড়বিড় করে বলে, — দ্যাহাম হালারা আইজ ঘরের পিছে কতক্ষণ বইয়া থাকতারছ?

গাঙপাড়ের কড়ই গাছ থেকে ঈগল পাখিটা কুউড়া-কুড়ড়…করে রাত তিনপ্রহরের ডাক দিলে চ্যাংড়াচ্যাংড়া কামলা-কিষানরা সাদিরের ঘরের পিছন থেকে উঠে আসে। পিঠ চুলকাতে চুলকাতে একজন বলে, ‘ইস্…মশায় আমারে খায়া ফালছে!’

একজন বলে, ‘দ্যাখছস সাদির ভাইয়ো বউরে কি লাম্বা সান্টিং দিছে! এই বিষয়ে বাজি হইলে সাদির ভাইয়ো বিশ্বচ্যাম্পিয়ান হইয়া যাইব।’
তারা হাঁটতে হাঁটতে পুকুরপাড়ের বাংলা ঘরে চলে আসে।
একজন বলে, ‘বউডাও মনের মতন!’

কথাটা যে বলল সে বিবাহিত। জয়ধরখালী থেকে তিনগ্রাম পুবে তার বাড়ি। দশ-বারোদিন পরে পরে সে বাড়ি যায় বউয়ের সাথে ঘুমাতে। সাদিরের চৌকির যে মড়মড়ানি-কড়কড়ানি শুনে এসেছে আজ রাতে আর তার ঘুম হবে না। শেষের দিকে বউটা অপারগ হয়ে সাদিরের হাতে-পায়ে ধরা শুরু করেছিল। সাদিরের এই বীরত্ব আগামী কয়েক মাস তারা যাকে সামনে পাবে তার কাছেই ফলাও করে বলবে। তারপর জোয়ান চাকর-মনিব সকলেই ফেক ফেক করে একচোট হাসবে।

‘পেটটা আর চেটটা না থাকলেই ভালা আছিন।’  —
এই কথা যে বলল তার বয়স চব্বিশ পেরিয়েছে কবেই। মানুষের বাড়িতে বছরবন্দী কামলা খেটে পেটের ভাত জোগায়। বাড়িতে একটা ঢেঁড়াও নাই, দিবার মতো সামর্থও নাই তাই সে বিয়ের কথা কল্পনাও করতে পারে না। বয়সে সবচে বড় আর বিবাহিত সেই কামলাটা জোরে জোরে বলে, ‘যার পেট নাই, চেটও নাই তার কোনো জীবন নাই।’

এই বাক্য শুনে কেউ আর কথা বলে না। একজন খড়ের নিবু নিবু বেনি ফুঁ দিয়ে জ্বালায়। হঠাৎ দপ করে জ্বলে-ওঠা আগুনের লাল শিখা থেকে আরেকজন শেষ বিড়িটা ধরায়। তারপর তারা নিজ নিজ বেদিশা জীবনের কথা ভাবতে ভাবতে অন্ধকারেই কাদাভরা পা খড়ের মাঝে ঘষে, একটা চৌকিতে সবাই গাদাগাদি করে শুয়ে পড়ে।  একজন শেষ-হয়ে-আসা বিড়িটা ঘরের কোনার দিকে ছুঁড়ে মারে। আগুনের লাল বিন্দুটুকু নিভে গেলে লক্ষ লক্ষ মশার গুঞ্জনে ঘরের অন্ধকার এইসব ভাঙাচোরা মানুষের গতরগুলাকে এক-লহমায় লুকিয়ে ফেলে।

প্রিভিয়াসলি অন জয়ধরখালী

… …

শেখ লুৎফর

COMMENTS

error: