জয়ধরখালী ৭ || শেখ লুৎফর

জয়ধরখালী ৭ || শেখ লুৎফর

‘তোমরা ক্যাডা কৈ আছ গ, আমার রঞ্জু বিষ খাইছে…।’

রঞ্জুর মায়ের এই বুকফাটা আর্তনাদে আষাঢ়ের নিরল দুপুর, মাঠের পর মাঠ পাটক্ষেতের সবুজ শান্তি খানখান হয়ে ভেঙে পড়ে জয়ধরখালীর ঘরে ঘরে। যে যেখানে ছিল হাতের কাম ফেলে সবাই ছুটতে থাকে রঞ্জুদের বাড়ির দিকে। নিথর রঞ্জু বাড়ির সামনের খলায় পড়ে আছে। তার দবদবা ফর্সা দেহটা বিষে নীল হয়ে গেছে। চারপাশে শুধু লুঙ্গি-গামছা পরা আধা-উলঙ্গ মানুষের ভিড়। হতাশায় ঘাড় মটকে একটা বদনা রঞ্জুর দেহের পাশে উপুত হয়ে পড়ে আছে। সারাটা চত্বর গুয়ের পানিতে সয়লাব।

দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে আস্ত এক বোতল বিষ গলায় ঢেলে দেওয়ার পর রঞ্জু উন্মাদ হয়ে গেছিল। বুক চাপড়াতে চাপড়াতে চিৎকার দিয়ে উঠানে পড়ে, —

আমার বুক জ্বইল্ল্যা যাইতাছে গ, আমি মরিয়মের লাইগ্গ্যা বিষ খাইছি… বিষ … বিষ …

চিৎকার করতে করতে রঞ্জু সারাপাড়া জুড়ে ছুটতে থাকে। চারপাশের মানুষ প্রথমে হতবাক। তারপর বিবেচনা করে বুঝতে পারে না রঞ্জুর কী হয়েছে। দুই-তিন মিনিটের মধ্যেই ছুটন্ত রঞ্জু ধপাস করে মাটিতে পড়ে যায়। লোকজন ছুটে এসে দেখে রঞ্জুর মুখে বিষের দুর্গন্ধ, দেহটা পাত্থরের মতো ঠাণ্ডা আর নীল। দশমাইল দূরের গফরগাঁও থানা সদর ছাড়া কোনো ডাক্তার নাই। চারমাইল দূরের কাওরাইদ বাজার ছাড়া কোনো ওষুধের দোকান নাই। লোকজন লোটা-বাটি-ঘটি ভরে পানি নিয়ে ছুটে আসতে থাকে। একজন আধাবদনা গু নিয়ে ছুটে আসে, —

পানিত্ গুইল্ল্যা গু খাওয়াও; ত্যা বমি করব, পেটের বিষ বমির লগে বাইর হইয়া যাইব।

গুয়েই কী আর গোবরেই কী আসে যায়; রঞ্জুর দেহে এই দুনিয়ার কোনো কারু নাই।

মরিয়ম দক্ষিণপাড়ার অফির মিয়ার মেয়ে। শ্যামলা হরিণীর মতো চোখ-মুখ, ছিপছিপা লম্বা যুবতীর পিঠভর্তি থাকথাক চুল। কী বুড়া, কী জোয়ান এক-নজর চাইলে যৈবতী কন্যার দিকে আরেকবার ফিরে তাকাতে মন চায়। নির্জন দুপুরে গাঙের ঘাটে কিংবা শাক তোলার ছলে, পাটক্ষেতে পাটক্ষেতে রঞ্জু আর মরিয়ম মনের বৈঠা দিয়ে পিরিতির নাও ভাসায়া দিছিল যেন রূপকথার লবালং সাগর।

মরিয়মের ভালো ভালো বিয়ের ঘর আসে, ভেঙে যায়। গ্রামের কেউ একটা পাদ মারলেও চাপা থাকে না; এই জিনিস গোপন থাকে কী করে? এখন দুপুর হলে মরিয়মের মা সর্তক হয়ে ওঠে। একদিন বাড়ির দক্ষিণের পাটক্ষেতে প্রায় হাতেনাতেই ধরে ফেলেছিল। তারপর থেকে মরিয়ম ঘরে বন্দি। গঙ্গাজলি ডাবের মতো পিরিতির শাঁস সবে জমে উঠেছে। তাই প্রিয়তমার বিরহে রঞ্জু প্রায় উন্মাদ। মরিয়মের সাথে প্রণয়ের প্রথম সবকের পরেই সে সাহাপাড়া থেকে একটা গোলাপগাছ চুরি করে এনে তার ঘরের সামনে রোপণ করেছিল। এখন তরতরা তরুণ গাছটার ডালে ডালে গোলাপফুলের ছলছলানি বাহার। সেই গাছের একটা তাজা ফুল লুঙ্গির কোঁচড়ে নিয়ে রঞ্জু একবার গাঙ্গের ঘাটে যায়; একবার দক্ষিণের পাটক্ষেতে যায়। পাখি নাই! রঞ্জুর হীরামন পাখি নাই! পিরিতির শেলে জ্বলে-পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাচ্ছে তার সোনার বুক। তাই রঞ্জু সাহস করে মরিয়মদের বাড়ির পিছনের বাতর দিয়ে সারাদুপুর খালি চক্কর দিয়েছে। মরিয়মের কোনো সাড়া-শব্দ নাই।

অফির মিয়া গরু বেচতে সকাল সকাল বিরুনিয়া বাজারে গেছে। ছেলেরা গাঙ্গের ঘাটে। কী সুবুদ্ধি! কী কুবুদ্ধি! মেয়ের মতো দেখতে অবিকল মরিয়মের মায়ের যে কী হয় কে জানে। সে একটু মুচকি হেসে মরিয়মের কালোপাড় শাড়িটা পরে মাথায় ঘোমটা তুলে দেয়। তারপর শাক তুলবার জন্য বিসমিল্লা বলে দক্ষিণের পাটক্ষেতে নেমে যায়। আষাঢ় মাসের খা খা দুপুর। গাঙপাড়ের উঁচা কড়ইগাছে বসে একটা ঈগল পাখি ডাকছে, কুউড়া, কুইড়া, কুড়–ড়…।

রঞ্জু এই পথে আবার ফিরে আসে। মরিয়মদের বাড়ির দক্ষিণের পাটক্ষেতে পাটগাছের মাথা নড়ছে! মানে মরিয়ম আজ শাক তুলতে এসেছে? রঞ্জুর বুকটা ধড়াস করে ওঠে। দেহ-মনের তাবৎ চেতনা চকচক করে দুইচোখে জ্বলছে। অন্ধ অনুভবশূন্য জ্বরতাপের ঘোরে সে হাল্কা পায়ে পাটক্ষেতে নেমে পড়ে। কামনার আগুনে গলা শুকিয়ে কাঠ! কানদুটো শা শা করছে। সে গুটিগুটি কদমে এগিয়ে গিয়ে পিছন থেকে মরিয়মকে জড়িয়ে ধরে। মহূর্তে মরিয়মের মা চিৎকার দিয়ে রঞ্জুর গালে ঠাস করে চড় বসায়, —

ছাড়, আমারে ছাড় লুচ্চার ঘরের লুচ্চা!

… …

শেখ লুৎফর

COMMENTS

error: